২০২০ সালের ৩১ জুলাই, ঈদুল আজহার আগের দিন শুক্রবার, রাজধানী ঢাকার পশুর হাটগুলোতে গরুর সরবরাহ প্রায় ফুরিয়ে গিয়েছিল। ফলে শেষ মুহূর্তে কোরবানির পশু কিনতে বের হওয়া নগরবাসীর ভরসা হয়ে উঠেছিল ছাগল। জাগো নিউজ ২৪-এর সেদিনের প্রতিবেদনে উঠে আসে, আগের কয়েক দিনের তুলনায় গরুর দাম অনেক বেড়ে যাওয়ায় মানুষ এক হাট থেকে আরেক হাটে ঘুরছিলেন, আর কোথাও কোথাও বাড়তি টাকা দিয়েও পছন্দের গরু মিলছিল না। সেদিন সকাল থেকেই ছাগলের চাহিদা বেড়ে যায়।
পাড়া-মহল্লায় ছাগলের অনির্ধারিত হাট
সরেজমিনে দেখা গিয়েছিল, পাড়া-মহল্লা থেকে শুরু করে ছোট-বড় সড়কের পাশে ছাগলের অনির্ধারিত হাট বসেছে এবং প্রতিটি জায়গায় ক্রেতার ভিড়। সরবরাহের চেয়ে ক্রেতা বেশি থাকায় বিক্রেতারা ছাগলভেদে অন্য সময়ের চেয়ে অন্তত দুই হাজার থেকে ১০ হাজার টাকা বেশি দাম চাইছিলেন। গরু কিনতে না পেরে অনেকে একাধিক ছাগল কিনে বাড়ি ফিরছিলেন।
পলাশী মোড়ে মিউনিসিপ্যাল মার্কেটের পাশের রাস্তায় বসা হাটে সাত বছরের ছেলেকে নিয়ে ছাগল কিনতে এসেছিলেন পলাশী স্টাফ কোয়ার্টারের বাসিন্দা সরকারি কর্মকর্তা আবদুস সালাম। বিক্রেতা একটি ছোট ছাগলের দাম চেয়েছিলেন ১১ হাজার টাকা। সাত হাজার টাকা থেকে দরদাম শুরু করে শেষ পর্যন্ত নয় হাজার টাকায় ছাগলটি কেনেন তিনি। তার মতে, ছাগলটির দাম কোনোভাবেই সাত হাজার টাকার বেশি হওয়ার কথা ছিল না।

বাজেট আর দামের ফারাক
বকশীবাজার মোড়ে একটি ছাগলের দরদাম করছিলেন মৌলভীবাজারের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী শাহাদাত হোসেন। বিক্রেতা একদাম ২২ হাজার টাকা চাইলে তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, হাটে গরু নেই খবর পেয়ে বড়জোর ১৫ হাজার টাকার ছাগলের দাম ২২ হাজার টাকা হাঁকা হচ্ছে। পাশে দাঁড়ানো এক তরুণকে তিনি বলছিলেন, ‘এত দাম দিয়ে কোরবানি দেয়ার মানে হয় না। চল বাসায় ফিরে যাই।’
শাহাদাত হোসেন জানিয়েছিলেন, প্রতিবছর কয়েকজন মিলে তিনি গরু কোরবানি দেন। করোনার কারণে ব্যবসা ভালো না যাওয়ায় শেষ দিনে গরু কেনার পরিকল্পনা করেছিলেন, কিন্তু শেষ সময়ে হাটে গরু পাওয়া যাবে না, তা ভাবেননি। তার বাজেট ছিল ১২ থেকে ১৫ হাজার টাকা, অথচ পছন্দের ছাগল কিনতে ২২ থেকে ২৫ হাজার টাকা লেগে যাচ্ছিল।
ছাগল বিক্রেতা মোজাম্মেল হক বলেছিলেন, ‘ছাগলের মাংসের দাম এমনিতেই প্রতিকেজি ৯০০ টাকা। সে হিসাবে ছাগলের দাম বেশি।’ ঈদ সামনে রেখে কয়েক দিনের পরিশ্রমে কিছু লাভ করতে চান বলেও জানান তিনি। তবে হাটে গরু না থাকায় ছাগলের চাহিদা বেড়েছে এবং সে কারণেই বিক্রেতারা দাম বাড়িয়েছেন, এ কথা তিনি স্বীকার করেন।

শেষ দুই দিনে ঢাকার হাটে সরবরাহ সংকট
ঢাকা ট্রিবিউনও একই দিনে জানিয়েছিল, শেষ দুই দিনে ঢাকার কোরবানির হাটগুলোতে সরবরাহ ঘাটতির কারণে পশুর দাম বেড়ে যায় এবং ছোট ও মাঝারি আকারের গরু প্রায় সবই বিক্রি হয়ে গিয়েছিল। পত্রিকাটির উদাহরণে, এক ক্রেতাকে পাঁচটি হাট ঘুরে এক লাখ ২০ হাজার টাকায় একটি গরু কিনতে হয়েছিল, যার দাম দুই-তিন দিন আগে ছিল প্রায় ৯০ হাজার টাকা। রাজধানীর সবচেয়ে বড় গাবতলী পশুর হাটের এক রাজস্ব আদায়কারী জানিয়েছিলেন, ঈদের মাত্র দুই দিন আগে থেকে চাহিদা চূড়ায় ওঠে।
অথচ দেশের সামগ্রিক সরবরাহে ঘাটতি ছিল না। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তৎকালীন মহাপরিচালক আবদুল জব্বার শিকদার সে বছরের জুলাইয়ের শুরুতে দ্য ডেইলি স্টারকে জানিয়েছিলেন, কোরবানির জন্য ১ কোটি ১৯ লাখ পশু প্রস্তুত করা হয়েছে, আগের বছর যা ছিল ১ কোটি ১৮ লাখ। ঢাকা ট্রিবিউনের প্রতিবেদন অনুযায়ী প্রস্তুত পশুর মধ্যে গরু ও মহিষ ছিল প্রায় ৪৫ লাখ ৩৮ হাজার, বাকিগুলো ছাগল ও ভেড়া।
সেবারের ঈদুল আজহা হয়েছিল করোনা মহামারির মধ্যে; বাংলাদেশে ঈদের দিন নির্ধারিত ছিল ১ আগস্ট। হাটে মাস্ক পরা, নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখা ও হাত ধোয়ার ব্যবস্থা রাখার সরকারি নির্দেশনা ছিল। তবে দ্য ডেইলি স্টারের ২৭ জুলাইয়ের প্রতিবেদনে উঠে আসে, পটুয়াখালীর পশুর হাটগুলোতে বেশির ভাগ মানুষ মাস্ক পরেননি এবং নিরাপদ দূরত্বও মানা হয়নি।

ছবি: Salim Khandoker / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 3.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, ঢাকা ট্রিবিউন, দ্য ডেইলি স্টার





মন্তব্য
(০)