পুকুর বা জলাশয়ের পাশে অল্প পুঁজিতে কীভাবে হাঁস পালন করা যায়, তা নিয়ে ২০২৫ সালের এপ্রিলে দ্য এগ্রো নিউজের নিজস্ব প্রতিনিধি একটি নির্দেশিকা তুলে ধরেছিলেন। তাতে বলা হয়, শুরুতে ছোট খামার করে পরে বাণিজ্যিক আকারে যাওয়াই ভালো। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) এবং ভারতের কেন্দ্রীয় পোলট্রি উন্নয়ন সংস্থার (সিপিডিও) নির্দেশিকা এ নিয়মগুলোর বিস্তারিত দেয়।
কোন জাতের হাঁস, কেন পুকুরের পাশে
ডিমের জন্য লেয়ার জাতের হাঁস পালন করা হয়; এর মধ্যে খাকি ক্যাম্পবেল, ইন্ডিয়ান রানার ও দেশি পাতি হাঁস উল্লেখযোগ্য। এফএওর টেকা নির্দেশিকা অনুযায়ী খাকি ক্যাম্পবেল ইংল্যান্ডে ইন্ডিয়ান রানার ও রুয়েন হাঁসের সংকর থেকে তৈরি; গরম আবহাওয়ায় মানিয়ে নেয় এবং বছরে ২৫০ থেকে ৩০০টি ডিম দিতে পারে।
বাংলাদেশে হাঁস ডিমের বড় উৎস। এফএওর পারিবারিক পোলট্রি নেটওয়ার্কে ২০১২ সালে প্রকাশিত ব্র্যাকের এক নোটে বলা হয়, দেশের মোট বার্ষিক ডিম উৎপাদনের প্রায় ২২ থেকে ২৫ শতাংশ আসে হাঁস থেকে, আর সরকারি হাঁস প্রজনন খামার থেকে খাকি ক্যাম্পবেল, জিনডিং ও মাসকোভি জাতের বাচ্চা সরবরাহ করা হয়। হাওরে প্রায় প্রতিটি পরিবার ৫ থেকে ১০০টি হাঁস রাখে।

ঘর ও পানির ব্যবস্থা
এফএওর নির্দেশিকা অনুযায়ী রাতের আশ্রয়ের জন্য প্রতি ৫ থেকে ৬টি হাঁসে ১ বর্গমিটার জায়গাই যথেষ্ট; দিনেও ঘরে রাখলে প্রতিটি হাঁসের জন্য আধা বর্গমিটার লাগে। ঘরে বাতাস চলাচল থাকতে হবে। পুকুরের ওপর ঘর করলে বাঁশ বা কাঠের ফালি দিয়ে মেঝে বানানো যায়, ফালির মাঝে প্রায় ১ সেন্টিমিটার ফাঁক রাখলে বিষ্ঠা সরাসরি পানিতে পড়ে পুকুরে সারের কাজ করে। মাটির মেঝেতে খড় বা তুষের বিছানা শুকনো রাখতে হয়।
ছোট হাঁসের বাচ্চা দিনে অন্তত এক ঘণ্টা করে দুবার পানিতে ছাড়া যায়, তবে বেশি সময় রাখলে ঠান্ডা লাগার ঝুঁকি থাকে। এফএও জানায়, ইনকিউবেটরে ফোটা বাচ্চা প্রায় তিন সপ্তাহ বয়সের আগে পালকে তেল মাখাতে পারে না। পূর্ণবয়স্ক হাঁস দিনে ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা পানিতে সাঁতার কাটতে পারে। সিপিডিওর মতে সাঁতারের পানি অপরিহার্য নয়, কিন্তু পানির পাত্র এমন গভীর হতে হবে যাতে হাঁস মাথা ডুবিয়ে চোখ পরিষ্কার করতে পারে।
সিপিডিওর মতে হাঁস-মাছের সমন্বিত চাষে হাঁসের বিষ্ঠাই মাছের খাবার হয়, হেক্টরপ্রতি ২০০ থেকে ৩০০টি হাঁস রাখা যায়। তবে বড় হাঁস ছোট মাছের পোনা ধরে খায়; তাই পোনা ছাড়ার পর প্রায় ১৫ দিন হাঁসকে আটকে রাখা যেতে পারে।

খাবার কী ও কতটুকু
সিপিডিওর নির্দেশিকায় জোর দিয়ে বলা হয়েছে, হাঁস যেন কখনো পানি ছাড়া খাবার না পায়। শুকনো খাবার দিলে পাশে অবশ্যই পানির পাত্র রাখতে হয়, কারণ বাচ্চা হাঁস খাবার মুখে নিয়ে পানির সাহায্যে গিলে ফেলে। ঘরে তৈরি খাবারে সাধারণত যা থাকে:
- ধান ও চালের খুদ
- চালের কুঁড়া
- গম ভাঙা ও গমের ভুসি
- ভাঙা শামুক ও ঝিনুক (ছোট বাচ্চাকে খুব অল্প পরিমাণে)
প্রতিবেদনে উন্নত জাতের হাঁসের দৈনিক খাবার ১৬০ থেকে ১৮০ গ্রাম বলা হয়েছিল; সিপিডিওর হিসাবে খাকি ক্যাম্পবেল ২০ সপ্তাহ বয়স পর্যন্ত মোট প্রায় সাড়ে ১২ কেজি খাবার খায়, পরে ডিম উৎপাদন ও সবুজ খাবারের প্রাপ্যতা অনুযায়ী দিনে ১২০ গ্রাম বা তার বেশি। দিনের খাবার সকাল, দুপুর ও বিকেলে ভাগ করে দেওয়া যায়।
ডিম পাড়ার সময়ের যত্ন
প্রতিবেদন অনুযায়ী হাঁসি সাধারণত ২২ থেকে ২৩ সপ্তাহ বয়সে ডিম পাড়া শুরু করে, যদিও সিপিডিও জানায় বেশি ডিম দেওয়া জাত ১৬ থেকে ১৮ সপ্তাহেই পাড়তে পারে। সিপিডিওর হিসাবে ৯৫ থেকে ৯৮ শতাংশ ডিম সকাল ৯টার আগেই পাড়া হয়; এফএও বলছে সূর্যোদয়ের তিন ঘণ্টার মধ্যে। তাই খুব ভোরে ঘর থেকে ছাড়লে হাঁস পানিতে ডিম পাড়তে পারে। ঘরে প্রতি তিন থেকে ছয়টি হাঁসের জন্য একটি করে ডিম পাড়ার বাক্স রাখলে ডিম পরিষ্কার থাকে।
হাঁসের ডিম মুরগির ডিমের চেয়ে বড়; সিপিডিওর মতে প্রায় ১৫ থেকে ২০ গ্রাম ভারী। যে হাঁসি ডিম পাড়ে না, তাকে চিহ্নিত করে ঝাঁক থেকে বাদ দিতে হয়। শুধু ডিমের জন্য পালন করলে পুরুষ হাঁস লাগে না; বাচ্চা ফোটাতে চাইলে প্রতিবেদনে ৭ থেকে ৮টি হাঁসির জন্য একটি হাঁসা রাখার কথা বলা হয়েছিল, এফএও ও সিপিডিওর নির্দেশিকায় অনুপাতটি ৬ থেকে ৭টিতে একটি।

ছবি: Masum Ibn Musa / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: দ্য এগ্রো নিউজ (নিজস্ব প্রতিনিধি), জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও টেকা: Duck keeping in the tropics), কেন্দ্রীয় পোলট্রি উন্নয়ন সংস্থা (দক্ষিণাঞ্চল), ভারত, এফএও আইএনএফপিডি ও ব্র্যাক (হাওর অঞ্চলে হাঁস পালন বিষয়ক নোট, ২০১২)





মন্তব্য
(০)