সরাসরিবাজারদর
আটা (প্যাকেটজাত)৫৮—আদা - আমদানিকৃত১৬৭—আদা - দেশী১৫৪—আমন চাল - মাঝারি৫৬—আমন চাল - মোটা৪৮—আমন চাল - সরু৭২—আয়োডিনযুক্ত লবণ (প্যাকেটজাত)৩২—কাঁচা মরিচ২১৮—খামারের মুরগী১৬২—খাসী৯০০—চিনি (দেশী)১৩২—ছোলা - গোটা৮৫—ডিম ফার্ম - লাল৪৭—পেঁয়াজ - দেশী৬০—বোরো চাল - মাঝারি৫৫—বোরো চাল - মোটা৪৭—বোরো চাল - সরু৬৬—মাংসঃ– গরু৭২৯—মুগ ডাল১২২—রসুন - আমদানিকৃত১৯২—রসুন - দেশী১৭৩—সয়াবিন তেল১৬৩—
হালনাগাদ ২ নভেম্বর ২০২৬
ঢাকা২৮°আংশিক মেঘলাআর্দ্রতা ৭৮%বাতাস ৪ কিমি/ঘ

সিরাজগঞ্জে ক্লান্ত হিমালয় গৃধিনী শকুন উদ্ধার, হস্তান্তরের উদ্যোগ

২০২৫ সালের ১৩ ডিসেম্বর রাতে সিরাজগঞ্জ পৌর শহরের আমলাপাড়া থেকে বিরল হিমালয় গৃধিনী প্রজাতির একটি ক্লান্ত শকুন উদ্ধার করে পরিবেশবাদী সংগঠন দি বার্ড সেফটি হাউজ। যমুনার চরে পড়ে থাকা পাখিটিকে উদ্ধার করে খাওয়ানো ও চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে, পরে বন বিভাগের কাছে হস্তান্তর করা হবে।

সিরাজগঞ্জে ক্লান্ত হিমালয় গৃধিনী শকুন উদ্ধার, হস্তান্তরের উদ্যোগ
পরিবেশ

২০২৫ সালের ১৩ ডিসেম্বর শনিবার রাতে সিরাজগঞ্জ পৌর শহর থেকে বিরল প্রজাতির একটি হিমালয় গৃধিনী শকুন (বৈজ্ঞানিক নাম Gyps himalayensis) উদ্ধার করা হয়। দীর্ঘ পথ উড়ে ক্লান্ত হয়ে উড়তে না পেরে পাখিটি মাটিতে পড়ে গিয়েছিল। রাত ৯টার দিকে পৌর শহরের আমলাপাড়া মহল্লার বাসিন্দা পাপ্পু সেখের বাড়ি থেকে শকুনটি উদ্ধার করেন পরিবেশবাদী সংগঠন দি বার্ড সেফটি হাউজের চেয়ারম্যান মামুন বিশ্বাস। পরদিন রোববার ১৪ ডিসেম্বর সকালে তিনি ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেন। এর আগে যমুনা নদীর চরাঞ্চলের কিছু যুবক অসুস্থ পাখিটিকে ধরে রাখেন এবং তিন দিন ধরে প্রাথমিক সেবা দেওয়া হয়।

যেভাবে পাখিটি পাওয়া ও উদ্ধার হলো


স্থানীয় পাপ্পু সেখ জানান, উড়তে না পেরে শকুনটি মাটিতে পড়ে যায়। সে সময় যমুনা নদীর চরাঞ্চলের কিছু যুবক অসুস্থ অবস্থায় পাখিটিকে ধরে আটকে রাখেন। বিষয়টি জানতে পেরে তিনি সেটি নিজের বাড়িতে নিয়ে আসেন। তিন দিন প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়ার পর তিনি দি বার্ড সেফটি হাউজের চেয়ারম্যান মামুন বিশ্বাসকে খবর দেন। পরে মামুন ও তার সঙ্গীরা আমলাপাড়ায় পাপ্পুর বাড়িতে গিয়ে শকুনটি উদ্ধার করে নিয়ে আসেন।

২০২৫ সালের ১৪ ডিসেম্বর রোববার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে মামুন বিশ্বাস এ ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেন। তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ডানায় ভর করে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে গিয়ে ক্লান্ত শকুনটি মাটিতে পড়ে গিয়েছিল। বিরল প্রজাতির এই শকুনের নাম হিমালয় গৃধিনী। তিনি আরও বলেন, আমি উদ্ধার করে খাবার ও ওষুধ খাওয়াচ্ছি। বাংলাদেশ জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ ফেডারেশনের (বিবিসিএফ) উপদেষ্টা মোল্লা রেজাউল করিম এবং বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণের রাজশাহী বিভাগীয় অফিসের সঙ্গে আমরা যোগাযোগ করেছি; তারা যেখানে শকুনটি পাঠানোর নির্দেশ দেবেন, আমরা সেখানেই হস্তান্তর করব।

বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞরা বলেন, দুর্বল বা মাটিতে পড়ে থাকা শকুন সাধারণ মানুষের হাতে ধরা বা ঘাঁটা ঠিক নয়, উদ্ধারকারী ও পাখি দুইয়ের জন্যই তা ঝুঁকির। পরামর্শ হলো, পাখিটির কাছে ভিড় ও কুকুর যেতে না দিয়ে দ্রুত বন বিভাগ বা নিকটস্থ বন্যপ্রাণী কার্যালয়ে খবর দেওয়া, যাতে প্রশিক্ষিত কর্মীরা এসে পাখিটিকে নিয়ে যেতে ও চিকিৎসা দিতে পারেন। সিরাজগঞ্জের ক্ষেত্রে যুবকেরা পাখিটি একজন পরিচিত পাখি উদ্ধারকর্মীর হাতে তুলে দেন, যিনি আবার বিভাগীয় বন্যপ্রাণী কার্যালয়ে খবর দেন।

হিমালয় গৃধিনী কেমন পাখি


হিমালয় গৃধিনী বা হিমালয়ান ভালচার পৃথিবীর বৃহত্তম শিকারি পাখিগুলোর একটি। উইকিপিডিয়ায় সংকলিত প্রজাতির বিবরণ অনুযায়ী এটি গিপস (Gyps) গোত্রের সবচেয়ে বড় শকুন এবং কালো শকুনের (সিনেরিয়াস ভালচার) পরে ওল্ড ওয়ার্ল্ড শকুনের মধ্যে দ্বিতীয় বৃহত্তম। এর দৈর্ঘ্য প্রায় ১০৩ থেকে ১১৫ সেন্টিমিটার, দুই ডানা মেললে বিস্তার প্রায় ২.৫৬ থেকে ৩.১ মিটার, আর ওজন ৬ থেকে ১২.৫ কেজি, গড়ে প্রায় ৯ কেজি। বিশাল শরীর ও চওড়া ডানার কারণে এটি উষ্ণ বাতাসের ঊর্ধ্বমুখী স্রোতে ভর করে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ভেসে থাকতে পারে।

অন্যান্য শকুনের মতোই এটি মৃতভোজী, কেবল মরা প্রাণীর মাংস (শব) খায়। তিব্বত মালভূমিতে চালানো গবেষণায় দেখা গেছে, এর খাদ্যের প্রায় ৬৪ শতাংশই আসে মরা গৃহপালিত চমরিগাই (ইয়াক) থেকে। পাখিটি দীর্ঘক্ষণ ডানা ঝাপটে উড়তে পারে না; চলাচল ও শব খুঁজতে সে উষ্ণ বাতাসের স্রোতের ওপরই নির্ভরশীল। এটি অত্যন্ত সামাজিক পাখি, প্রায়ই মরা প্রাণীর কাছে বড় দলে জড়ো হয়, আর একটি দল অল্প সময়েই শবের নরম অংশ সাবাড় করে ফেলতে পারে।

হিমালয় গৃধিনী মধ্য ও দক্ষিণ এশিয়ার উঁচু পর্বত ও মালভূমি অঞ্চলে বংশবিস্তার করে: কাজাখস্তান, আফগানিস্তান ও ইরান থেকে শুরু করে পাকিস্তান, উত্তর ভারত, নেপাল, ভুটান, পশ্চিম চীন হয়ে মঙ্গোলিয়া পর্যন্ত, সাধারণত সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১,২০০ থেকে ৫,৫০০ মিটার উচ্চতায়। এটি দুর্গম পাহাড়ের খাঁজে বাসা বাঁধে, সাধারণত একটি মাত্র ডিম পাড়ে, আর বংশবিস্তারের মৌসুম শুরু হয় জানুয়ারির দিকে। অল্পবয়সী পাখিরা বাসস্থান থেকে অনেক দূরে ছড়িয়ে পড়ে, আর ভারতীয় উপমহাদেশের সমতলে বেশিরভাগ সময় এই অল্পবয়সী শকুনগুলোই দেখা যায়।

প্রজাতিটি সাধারণত ৫ থেকে ৭ জোড়ার আলগা উপনিবেশে বাসা বাঁধে; উত্তর ভারতে ডিম পাড়া হয় ডিসেম্বরের শেষ থেকে মার্চের শুরুর মধ্যে, খাঁচায় ডিম ফুটতে সময় লাগে প্রায় ৫৪ থেকে ৫৮ দিন, আর ছানা বাবা-মায়ের সঙ্গে থাকে ছয় থেকে সাত মাস। শবের কাছে হিমালয় গৃধিনী বেশিরভাগ মৃতভোজীর ওপর প্রাধান্য বিস্তার করলেও নেকড়ে, তুষার চিতা ও তার চেয়েও বড় কালো শকুনকে জায়গা ছেড়ে দেয়। এটি সাধারণত মাংসল অংশ খায়, নাড়িভুঁড়ি এড়িয়ে চলে, আর শবের কাছে কয়েক দিন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে পারে। উঁচু হিমালয়ে এটি অতীতে আকাশ-সমাধিস্থলে শব খেয়ে এসেছে, যা স্থানীয় সংস্কৃতিতেও পাখিটিকে একটি স্থান দিয়েছে।

প্রাপ্তবয়স্ক হিমালয় গৃধিনীকে চেনা সহজ তার বিশাল আকার ও হালকা রঙের জন্য। উইকিপিডিয়ার বিবরণ অনুযায়ী দেহ ও ডানার ওপরের পালক হালকা বালু-বাদামি, কোনো কোনো পাখিতে প্রায় সাদাটে, যা গাঢ় বাদামি ওড়ার পালক ও লেজের সঙ্গে স্পষ্ট বৈসাদৃশ্য তৈরি করে; আকাশে লম্বা ডানার আঙুলের মতো পালক মেলে উড়লে এই রঙের পার্থক্য চোখে পড়ে। মাথা ও গলায় থাকে সাদাটে কোমল পালক, যা প্রাপ্তবয়স্কে হলদেটে হয়ে ওঠে, তার নিচে লম্বা ফিকে রঙের গলাবন্ধ; মুখের খোলা চামড়া হালকা নীল আর ঠোঁট হলদেটে। অল্পবয়সী পাখির নিচের দিক বেশি গাঢ় এবং ঠোঁট ফিকে।

ভারতের হিমালয় অঞ্চলের স্পিতিতে বসে থাকা একটি হিমালয় গৃধিনী শকুন; এলাকাটি প্রজাতিটির বংশবিস্তার অঞ্চলের অংশ। ছবি: Ksuryawanshi / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
ভারতের হিমালয় অঞ্চলের স্পিতিতে বসে থাকা একটি হিমালয় গৃধিনী শকুন; এলাকাটি প্রজাতিটির বংশবিস্তার অঞ্চলের অংশ। ছবি: Ksuryawanshi / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)

শীতে কেন বাংলাদেশে আসে


বাংলাদেশ হিমালয় গৃধিনীর বংশবিস্তারের পাহাড়ি অঞ্চল থেকে অনেক দক্ষিণে; তবু শীতে পাখিটি নিয়মিত অতিথি। প্রথম আলোর ২০২১ সালের জানুয়ারির এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, হিম ও বরফঢাকা হিমালয় ও তিব্বত মালভূমির শীত থেকে বাঁচতে শকুনগুলো নভেম্বর-ডিসেম্বরের দিকে উষ্ণ সমতলের দিকে নেমে আসে এবং মার্চে ফিরে যায়। এ যাত্রা প্রায় ১,০০০ কিলোমিটার হতে পারে, আর উত্তর বাংলাদেশে পৌঁছানো পাখিগুলোর অনেকেই অল্পবয়সী ও অনভিজ্ঞ।

দীর্ঘ এই উড়াল তাদের দুর্বল করে ফেলে। একই প্রতিবেদনে বলা হয়, স্বাভাবিকভাবে প্রায় ১৩ কেজি ওজনের একটি গৃধিনী বাংলাদেশে পৌঁছাতে পৌঁছাতে ওজন কমে মাত্র ৪ থেকে ৫ কেজিতে নেমে আসতে পারে, আর নামার পর অনেক সময় যথেষ্ট খাবারও মেলে না। ক্লান্ত ও কমে যাওয়া ওজনের পাখিগুলো খোলা মাঠ, চর ও গ্রামের কাছে নেমে পড়ে, যেখানে কৌতূহলী মানুষ কখনো তাদের অসুস্থ বা বিপজ্জনক প্রাণী ভেবে ধরে ফেলেন, যেমনটা সিরাজগঞ্জে ঘটেছে।

যেহেতু সমতলে পৌঁছানো পাখিগুলোর বেশিরভাগই অল্পবয়সী ও অনভিজ্ঞ, বাংলাদেশে আসা শকুনগুলো প্রায়ই দুর্বল অবস্থায় থাকে। প্রজাতিটি উঁচুতে ওড়ায় পারদর্শী, হিমালয়ের গিরিপথ পেরোতে দেখা গেছে, তবে পথভ্রষ্ট হিমালয় গৃধিনীকে থাইল্যান্ড, মিয়ানমার ও সিঙ্গাপুরের মতো দূর জায়গাতেও পাওয়া গেছে, যা দেখায় একটি ভবঘুরে অল্পবয়সী পাখি পাহাড় থেকে কত দূরে চলে যেতে পারে।

সিরাজগঞ্জের যে যমুনার চরে পাখিটি প্রথমে পাওয়া যায়, তা ঠিক সেই ধরনের খোলা ও কম জনবসতিপূর্ণ জমি, যেখানে ক্লান্ত শকুন নামার সম্ভাবনা বেশি। বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী রাজশাহী বিভাগের সিরাজগঞ্জ জেলার আয়তন প্রায় ২,৪০২ বর্গকিলোমিটার; দেশের অন্যতম বড় নদী যমুনা জেলাটির ওপর দিয়ে বয়ে গেছে, আর জেলার অর্ধেকের বেশি মানুষের আয়ের প্রধান উৎস কৃষি। প্রতি বছর নদীতে গড়ে ওঠা ও সরে যাওয়া প্রশস্ত বালুচর পরিযায়ী পাখিদের বিশ্রামের জায়গা দেয়, আবার তাদের মানুষের কাছাকাছিও নিয়ে আসে।

সিরাজগঞ্জের উজানে বগুড়ার কাছে যমুনা নদী; এর খোলা চরে প্রায়ই ক্লান্ত পরিযায়ী শকুন নেমে পড়ে। ছবি: Afifa Afrin / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 3.0)
সিরাজগঞ্জের উজানে বগুড়ার কাছে যমুনা নদী; এর খোলা চরে প্রায়ই ক্লান্ত পরিযায়ী শকুন নেমে পড়ে। ছবি: Afifa Afrin / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 3.0)

শকুন কেন এত বিরল হয়ে উঠল


একটি মাত্র গৃধিনী উদ্ধারের ঘটনাও গুরুত্ব পায়, কারণ দক্ষিণ এশিয়াজুড়ে সব ধরনের শকুনই বিরল হয়ে পড়েছে। পরিবেশবিষয়ক সংবাদমাধ্যম মঙ্গাবের ২০২২ সালের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, এক সময় বাংলাদেশে সাত প্রজাতির শকুন ছিল। রাজ শকুন (রেড-হেডেড ভালচার) এখন দেশে বিলুপ্ত বলে ধরা হয়, আর আবাসিক বাংলা শকুন (হোয়াইট-রাম্পড) ও সরুঠোঁট শকুন (স্লেন্ডার-বিলড) দেশে ও বিশ্বে মহাবিপন্ন হিসেবে তালিকাভুক্ত। বাকি চারটি প্রজাতি, হিমালয় গৃধিনীসহ, শীতের পরিযায়ী অতিথি।

ভারতীয় উপমহাদেশে আশির দশকের শেষ পর্যন্ত শকুন ছিল খুবই সাধারণ পাখি, কিন্তু ২০১৭ সাল নাগাদ কোনো কোনো প্রজাতির সংখ্যা প্রায় ৯৫ শতাংশ কমে যায়। এর প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয় ডাইক্লোফেনাক, গবাদি পশুকে দেওয়া একধরনের সস্তা ব্যথানাশক ওষুধ। এই ওষুধ দেওয়া প্রাণীর মরদেহ খেয়ে শকুনের কিডনি বিকল হয়ে মৃত্যু ঘটত; গবেষণায় দেখা গেছে, শবে থাকা অতি সামান্য পরিমাণ ওষুধও গিপস শকুনের জন্য প্রাণঘাতী। ২০০৩ সালে পেরেগ্রিন ফান্ড ডাইক্লোফেনাককে এই মৃত্যুর কারণ হিসেবে শনাক্ত করে; এতে যে বিপর্যয় ঘটে, তা কোনো পাখির দলের সবচেয়ে দ্রুত হ্রাসের একটি হিসেবে নথিভুক্ত।

উপমহাদেশের আবাসিক গিপস শকুন, বাংলাদেশের ক্ষেত্রে মূলত বাংলা শকুন ও সরুঠোঁট শকুন, সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে; তবে একই পশুচিকিৎসা ওষুধ যেকোনো শকুনের জন্যই হুমকি, যারা ওষুধ দেওয়া মরদেহ খায়, এর মধ্যে হিমালয় গৃধিনীর মতো শীতের অতিথিও আছে। এই অভিন্ন ঝুঁকির কারণেই বাংলাদেশের ওষুধ নিষিদ্ধকরণ ও নিরাপদ এলাকার মতো সংরক্ষণ পদক্ষেপ আবাসিক ও পরিযায়ী, উভয় শকুনকেই রক্ষা করার উদ্দেশ্যে নেওয়া।

হিমালয় গৃধিনী নিজে আইইউসিএন রেড লিস্টে প্রায়-বিপদগ্রস্ত (নিয়ার থ্রেটেনড) হিসেবে তালিকাভুক্ত। বার্ডলাইফ ইন্টারন্যাশনালের পরিচালিত এই মূল্যায়ন মূলত ডাইক্লোফেনাকসহ অন্যান্য পশুচিকিৎসা ওষুধের প্রভাবে সৃষ্ট সম্ভাব্য হ্রাসের ওপর ভিত্তি করে করা। আবাসিক গিপস শকুনের মতো এটি অতটা দ্রুত কমেনি, তবু সংরক্ষণকর্মীরা প্রতিটি পাখিকেই মূল্যবান মনে করেন; এ কারণেই সিরাজগঞ্জের মতো উদ্ধারের ঘটনা জাতীয় সংগঠনগুলোর কাছে খবর পৌঁছায় ও গুরুত্ব পায়।

উত্তর ভারতে একটি হিমালয় গৃধিনী শকুন; এই অঞ্চলে ডাইক্লোফেনাক ওষুধ শকুনের সংখ্যা ব্যাপকভাবে কমিয়ে দিয়েছিল। ছবি: Koshy Koshy / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY 2.0)
উত্তর ভারতে একটি হিমালয় গৃধিনী শকুন; এই অঞ্চলে ডাইক্লোফেনাক ওষুধ শকুনের সংখ্যা ব্যাপকভাবে কমিয়ে দিয়েছিল। ছবি: Koshy Koshy / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY 2.0)

বাংলাদেশে শকুন রক্ষায় যা করা হয়েছে


শকুনের হ্রাস ঠেকাতে বাংলাদেশ ধাপে ধাপে কয়েকটি পদক্ষেপ নিয়েছে। নব্বইয়ের দশকের শুরু থেকেই গবাদি পশুতে ডাইক্লোফেনাকের ব্যাপক ব্যবহার ছিল। আইইউসিএন বাংলাদেশ ২০১০ সালে এটি নিষিদ্ধ করার সুপারিশ করে, আর পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় ২০১১ সালে গবাদি পশুর ক্ষেত্রে ওষুধটি নিষিদ্ধ করে। পরে কিটোপ্রোফেন নামে আরেকটি ক্ষতিকর ওষুধের দিকেও নজর দেওয়া হয়, আর মঙ্গাবের তথ্য অনুযায়ী ২০২১ সালে বাংলাদেশ হয় শকুনপ্রবণ এলাকায় এমন শকুন-বিষাক্ত ওষুধ নিষিদ্ধ করা প্রথম দেশ। এর আগে ভারত, নেপাল ও পাকিস্তান ২০০৬ সালে ডাইক্লোফেনাকের বিরুদ্ধে আইন করেছিল।

বন বিভাগ ও আইইউসিএন বাংলাদেশ ২০১৫ সালে মিলে একটি জাতীয় শকুন সংরক্ষণ কর্মপরিকল্পনা তৈরি করে, যার মেয়াদ ২০১৬ থেকে ২০২৫ সাল। এই পরিকল্পনার আওতায় সরকার বৃহত্তর সিলেট ও খুলনা অঞ্চলে দুটি শকুন নিরাপদ এলাকা (ভালচার সেফ জোন) গড়ে তোলে, যেখানে ডাইক্লোফেনাক ও কিটোপ্রোফেন ঢুকতে দেওয়া হয় না, যাতে শকুন নিরাপদে শব খেতে পারে। মঙ্গাবে খুলনার অঞ্চলটিকে প্রায় ২৭,৭০০ বর্গকিলোমিটার এবং সিলেটের অঞ্চলটিকে প্রায় ৯,৬৬০ বর্গকিলোমিটার হিসেবে উল্লেখ করেছে। আইইউসিএন বাংলাদেশ স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে নিয়ে সংরক্ষণ দল ও খাবারের কেন্দ্রের (ফিডিং স্টেশন) মাধ্যমেও কাজ করে।

বাংলাদেশে টিকে থাকা শকুন


বাংলাদেশে এখনো যেসব শকুন বংশবিস্তার করে, সেই আবাসিক পাখির সংখ্যা শীতের অতিথিদের চেয়ে অনেক কম। একসময় গ্রামবাংলার সবচেয়ে পরিচিত শকুন ছিল বাংলা শকুন (হোয়াইট-রাম্পড); সংরক্ষণ প্রতিবেদনে উল্লিখিত হিসাব অনুযায়ী ২০১৫ সালের এক গণনায় এর সংখ্যা নেমে আসে প্রায় ২৬০টিতে। আইইউসিএন বাংলাদেশ বলেছে, ওই সর্বশেষ গণনার পর দেশে শকুনের সংখ্যা মোটামুটি একই রকম রয়ে গেছে, যা ইঙ্গিত দেয় আগের দশকগুলোর তীব্র হ্রাস অন্তত কিছুটা থেমেছে।

টিকে থাকা পাখিগুলোকে নিরাপদে খাওয়ানোর জন্য সংরক্ষণকর্মীরা জনগোষ্ঠীভিত্তিক খাবারের কেন্দ্র চালান, যেগুলোকে কখনো কখনো শকুনের রেস্তোরাঁ বলা হয়; সেখানে ক্ষতিকর ওষুধমুক্ত শব রেখে দেওয়া হয়। নিরাপদ এলাকার ভেতরের গ্রামগুলোতে প্রশিক্ষিত স্বেচ্ছাসেবকদের নিয়ে গঠিত স্থানীয় শকুন সংরক্ষণ দল বাসা বাঁধা পাখি পাহারা দেয় এবং অসুস্থ বা মাটিতে পড়ে থাকা শকুনের খবর দেয়। শীতে হিমালয় গৃধিনীর মতো পরিযায়ী পাখির আগমন ছোট আবাসিক সংখ্যার সঙ্গে যোগ হয়, আর প্রকৃতিতে ফিরিয়ে দেওয়া প্রতিটি পাখিই মূল্যবান।

দিনাজপুরের উদ্ধারকেন্দ্র


ক্লান্ত হয়ে নামা পাখিগুলোর সুস্থ হয়ে ওঠার জন্য জায়গা দরকার, আর সেই কাজটিই করে দেশের উত্তর-পশ্চিমে দিনাজপুরের সিংড়া জাতীয় উদ্যানে অবস্থিত শকুন উদ্ধার ও পরিচর্যা কেন্দ্র। প্রথম আলোর তথ্য অনুযায়ী আইইউসিএন ২০১৪ সালে সিংড়ায় এই উদ্ধার ও পরিচর্যার প্রকল্প শুরু করে; মঙ্গাবে জানায়, কেন্দ্রটি নিজে প্রতিষ্ঠিত হয় ২০১৬ সালে। প্রথম ছয় বছরে এটি প্রায় ৯৯টি শকুন উদ্ধার, চিকিৎসা ও অবমুক্ত করে, আর ২০২২ সাল নাগাদ এই সংখ্যা ১০০ ছাড়িয়ে যায়।

কেন্দ্রের কাজের ধরন ক্ষুধার্ত পরিযায়ী পাখির প্রয়োজনের সঙ্গে মিলে যায়। উদ্ধার হওয়া গৃধিনীগুলোকে প্রায় তিন মাস খাওয়ানো ও চিকিৎসা দেওয়া হয় এবং সাধারণত এপ্রিলের শুরুর দিকে অবমুক্ত করা হয়, যে সময়টায় টিকে থাকা বন্য পাখিরা পাহাড়ে ফেরার যাত্রা শুরু করে। প্রথম আলোর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কোনো কোনো মৌসুমে শুধু হিমালয় গৃধিনীই ১৮টি আনা হয়েছে। মাটিতে পড়ে থাকা পাখির খবর পেয়ে বন বিভাগ ও স্থানীয় বন্যপ্রাণী কার্যালয় দল পাঠায় এবং সিরাজগঞ্জের মতো স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের সঙ্গে মিলে কাজ করে। দিনাজপুরের এই কেন্দ্রটি দেশের উত্তরের জেলাগুলোর সেই অঞ্চলের জন্য কাজ করে, যেখানে শীতে ক্লান্ত গৃধিনী বেশি নেমে পড়ে।

নেপালের কোশি টাপ্পুতে একঝাঁক হিমালয় গৃধিনী; এলাকাটি প্রজাতিটির বিচরণ এলাকার ভেতরে পড়ে। ছবি: gailhampshire / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY 2.0)
নেপালের কোশি টাপ্পুতে একঝাঁক হিমালয় গৃধিনী; এলাকাটি প্রজাতিটির বিচরণ এলাকার ভেতরে পড়ে। ছবি: gailhampshire / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY 2.0)

শকুন কেন প্রকৃতির জন্য জরুরি


শকুনকে প্রায়ই প্রকৃতির ঝাড়ুদার বলা হয়। মরা প্রাণীর দেহ দ্রুত খেয়ে ফেলে তারা পচা মাংস ছড়িয়ে পড়ার আগেই সরিয়ে দেয় এবং গ্রামাঞ্চলকে এমন আবর্জনা থেকে পরিষ্কার রাখে, যা না থাকলে ইঁদুর ও বেওয়ারিশ কুকুর বাড়ত। একটি বড় দল অল্প সময়েই একটি শবকে হাড়ে পরিণত করতে পারে; এ কারণেই আগের দশকগুলোতে কৃষকেরা মরা গবাদি পশু সরাতে অনেকটা শকুনের ওপরই নির্ভর করতেন।

দক্ষিণ এশিয়াজুড়ে শকুন হারিয়ে যাওয়ার বাস্তব পরিণতি হয়েছে। সংখ্যা কমে যাওয়ায় মরদেহ পচে থাকতে শুরু করে, আর সেই শূন্যস্থান পূরণ করে বেওয়ারিশ কুকুরসহ অন্যান্য মৃতভোজী প্রাণী, যাদের সঙ্গে সংরক্ষণকর্মীরা জলাতঙ্ক ও রোগ ছড়ানোর বাড়তি ঝুঁকির সম্পর্ক দেখেন। এ কারণেই সরকার ও গবেষকেরা শকুনের সংখ্যা ফিরিয়ে আনাকে কেবল বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ নয়, জনস্বাস্থ্যের বিষয় হিসেবেও দেখেন, আর শীতে হিমালয় গৃধিনীর মতো পরিযায়ী পাখির আগমন সতর্ক দৃষ্টিতে পর্যবেক্ষণ করা হয়।

আইন যা শকুনকে রক্ষা করে


২০২৫ সালের ডিসেম্বরে কার্যকর আইন ছিল বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন, ২০১২, যা বাংলাদেশের বন্য পাখি ও প্রাণীকে রক্ষা করে। এই আইনে অনুমতি ছাড়া সংরক্ষিত বন্যপ্রাণী শিকার, হত্যা, ধরা, কেনাবেচা বা আটকে রাখা অপরাধ, আর কতটা বিপন্ন তার ভিত্তিতে প্রজাতিগুলোকে তফসিলে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। শকুন সংরক্ষিত পাখি, তাই উদ্ধার হওয়া শকুন নিজের কাছে রেখে না দিয়ে কর্তৃপক্ষের হাতে তুলে দিতে হয়, সিরাজগঞ্জের উদ্ধারকারীরা যে পথই অনুসরণ করেছেন।

একই আইন বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ এবং নিরাপদ এলাকা ও উদ্ধার কার্যক্রম পরিচালনার দায়িত্ব বন বিভাগকে দিয়েছে। জাতীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বন্য পাখিসংক্রান্ত অপরাধে এই আইনের অধীনে কারাদণ্ড ও জরিমানার কথা বলা হলেও, আইনের মূল লক্ষ্য শাস্তি নয়, রক্ষা করা। দুর্বল বা আহত শকুন পাওয়া সাধারণ মানুষের জন্য কর্তৃপক্ষের চাওয়া সহজ: পাখিটির কোনো ক্ষতি বা বিক্রি না করে তাকে শান্ত ও ভিড়মুক্ত রাখা এবং নিকটস্থ বন বা বন্যপ্রাণী কার্যালয়ে খবর দেওয়া, যাতে প্রশিক্ষিত কর্মীরা দায়িত্ব নিতে পারেন।

ছবি: Jan Reurink / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY 2.0)

সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, প্রথম আলো, মঙ্গাবে, বার্ডলাইফ ইন্টারন্যাশনাল (আইইউসিএন রেড লিস্ট), উইকিপিডিয়া, বাংলাপিডিয়া

অনলাইন ডেস্কদা এগ্রো নিউজ

পরিবেশ

সম্পর্কিত খবর

পরিবেশ

বরফের রাজ্য গরম হচ্ছে দ্রুত, হিমবাহ হ্রদের বন্যায় সবচেয়ে বেশি মৃত্যু ভারতে

কপ৩১-এর আগে প্রকাশিত দুটি প্রতিবেদন বলছে, ১.৫ ডিগ্রির সীমা সাময়িক পেরোলেও বরফের ক্ষতি স্থায়ী হবে; জাতিসংঘের নেতৃত্বে আরেক গবেষণা বলছে, ১৮৩৫ সাল থেকে হিমবাহ হ্রদের বন্যায় ভারতে মারা গেছেন ৬ হাজার ১১৯ জন।

ডাউন টু আর্থ২ নভেম্বর ২০২৬২ মিনিটের পড়া
পরিবেশ

কপ৩১-এ ঋণ নয়, অনুদানভিত্তিক জলবায়ু অর্থায়ন চাইবে বাংলাদেশ

তুরস্কের আনতালিয়ায় কপ৩১-এর ১১-১২ নভেম্বরের ওয়ার্ল্ড লিডার্স সামিটে যোগ দেবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান; বাংলাদেশ সেখানে অনুদানভিত্তিক জলবায়ু অর্থায়ন ও বড় নির্গমনকারী দেশগুলোর জবাবদিহি দাবি করবে।

বাসস২ নভেম্বর ২০২৬২ মিনিটের পড়া
মৎস্য

সিংড়ার লাড়কিবাড়ী বিলে বিষ, সামাজিক মাছ চাষে চার লাখ টাকার ক্ষতি

নাটোরের সিংড়ায় চার দশক ধরে সামাজিকভাবে মাছ চাষ হওয়া লাড়কিবাড়ী বিলে রাতে কীটনাশক দেওয়ায় প্রায় চার লাখ টাকার মাছ মরেছে; বিলের দখল নিয়ে বিরোধকে দায়ী করছেন চাষিরা।

সমকাল২ নভেম্বর ২০২৬১ মিনিটের পড়া

মন্তব্য

(০)