সরাসরিবাজারদর
আটা (প্যাকেটজাত)৫৮+০.০%আদা - আমদানিকৃত১৬৭+০.০%আদা - দেশী১৫৪+০.০%আমন চাল - মাঝারি৫৬+০.০%আমন চাল - মোটা৪৮+০.০%আমন চাল - সরু৭২+০.০%আয়োডিনযুক্ত লবণ (প্যাকেটজাত)৩২+০.০%কাঁচা মরিচ২১৮+০.০%খামারের মুরগী১৬২+০.০%খাসী৯০০+০.০%চিনি (দেশী)১৩২+০.০%ছোলা - গোটা৮৫+০.০%ডিম ফার্ম - লাল৪৭+০.০%পেঁয়াজ - দেশী৬০+০.০%বোরো চাল - মাঝারি৫৫+০.০%বোরো চাল - মোটা৪৭+০.০%বোরো চাল - সরু৬৬+০.০%মাংসঃ– গরু৭২৯+০.০%মুগ ডাল১২২+০.০%রসুন - আমদানিকৃত১৯২+০.০%রসুন - দেশী১৭৩+০.০%সয়াবিন তেল১৬৩+০.০%
হালনাগাদ ১ নভেম্বর ২০২৬
ঢাকা৩২°মূলত পরিষ্কারআর্দ্রতা ৫৬%বাতাস ৬ কিমি/ঘ

মৌলভীবাজারে বন্যায় গো-খাদ্য সংকটে বিপাকে গবাদিপশুর মালিকেরা

২০২৬ সালের জুলাইয়ের বন্যায় মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ, কুলাউড়া, রাজনগর ও সদর উপজেলার প্রায় ২৮টি ইউনিয়নে চারণভূমি ও গো-খাদ্য তলিয়ে যাওয়ায় অনেক গবাদিপশু অসুস্থ হয়ে পড়ে; জেলা প্রাণিসম্পদ অফিস তখনো ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ করছিল।

মৌলভীবাজারে বন্যায় গো-খাদ্য সংকটে বিপাকে গবাদিপশুর মালিকেরা
লাইভস্টক

২০২৬ সালের জুলাইয়ের দ্বিতীয় সপ্তাহে চলমান বন্যায় উত্তর-পূর্ব বাংলাদেশের মৌলভীবাজার জেলার চারটি উপজেলার প্রায় ২৮টি ইউনিয়নের মানুষ গবাদিপশু নিয়ে চরম বিপাকে পড়েন। কমলগঞ্জ, কুলাউড়া, রাজনগর ও সদর উপজেলায় বন্যার পানিতে বসতঘর ও চারণভূমি তলিয়ে যাওয়ায় দেখা দেয় তীব্র গো-খাদ্য সংকট। খাদ্যের অভাবে অনেক গবাদিপশু অসুস্থ হয়ে পড়ে, আর কম দামেও গরু বিক্রি করতে পারছিলেন না মালিকেরা। ২০২৬ সালের ১৩ জুলাই জাগো নিউজ ২৪-এ প্রকাশিত প্রতিবেদনে উঠে আসে এমন এক সংকটের চিত্র, যার ধাক্কা সবচেয়ে বেশি লেগেছিল সেই পরিবারগুলোর ওপর, যাদের জীবিকা কয়েকটি গবাদিপশুর ওপর নির্ভরশীল।

পানিতে দাঁড়িয়ে থাকা পশু, মুখে উঠছে না খাবার


রাজনগর, কমলগঞ্জ ও কুলাউড়া উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়ন ঘুরে দেখা যায়, নদ-নদীর পানি কমতে শুরু করায় বন্যা পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলেও সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে ছিলেন গবাদিপশুর মালিকেরা। বিস্তীর্ণ এলাকা কয়েকদিন পানির নিচে থাকায় ঘাস ও সংরক্ষিত গো-খাদ্য পচে নষ্ট হয়ে যায়। মাঠে পশু চরানোর সুযোগ না থাকায় অনেকে গবাদিপশু উঁচু স্থানে বা সড়কের পাশে বেঁধে রাখেন। কেউ কেউ ধানের গুঁড়া ও শুকনা খড় খাইয়ে পশুগুলোকে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করছিলেন।

গবাদিপশু নিয়ে বিপাকে পড়া মানুষেরা জানান, টানা ৪ দিন ধরে একই জায়গায় দাঁড়িয়ে ছিল পশুগুলো। অনেক পশু অসুস্থ হয়ে পড়েছিল, আর গো-খাদ্যের মজুত প্রায় শেষ। তাঁরা বলেন, সবকিছু বন্যার পানির নিচে থাকায় চারপাশে একটা গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে; এ কারণে পানি কমে যাওয়ার পরও পশুরা খাবার মুখে তুলছিল না। খড় ছাড়া আর কিছুই দেওয়া যাচ্ছিল না, কারণ পানি নামলেও ঘাস ও গো-খাদ্য পচে গিয়েছিল।

রাজনগর উপজেলার টেংরা ইউনিয়নের জরিফ মিয়া ও বেলাল মিয়া বলেন, বন্যায় সারা এলাকা ডুবে গিয়েছিল। তাঁরা বলেন, 'গরুগুলো ৪ দিন ধরে না খেয়ে আছে। গরুর জন্য কোনো ধরনের খাবার পাচ্ছি না। আমাদের ৮টি গরু আছে, এর মধ্যে দুটি অসুস্থ হয়ে পড়েছে।'

বাংলাদেশের একটি নদীর চরে চরছে গবাদিপশু; বর্ষায় নিচু চারণভূমি তলিয়ে গেলে দেখা দেয় গো-খাদ্য সংকট (ফাইল ছবি)। ছবি: ওয়াটার অল্টারনেটিভস / উইকিমিডিয়া কমন্স (সিসি০)
বাংলাদেশের একটি নদীর চরে চরছে গবাদিপশু; বর্ষায় নিচু চারণভূমি তলিয়ে গেলে দেখা দেয় গো-খাদ্য সংকট (ফাইল ছবি)। ছবি: ওয়াটার অল্টারনেটিভস / উইকিমিডিয়া কমন্স (সিসি০)

ক্ষয়ক্ষতির হিসাব তখনো নিরূপণ করছিল প্রাণিসম্পদ অফিস


মৌলভীবাজার জেলা প্রাণিসম্পদ অফিস সূত্রে জানানো হয়, চলমান বন্যায় পশুর কী পরিমাণ ক্ষতি হয়েছে তার সঠিক তথ্য পেতে এক-দুই দিন সময় লাগবে। জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. আশরাফুল আলম খান বলেন, বন্যা পরিস্থিতিতে মানুষের পাশাপাশি যাদের ঘরে গবাদিপশু আছে, তারা স্বাভাবিকভাবেই একটু বেশি সংকটে পড়েছেন; জেলায় বন্যায় কী পরিমাণ ক্ষতি হয়েছে তা নিরূপণ করা হচ্ছে। প্রতিবেদন প্রকাশের সময় পর্যন্ত গবাদিপশুর ক্ষয়ক্ষতির কোনো সংখ্যা প্রকাশ করা হয়নি; কর্মকর্তারা জানান, পানি নেমে গিয়ে মাঠপর্যায়ের কর্মীরা ক্ষতিগ্রস্ত ইউনিয়নে পৌঁছাতে পারলেই কেবল প্রকৃত হিসাব করা সম্ভব।

যেভাবে জুলাইয়ের বন্যা গ্রামে গ্রামে ছড়িয়ে পড়ে


জুলাইয়ের দ্বিতীয় সপ্তাহে সিলেট বিভাগের যে কয়েকটি জেলা বর্ষার বন্যায় কবলিত হয়, মৌলভীবাজার তার অন্যতম। এই অঞ্চলের নদ-নদীগুলো দ্রুত ফুঁসে ওঠে, কারণ এগুলো আন্তঃসীমান্ত: মনু, ধলাই, জুড়ী ও কুশিয়ারা সবই ভারতের ত্রিপুরা ও আসামের পাহাড় থেকে নেমে আসে, ফলে উজানে ভারী বৃষ্টি হলে এক-দুই দিনের মধ্যেই পানি তীর উপচে পড়তে পারে। বাংলাদেশের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র প্রতিটি নদীর মাপনকেন্দ্রের জন্য একটি বিপৎসীমা নির্ধারণ করে; পানি সেই সীমা অতিক্রম করলেই বাঁধের পেছনের নিচু জমি ঝুঁকিতে পড়ে।

উত্তর-পূর্ব বাংলাদেশ পৃথিবীর অন্যতম ভারী বর্ষণের পথে অবস্থিত। সীমান্তের ওপারে মেঘালয় ও ত্রিপুরার পাহাড়, যার মধ্যে চেরাপুঞ্জি অঞ্চলও পড়ে, প্রচুর বৃষ্টি পায় এবং সেই পানি সরাসরি সিলেট বিভাগের হাওর ও নদ-নদীতে নেমে আসে। এই অববাহিকা খাড়া ও কাছাকাছি হওয়ায় উজানে ভারী বৃষ্টির কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই নদীর পানি স্বাভাবিক থেকে বিপৎসীমার ওপরে উঠে যেতে পারে, আর তাতেই দেখা দেয় আকস্মিক বন্যা, যার জন্য অঞ্চলটি পরিচিত। মধ্যাঞ্চলের গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র সমতলের ধীরগতির নদীবন্যার চেয়ে এটি আলাদা; এ কারণেই মৌলভীবাজারের বন্যাকবলিত পরিবারগুলো প্রায়ই পশু ও খাবার নিরাপদ জায়গায় সরানোর তেমন সময় পায় না।

বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের অধীন বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র প্রধান নদীগুলোর মাপনকেন্দ্রে পানির উচ্চতা পর্যবেক্ষণ করে এবং বর্ষাজুড়ে প্রতিদিন বুলেটিন প্রকাশ করে, আর পানি উন্নয়ন বোর্ড নদীকে ঠেকিয়ে রাখার বাঁধ নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণ করে। হাওর অঞ্চলে এই দুই কাজ, অর্থাৎ পূর্বাভাস আর বাঁধ রক্ষণাবেক্ষণ, ফুলে ওঠা নদী আর তার প্লাবনভূমির গ্রামগুলোর মধ্যে ঢাল হয়ে দাঁড়ায়। সিলেট অঞ্চলের পঞ্জিকায় বন্যা বিরল কোনো ঘটনা নয়, বরং বারবার ফিরে আসা একটি বৈশিষ্ট্য: এপ্রিল-মে মাসের প্রাক-বর্ষা আকস্মিক বন্যা হাওরে পাকতে থাকা বোরো ধানের ক্ষতি করতে পারে, আর প্রধান নদীবন্যা আসে জুন-জুলাইয়ের ভারী বৃষ্টির সঙ্গে। ২০২৬ সালের জুলাইয়ের বন্যা মৌসুমের এই দ্বিতীয় তথা তুঙ্গ পর্বে পড়েছিল, যখন নদীগুলো আগে থেকেই ফুলে থাকে এবং উজানে নতুন বৃষ্টি হলে তা দ্রুত বিপৎসীমা ছাড়িয়ে যেতে পারে।

সংবাদ প্রতিবেদনগুলোতে ২০২৬ সালের জুলাইয়ের বন্যার ঘটনাপ্রবাহ এভাবে উঠে আসে: মাসের প্রথম সপ্তাহে টানা বৃষ্টির পর জেলার নদ-নদীর পানি বাড়তে থাকে এবং ৮ জুলাইয়ের মধ্যে বন্যার আশঙ্কা দেখা দেয়। ৯ জুলাইয়ের দিকে মনু ও ধলাই নদের পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে বইতে শুরু করে এবং রাজনগর ও কমলগঞ্জ উপজেলায় বাঁধ ভেঙে যায়। ৯ ও ১০ জুলাই বাঁধ ভাঙার পরিধি বাড়তে থাকে; বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম প্লাবিত গ্রামের সংখ্যা ৫ থেকে ৩০-এর বেশি পর্যন্ত এবং ১০ ও ১১ জুলাই প্রকাশিত প্রতিবেদনে ক্ষতিগ্রস্ত উপজেলাগুলোয় পানিবন্দি মানুষের সংখ্যা আনুমানিক ১৫ হাজার থেকে ৩৮ হাজার পর্যন্ত উল্লেখ করে। পানি সরে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এসব প্রাথমিক সংখ্যা সংবাদমাধ্যমভেদে ভিন্ন ছিল। গো-খাদ্য সংকটের পাশাপাশি প্রাথমিক প্রতিবেদনগুলোতে পানিবন্দি গ্রামে বিশুদ্ধ খাবার পানি, খাদ্য ও ওষুধের সংকটের কথাও উঠে আসে এবং স্থানীয় প্রশাসন আশ্রয়কেন্দ্র খুলে দেয়।

মনু ও ধলাই: যে নদ মৌলভীবাজারকে বাঁচায়, আবার ডোবায়


বাংলাদেশ এনসাইক্লোপিডিয়া বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী, মনু নদের উৎপত্তি ভারতের পাহাড়ি ত্রিপুরার সাক্কানক্লাং পর্বতশ্রেণির কাহৈসিব চূড়ার নিচে। উজানের অংশে নদটি খাড়া পাথুরে দেয়ালঘেরা সরু গিরিখাত ও গভীর স্বচ্ছ জলাধারের মধ্য দিয়ে বয়ে যায়; সমতলে পৌঁছে তা চওড়া, ধীর ও আঁকাবাঁকা স্রোতে পরিণত হয়। উত্তরমুখী হয়ে সিলেটের সমতলে নেমে নদটি কুলাউড়া উপজেলা দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে, এরপর উত্তর-পশ্চিম ও উত্তর দিকে বাঁক নিয়ে মনুমুখে কুশিয়ারার সঙ্গে মিলিত হয়। রাজনগর উপজেলায় ধলাই নদ মনুর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে।

সংবাদ প্রতিবেদন অনুযায়ী মনুর দৈর্ঘ্য প্রায় ১৬৭ থেকে ১৮৬ কিলোমিটার, যার বাংলাদেশ অংশ প্রায় ৭৪ কিলোমিটার, আর দুই তীরজুড়ে রয়েছে রক্ষা বাঁধ। শুষ্ক মৌসুমে এই বাঁধই নদকে খাতের মধ্যে ধরে রাখে, কিন্তু ভরা বর্ষায় সেগুলোই দুর্বল স্থান হয়ে দাঁড়ায়: পানি বিপৎসীমার ওপরে উঠলে বাঁধ ভেঙে নিচু গ্রামগুলো প্লাবিত হয়। মনুর কারণে মৌলভীবাজার আগেও প্লাবিত হয়েছে; ২০১৮ সালের জুনে সংবাদ প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, মনুসহ বিভিন্ন নদের পানি বাড়ায় মৌলভীবাজারে ৩ লাখের বেশি মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছিলেন।

মনু ও ধলাইয়ের তীরের বাঁধগুলো রক্ষণাবেক্ষণ করে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড, আর মৌলভীবাজারে ভরা পানিতে বাঁধ ভাঙা বারবার ফিরে আসা একটি সমস্যা। স্থানীয় বাসিন্দা ও আগের প্রতিবেদনগুলোতে দীর্ঘদিন ধরে দুর্বল ও পলি জমে ভরাট হয়ে যাওয়া অংশগুলোর কথা বলা হয়েছে, যেগুলো নদীর পানি বাড়লে ভেঙে পড়ে; ২০২৬ সালের জুলাইয়ে রাজনগর ও কমলগঞ্জে বাঁধ ভাঙার ঘটনাও সেই চেনা ধারারই অংশ। প্রতিটি ভাঙন পানিকে সরাসরি বাঁধের পেছনের জনবসতিপূর্ণ প্লাবনভূমিতে ঢুকিয়ে দেয়, আর সেখানেই থাকে বসতঘর, চারণভূমির ফালি ও খড়ের গাদা; ফলে বাঁধ ভাঙা ও গবাদিপশুর সংকট প্রায় একসঙ্গে হাজির হয়।

মৌলভীবাজারের মনু নদ। ছবি: রকি মাসুম / উইকিমিডিয়া কমন্স (সিসি বাই-এসএ ৪.০)
মৌলভীবাজারের মনু নদ। ছবি: রকি মাসুম / উইকিমিডিয়া কমন্স (সিসি বাই-এসএ ৪.০)

প্রধান গো-খাদ্য খড়, আর বন্যা যেভাবে তা নষ্ট করে


প্রতিবেদনে বর্ণিত গো-খাদ্য সংকট আসলে গ্রামীণ বাংলাদেশে গবাদিপশু পালনের ধরন থেকেই জন্ম নেয়। বেশির ভাগ ছোট খামারি আলাদা করে সবুজ ঘাসের কোনো ফসল আবাদ করেন না; তাঁদের পশু বেঁচে থাকে উন্মুক্ত চারণভূমিতে চরে আর সর্বোপরি খড়ের ওপর, অর্থাৎ ধান কাটার পর পড়ে থাকা শুকনা নাড়ার ওপর। এপ্রিল-মে মাসে কাটা বোরো এবং বছরের শেষ দিকে কাটা আমন ধানের খড় গাদা করে বাড়ির আঙিনায় মজুত করা হয়, যাতে ঘাসের অভাবের মাস, বিশেষ করে বর্ষায়, পশুগুলোকে খাওয়ানো যায়।

হাওর অববাহিকায় খড়ের ওপর এই নির্ভরতা আরও তীব্র। এখানকার প্রধান ফসল বোরো ধান, যা বছরের বাকি সময় পানির নিচে থাকা জমিতে শুষ্ক মৌসুমে আবাদ করে বর্ষার বন্যা শুরুর ঠিক আগে এপ্রিল-মে মাসে কাটা হয়। সেই একটিমাত্র ফসলের খড়ই পরবর্তী মাসগুলোতে গবাদিপশুর খাদ্যের মূল ভরসা। ২০২৬ সালের জুলাইয়ের মতো আগেভাগে বা প্রবল বন্যা এলে তা কেবল দাঁড়ানো ফসল নয়, কেটে মজুত করে রাখা খড়ের গাদাকেও হুমকিতে ফেলে; ফলে হাওরের পরিবারগুলো দ্বিগুণ ঝুঁকিতে পড়ে।

বন্যা এই ব্যবস্থাকে দুই দিক থেকেই ভেঙে দেয়: একদিকে তা পশুর চরানোর মাঠ ও সড়কের পাশের জমি ডুবিয়ে দেয়, অন্যদিকে মজুত করা খড়ের গাদা ভিজিয়ে পচিয়ে ফেলে। মৌলভীবাজারের মালিকেরা যেমন বলেছিলেন, ঘাস ও গো-খাদ্য পচে যাওয়ার পর খড় ছাড়া আর কিছুই দেওয়ার থাকছিল না, আর সেটিও ফুরিয়ে আসছিল। পানি নেমে যাওয়ার পর পচা গাছপালা থেকে ছড়ানো গন্ধও পশুদের খাবারে অরুচি এনে দেয়। সারা বছরের বড় অংশজুড়ে দেশে সবুজ গো-খাদ্যের ঘাটতি থাকায় একটি মাত্র বন্যা খড়ের মজুত নষ্ট করলে পশুগুলো সপ্তাহের পর সপ্তাহ অভুক্ত থাকতে পারে; এ কারণেই প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তারা বন্যা ত্রাণে জরুরি গো-খাদ্যকে অগ্রাধিকার দেন।

মৌলভীবাজার: হাওর ও চায়ের জেলা


মৌলভীবাজার সিলেট বিভাগের একটি জেলা। এর আয়তন প্রায় ২,৭৯৯ বর্গকিলোমিটার এবং ২০২২ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী জনসংখ্যা ২১ লাখ ২৩ হাজারের বেশি। জেলায় ৭টি উপজেলা রয়েছে: মৌলভীবাজার সদর, কমলগঞ্জ, কুলাউড়া, রাজনগর, শ্রীমঙ্গল, বড়লেখা ও জুড়ী। শ্রীমঙ্গলকে বলা হয় বাংলাদেশের 'চায়ের রাজধানী'; দেশের বেশির ভাগ চা-বাগান এই জেলায়। জেলার উল্লেখযোগ্য পণ্যের মধ্যে আছে বাঁশ, চা, আনারস, বেত, কাঁঠাল, কমলা, আগর, রাবার, আম ও লেবু।

মনু, ধলাই ও জুড়ী জেলার প্রধান নদ, আর হাকালুকি হাওর, হাইল হাওর ও মাধবপুর লেক উল্লেখযোগ্য জলাভূমি। প্লাবিত চারটি উপজেলা, অর্থাৎ কমলগঞ্জ, কুলাউড়া, রাজনগর ও সদর, মনু ও ধলাইয়ের প্লাবনভূমির ধারে অবস্থিত; এখানকার অনেকটা জমিই নিচু হাওর অববাহিকার অন্তর্গত, যা বর্ষায় ভরে ওঠে। ফলে চারণভূমি ও বসতভিটা দ্রুত পানির নিচে চলে যায়, আর পশু সরানোর বা খাবার মজুত রক্ষা করার সময়ও মেলে কম।

হাকালুকি হাওর ও পানির নিচে চলে যাওয়া চারণভূমি


হাকালুকি হাওর বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ মিঠাপানির জলাভূমি, যার আয়তন প্রায় ১৮১ বর্গকিলোমিটার। এটি মৌলভীবাজারের বড়লেখা (যার প্রায় ৪০ শতাংশ এই উপজেলায়), কুলাউড়া ও জুড়ী এবং সিলেটের গোলাপগঞ্জ ও ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলাজুড়ে বিস্তৃত। এটি একটি পরিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা (ইসিএ) হিসেবে ঘোষিত; এখানে ৫৫৮ প্রজাতির প্রাণী ও পাখি শনাক্ত করা হয়েছে এবং হাওর ঘিরে প্রায় ১ লাখ ৯০ হাজার মানুষের বসবাস।

হাকালুকি বহু পরস্পর-সংযুক্ত বিল বা স্থায়ী জলাশয় নিয়ে গঠিত এবং এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ অভ্যন্তরীণ মৎস্যভাণ্ডার ও পরিযায়ী জলচর পাখির শীতকালীন আবাস; এ কারণেও এটিকে পরিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা ঘোষণা করা হয়েছে। হাওরপাড়ের গ্রামগুলোর জন্য বর্ষায় যে পানি মাছ ও পাখিকে টিকিয়ে রাখে, সেই পানিই শুষ্ক মৌসুমে গবাদিপশুর চরানোর জমি কেড়ে নেয়।

শুষ্ক মৌসুমে হাওরের বিলগুলো সংকুচিত হয়ে এলে উন্মুক্ত জমি চারণভূমি ও বোরো ধানের আবাদে ব্যবহৃত হয়; বর্ষায় পুরো অববাহিকা ভরে উঠলে সেই চারণভূমি পানির নিচে চলে যায়। এই ঋতুচক্র স্বাভাবিক হলেও ২০২৬ সালের জুলাইয়ের মতো হঠাৎ পানি বাড়লে পশুদের চরানোর জায়গা থাকে না, আর উঁচু স্থানে গো-খাদ্য সরানোরও সময় মেলে না। এ কারণেই এসব উপজেলায় বন্যা এত দ্রুত গবাদিপশুর সংকটে রূপ নেয়।

মৌলভীবাজারের কুলাউড়া, বড়লেখা ও জুড়ী উপজেলাজুড়ে বিস্তৃত হাকালুকি হাওর (ফাইল ছবি)। ছবি: শাহনূর হাবিব মুন্মুন / উইকিমিডিয়া কমন্স (সিসি বাই ২.৫)
মৌলভীবাজারের কুলাউড়া, বড়লেখা ও জুড়ী উপজেলাজুড়ে বিস্তৃত হাকালুকি হাওর (ফাইল ছবি)। ছবি: শাহনূর হাবিব মুন্মুন / উইকিমিডিয়া কমন্স (সিসি বাই ২.৫)

গ্রামীণ অর্থনীতিতে গবাদিপশু


প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের 'লাইভস্টক ইকোনমি অ্যাট আ গ্ল্যান্স ২০২৩-২৪' অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রায় ২ কোটি ৫০ লাখ গরু, ১৫ লাখ মহিষ, প্রায় ২ কোটি ৭০ লাখ ছাগল ও প্রায় ৪০ লাখ ভেড়া রয়েছে। প্রাণিসম্পদ খাত দেশের মোট জিডিপির প্রায় ১.৯ শতাংশ এবং কৃষি জিডিপির প্রায় ১৬.৫ শতাংশ জোগায় (২০২১-২২ অর্থবছর)। এই খাত বহু গ্রামীণ পরিবারের নগদ আয় ও পুষ্টির অন্যতম উৎস।

এই গবাদিপশুর বেশির ভাগই বড় বাণিজ্যিক খামারে নয়, বরং গ্রামীণ পরিবারগুলোর কাছে অল্পসংখ্যায়, সাধারণত দুই থেকে পাঁচটি করে, ফসল চাষের পাশাপাশি পালিত হয়। হাওর অঞ্চলে যেখানে আবাদি জমি কেবল এক মৌসুমের, সেখানে গবাদিপশু পালন আয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ দ্বিতীয় উৎস, আর পশু দেখভালের কাজে নারী ও পরিবারের প্রবীণ সদস্যরাও সমানভাবে যুক্ত থাকেন। এই পারিবারিক পরিসরের কারণেই বন্যার ক্ষতি কয়েকটি বড় খামারে কেন্দ্রীভূত না হয়ে বহু পরিবারের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে, আর ত্রাণ পৌঁছাতে হয় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা অসংখ্য বাড়িতে।

হাওরপাড়ের একজন ছোট খামারির কাছে কয়েকটি গরু একদিকে দুধ ও হালচাষের শক্তি, অন্যদিকে বিপদের দিনে বিক্রি করার মতো সঞ্চয়। অনেক পরিবারের কাছে গবাদিপশুই সবচেয়ে বড় সম্পদ, যা প্রয়োজনে নগদ অর্থে রূপান্তর করা যায়। তাই বন্যায় পশু অসুস্থ হওয়া বা মারা যাওয়া মানে পরিবারের ওপর সরাসরি আর্থিক আঘাত; আর খাদ্য সংকটে কম দামেও গরু বিক্রি করতে না পারা সেই চাপ আরও বাড়িয়ে তোলে।

এর একটি পরোক্ষ প্রভাবও আছে। যেসব এলাকায় এখনো হালচাষ ও মালবহনে গরু ব্যবহৃত হয়, সেখানে বন্যায় দুর্বল বা মারা যাওয়া পশু কৃষককে পরবর্তী আবাদের জন্য হালের শক্তির সংকটে ফেলে দেয়; এর সঙ্গে যোগ হয় দুধ, গোবর ও বিক্রয়মূল্যের ক্ষতি, যা পরিবারটি অন্যথায় পেত। ভাঙা ঘর ও নষ্ট হওয়া খাদ্যের মজুত নিয়ে ইতিমধ্যে হিমশিম খাওয়া পরিবারগুলোর জন্য পশুর ওপর এই চাপ কঠিন এক মৌসুমে আরও একটি আঘাত; এ কারণেই বন্যা ত্রাণে খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানির পাশাপাশি গবাদিপশুও গুরুত্ব পায়।

বন্যায় গবাদিপশুর ঝুঁকি ও করণীয়


যে অধিদপ্তর এই পরিসংখ্যান প্রকাশ করে, সেই প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর দেশজুড়ে পশুস্বাস্থ্য, টিকাদান, জাত উন্নয়ন ও প্রাণিসম্পদ সম্প্রসারণের দায়িত্বে থাকা সরকারি সংস্থা। এটি জেলা প্রাণিসম্পদ অফিস এবং উপজেলা প্রাণিসম্পদ অফিস ও ভেটেরিনারি হাসপাতালের মাধ্যমে কাজ করে, যেগুলো খামারিদের প্রথম যোগাযোগকেন্দ্র এবং যেগুলোর মধ্য দিয়ে বন্যাকবলিত এলাকায় জরুরি গো-খাদ্য ও চিকিৎসাসেবা পৌঁছায়।

বন্যা দুর্যোগে কাজের অভিজ্ঞতা থেকে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) উল্লেখ করেছে, বন্যার পর মূল সমস্যা হয়ে দাঁড়ায় বেঁচে থাকা পশুগুলোকে খাওয়ানো, কারণ বন্যা দাঁড়ানো গো-খাদ্য ও সংরক্ষিত খড় নষ্ট করে দেয়। দুর্বল পশুগুলো রোগ ও পরজীবীর বাড়তি ঝুঁকিতে পড়ে, আর দ্রুত খাবার, বিশুদ্ধ পানি ও ভেটেরিনারি সেবা পৌঁছানোই ক্ষতি কমিয়ে রাখতে পারে। পানিতে দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকা বা দূষিত পানি খাওয়া পশুরা বিশেষভাবে ঝুঁকিপূর্ণ।

প্রাণিসম্পদ বিশেষজ্ঞরা বন্যাকবলিত মালিকদের পরামর্শ দেন, পশুগুলোকে শুকনা উঁচু জায়গায় সরিয়ে নিতে, বিশুদ্ধ পানি ও যতটা সম্ভব শুকনা খড় দিতে এবং অসুস্থ পশু দেখলে নিজে ওষুধ প্রয়োগ না করে উপজেলা প্রাণিসম্পদ অফিসে জানাতে। জরুরি গো-খাদ্য, টিকা ও চিকিৎসার জন্য উপজেলা ও জেলা প্রাণিসম্পদ অফিসই যোগাযোগের কেন্দ্র, যারা বন্যা-পরবর্তী সময়ে ক্ষতিগ্রস্ত খামারিদের সহায়তা দিয়ে থাকে।

ছবি: পররাষ্ট্র ও বাণিজ্যবিষয়ক দপ্তর (অস্ট্রেলিয়া) / উইকিমিডিয়া কমন্স (সিসি বাই ২.০)

সূত্র: জাগো নিউজ ২৪; আজকের পত্রিকা ও সময়ের আলো (১৩ জুলাই ২০২৬); মনু বাঁধ ভাঙা নিয়ে ডেইলি স্টার বাংলা, ঢাকা পোস্ট, কালবেলা ও আরটিভির প্রতিবেদন (৯-১১ জুলাই ২০২৬); বাংলাপিডিয়া; ইংরেজি উইকিপিডিয়া (মৌলভীবাজার জেলা, হাকালুকি হাওর); প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর, লাইভস্টক ইকোনমি অ্যাট আ গ্ল্যান্স ২০২৩-২৪; এফএও

অনলাইন ডেস্কদা এগ্রো নিউজ

লাইভস্টক

সম্পর্কিত খবর

লাইভস্টক

ওজন কমানোর ওষুধে বদলাচ্ছে মার্কিন বাজার, চাহিদা বাড়ছে মুরগি আর অল্প পরিমাণ ভালো গরুর মাংসে

কোব্যাংকের অর্থনীতিবিদ ব্রায়ান আর্নেস্ট বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি চার পরিবারের একটিতে জিএলপি-১ ওষুধ সেবনকারী আছেন; তাঁরা আমিষবহুল মুরগি আর ছোট পরিমাণের ভালো মানের গরুর মাংস বেশি কিনছেন।

মিশিগান এজি টুডে৩১ অক্টোবর ২০২৬১ মিনিটের পড়া
পরিবেশ

বন্যার আগেই সহায়তা: দক্ষিণ সুদানে এফএও ও ডব্লিউএফপিকে ২১ লাখ পাউন্ড দিল যুক্তরাজ্য

এল নিনোর সম্ভাব্য বন্যা ও খরার আগে জঙ্গলেই, ইউনিটি ও আপার নাইলে আগাম সতর্কতা, নগদ সহায়তা, জীবিকা সুরক্ষা ও ত্রাণসামগ্রী মজুতে এই অর্থ খরচ হবে ২০২৭ সালের মার্চ পর্যন্ত।

ডব্লিউএফপি৩১ অক্টোবর ২০২৬২ মিনিটের পড়া
লাইভস্টক

যুক্তরাষ্ট্রের ৫০০-র বেশি কাউন্টিতে বড় পশুর চিকিৎসকের সংকট

মন্টানায় এক তথ্যচিত্রের প্রদর্শনীতে পশুচিকিৎসকেরা বলেছেন, শিক্ষাঋণ, চেম্বার খোলার খরচ আর দিনরাত জরুরি ডাকের চাপে নতুন চিকিৎসকেরা গ্রামে যেতে চান না; একজন বাড়তি চিকিৎসকেই বদলেছে একটি ক্লিনিকের চিত্র।

নর্দার্ন এজি নেটওয়ার্ক৩১ অক্টোবর ২০২৬২ মিনিটের পড়া

মন্তব্য

(০)