চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জ উপজেলার শাহাপুর গ্রামে ২০১৯ সালের বোরো মৌসুমে কৃষক আক্তারুজ্জামান পাটওয়ারী সবুজ ধানক্ষেতের মাঝে এক টুকরো জমিতে বেগুনি রঙের ধানের আবাদ করে এলাকায় সাড়া ফেলেন। সোনালী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের পাশের মাঠে, সড়কের ধারে ক্ষেতটি হওয়ায় পথচারীদের নজর কাড়ে। দূর থেকে গাছগুলো রোগাক্রান্ত মনে হলেও আসলে তা ছিল না; এগুলো ছিল বেগুনি পাতা ও কাণ্ডের এক ধরনের ধান।
শাহাপুরের মাঠে বেগুনি ধান
ঢাকা ট্রিবিউনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, আক্তারুজ্জামান আগ্রহের বশে এক আত্মীয়ের কাছ থেকে বীজ নিয়ে এ ধান চাষ করেন। প্রতিবেদনের সময় গাছে ফুল এসেছিল এবং ধানের ছড়া বের হতে শুরু করেছিল। প্রথম আলো ২০১৯ সালের ১৯ এপ্রিল জানায়, তাঁর এক আত্মীয় গাজীপুর থেকে এ ধানের বীজ এনে তাঁকে এক কেজি দেন। সেই বীজে চারা তৈরি করে তিনি সাড়ে ১৫ শতক জমিতে পরীক্ষামূলকভাবে রোপণ করেন। তাঁর দাবি ছিল, চাঁদপুরে তিনিই এ ধানের প্রথম আবাদকারী, আর ফলন ভালো হলে অন্য কৃষকদেরও বীজ দেবেন।
এলাকার কৃষকদের কাছে ধানটি পরিচিতি পায় বেগুনি ধান বা রঙিন ধান নামে। ফরিদগঞ্জ উপজেলার উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা মো. নূরে আলম প্রথম আলোকে বলেন, "বেগুনি রঙের এই ধানের চাষ চাঁদপুরে এই প্রথম। এই ধানের পাতা ও কাণ্ডের রং বেগুনি।" তিনি জানান, কৃষক নিজ উদ্যোগে বীজ সংগ্রহ করে আবাদ করেছেন এবং এটি বিদেশি কোনো জাত নয়। ঢাকা ট্রিবিউনকে তিনি বলেন, 'আমরা বেগুনি রংয়ের ধানক্ষেতটি পর্যবেক্ষণ করে দেখেছি। এর ফলন কী রকম হবে তা জানতে ধান কাটা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।'
ফরিদগঞ্জ চাঁদপুর জেলার একটি উপজেলা, আয়তন ২৩২ দশমিক ২২ বর্গকিলোমিটার। শাহাপুরের একই গ্রামের আতাউর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, ফরিদগঞ্জ ধান চাষের জন্য অন্যতম উৎকৃষ্ট এলাকা, এখানকার কৃষকেরা সারা বছর ধান চাষ করেন।

কৃষি বিভাগ যা বলেছিল
চাঁদপুর জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক আবদুর রশিদ প্রথম আলোকে বলেন, "এটি বিশেষ কোনো জাত নয়, অন্য ধানের মতোই।" প্রতিবেদনে বলা হয়, কেউ একে বেগুনি সুন্দরী, কেউ দুলালি সুন্দরী নামে ডাকেন। ধানক্ষেতের সীমানা চিহ্নিত করার জন্য এটি উদ্ভাবন করা হয়েছিল; পরে দেশের দু-একটি জায়গায় চাষ হলেও ফলন তেমন ভালো না হওয়ায় এর আবাদ বাড়ানো হয়নি।
শাহাপুরের আগেও দেশের কয়েকটি জায়গায় এ ধরনের ধান দেখা গিয়েছিল। প্রথম আলোর একই প্রতিবেদন অনুযায়ী, আগের মৌসুমে গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার ভবানীপুর গ্রামের দুলালি বেগম এবং কুমিল্লার আদর্শ সদর উপজেলার মনাগ্রামের কৃষক মনজুর হোসেন বেগুনি রঙের ধান চাষ করেন। ২০১৯ সালে শেরপুরের নালিতাবাড়ী উপজেলার ভেদিকুড়া গ্রামের শাহিনুর আলমও এ ধান চাষ করেন। দুলালি বেগম স্থানীয় জাতের ধানের মধ্যে কিছু বেগুনি গাছ দেখে সেগুলোর বীজ আলাদা করে রেখেছিলেন, আর মনজুর হোসেন ২০১৭ সালে সাতক্ষীরায় এক কৃষকের জমি থেকে বীজ এনেছিলেন।

ধানের পাতা কেন বেগুনি হয়
ধানগাছের বেগুনি রং আসে অ্যান্থোসায়ানিন নামের রঞ্জক থেকে। ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বরে ইন্টারন্যাশনাল জার্নাল অব মলিকুলার সায়েন্সেসে প্রকাশিত এক গবেষণাপত্রে বলা হয়, অ্যান্থোসায়ানিন একটি শক্তিশালী অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, যা গাছের নানা অঙ্গে রং আনে, আর ধানের পাতায় এর উৎপাদন কয়েকটি কাঠামোগত ও নিয়ন্ত্রক জিন মিলে নিয়ন্ত্রণ করে।
গবেষকেরা লেখেন, বেগুনি পাতার বৈশিষ্ট্য টু-লাইন হাইব্রিড ধানের স্টেরাইল লাইনে যুক্ত করলে পাতার রং দেখেই আসল হাইব্রিড বীজ আর স্বপরাগায়িত বীজ আলাদা করা যায়। গবেষণাপত্রটির হিসাবে, চীনে এ ধরনের লাইনে ৩ থেকে ৫ শতাংশ স্বপরাগায়িত বীজ তৈরি হয়, যাতে বছরে ৫০০ থেকে ৬০০ মিলিয়ন কেজি ধানের ক্ষতি হয়। এ কারণে বেগুনি পাতা ধানের প্রজননে চিহ্নিতকারী বৈশিষ্ট্য হিসেবে কাজে লাগে।
রঙিন চালের ধানও আছে। উইকিপিডিয়ার বর্ণনায়, কালো চালের দানার বাইরের স্তরে (ব্র্যান) অ্যান্থোসায়ানিন বেশি থাকে, আর রান্নার পর এ চাল সাধারণত গাঢ় বেগুনি হয়ে যায়।

ছবি: yari hotaka / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY 2.0)
সূত্র: ঢাকা ট্রিবিউন, প্রথম আলো, ইন্টারন্যাশনাল জার্নাল অব মলিকুলার সায়েন্সেস (এমডিপিআই), উইকিপিডিয়া





মন্তব্য
(০)