মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলার একটি লোকালয় থেকে প্রায় ২০ কেজি ওজনের একটি অজগর সাপ অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করা হয় ২০২৫ সালের ২৪ নভেম্বর, সোমবার। উপজেলার ইছবপুর এলাকা থেকে সাপটি উদ্ধার করেন বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশন ও বন বিভাগের সদস্যরা, সেদিন সন্ধ্যায় এ খবর প্রকাশ করে জাগো নিউজ ২৪। পরে অজগরটি শ্রীমঙ্গল বন বিভাগের রেঞ্জ কার্যালয়ে হস্তান্তর করা হয়, আর সেখান থেকে লাউয়াছড়া বনে অবমুক্ত করার জন্য সেটি বিট কর্মকর্তার কাছে দেওয়া হয়।
স্থানীয়রা জানান, ইছবপুর এলাকায় ঝোপঝাড় পরিষ্কার করার সময় শ্রমিকরা একটি দেওয়ালের ওপর অজগরটি দেখতে পান। বিশাল সাপটি দেখে তারা আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। পরে বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশনকে খবর দেওয়া হয়। ফাউন্ডেশনের পরিচালক স্বপন দেব সজলের নেতৃত্বে একটি দল ঘটনাস্থলে এসে সাপটিকে কোনো আঘাত ছাড়াই উদ্ধার করে। পরে সেটি শ্রীমঙ্গল রেঞ্জ কার্যালয়ে হস্তান্তর করা হয়।
ইছবপুরে যেভাবে উদ্ধার হলো অজগরটি
প্রতিবেদনে ঘটনার একটি ছোট ধারাবাহিকতা পাওয়া যায়। কোনো বন্যপ্রাণী খোঁজার সময় নয়, নিয়মিত ঝোপঝাড় পরিষ্কারের কাজের মধ্যেই অজগরটি চোখে পড়ে। শ্রমিকরা নিজেরা সাপটিকে কিছু করার চেষ্টা করেননি; খবর যায় বন্যপ্রাণী উদ্ধারকারী সংগঠনের কাছে, যাদের দল এসে সাপটি উদ্ধার করে সরকারি বন কার্যালয়ের হাতে তুলে দেয়। শ্রীমঙ্গল রেঞ্জ কর্মকর্তা নাজমুল ইসলাম সংবাদমাধ্যমটির কাছে উদ্ধারের বিষয়টি নিশ্চিত করেন। তিনি জানান, অজগর সাপটিকে লাউয়াছড়া বনে অবমুক্ত করার জন্য বিট কর্মকর্তার কাছে দেওয়া হয়েছে।
জাগো নিউজ ২৪ সাপটির ওজন জানিয়েছিল প্রায় ২০ কেজি। প্রতিবেদনে এর দৈর্ঘ্য বা প্রজাতির নাম উল্লেখ ছিল না, আর সাপটি স্ত্রী না পুরুষ কিংবা এর বয়স কত, সে বিষয়েও উদ্ধারকারীদের কোনো বক্তব্য ছিল না। তবে কোন প্রক্রিয়া মেনে কাজটি হয়েছে, প্রতিবেদন থেকে তা স্পষ্ট: উদ্ধারকারী সংগঠনকে খবর দেওয়া, প্রাণীটির কোনো ক্ষতি না করে উদ্ধার, বন বিভাগের কাছে হস্তান্তর, এবং যেখানে সাপটি পাওয়া গেছে সেখানে নয়, একটি সংরক্ষিত বনে অবমুক্তি।
শ্রীমঙ্গলে এমন উদ্ধার নতুন ছিল না। ২০২৫ সালের ৫ অক্টোবর দেশ রূপান্তর জানায়, একই ফাউন্ডেশন শ্রীমঙ্গলের খাইছড়া চা বাগানের লেকপাড় থেকে প্রায় ১২ ফুট লম্বা ও ২১ কেজি ওজনের একটি অজগর উদ্ধার করেছিল। সেবার দুপুরে চা শ্রমিকরা প্রথমে সাপটি দেখে বাগান ব্যবস্থাপনাকে জানান, চা কোম্পানির ব্যবস্থাপকেরা খবর দেন ফাউন্ডেশনে, আর ফাউন্ডেশনের পরিচালক স্বপন দেব সজল একজন পরিবেশকর্মীকে সঙ্গে নিয়ে এসে অজগরটি উদ্ধার করে নিয়ে যান। পরিচালক পত্রিকাটিকে জানান, সেই সাপটিকেও শ্রীমঙ্গল বন বিভাগের রেঞ্জ কার্যালয়ে হস্তান্তর করা হয়েছিল।
শ্রীমঙ্গল: চা-বাগান, বন আর গ্রাম পাশাপাশি
শ্রীমঙ্গল সিলেট বিভাগের মৌলভীবাজার জেলার সাতটি উপজেলার একটি। জাতীয় জ্ঞানকোষ বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী উপজেলাটির আয়তন ৪৫০.৭৩ বর্গকিলোমিটার। এর উত্তরে মৌলভীবাজার সদর উপজেলা, দক্ষিণে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্য, পূর্বে কমলগঞ্জ উপজেলা এবং পশ্চিমে চুনারুঘাট, বাহুবল ও নবীগঞ্জ উপজেলা। শ্রীমঙ্গল থানা গঠিত হয় ১৯১২ সালে, পৌরসভা ১৯৩৫ সালে। ২০১১ সালের আদমশুমারিতে উপজেলার জনসংখ্যা ছিল ৩ লাখ ১৮ হাজার ২৫ জন; উপজেলায় রয়েছে একটি পৌরসভা, নয়টি ইউনিয়ন ও ২০৮টি গ্রাম।
চা-ই এলাকাটির পরিচয়। বাংলাপিডিয়া শ্রীমঙ্গলের প্রধান ফসল হিসেবে চা, ধান, পান, রাবার, আলু ও সবজির কথা বলেছে; প্রধান ফল আনারস, কাঁঠাল ও লেবু, আর প্রধান রপ্তানিপণ্য চা, আনারস, লেবু ও পান। উপজেলায় ১৫টি চা কারখানা ও দুটি রাবার প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানার হিসাবও দিয়েছে জ্ঞানকোষটি। বাংলাদেশ চা বোর্ডের অধীন স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ চা গবেষণা ইনস্টিটিউট শ্রীমঙ্গলে আছে ১৯৫৭ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে, যখন এটি পাকিস্তান চা গবেষণা কেন্দ্র হিসেবে যাত্রা শুরু করে; ১৯৭৩ সালে এটি বর্তমান নাম পায়। প্রতিষ্ঠানটি শ্রীমঙ্গল শহর থেকে প্রায় ৩.২ কিলোমিটার দূরে।
এখানকার ভূদৃশ্যে চা-বাগানের সঙ্গে মিশে আছে বন ও জলাভূমি। উপজেলার নদীর মধ্যে রয়েছে বিলাস (গোপলা), গোপবিয়া, ফুলছড়ি, উদনাছড়ি ও বরমাছড়ি, আর জলাশয়ের মধ্যে সবচেয়ে পরিচিত হাইল হাওর। বাংলাপিডিয়া উপজেলার দর্শনীয় স্থানের তালিকায় লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান, বাংলাদেশ চা গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাইল হাওরের নাম রেখেছে। পুরো মৌলভীবাজার জেলার আয়তন ২ হাজার ৭৯৯.৩৮ বর্গকিলোমিটার; জেলাটির সীমানায় ভারতের আসাম ও ত্রিপুরা রাজ্য, আর এখানে বাস করে মণিপুরী, খাসিয়া, ত্রিপুরা ও হালাম জনগোষ্ঠী। বাগান, টিলা, বন আর গ্রাম যেখানে এত কাছাকাছি, সেখানে বন্যপ্রাণী ও মানুষকে অনেকটা একই জায়গা ভাগাভাগি করে থাকতে হয়।

বাংলাদেশের অজগর
অজগর বড় আকারের বিষহীন সাপ। বাংলাপিডিয়ার বর্ণনায় অজগর বোইডি (Boidae) গোত্রের সাপ, বিশাল গড়নের; দৈর্ঘ্যের তুলনায় এর দেহের বেড় প্রায় সব সাপের চেয়ে বেশি। এর আঁশ মসৃণ, আর সাপটি সুস্থ থাকলে গা চকচকে দেখায়। দাঁত শক্তিশালী, কিন্তু বিষ তৈরির কোনো ব্যবস্থা নেই। ঘাড় আলাদা করে বোঝা যায়, মাথা চ্যাপ্টা, নাক লম্বা। জ্ঞানকোষটি জানায়, ছাগল ও এ ধরনের প্রাণী শিকারের অভ্যাসের কারণেই সাপটির নাম হয়েছে অজগর।
বাংলাদেশে দুই প্রজাতির অজগর আছে। বাংলাপিডিয়া পুরোনো নামকরণ অনুসরণ করে এদের রক পাইথন (Python molurus) ও রেটিকুলেটেড পাইথন বলে উল্লেখ করেছে। বাংলাদেশে কর্মরত গবেষকদের লেখা, পিয়ার-রিভিউড সাময়িকী রেপটাইলস অ্যান্ড অ্যামফিবিয়ানস-এ ২০২৪ সালে প্রকাশিত একটি নিবন্ধে দেশের মাত্র দুই অজগর প্রজাতিকে বর্মি অজগর (Python bivittatus) ও রেটিকুলেটেড অজগর (Malayopython reticulatus) বলা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের স্মিথসোনিয়ান ন্যাশনাল জু ব্যাখ্যা করে, বর্মি অজগরকে একসময় ভারতীয় অজগরের (Python molurus) উপপ্রজাতি ধরা হতো; এখন অধিকাংশ বিশেষজ্ঞ একে আলাদা প্রজাতি হিসেবে স্বীকৃতি দেন।
২০২৪ সালের নিবন্ধটি দেশের বন্যপ্রাণী নিয়ে ২০১৮ সালের একটি আলোকচিত্র নির্দেশিকার বরাতে জানায়, বর্মি অজগর বাংলাদেশের সব বিভাগেই আছে, আর রেটিকুলেটেড অজগরের দেখা মিলেছে কেবল সিলেট ও চট্টগ্রাম বিভাগে। আইইউসিএন বাংলাদেশের ২০১৫ সালের লাল তালিকার বরাতে নিবন্ধে বলা হয়েছে, দুই প্রজাতিকেই মাঝেমধ্যে বনে দেখা যায়, তবে বাগান, খামার ও মানুষের হাতে বদলে যাওয়া অন্যান্য আবাসেও এরা থাকে। বাংলাপিডিয়া দুটি সাপেরই আবাস হিসেবে দেশের উত্তর-পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের মিশ্র চিরসবুজ বনের কথা বলেছে, আর রক পাইথন সুন্দরবনেও পাওয়া যায় বলে উল্লেখ করেছে।
বর্মি অজগর বিশ্বের সবচেয়ে বড় সাপগুলোর একটি। স্মিথসোনিয়ান ন্যাশনাল জুর হিসাবে এর গড় দৈর্ঘ্য ৩ থেকে ৪.৯ মিটার, আর ৪.৬ মিটারের বেশি লম্বা অজগর প্রায়ই দেখা যায়; স্ত্রী অজগর সাধারণত পুরুষের চেয়ে বড় হয়। বাংলাপিডিয়া রক পাইথনকে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সাপ বলেছে, যা প্রায় ৫.৭ মিটার পর্যন্ত লম্বা হতে পারে। দেহের রং হালকা বাদামি, হলদেটে বাদামি বা ধূসর হতে পারে, তার ওপর ক্রিম বা সোনালি রেখায় ঘেরা বড় বড় গাঢ় বাদামি বা জলপাই রঙের ছোপ। অজগর পেঁচিয়ে শিকার মারে বলে এর বিষদাঁত নেই, তবে পেছনের দিকে বাঁকানো অনেকগুলো দাঁত দিয়ে এটি শিকার আঁকড়ে ধরে রাখে।

অজগরের জীবনযাপন, শিকার ও প্রজনন
বেশিরভাগ অজগর আংশিক বৃক্ষবাসী এবং বনে থাকে, তবে বাংলাপিডিয়া জানায়, নদী, হাওর ও বিলেও এদের পাওয়া যায়। পানিতে এরা স্বচ্ছন্দ, প্রয়োজনে দক্ষতার সঙ্গে জোরে সাঁতার কাটে, আর সাধারণত তীরের কাছে নাকের ডগাটুকু ছাড়া শরীরের অংশবিশেষ বা পুরোটাই পানিতে ডুবিয়ে থাকে। ভারতে বর্মি অজগর নিয়ে রেপটাইলস অ্যান্ড অ্যামফিবিয়ানস-এ ২০২০ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণাপত্রে বলা হয়েছে, এরা মূলত রাতে সক্রিয়, নানা ধরনের প্রাণী শিকার করে, এবং সাধারণত পানির উৎসের কাছে থাকে বলে অনেক সময় এদের আধা-জলচর বলা হয়। জলাভূমি, বাদাবন, তৃণভূমি, বনভূমি, ম্যানগ্রোভ, উপকূলীয় সমভূমি, বৃষ্টিবন ও পাথুরে পাহাড়ের পাদদেশকে এদের আবাসের তালিকায় রেখেছে গবেষণাপত্রটি।
বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী অজগর স্তন্যপায়ী, পাখি ও সরীসৃপ সবই খায়, তবে স্তন্যপায়ী প্রাণীর প্রতি এর ঝোঁক বেশি বলে মনে হয়; ইঁদুর, খরগোশ, ছাগল, ভেড়া, শিয়াল ও হরিণ এর সাধারণ শিকার। অজগর শিকারকে পেঁচিয়ে ধরে চাপ দেয়, আর শ্বাসরোধ হয়ে শিকারটি মারা যায়। সাপ সাধারণত শিকার আস্ত গিলে ফেলে; জ্ঞানকোষটি ব্যাখ্যা করে, সাপের চোয়ালের দুই অর্ধেক স্থিতিস্থাপক লিগামেন্ট দিয়ে যুক্ত থাকে, তাই গেলার সময় প্রতিটি অর্ধেক আলাদাভাবে নড়াচড়া করতে পারে। স্মিথসোনিয়ান যোগ করে, বনে সাপ সাধারণত প্রতিদিন খায় না; বর্মি অজগর সকালবেলা রোদের উষ্ণতা নেয়, যাতে খাবারের খোঁজে চলাফেরা করতে পারে, আর সফলভাবে শিকার করার পর খাবার হজমের জন্য কয়েক দিন থেকে কয়েক সপ্তাহ শরীর উষ্ণ রাখার চেষ্টায় কাটায়।
স্তন্যপায়ী প্রাণীর মতো সাপ শরীরের তাপমাত্রা স্থির রাখতে পারে না। বাংলাপিডিয়া সাপকে শীতল রক্তের (পইকিলোথার্মাস) প্রাণী বলেছে: এদের তিন প্রকোষ্ঠের হৃৎপিণ্ডে অক্সিজেনসমৃদ্ধ ও অক্সিজেনহীন রক্ত আংশিক মিশে যায়, ফলে শরীরের তাপমাত্রা স্থির রাখার মতো শক্তি কম পাওয়া যায়। সাপের বাইরের কোনো কানের ছিদ্র নেই; নিচের চোয়ালের মাধ্যমে এরা মাটির কম্পন টের পায়। চেরা জিভ দিয়ে এরা বাতাস ও মাটি থেকে রাসায়নিক সংকেত সংগ্রহ করে ওপরের চোয়ালের জ্যাকবসন অঙ্গে পৌঁছে দেয়; দুর্বল শ্রবণশক্তি ও কম দৃষ্টিশক্তির ঘাটতি এভাবেই পূরণ হয়।
বাংলাপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশে অজগরের প্রজনন শুরু হয় ডিসেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারির মধ্যে, আর এর তিন থেকে চার মাস পর ডিম পাড়ে। স্ত্রী অজগর ডিমগুলোর চারপাশে কুণ্ডলী পাকিয়ে সেগুলোতে তা দেয়, তবে ছানা ফোটার পর মা আর তাদের যত্ন নেয় না। স্মিথসোনিয়ানের হিসাবে বর্মি অজগর গড়ে ৩০ থেকে ৬০টি ডিম পাড়ে, কখনো ১০০টি পর্যন্ত। ছানা না ফোটা পর্যন্ত স্ত্রী অজগর ডিম পেঁচিয়ে থাকে, এই সময়ে, যা দুই মাস বা তার বেশি হতে পারে, সে কিছু খায় না, এবং পেশি কাঁপিয়ে কুণ্ডলীর ভেতরের তাপমাত্রা বাড়িয়ে রাখে। সদ্য ফোটা ছানা প্রায় ৩১ থেকে ৪৬ সেন্টিমিটার লম্বা হয়। বর্মি অজগর চার থেকে পাঁচ বছরে প্রজননক্ষম হয়, আর মানুষের তত্ত্বাবধানে সাধারণত ২০ থেকে ২৫ বছর বাঁচে; বনে এদের আয়ু কত, তা জানা নেই।
অজগর কেন বাড়িঘর ও খামারের কাছে আসে
অজগরের টিকে থাকার জন্য অক্ষত বন অপরিহার্য নয়। রেপটাইলস অ্যান্ড অ্যামফিবিয়ানস-এর ২০২৪ সালের নিবন্ধ অনুযায়ী, বাংলাদেশের দুই প্রজাতির অজগরই বনের পাশাপাশি বাগান, খামার ও মানুষের হাতে বদলে যাওয়া আবাসে দেখা যায়। স্মিথসোনিয়ান জানায়, গৃহপালিত হাঁস-মুরগি ও শূকরের উপস্থিতি বর্মি অজগরকে কৃষি এলাকার দিকে টেনে আনে। খামার ও বাড়ির আশপাশে যেখানে ইঁদুর, হাঁস-মুরগি ও অন্যান্য শিকার জড়ো হয়, সেখানে বড় এই সাপও আসতে পারে।
কৃষি এলাকায় সাপ উপকারী কাজও করে। বাংলাপিডিয়া বলছে, সাপ প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক জীবন্ত প্রাণী খায়, যেগুলোর বেশিরভাগকে সাধারণত ফসলের শত্রু বা মানুষের জন্য বিপজ্জনক বলে ধরা হয়। স্মিথসোনিয়ান সাপের পরিবেশগত সেবার মধ্যে ইঁদুরের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণে রাখার কথা বলেছে এবং সাপকে ইঁদুর নিয়ন্ত্রণের অপরিহার্য প্রাণী বলেছে, যাদের অভাবে ইঁদুরের উপদ্রবে অনেক ফসল নষ্ট হয়। বাংলাদেশে প্রায় ৯০ প্রজাতির সাপের বেশিরভাগই বিষহীন; বাংলাপিডিয়া এদের চার ভাগের তিন ভাগের বেশিকে বিষহীন বলেছে, আর সাধারণ বিষহীন সাপের তালিকায় অজগরের নাম রেখেছে।
শ্রীমঙ্গলে ২০২৫ সালের অক্টোবরে খাইছড়া চা বাগানের ঘটনা এবং নভেম্বরে ইছবপুরের ঘটনা, দুটিতেই বড় অজগরগুলো পাওয়া গিয়েছিল শ্রমিকদের কাজের সময়: একটি বাগানের লেকপাড়ে, আরেকটি ঝোপঝাড় পরিষ্কারের সময় দেওয়ালের ওপর। প্রতিবেদন অনুযায়ী দুই ক্ষেত্রেই যারা সাপটি দেখেছিলেন, তারা নিজেরা কিছু না করে উদ্ধারকারী ফাউন্ডেশনকে খবর দেন, আর সাপটি জীবিত অবস্থায় বন বিভাগের কাছে পৌঁছায়।
ঝুঁকিতে থাকা একটি প্রজাতি
বিশ্বপর্যায়ে আইইউসিএন লাল তালিকায় বর্মি অজগর 'সংকটাপন্ন' (Vulnerable) হিসেবে তালিকাভুক্ত, স্টুয়ার্ট ও সহকর্মীদের ২০১২ সালের মূল্যায়নে। সেই মূল্যায়নের বরাতে রেপটাইলস অ্যান্ড অ্যামফিবিয়ানস-এর ২০২০ সালের গবেষণাপত্র আবাস হারানো, মাংস, চামড়া ও প্রথাগত ওষুধের জন্য চোরাশিকার এবং জীবন্ত প্রাণীর আন্তর্জাতিক বাণিজ্যকে প্রধান হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করেছে। স্মিথসোনিয়ান ন্যাশনাল জু জানায়, নিজ আবাস অঞ্চলে বর্মি অজগর বিস্তৃত এলাকায় ছড়িয়ে থাকলেও এদের সংখ্যা কমছে: মানুষের সামনে পড়লে চামড়া বা মাংসের জন্য, কিংবা কেবল সাপ বলেই অনেক সময় এদের মেরে ফেলা হয়, আর জুতা, বেল্ট ও অন্যান্য পণ্য তৈরির চামড়ার জন্য লাখ লাখ অজগর মারা পড়ে। এশিয়ায় কমতে থাকা এই সংখ্যার বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ফ্লোরিডার কিছু অংশে প্রজাতিটি আগ্রাসী হয়ে উঠেছে।
দেশের ভেতরে বাংলাপিডিয়া জানায়, দুই প্রজাতির অজগরই এখন দুর্লভ; রক পাইথনকে দেশে মহাবিপন্ন এবং রেটিকুলেটেড পাইথনকে বিপন্ন প্রজাতি হিসেবে গণ্য করা হয়। জ্ঞানকোষটি আরও বলেছে, অজগরের চামড়ার বাণিজ্যিক মূল্য আছে, আর সাধারণভাবে প্রক্রিয়াজাত সাপের চামড়ার বাজারদর অনেক বেশি। লোকালয়ে পাওয়া অজগর উদ্ধারকারী সংগঠন ও বন বিভাগ যে সংরক্ষিত বনে ছেড়ে দেয়, তার পেছনে এই চাপগুলোও একটি কারণ।
২০২৫ সালের নভেম্বরে আইন যা বলত
ইছবপুরে উদ্ধারের সময় বাংলাদেশে বন্যপ্রাণী সুরক্ষা দেওয়া হতো বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন, ২০১২ অনুযায়ী। ২০১২ সালের ১০ জুলাই তারিখের এই আইন ১৯৭৩ সালের বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ) আদেশ রহিত করে। আইনের প্রকাশিত ইংরেজি পাঠে ধারা ২(৩৭)-এ 'শিকার' বলতে যেকোনো বন্যপ্রাণী হত্যা, ধরা বা বিষ প্রয়োগ, কিংবা তার চেষ্টাকেও বোঝানো হয়েছে। ধারা ৬(১) অনুযায়ী এই আইনের অধীনে লাইসেন্স বা পারমিট ছাড়া কেউ কোনো বন্যপ্রাণী শিকার করতে পারবেন না। ধারা ৫৩ বলছে, বাংলা ও ইংরেজি পাঠে বিরোধ দেখা দিলে বাংলা পাঠই প্রাধান্য পাবে।
ধারা ৬ লঙ্ঘনের শাস্তি নির্ধারণ করেছে ধারা ৩৯: সর্বোচ্চ এক বছরের কারাদণ্ড, বা সর্বোচ্চ ৫০ হাজার টাকা জরিমানা, বা উভয় দণ্ড। একই অপরাধ আবার করলে সর্বোচ্চ দুই বছরের কারাদণ্ড, বা সর্বোচ্চ এক লাখ টাকা জরিমানা, বা উভয় দণ্ড। অর্থাৎ নিজের উদ্যোগে কোনো বন্য অজগর মারা বা ধরার সুযোগ আইনে ছিল না।
ইছবপুরের অজগরটি যে পথে গেছে, আইনে সে পথের কথাও আছে। ধারা ৯ অনুযায়ী ধরা পড়া, উদ্ধার করা বা জব্দ করা কোনো বন্যপ্রাণীকে খাঁচা বা ঘেরের মধ্যে রাখলে যদি তার জীবন ঝুঁকিতে পড়ে, তবে উপযুক্ত প্রাকৃতিক আবাসে অবমুক্ত করার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। কোনো বন্যপ্রাণী মানুষের জীবন বা সম্পদের জন্য হুমকি হলে ধারা ৮ প্রধান ওয়ার্ডেন, অতিরিক্ত প্রধান ওয়ার্ডেন বা ওয়ার্ডেনকে পুনর্বাসনসহ কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার দায়িত্ব দিয়েছে। আর ধারা ৩০ সরকারকে আহত, জব্দ, পরিত্যক্ত বা দান করা বন্যপ্রাণীর চিকিৎসা, খাবার, আশ্রয় ও নিরাপত্তার জন্য বন্যপ্রাণী উদ্ধার কেন্দ্র স্থাপনের ক্ষমতা দিয়েছে।
সাধারণ মানুষের জন্য নিরাপদ পথ সেটিই, যা ইছবপুরের শ্রমিকরা নিয়েছিলেন: সাপ থেকে দূরে থাকা এবং বন বিভাগ বা বন্যপ্রাণী উদ্ধারকারী দলকে খবর দেওয়া। স্মিথসোনিয়ানের নিজস্ব পরামর্শও হলো, বনে-বাদাড়ে সাপ দেখলে সেটিকে তার মতো থাকতে দিতে হবে, সাপটি বিষধর বলে ধরে নেওয়া যাবে না, এবং নিজের নিরাপত্তার জন্য হুমকি না হলে সেটিকে আক্রমণ করা যাবে না। বড় অজগর ধরা বা সরানো বন বিভাগের সঙ্গে কাজ করা প্রশিক্ষিত উদ্ধারকারীদের কাজ।
লাউয়াছড়া: অবমুক্তির জন্য বেছে নেওয়া বন
লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান শ্রীমঙ্গলের কাছেই, মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলায়। ২০২১ সালের মে মাসে প্রথম আলো জানায়, সিলেট বন বিভাগের অধীন পশ্চিম ভানুগাছ সংরক্ষিত বনের ১ হাজার ২৫০ হেক্টর এলাকা নিয়ে ১৯৯৬ সালে উদ্যানটি প্রতিষ্ঠিত হয়। ডেইলি স্টারের ২০১৮ সালের মার্চের একটি প্রতিবেদনেও বলা হয়, ১৯৯৬ সালে বন বিভাগ ১ হাজার ২৫০ হেক্টর সংরক্ষিত বন নিয়ে এলাকাটিকে জাতীয় উদ্যান ঘোষণা করে; প্রতিবেদনটি আরও জানায়, কমলগঞ্জ-শ্রীমঙ্গল সড়কের প্রায় সাড়ে পাঁচ কিলোমিটার এই বনের ভেতর দিয়ে গেছে।
প্রথম আলোর একই প্রতিবেদনে এই সংরক্ষিত বনকে উল্লুক, ধূসর হনুমান, লজ্জাবতী বানর, বনরুই, মেছোবাঘ, বনমোরগ ও মায়া হরিণের মতো দুর্লভ প্রাণী এবং নানা প্রজাতির সাপ ও পাখির অভয়াশ্রম বলা হয়েছে; সেখানে অনেক দুর্লভ উদ্ভিদ, ঝোপঝাড় ও লতানো বাঁশও আছে। ২০১২ সালের আইনে জাতীয় উদ্যান বলতে বোঝানো হয়েছে অসাধারণ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের তুলনামূলক বড় একটি এলাকা, যা সরকার প্রজ্ঞাপন দিয়ে ঘোষণা করে এবং যা শিক্ষা, গবেষণা ও বিনোদনের পাশাপাশি উদ্ভিদ, বন্যপ্রাণী ও তাদের আবাস সংরক্ষণের জন্য পরিচালিত হয়।
শ্রীমঙ্গলের লোকালয়ে পাওয়া একটি অজগরের জন্য তাই কাছের সংরক্ষিত বন লাউয়াছড়াই ছিল স্বাভাবিক গন্তব্য। জাগো নিউজ ২৪-কে রেঞ্জ কর্মকর্তা নাজমুল ইসলাম জানিয়েছিলেন, সেখানে অবমুক্ত করার জন্য সাপটি এরই মধ্যে বিট কর্মকর্তার হাতে দেওয়া হয়েছে।

ছবি: MD sajjad hossain photography / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪ (২৪ নভেম্বর ২০২৫), দেশ রূপান্তর (৫ অক্টোবর ২০২৫), বাংলাপিডিয়া (অজগর, সাপ, শ্রীমঙ্গল উপজেলা, মৌলভীবাজার জেলা, বাংলাদেশ চা গবেষণা ইনস্টিটিউট), রেপটাইলস অ্যান্ড অ্যামফিবিয়ানস (২০২০ ও ২০২৪), স্মিথসোনিয়ান ন্যাশনাল জু অ্যান্ড কনজারভেশন বায়োলজি ইনস্টিটিউট, বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন, ২০১২, প্রথম আলো (১৫ মে ২০২১), দ্য ডেইলি স্টার (২০ মার্চ ২০১৮)





মন্তব্য
(০)