শহরে জমি না থাকলেও বাড়ির ছাদ, বারান্দা বা কার্নিশে নানা আকারের টবে শীতের শাক-সবজি ফলানো যায়। জাগো নিউজ ২৪-এর একটি প্রতিবেদনে টবে সবজি চাষের ধাপগুলো তুলে ধরা হয়েছিল: কোন সবজি লাগানো যায়, টবের মাটি কেমন হবে, বীজ কীভাবে বুনতে হয়, সেচ ও পরিচর্যা কীভাবে করতে হয় এবং কখন সবজি তুলতে হয়। কৃষি তথ্য সার্ভিস (এআইএস) এবং যুক্তরাষ্ট্রের দুটি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের নির্দেশিকা মিলিয়ে সেই পরামর্শগুলো এখানে আরও বিস্তারিত দেওয়া হলো।
টবে কোন কোন সবজি লাগানো যায়
প্রতিবেদনে যেসব শাক-সবজির নাম এসেছিল:
- ফল জাতীয় সবজি: টমেটো, বেগুন, মরিচ, শসা, ঝিঙে, মিষ্টি কুমড়া, লাউ, পেঁপে
- শুঁটি জাতীয়: মটরশুঁটি, কলমি শুঁটি
- শাক: কলমি শাক, পুঁই শাক, লেটুস, ব্রোকলি
- সুগন্ধি ও ঔষধি পাতা: পুদিনা, ধনেপাতা, থানকুনি
এআইএসে প্রকাশিত নগর কৃষি উৎপাদন সহায়ক (পাইলট) প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক কৃষিবিদ মো. শামীম শেখের লেখা ছাদ বাগান নির্দেশিকায় লাউয়ের জন্য বারি লাউ-৪ ও হাজারী এবং শিমের জন্য বারি শিম-৭ জাতের কথা বলা হয়েছে; ছাদে খাটো জাতের শিম ভালো। ভার্জিনিয়া কোঅপারেটিভ এক্সটেনশনের নির্দেশিকা অনুযায়ী টমেটো, মরিচের মতো ফল জাতীয় সবজির দিনে অন্তত ছয় ঘণ্টা সরাসরি রোদ লাগে, আট থেকে দশ ঘণ্টা পেলে ফলন আরও ভালো হয়। অন্যদিকে ইউনিভার্সিটি অব মেরিল্যান্ড এক্সটেনশন বলছে, লেটুস ও পালংয়ের মতো শীতের শাকের জন্য দিনে তিন থেকে পাঁচ ঘণ্টা সরাসরি রোদই যথেষ্ট।

টবের মাটি তৈরি ও পানি নিষ্কাশন
জাগো নিউজের প্রতিবেদন অনুযায়ী টবের মাটি হতে হবে ঝরঝরে ও হালকা, অথচ পানি ধরে রাখার ক্ষমতা থাকতে হবে। মাটি চালনি দিয়ে চেলে নিতে হয়। দুই ভাগ বেলে দো-আঁশ মাটির সঙ্গে দুই ভাগ জৈব সার মিশিয়ে বীজতলার মাটি তৈরি করা যায়; মাটি এঁটেল হলে এক ভাগ বালি মিশিয়ে হালকা করে নিতে হয়। এআইএসের নির্দেশিকায় অর্ধেক মাটি ও অর্ধেক জৈব সারের সঙ্গে ১০০ গ্রাম ইউরিয়া, ১০০ গ্রাম টিএসপি, ১০০ গ্রাম এমওপি ও ২০০ গ্রাম হাড়ের গুঁড়া মিশিয়ে টব ভরার কথা বলা হয়েছে।
মূল প্রতিবেদনে চারাকে রোগবালাই থেকে বাঁচাতে ৪০ শতাংশ ফরমালডিহাইড পানিতে মিশিয়ে মাটি জীবাণুমুক্ত করার একটি পদ্ধতিও দেওয়া হয়েছিল। তবে আন্তর্জাতিক ক্যানসার গবেষণা সংস্থা (আইএআরসি) ফরমালডিহাইডকে মানুষের জন্য নিশ্চিত ক্যানসার সৃষ্টিকারী (গ্রুপ ১) পদার্থ হিসেবে শ্রেণিভুক্ত করেছে, তাই ঘরের ছাদ বা বারান্দায় এটি ব্যবহারে বাড়তি সতর্কতা দরকার। মেরিল্যান্ড এক্সটেনশনের পরামর্শ হলো জীবাণু, পোকা ও আগাছার বীজমুক্ত পরিষ্কার মিশ্রণ ব্যবহার করা। প্রতিটি টবের তলায় পানি বের হওয়ার ছিদ্র থাকতে হবে, যাতে শিকড় পানিতে ডুবে পচে না যায়; আর টবের তলায় নুড়ি বিছালে নিষ্কাশন ভালো হয় না, বরং খারাপ হয়।
বীজ বপন ও সেচ
- মাটি ঝরঝরে করে টবের ওপরের অংশ সমান করুন।
- হালকাভাবে বীজ ছিটিয়ে দিন।
- জৈব সারের পাতলা স্তর দিয়ে বীজ ঢেকে দিন।
- ছোট ছিদ্রওয়ালা ঝাঁঝরি দিয়ে নিয়মিত পানি দিন, যাতে পানির ঝাপটায় বীজের ওপরের আবরণ সরে না যায়।
- ছোট বীজের টবে ওপর থেকে পানি না ঢেলে তলা দিয়ে সেচের ব্যবস্থা করুন, তাতে বীজ এক জায়গায় জড়ো হয়ে অঙ্কুরোদগম ব্যাহত হয় না।
এআইএসের নির্দেশিকা দিনে দুবার, সকালে ও বিকেলে, পরিমিত পানি দিতে বলেছে। ভার্জিনিয়া এক্সটেনশনের মতে গাছ বেড়ে ওঠার পর প্রতিদিন, গরম ও বাতাসের দিনে দিনে দুবারও পানি লাগতে পারে, আর পানি দিতে হয় যতক্ষণ না তলার ছিদ্র দিয়ে বের হয়। মেরিল্যান্ড এক্সটেনশন বলছে, পানি দেওয়ার আগে আঙুল দিয়ে মাটির ভেতরের আর্দ্রতা দেখে নিন এবং পানি দিন গাছের গোড়ায়, পাতায় নয়।

পরিচর্যা, বালাই দমন ও সবজি তোলা
পাখির হাত থেকে ফসল বাঁচাতে টবের ওপর তারের বা নাইলনের জাল দিয়ে ঢেকে রাখতে হয়। টবে আগাছা জন্মালে নিড়ানি দিয়ে তুলে ফেলতে হবে, তবে চারার গোড়ায় যেন আঘাত না লাগে। টব রাখতে হবে আলো-বাতাস চলাচল করে এমন জায়গায়; ঝড়, ভারী বৃষ্টি বা কড়া রোদের সময় সাময়িকভাবে নিরাপদ জায়গায় সরিয়ে নেওয়া যায়।
মূল প্রতিবেদনে পিঁপড়া ও মাকড়সা দমনে হেপ্টাক্লোর ৪০ ব্যবহারের কথা বলা হয়েছিল। হেপ্টাক্লোর একটি অর্গানোক্লোরিন কীটনাশক, যা স্টকহোম কনভেনশনের তালিকাভুক্ত স্থায়ী জৈব দূষক; পরিবেশে এটি কয়েক দশক টিকে থাকতে পারে এবং আইএআরসি ও যুক্তরাষ্ট্রের পরিবেশ সুরক্ষা সংস্থা এটিকে মানুষের সম্ভাব্য ক্যানসার সৃষ্টিকারী হিসেবে শ্রেণিভুক্ত করেছে। তাই এখানে সেটির বদলে এআইএসের পরামর্শটি দেওয়া হলো: নিমতেল, সাবান পানি বা তামাক পাতা ভেজানো পানির মতো জৈব বালাইনাশক ৭ থেকে ১০ দিন পরপর ছিটানো এবং মাছি পোকা দমনে ফেরোমন ফাঁদ ব্যবহার।

সবজি বেশিদিন গাছে না রেখে নরম থাকতেই তোলা ভালো। গাছ থেকে টেনে ছিঁড়ে না নিয়ে আস্তে কেটে সংগ্রহ করলে গাছের ক্ষতি হয় না। এআইএসের নির্দেশিকা অনুযায়ী প্রতি বছর টবের ওপরের তিন থেকে চার ইঞ্চি মাটি বদলে নতুন সার দিতে হয়।
ছবি: AbuSayeed / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, কৃষি তথ্য সার্ভিস (এআইএস), ভার্জিনিয়া কোঅপারেটিভ এক্সটেনশন, ইউনিভার্সিটি অব মেরিল্যান্ড এক্সটেনশন, উইকিপিডিয়া (হেপ্টাক্লোর ও ফরমালডিহাইড)





মন্তব্য
(০)