পরীক্ষাগারে প্রাণিকোষ থেকে চাষ করা মাংস, অর্থাৎ কালচার্ড মাংস যত বাজারের কাছে আসছে, শিল্পটির সামনে তত বড় হয়ে উঠছে নিরাপত্তা প্রমাণের প্রশ্ন। ফুডনেভিগেটর জানিয়েছে, কালচার্ড মাংস খেলে স্বাস্থ্যের ক্ষতি হয়, এমন কোনো প্রকাশিত গবেষণা এখনো নেই। আবার এটি পুরোপুরি ঝুঁকিমুক্ত, তা-ও প্রমাণিত হয়নি। যুক্তরাজ্যের পার্লামেন্টের ২০২৫ সালের একটি ব্রিফিংয়ে দেখা যায়, কালচার্ড মাংস খাওয়ার প্রভাব সরাসরি পরীক্ষা করা কোনো পিয়ার-রিভিউড গবেষণা নেই।
২০১৩ সালে নেদারল্যান্ডসের মাসট্রিখট বিশ্ববিদ্যালয়ে মার্ক পোস্টের (Mark Post) দল প্রথম কালচার্ড গরুর মাংসের বার্গার দেখিয়েছিল, খরচ পড়েছিল ৩ লাখ ২৫ হাজার ডলার। গুড ফুড ইনস্টিটিউটের হিসাবে ২০২৫ সালের শেষে বিশ্বে ১৪০টির বেশি কোম্পানি কালচার্ড মাংস, সামুদ্রিক খাবার বা সংশ্লিষ্ট উপকরণ তৈরি করছিল। তাদের পদ্ধতিও আলাদা: অ্যালেফ ফার্মস স্টেকের মতো টুকরার জন্য উদ্ভিজ্জ প্রোটিনের কাঠামো ব্যবহার করে, আপসাইড ফুডস কাঠামো ছাড়াই মুরগির কোষ চাষ করে, আর গুড মিট সিরামমুক্ত মাধ্যম তৈরি করেছে।
ওয়াশিংটনের সেন্টার ফর ফুড সেফটির নীতি পরিচালক জেডি হ্যানসন (Jaydee Hanson) বলেন, কালচার্ড মাংসের নিরাপত্তা অনেকটাই নির্ভর করে কী চাষ করা হচ্ছে তার ওপর। পোল্যান্ডের পোজনান ইউনিভার্সিটি অব মেডিক্যাল সায়েন্সেসের গবেষক পিওতর জিমস্কি (Piotr Rzymski) সম্ভাব্য ঝুঁকিগুলো তুলে ধরেন: কোষ চাষের সময় জীবাণু দূষণ, যা অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল দিয়ে নির্ভরযোগ্যভাবে দূর করা যায় না, এবং চূড়ান্ত পণ্যে কালচার মাধ্যমের উপাদানের অবশেষ। প্রচলিত মাংসের সঙ্গে পুষ্টিগুণের পার্থক্যও স্পষ্ট লেবেলে জানানো দরকার হতে পারে।
বোস্টনের ভিরিও অ্যাডভাইজার্সের নিরাপত্তা ও নিয়ন্ত্রণ পরামর্শক কিম্বারলি অং (Kimberly Ong) মনে করেন, কোষ যেহেতু কড়া নিয়ন্ত্রিত প্রক্রিয়ায় জানা উপকরণে বেড়ে ওঠে, তাই দূষণ বা মাধ্যমের অবশেষের মতো ঝুঁকি প্রচলিত বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতেই শনাক্ত ও মূল্যায়ন করা যায়। তবে প্রতিটি পণ্যের আলাদা নিরাপত্তা মূল্যায়ন লাগবে।
হালাল প্রশ্নটি আলাদা। জিমস্কি বলেন, শুরুর কোষ জীবিত প্রাণী থেকে নাকি হালালভাবে জবাই করা প্রাণী থেকে নেওয়া, আর ভ্রূণের গোবৎস সিরাম, প্রাণিজ গ্রোথ ফ্যাক্টর ও কাঠামোর ব্যবহার, এসব হালাল শর্তের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে। নিরাপদ প্রমাণিত হলেই কোনো পণ্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে হালাল হয় না। তাঁর দল প্রস্তাব করেছে 'হালাল-বাই-ডিজাইন' পদ্ধতি: প্রাণিজ উপাদানমুক্ত মাধ্যম, একই ধরনের সনদ মানদণ্ড, আর শুরু থেকেই বিজ্ঞানী, নিয়ন্ত্রক ও ইসলামি পণ্ডিতদের যুক্ত করা। ইন্দোনেশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের মতো বাজারে এটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন তাঁরা।
সবচেয়ে কঠিন হতে পারে আস্থা অর্জন। অস্ট্রেলিয়ার ডিকিন বিশ্ববিদ্যালয়ের গি লিয়েম (Gie Liem) ১,৫৪০ জন প্রাপ্তবয়স্কের ওপর জরিপ করে দেখেছেন, ঝুঁকির ধারণার চেয়ে সুবিধার ধারণা গ্রহণযোগ্যতায় বেশি প্রভাব ফেলে, আর শুধু বৈজ্ঞানিক তথ্য বাড়িয়ে ভোক্তার মন জয় করা কঠিন। যে প্রাণিসম্পদ খামারিরা প্রযুক্তিটির দিকে নজর রাখছেন, তাঁদের জন্য বার্তা হলো, এর বাজারে পৌঁছানোর পথ পরীক্ষাগার ছাড়াও নিয়ন্ত্রক, সনদদাতা আর ক্রেতার আস্থার মধ্য দিয়ে যায়।
ছবি: World Economic Forum / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY 3.0)
সূত্র: FoodNavigator





মন্তব্য
(০)