সরাসরিবাজারদর
আটা (প্যাকেটজাত)৫৮—আদা - আমদানিকৃত১৬৭—আদা - দেশী১৫৪—আমন চাল - মাঝারি৫৬—আমন চাল - মোটা৪৮—আমন চাল - সরু৭২—আয়োডিনযুক্ত লবণ (প্যাকেটজাত)৩২—কাঁচা মরিচ২১৮—খামারের মুরগী১৬২—খাসী৯০০—চিনি (দেশী)১৩২—ছোলা - গোটা৮৫—ডিম ফার্ম - লাল৪৭—পেঁয়াজ - দেশী৬০—বোরো চাল - মাঝারি৫৫—বোরো চাল - মোটা৪৭—বোরো চাল - সরু৬৬—মাংসঃ– গরু৭২৯—মুগ ডাল১২২—রসুন - আমদানিকৃত১৯২—রসুন - দেশী১৭৩—সয়াবিন তেল১৬৩—
হালনাগাদ ৭ নভেম্বর ২০২৬
ঢাকা২৮°পরিষ্কার আকাশআর্দ্রতা ৬৫%বাতাস ৯ কিমি/ঘ

AEZ-০৮: তরুণ ব্রহ্মপুত্র-যমুনা প্লাবনভূমি, যেখানে একই গ্রামের দুই জমির হিসাব দুই রকম

উঁচু ভাঁজ, নিচু অববাহিকা আর পুরোনো নদীখাতে ভরা প্রায় ৫ লাখ ৯২ হাজার হেক্টরের এই অঞ্চলে পাশাপাশি দুটি জমির মাটি, পানি আর ফসলের হিসাব আলাদা হতে পারে। জমি বুঝে পরিকল্পনাই এখানে ভালো ফলনের পথ।

AEZ-০৮: তরুণ ব্রহ্মপুত্র-যমুনা প্লাবনভূমি, যেখানে একই গ্রামের দুই জমির হিসাব দুই রকম
বাংলাদেশ

একই গ্রামের দুটি জমি, মাঝখানে একটি আল। বর্ষা শেষে একটি জমির পানি কয়েক দিনেই নেমে যায়, মাটি শুকিয়ে ঝুরঝুরে হয়ে ওঠে। পাশের জমিতে তখনও পানি দাঁড়িয়ে থাকে, পা ফেললে কাদায় ডুবে যায়। প্রথম জমির মালিক যখন শীতের ফসলের জন্য চাষ দিচ্ছেন, দ্বিতীয় জন তখনও অপেক্ষায়, কবে পানি সরবে। দুজনের গ্রাম এক, আকাশ এক, বৃষ্টিও এক। তবু তাঁদের চাষের হিসাব আলাদা।

এই পার্থক্যের পেছনে আছে একটি নদীর দীর্ঘ ইতিহাস। ব্রহ্মপুত্র যুগের পর যুগ যে পলি ফেলে গেছে, তা সবখানে সমানভাবে পড়েনি। কোথাও উঁচু হয়ে জমেছে, কোথাও নিচু খাদ রয়ে গেছে, কোথাও পুরোনো নদীখাত আধা ভরাট হয়ে পড়ে আছে। জমির উচ্চতা, মাটির ধরন আর পানি চলাচলের পথ, এই তিনে মিলে ঠিক হয় কোন জমিতে কী হবে।

দেশের কৃষি মানচিত্রে এই ভূভাগের নাম তরুণ ব্রহ্মপুত্র-যমুনা প্লাবনভূমি, কৃষি-পরিবেশ অঞ্চল ৮। কৃষি গবেষকেরা একে এইজেড-০৮ নামেও চেনেন। মাটি, ভূমির গড়ন, পানি আর আবহাওয়ার মিল দেখে বাংলাদেশকে ৩০টি কৃষি-পরিবেশ অঞ্চলে ভাগ করা হয়েছে, যাতে কোথায় কোন ফসল ভালো হবে তা বোঝা যায়। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের (বিএআরসি) ২০২৪ সালের সার সুপারিশ নির্দেশিকা বলছে, এই অঞ্চলের আয়তন ৫ লাখ ৯২ হাজার ৩৯৪ হেক্টর। সেই হিসাবে প্রায় ৫ হাজার ৯২৪ বর্গকিলোমিটার, একরে প্রায় সাড়ে ১৪ লাখ।

নাম শুনে পাশের অঞ্চলের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলা খুব স্বাভাবিক। কৃষি-পরিবেশ অঞ্চল ৭ হলো সক্রিয় ব্রহ্মপুত্র-যমুনা প্লাবনভূমি, যেখানে নদীর বুকে চর জাগে আর ভাঙে। অঞ্চল ৯ হলো পুরাতন ব্রহ্মপুত্র প্লাবনভূমি। অঞ্চল ৮ এই দুইয়ের থেকে আলাদা। এখানকার মূল কথা নদীভাঙন নয়, বরং উঁচু-নিচু জমির বৈচিত্র্য, মাটির পার্থক্য আর পানি ব্যবস্থাপনা।

ময়মনসিংহের শম্ভুগঞ্জে পুরাতন ব্রহ্মপুত্র। নদীর মূল স্রোত সরে গেলেও এই ধারা আজও বয়ে চলেছে। ছবি: অনুপ সাদি / উইকিমিডিয়া কমন্স (সিসি বাই-এসএ ৪.০)
ময়মনসিংহের শম্ভুগঞ্জে পুরাতন ব্রহ্মপুত্র। নদীর মূল স্রোত সরে গেলেও এই ধারা আজও বয়ে চলেছে। ছবি: অনুপ সাদি / উইকিমিডিয়া কমন্স (সিসি বাই-এসএ ৪.০)

নদী সরে গেছে, রেখে গেছে জমির নকশা


এই অঞ্চল বুঝতে হলে একটু পেছনে তাকাতে হয়। বিএআরসির নির্দেশিকা অনুযায়ী, প্রায় ২০০ বছর আগে ব্রহ্মপুত্রের মূল স্রোত সরে গিয়ে আজকের যমুনা খাতে চলে আসে। নদী পথ বদলালেও তার পুরোনো ধারা একেবারে হারিয়ে যায়নি। ময়মনসিংহ দিয়ে বয়ে চলা পুরাতন ব্রহ্মপুত্র তারই চিহ্ন।

নির্দেশিকায় এই অঞ্চলের পরিচয় দেওয়া হয়েছে ব্রহ্মপুত্রের পলিতে গড়া ভূমি হিসেবে, যার গড়ন বেশ জটিল। আছে চওড়া ও সরু উঁচু ভাঁজ, দুই ভাঁজের মাঝে নিচু জায়গা, আধা ভরাট হয়ে যাওয়া পুরোনো নদীখাত আর অববাহিকা। অববাহিকা মানে চারপাশের চেয়ে নিচু এমন জায়গা, যেখানে পানি গড়িয়ে এসে জমে। এই উঁচু ভাঁজগুলোকে ভূগোলের ভাষায় বলে রিজ।

রিজ তৈরি হওয়ার কারণটি বোঝা কঠিন নয়। বর্ষায় নদী উপচে পানি যখন দুই পাশে ছড়িয়ে পড়ে, তখন স্রোতের গতি কমে যায়। পাড়ের কাছেই তুলনামূলক ভারী কণাগুলো আগে নেমে পড়ে। বছরের পর বছর এভাবে জমে জমে নদীর ধারে তৈরি হয় অপেক্ষাকৃত উঁচু জমি। অতি মিহি কাদা ভেসে যায় আরও দূরে, পানি সেখানে স্থির হয়ে দাঁড়ায়, আর সেখানেই জমে ভারী কাদামাটি।

সে কারণে এই অঞ্চল এক রকম সমতল মাঠ নয়। চোখে দেখে খুব বেশি উঁচু-নিচু মনে না হলেও বর্ষার পানি ঠিকই ধরিয়ে দেয় কোন জমি কোথায় আছে।

অঞ্চলটি কোথায়, কতটা জুড়ে


বিএআরসির তালিকায় এই অঞ্চলের প্রধান জেলা আটটি। সবচেয়ে বেশি অংশ জামালপুরে, প্রায় ৯৪ হাজার ৩০০ হেক্টর। এরপর ময়মনসিংহে প্রায় ৮৬ হাজার ১০০, কিশোরগঞ্জে ৭৭ হাজার ৬০০ এবং মানিকগঞ্জে ৭১ হাজার হেক্টর। শেরপুরে প্রায় ১৭ হাজার ৪০০, মুন্সিগঞ্জে ১৩ হাজার ৪০০, নরসিংদীতে ৯ হাজার ৩০০ আর নারায়ণগঞ্জে ৫ হাজার ৬০০ হেক্টর।

এই আট জেলা মিলিয়ে হয় প্রায় ৩ লাখ ৭৪ হাজার ৭০০ হেক্টর, অর্থাৎ পুরো অঞ্চলের প্রায় ৬৩ শতাংশ। বাকি অংশের জেলাভিত্তিক হিসাব এই তালিকায় নেই। অন্য কিছু আঞ্চলিক ভূমি-সম্পদ বিবরণে টাঙ্গাইল, ঢাকা ও গাজীপুরের কিছু অংশের কথাও পাওয়া যায়।

এখানে একটি সতর্কতা জরুরি। জেলার নাম দেখে পুরো জেলাকে এই অঞ্চলের অংশ ভাবলে ভুল হবে। একই নির্দেশিকার হিসাবে জামালপুরের প্রায় ৩৩ হাজার ৮০০ হেক্টর পড়েছে অঞ্চল ৭-এ, ৯৪ হাজার ৩০০ হেক্টর অঞ্চল ৮-এ আর ৬৭ হাজার ১০০ হেক্টর অঞ্চল ৯-এ। অর্থাৎ এক জেলার ভেতরেই তিনটি আলাদা কৃষি-পরিবেশ অঞ্চল। কোনো উপজেলা, ইউনিয়ন বা গ্রাম ঠিক কোন অঞ্চলে পড়েছে, তা জানতে সরকারি মানচিত্র দেখে নিতে হয়।

এই অঞ্চলের অনেকটাই রাজধানীর খুব দূরে নয়। মানিকগঞ্জ, মুন্সিগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ আর নরসিংদী ঢাকার পাশের জেলা, আবার জামালপুর, শেরপুর, ময়মনসিংহ ও কিশোরগঞ্জ রয়েছে দেশের উত্তর-মধ্য অংশে। ফলে এই জমির কথা শুধু দূরের কোনো গ্রামের কথা নয়। এখানকার পানি আর মাটির হিসাব জড়িয়ে আছে দেশের মধ্যাঞ্চলের কৃষির সঙ্গেই।

আরেকটি কথা মনে রাখা ভালো। প্রায় ৫ লাখ ৯২ হাজার হেক্টরের এই সংখ্যাটি একটি প্রকাশিত হিসাব। এটি ২০২৬ সালে নতুন করে মাপা কোনো তথ্য নয়। মানচিত্রের সময় ও প্রশাসনিক সীমানা বদলালে এমন হিসাবে কিছুটা পার্থক্য দেখা দিতে পারে।

সেপ্টেম্বরে নরসিংদীর নিচু জমিতে পানি। আশপাশের উঁচু জমিতে গাছপালা আর বসতি। ছবি: মহিন রিয়াদ / উইকিমিডিয়া কমন্স (সিসি বাই-এসএ ৪.০)
সেপ্টেম্বরে নরসিংদীর নিচু জমিতে পানি। আশপাশের উঁচু জমিতে গাছপালা আর বসতি। ছবি: মহিন রিয়াদ / উইকিমিডিয়া কমন্স (সিসি বাই-এসএ ৪.০)

উঁচু জমি, মাঝারি জমি, নিচু জমি


বাংলাদেশে জমিকে সাধারণত ভাগ করা হয় বর্ষায় কতটা পানি ওঠে, তার ভিত্তিতে। উঁচু জমিতে স্বাভাবিক বন্যার পানি ওঠে না। মাঝারি উঁচু জমিতে পানি ওঠে প্রায় ৯০ সেন্টিমিটার পর্যন্ত। মাঝারি নিচু জমিতে ৯০ থেকে ১৮০ সেন্টিমিটার, আর নিচু জমিতে ১৮০ থেকে ৩০০ সেন্টিমিটার পর্যন্ত।

নির্দেশিকার হিসাবে এই অঞ্চলের ১৮ শতাংশ উঁচু জমি, ৪২ শতাংশ মাঝারি উঁচু, ১৯ শতাংশ মাঝারি নিচু এবং ৯ শতাংশ নিচু জমি। বাকি ১২ শতাংশজুড়ে আছে বসতভিটা ও জলাশয়। হিসাবটি বলছে, অঞ্চলের প্রায় ছয় ভাগের এক ভাগ জমিতে সাধারণ বন্যার পানি পৌঁছায় না, আবার প্রায় চার ভাগের এক ভাগের বেশি জমি থাকে এক মিটারের কাছাকাছি বা তার চেয়েও গভীর পানির ঝুঁকিতে।

কৃষকের কাছে এই ভাগের মানে খুব বাস্তব। উঁচু জমিতে পানি দ্রুত নেমে যায়, তাই শীতের ফসলের প্রস্তুতি আগে শুরু করা যায়। নিচু জমিতে পানি দীর্ঘদিন থাকে, ফলে চাষ, বীজ বোনা আর ফসল কাটার সব হিসাবই পিছিয়ে যেতে পারে। একই মৌসুমে একই গ্রামের কৃষকদের ক্যালেন্ডার তাই এক হয় না।

আলগা মাটি আর ভারী কাদা


জমির উচ্চতার সঙ্গে মাটিও বদলায়। উঁচু ভাঁজে সাধারণত পাওয়া যায় পলি-দোআঁশ থেকে পলি-এঁটেল দোআঁশ মাটি। এই মাটিতে পানি সহজে চুইয়ে নিচে নামে। নিচু অববাহিকায় থাকে ভারী এঁটেল মাটি, যার ভেতর দিয়ে পানি প্রায় নামতেই পারে না। নির্দেশিকা উঁচু জায়গার মাটিকে বলছে পানি চলাচলের উপযোগী আর অববাহিকার কাদাকে পানি আটকে রাখা মাটি। পুরো অঞ্চলের প্রধান মাটি ধূসর প্লাবনভূমির মাটি।

এই পার্থক্য হাতেই টের পাওয়া যায়। এক মুঠো ভেজা মাটি হাতে চেপে দেখলে দোআঁশ মাটি সহজে ভেঙে যায়, কিন্তু এঁটেল মাটি আঠার মতো লেগে থাকে। প্রথমটিতে শিকড় ছড়ায় সহজে, তবে পানি ধরে রাখে কম। দ্বিতীয়টি পানি ধরে রাখে অনেক বেশি, কিন্তু ভেজা অবস্থায় চাষ করা কঠিন, শুকালে আবার শক্ত হয়ে যায়। কোথাও কোথাও মাটির অল্প নিচেই বালুর স্তর থাকতে পারে। তখন ওপরের মাটি দেখে যা মনে হয়, পানি ও শিকড়ের আচরণ হয় তার চেয়ে আলাদা।

মাটির অম্লতা নিয়েও একটি জরুরি তথ্য আছে। মাটি কতটা অম্লীয় তা মাপা হয় পিএইচ নামের একটি সূচকে। ৭ হলো নিরপেক্ষ, তার নিচে যত কমে মাটি তত অম্লীয়। নির্দেশিকা বলছে, এই অঞ্চলের মাটি প্রবল অম্লীয় থেকে নিরপেক্ষ পর্যন্ত হতে পারে। উঁচু জমিতে পিএইচ ৪.৩ থেকে ৭.২, মাঝারি উঁচু জমিতে ৪.৫ থেকে ৭.৪, মাঝারি নিচু জমিতে ৪.৬ থেকে ৭.৬। অর্থাৎ এক অঞ্চলের ভেতরেই পরিসরটি বেশ চওড়া। বেশি অম্লীয় মাটিতে অনেক ফসল জমিতে থাকা পুষ্টিও ঠিকমতো নিতে পারে না, তাই নিজের জমির পিএইচ জানা কাজের কথা।

ময়মনসিংহের চর পুলিয়ামারীতে আলুখেতে কাজ করছেন এক নারী। আলু এই অঞ্চলের শীত মৌসুমের ফসলের তালিকায় আছে। ছবি: হৃদয়ে মাটি ও মানুষ / উইকিমিডিয়া কমন্স (সিসি বাই ২.০)
ময়মনসিংহের চর পুলিয়ামারীতে আলুখেতে কাজ করছেন এক নারী। আলু এই অঞ্চলের শীত মৌসুমের ফসলের তালিকায় আছে। ছবি: হৃদয়ে মাটি ও মানুষ / উইকিমিডিয়া কমন্স (সিসি বাই ২.০)

মাটিতে কী কম, নির্দেশিকা কী বলে


ফসলের খাবার আসে মূলত মাটি থেকে। বিএআরসির ২০২৪ সালের নির্দেশিকা অনুযায়ী এই অঞ্চলের মাটিতে প্রধানত ঘাটতি আছে নাইট্রোজেন, ফসফরাস, পটাশিয়াম, গন্ধক, দস্তা ও বোরনের। উঁচু, মাঝারি উঁচু ও মাঝারি নিচু, তিন ধরনের জমিতেই নাইট্রোজেন, ফসফরাস, দস্তা ও বোরনের মাত্রা খুব কম থেকে কম। পটাশিয়ামের মাত্রা কম থেকে মাঝারি। গন্ধক উঁচু জমিতে কম থেকে মাঝারি হলেও বাকি দুই ধরনের জমিতে খুব কম থেকে কম।

মাটির জৈব পদার্থ কম থেকে মাঝারি। জৈব পদার্থ হলো পচে যাওয়া পাতা, খড়, শিকড় ও গোবরের মতো উপাদান। এটি শুধু পুষ্টিই জোগায় না, মাটিকে ঝুরঝুরে রাখে, পানি ধরে রাখতে সাহায্য করে এবং মাটির উপকারী জীবাণুকে বাঁচিয়ে রাখে। যে উঁচু জমি থেকে পানি দ্রুত নেমে যায়, সেখানে জৈব পদার্থ কম থাকলে শুকনো মৌসুমে ফসল সহজেই পানির টানে পড়তে পারে।

পুরোনো কিছু আঞ্চলিক বিবরণে পটাশিয়াম ও দস্তাকে মাঝারি মাত্রার বলা হয়েছিল। সর্বশেষ নির্দেশিকার সঙ্গে এই ফারাক একটি বড় সত্যই মনে করিয়ে দেয়: অঞ্চলের গড় তথ্য দিয়ে কোনো একটি জমির সার ঠিক করা যায় না। পাশাপাশি দুটি জমির মাটিতেও পুষ্টির মাত্রা আলাদা হতে পারে। আগের ফসল কী ছিল, কতটা সার পড়েছে, জমি কতদিন পানির নিচে ছিল, সবকিছুরই প্রভাব আছে।

তাই সবচেয়ে নিরাপদ পথ হলো মাটি পরীক্ষা করিয়ে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার পরামর্শ নেওয়া। অপ্রয়োজনীয় সার মানে বাড়তি খরচ, এবং তা পরিবেশের ক্ষতিও করতে পারে। আবার দরকারি উপাদান বাদ পড়লে অন্য সার দিয়েও ফলন ঠিকমতো ওঠে না। ফসলের অবশিষ্টাংশ, কম্পোস্ট ও স্থানীয়ভাবে পাওয়া জৈব উপাদান মাটির অবস্থা ভালো করতে সাহায্য করতে পারে, তবে কোন জমিতে কতটা লাগবে, সেটিও নির্ভর করে মাটি, ফসল, মৌসুম ও পানি নিষ্কাশনের ওপর।

কোন জমিতে কোন ফসল


আঞ্চলিক কৃষি বিবরণে এই অঞ্চলের বর্ষা মৌসুমের ফসল হিসেবে বোনা আউশ, রোপা আউশ, রোপা আমন, পাট, সবুজ সারের ফসল ও কাউনের নাম পাওয়া যায়। শীত মৌসুমের তালিকায় আছে গম, আলু, সরিষা ও বোরো ধান। এসব তালিকা মানে এই নয় যে প্রতিটি জমিতে সবই হবে। এগুলো কেবল সম্ভাবনার একটি প্রাথমিক ধারণা।

উঁচু জমিতে পানি দ্রুত সরে যায় বলে যেসব ফসল জলাবদ্ধতা সহ্য করতে পারে না, সেগুলোর জন্য এখানে সুযোগ বেশি। মাঝারি উঁচু জমিতে বৃষ্টি ও পানির অবস্থা দেখে ধান বা অন্য ফসলের পরিকল্পনা করা যায়। নিচু জমিতে পানি কতদিন থাকে, সেটিই প্রধান প্রশ্ন, কারণ বীজতলা আর চারা রোপণের সময় তার ওপরই নির্ভর করে।

প্রতিটি ফসলের নিজস্ব হিসাবও আছে। বোরো ধান চলে সেচের ওপর, তাই সেচের পানি পাওয়া যাবে কি না আর তার খরচ কত, সেটি আগে দেখতে হয়। আউশ ও আমনে দেখতে হয় বৃষ্টির সময়, জমির আর্দ্রতা আর বন্যা আসার সময়। পাট কাটার পর জাগ দেওয়ার জন্য পরিষ্কার পানির ব্যবস্থা লাগে, পাশে তেমন জলাশয় না থাকলে লাভের হিসাব বদলে যায়।

বাংলাদেশের একটি গ্রামে পানির ধারে পাটকাঠি। পাট জাগ দেওয়ার জন্য কাছাকাছি পরিষ্কার পানি লাগে। ছবি: আফিফা আফরিন / উইকিমিডিয়া কমন্স (সিসি বাই-এসএ ৪.০)
বাংলাদেশের একটি গ্রামে পানির ধারে পাটকাঠি। পাট জাগ দেওয়ার জন্য কাছাকাছি পরিষ্কার পানি লাগে। ছবি: আফিফা আফরিন / উইকিমিডিয়া কমন্স (সিসি বাই-এসএ ৪.০)

একজন কৃষক মৌসুম শুরুর আগে নিজের জমি নিয়ে কয়েকটি প্রশ্ন করে দেখতে পারেন। গত কয়েক বছরে এই জমিতে পানি কতটা উঠেছে, কত দিন ছিল? পানি নামার পর কত দিনে চাষ দেওয়া গেছে? মাটি হাতে কেমন লাগে, ঝুরঝুরে না আঠালো? শুকনো মৌসুমে সেচের পানি কোথা থেকে আসে, খরচ কত? কাছের বাজারে কোন ফসলের চাহিদা আছে? এই উত্তরগুলো কোনো বড় তালিকার চেয়ে অনেক বেশি কাজে আসে, কারণ এগুলো সেই জমিরই কথা বলে।

কিছু পুরোনো ফসল তালিকায় তামাকের নামও আছে। তালিকায় থাকা মানে এটি চাষের পরামর্শ নয়। কোন ফসল বাছা হবে, সে সিদ্ধান্তে স্বাস্থ্য, পরিবেশ, বাজার ও সরকারি নীতির কথাও ভাবা দরকার, আর ভাবা দরকার লাভজনক বিকল্প ফসলের কথা। শেষ পর্যন্ত জমির উচ্চতা, মাটি, পানি, সেচের সুযোগ, বাজারের চাহিদা, সব মিলিয়েই ঠিক হয় কোনটি একজন কৃষকের জন্য ঠিক।

কোথাও পানি চাই, কোথাও পানি সরানো চাই


এই অঞ্চলের পানির সমস্যা এক রকম নয়, এবং সেটিই এখানকার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য। উঁচু জমি থেকে পানি দ্রুত বেরিয়ে যায়, তাই শুকনো মৌসুমে সেচের প্রয়োজন পড়ে। নিচু অববাহিকায় বর্ষার বাড়তি পানি জমে ফসলের ক্ষতি করতে পারে, জমি তৈরিও দেরি করিয়ে দেয়। ফলে পুরো এলাকার জন্য শুধু সেচ বাড়ানো বা শুধু পানি সরানোর পরামর্শ কাজে আসে না। একই গ্রামের এক প্রান্তে যা সমাধান, অন্য প্রান্তে তা সমস্যাও হতে পারে।

শেরপুরে ধানখেতের মাঝ দিয়ে এঁকেবেঁকে যাওয়া সরু খাল। এমন খাল দিয়েই নদী বা জলাশয়ের পানি খেতে পৌঁছায়। ছবি: আয়মান নকিব বাঁধন / উইকিমিডিয়া কমন্স (সিসি বাই-এসএ ৪.০)
শেরপুরে ধানখেতের মাঝ দিয়ে এঁকেবেঁকে যাওয়া সরু খাল। এমন খাল দিয়েই নদী বা জলাশয়ের পানি খেতে পৌঁছায়। ছবি: আয়মান নকিব বাঁধন / উইকিমিডিয়া কমন্স (সিসি বাই-এসএ ৪.০)

খাল, নালা, পুকুর, পুরোনো নদীখাত আর পানি চলাচলের স্বাভাবিক পথ এখানে বড় ভূমিকা রাখে। যেখানে নিরাপদে পানি ধরে রাখা যায়, শুকনো মৌসুমে সেই পানিই সেচে কাজে লাগতে পারে। যেখানে পানি বের হওয়ার পথ আটকে গেছে, সেখানে পরিকল্পনা করে পথ খুলে দিলে ফসলের ক্ষতি কমতে পারে। তবে একটি নালা কাটলে বা একটি পথ বন্ধ করলে তার প্রভাব পড়ে পাশের জমিতে, পড়ে মাছ ও জলজ প্রাণের ওপরও। তাই এসব কাজে স্থানীয় অবকাঠামো ও প্রকৃতির ভারসাম্যের কথা মাথায় রাখতে হয়।

অনিয়মিত বৃষ্টি আর অল্প সময়ে অতিবৃষ্টির ঝুঁকি পানি ব্যবস্থাপনার গুরুত্ব আরও বাড়িয়েছে। তবে কোনো একটি এলাকায় ঝুঁকি কতটা, তা বলতে হলে দরকার দীর্ঘমেয়াদি আবহাওয়ার তথ্য, বন্যার রেকর্ড আর মাঠের পর্যবেক্ষণ। অঞ্চলের নাম দেখে আন্দাজ করলে চলে না।

পুরোনো নদীখাতের হিসাব


এই অঞ্চলের কিছু জায়গায় নদীর পুরোনো খাত আংশিক ভরাট হয়ে আছে। ওপর থেকে দেখলে হয়তো সাধারণ ধানখেতই মনে হয়, কিন্তু আশপাশের উঁচু জমির সঙ্গে এর মাটি ও পানির আচরণ মেলে না। কোথাও বর্ষায় পানি জমে থাকে। কোথাও বসতি, রাস্তা বা অন্য স্থাপনায় পানির পথ সরু হয়ে জলাবদ্ধতা তৈরি করতে পারে।

কৃষি পরিকল্পনায় এসব খাত ও অববাহিকা চিহ্নিত করা তাই দরকার। একই গ্রামের এক অংশে জলসহিষ্ণু ফসলের সুযোগ থাকতে পারে, অন্য অংশে মানাবে কম পানি লাগে এমন ফসল। জমির উচ্চতা আর পানি চলাচলের তথ্য ছাড়া দূর থেকে এই পার্থক্য ধরা কঠিন।

এখানেই কৃষকের অভিজ্ঞতার দাম। কোন জমিতে কখন পানি জমে, কত দিন থাকে, কোন পথে নামে, কবে থেকে চাষ দেওয়া যায়, এসব কথা গ্রামের মানুষ জানেন প্রজন্ম ধরে দেখে। এই জানা মানচিত্রের সঙ্গে মেলাতে পারলে কাগজের তথ্য অনেক বেশি বাস্তব হয়ে ওঠে।

উপগ্রহের ছবি কতটা বলতে পারে


উপগ্রহ থেকে তোলা ছবিতে দেখা যায় কোন এলাকা পানির নিচে, কোথায় ফসল আছে, নদী ও জলাশয় কোথায়। বিভিন্ন সময়ের ছবি পাশাপাশি রাখলে বোঝা যায় কোথায় পানি বেশি দিন থাকছে, কোথায় জমির ব্যবহার বদলে যাচ্ছে।

ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থার এনভিস্যাট উপগ্রহের রাডার ছবি। ২০০৭ সালের ১২ এপ্রিল ও ২৬ জুলাইয়ের ছবি মিলিয়ে বাংলাদেশ ও ভারতের কিছু অংশের বন্যা দেখানো হয়েছে। ছবি: ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থা / উইকিমিডিয়া কমন্স (সিসি বাই-এসএ ৩.০ আইজিও)
ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থার এনভিস্যাট উপগ্রহের রাডার ছবি। ২০০৭ সালের ১২ এপ্রিল ও ২৬ জুলাইয়ের ছবি মিলিয়ে বাংলাদেশ ও ভারতের কিছু অংশের বন্যা দেখানো হয়েছে। ছবি: ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থা / উইকিমিডিয়া কমন্স (সিসি বাই-এসএ ৩.০ আইজিও)

তবে উপগ্রহের ছবিরও সীমা আছে। একটি ছবি দেখে জমির নাইট্রোজেন বা ফসফরাসের আসল পরিমাণ জানা যায় না, কোনো ফসলের ফলন কত হবে তাও নিশ্চিত করে বলা যায় না। এর জন্য লাগে মাটির নমুনা, আবহাওয়ার তথ্য, জমিতে আগে কী ফসল ছিল তার হিসাব আর মাঠের পর্যবেক্ষণ।

ডিজিটাল কৃষি সেবা এই তথ্যগুলো এক জায়গায় আনতে পারলে কৃষক ও মাঠকর্মীর জন্য তা কাজের হতে পারে। জমির অবস্থান, উচ্চতা, মাটির ধরন, পানি নিষ্কাশন, আবহাওয়া আর ফসলের মৌসুম মিলিয়ে একটি জমির জন্য আলাদা পরামর্শ দেওয়া সম্ভব হতে পারে। বিএআরসির ক্রপ জোনিং তথ্যব্যবস্থায় মাটি, জমির ধরন, নিষ্কাশন ও কৃষি-পরিবেশ অঞ্চলের স্তর দেখার সুযোগ এমনই একটি উদাহরণ। তবে কোনো অ্যাপ বা মডেলের ফলকে চূড়ান্ত সত্য ধরে নেওয়া ঠিক নয়। পরামর্শ আগে মাঠে মিলিয়ে দেখতে হবে, এবং তথ্যের সীমাবদ্ধতাও খোলাখুলি জানাতে হবে।

গ্রামের গড় হিসাব কেন যথেষ্ট নয়


এই অঞ্চল নিয়ে গবেষণার বড় প্রশ্নটি হলো জমির ভেতরের বৈচিত্র্য। জেলা বা উপজেলার গড় তথ্য একজন কৃষকের জমির অবস্থা সবসময় বলতে পারে না। একই গ্রামের উঁচু ভাঁজ, ঢাল ও নিচু অববাহিকায় মাটি, পানি ও ফসল কীভাবে আলাদা হয়, তা আলাদা করে লিখে রাখা দরকার।

কয়েকটি বিষয় এখানে বিশেষভাবে কাজে লাগতে পারে: জমির উচ্চতা ও গড়ন, মাটির ধরন ও পিএইচ, জৈব পদার্থ, প্রধান পুষ্টির মাত্রা, বছরে কতদিন পানি জমে থাকে, কোন ফসল হয়, সেচ কতটা লাগে এবং শেষে ফল কী দাঁড়াল। স্থান ও সময় উল্লেখ করে এসব তথ্য সংগ্রহ করা গেলে অঞ্চলটি সম্পর্কে অনেক নির্ভরযোগ্য ধারণা তৈরি হবে।

তথ্যের উৎস নিয়েও সতর্ক থাকা চাই। সরকারি মানচিত্র, মাটির তথ্য, আবহাওয়ার রেকর্ড, উপগ্রহের ছবি আর মাঠের পর্যবেক্ষণ সবসময় একই সময়ের বা একই মাপের হয় না। এগুলো একসঙ্গে মেলানোর আগে কোনটি কী বোঝায় আর কোথায় তার সীমা, তা দেখে নিতে হয়। একটি গ্রামের কয়েকটি জমির ফল দিয়ে পুরো অঞ্চলের জন্য সিদ্ধান্ত টানা যায় না। আবার কৃষকের কথাও গবেষণার বাইরে রাখার সুযোগ নেই, কারণ বড় মানচিত্রে যে সমস্যা ধরা পড়ে না, তা প্রায়ই তাঁদের চোখেই আগে পড়ে।

কৃষকের সিদ্ধান্তে কাজে লাগলে তবেই গবেষণার দাম


গবেষণার ফল তখনই অর্থ পায়, যখন একজন কৃষক তা দিয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। কোন জমিতে কোন মৌসুমে কী ফসল করা যায়? কোথায় পানি সরানো দরকার, কোথায় সেচ আগে? কোন পুষ্টির ঘাটতি আগে সামলাতে হবে? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর আসতে হবে স্থানীয় বাস্তবতা থেকে।

তরুণ ব্রহ্মপুত্র-যমুনা প্লাবনভূমিতে তাই একসঙ্গে দুই ধরনের তথ্য লাগে। এক দিকে সরকারি মানচিত্র ও মাটির তথ্য, অন্য দিকে গ্রামের জমি আর কৃষকের অভিজ্ঞতা। উপগ্রহের ছবি ও ডিজিটাল প্রযুক্তি এগুলোকে জোড়া লাগাতে পারে, কিন্তু মাঠে যাচাই না হলে সে পরামর্শ অসম্পূর্ণই থেকে যায়।

শুরুর সেই দুটি জমির কথায় ফিরে আসা যাক। আলের এপারে যে কৃষক শীতের ফসলের জন্য চাষ দিচ্ছেন, আর ওপারে যিনি পানি নামার অপেক্ষায়, দুজনের কারও ভুল নেই। তাঁদের জমি আলাদা, তাই তাঁদের পরিকল্পনাও আলাদা হওয়া উচিত। পুরো অঞ্চলকে এক নিয়মে চালানোর বদলে প্রতিটি জমির ভিন্নতাকে গুরুত্ব দিলেই এই পলিমাটি থেকে আরও ভালো ফল আসতে পারে।

তানিয়া চৌধুরীদা এগ্রো নিউজ

বাংলাদেশ

সম্পর্কিত খবর

গ্যালারি

একঝলকে ৪ নভেম্বর: ঢ্যাঁড়সের খেত, কলাবতী ফুল আর বিলের শাপলা

প্রথম আলোর ‘একঝলক’ আয়োজনের কৃষি ও প্রকৃতির ছবিগুলো নিয়ে এই ছবির গল্প: ফরিদপুরের ঢ্যাঁড়সচাষি, সিরাজগঞ্জের কলাবতী, ডুমুরিয়ার শাপলা ও পানকৌড়ি।

প্রথম আলো৫ নভেম্বর ২০২৬১ মিনিটের পড়া
এগ্রোবিজ

সংকট নেই বলছে মন্ত্রণালয়, তবু বস্তা ১৭০০ টাকা: সার নিয়ে সংসদীয় কমিটিতে প্রশ্ন

কৃষি মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির প্রথম বৈঠকের রিপোর্টে সদস্যরা বলেছেন, পর্যাপ্ত মজুতের পরও বিতরণের দুর্বলতা, কালোবাজারি ও পাচারে কৃষক ভুগছেন; নজরদারি ও ডিলার নিয়োগে স্বচ্ছতার সুপারিশ এসেছে।

ঢাকা পোস্ট৫ নভেম্বর ২০২৬২ মিনিটের পড়া
শাকসবজি

নওগাঁয় ৩ হাজার ৩৫০ হেক্টরে আগাম শীতের সবজি, এক সপ্তাহে দাম নেমেছে অনেকটা

বাজার ধরতে আগাম চাষে নেমেছেন নওগাঁর কৃষকেরা; এক বিঘা বাঁধাকপিতে ৪৫ হাজার টাকা খরচে ১ লাখ ২০ হাজার টাকার আশা এক চাষির, সরবরাহ বাড়ায় কেজিতে ১০ থেকে ১৫ টাকা কমেছে দাম।

দৈনিক বাংলা৫ নভেম্বর ২০২৬১ মিনিটের পড়া

মন্তব্য

(০)