ভারতের একাধিক গবেষণা প্রতিষ্ঠানের এক যৌথ গবেষণায় দেখা গেছে, বঙ্গোপসাগর থেকে ডিম পাড়তে গঙ্গায় ঢোকা বহু ইলিশ আর কখনও সাগরে ফিরে যাচ্ছে না। ২০১৮ সালের ২৩ জানুয়ারি বিবিসি বাংলা দিল্লি থেকে এই খবর প্রকাশ করে। গবেষণার সঙ্গে যুক্ত বিজ্ঞানীরা বিবিসিকে জানান, এ কারণেই গঙ্গার মোহনা থেকে প্রায় দুশো কিলোমিটার উজানেও এখন সারা বছর ইলিশ ধরা পড়ছে। তাঁদের ধারণা, মোহনায় পাতা অসংখ্য জালের কারণেই ইলিশের ঝাঁক মিঠা পানিতে থেকে যাচ্ছে।
ইলিশের বৈজ্ঞানিক নাম Tenualosa ilisha, এটি হেরিং পরিবারের (ক্লুপিইডি) মাছ। এটি বাংলাদেশের জাতীয় মাছ এবং ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের রাজ্য-মাছ। সাধারণভাবে ইলিশকে বলা হয় ‘অ্যানাড্রোমাস’ মাছ: বড় হয় সাগরে, আর ডিম পাড়তে উজান বেয়ে নদীতে ঢোকে।
অটোলিথে মিলেছে প্রমাণ
বিবিসির প্রতিবেদন অনুযায়ী, গবেষণাটির অর্থায়ন করে বেঙ্গালুরুর ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স। গবেষক দলের অন্যতম প্রধান বিজ্ঞানী অধ্যাপক অসীম কুমার নাথ জানান, ইলিশের ‘অটোলিথে’ বিভিন্ন রাসায়নিকের পরিমাণের তারতম্য দেখে তাঁরা এর প্রমাণ পেয়েছেন। তাঁর ভাষায়, "অটোলিথ মাছের একটা অর্গ্যান, যা ইলিশের ক্ষেত্রে মাথায় থাকে... এই অটোলিথ বিশ্লেষণ করে একটা মাছের মাইগ্রেটরি রুট সম্বন্ধে ধারণা পাওয়া যায়।"
অটোলিথকে বলা হয় মাছের ‘কানের পাথর’। যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় সমুদ্র ও বায়ুমণ্ডল প্রশাসনের (নোয়া) মৎস্য বিভাগের তথ্যে, এটি অস্থিযুক্ত মাছের মাথার ভেতরে থাকা ক্যালসিয়াম কার্বোনেটের ছোট গঠন, যাতে প্রতি বছর বৃদ্ধির একটি করে বলয় তৈরি হয়। অটোলিথ বাড়ার সময় চারপাশের পানির কিছু মৌল, বিশেষ করে স্ট্রনশিয়াম, এর ভেতরে জমা হয়। তাই এর রাসায়নিক গঠন থেকে বোঝা যায় মাছটি জীবনের কোন সময়ে কোন ধরনের পানিতে ছিল, মিঠা না লোনা।
অধ্যাপক নাথ বিবিসিকে বলেন, অটোলিথ কেটে দেখা যাচ্ছে বহু ইলিশ আর সাগরে ফিরছে না। মিঠা পানিতেই এগুলোর ওজন পাঁচশো থেকে সাড়ে পাঁচশো গ্রাম হয়ে গেছে, আবার পাঁচ থেকে দশ গ্রাম ওজনের ছোট ইলিশও মিলছে।

জালের চাপে মিঠা পানিতে থেকে যাওয়া
ভারতের সেন্ট্রাল ইনস্টিটিউট অব ফিশারিজ এডুকেশনের মুখ্য বিজ্ঞানী বি কে মহাপাত্র বিবিসিকে বলেন, সাগরে না ফেরা এই ইলিশদের এক ধরনের বেঁচে থাকার চেষ্টা, যাকে তিনি ‘ন্যাচারাল সিলেকশন’ হিসেবে দেখছেন। তাঁর ব্যাখ্যায়, গলদা চিংড়ির মতো ‘ক্যাটাড্রোমাস’ প্রাণী ডিম পাড়তে নদী থেকে মোহনার দিকে যায়, আর ইলিশ অ্যানাড্রোমাস বলে সাগর থেকে নদীতে আসে। তিনি বলেন, "গঙ্গার এসচুয়ারি জুড়ে বিছানো আছে চোদ্দ হাজারেরও বেশি জাল, তাই প্রাণে বাঁচতেই তারা রয়ে যাচ্ছে মিষ্টি জলে।"
অধ্যাপক নাথ জানান, কাকদ্বীপের নিচে নিশ্চিন্দাপুরে যেখানে মিঠা পানি শুরু, সেখান থেকে দুশো কিলোমিটারেরও বেশি উজানে বলাগড় পর্যন্ত জানুয়ারি থেকে বর্ষার পর পর্যন্ত সারা বছরই ইলিশ পাওয়া যাচ্ছে। তবে তিনি সতর্ক করেন, বিশেষ করে বর্ষার পর কৃষিজমির কীটনাশক মেশানো পানি নদীতে এলে এই মিঠা পানির ইলিশের বড় ক্ষতি হচ্ছে। ড. মহাপাত্রের মতে, নদীতে ঢোকার পর ইলিশের শরীরে চর্বি বাড়ে, তাই স্বাদে এগুলো গভীর সমুদ্রে ধরা ইলিশের চেয়েও ভালো।

নদীবাসী ইলিশের কথা আগেও জানা ছিল
নদীতে স্থায়ীভাবে থাকা ইলিশের কথা বিজ্ঞানীদের কাছে একেবারে নতুন নয়। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) বে অব বেঙ্গল প্রোগ্রামের জন্য বি টি অ্যান্টনি রাজার লেখা ১৯৮৫ সালের এক পর্যালোচনায় বলা হয়, ইলিশ মূলত অ্যানাড্রোমাস হলেও এর আরও দুটি ধরন চিহ্নিত হয়েছে: নদীতেই থাকা ও প্রজনন করা একটি ধরন এবং একটি সামুদ্রিক ধরন। পর্যালোচনায় পুরনো গবেষণার বরাতে বলা হয়, নদীর ইলিশের মজুত সারা বছর মিঠা পানিতেই থাকে বলে মনে হয়।
বিবিসির প্রতিবেদনে গুজরাটের উকাই জলাধারের উদাহরণও দেওয়া হয়েছিল, যেখানে ইলিশ থেকে গিয়ে ডিম পেড়েছিল। এফএওর ওই পর্যালোচনা অনুযায়ী, উকাইয়ে কৃত্রিম প্রজননে পাওয়া ইলিশের পোনা ছেড়ে দেওয়ার পর সেখানে নিজে থেকে বংশ বাড়ানো একটি মজুত গড়ে ওঠে। ছাড়া পোনা ১৭ মাসে ৫০০ গ্রাম ওজনে পৌঁছায় এবং ২১ মাস বয়স হওয়ার আগেই আবদ্ধ পানিতে প্রথমবার ডিম পাড়ে।
সাগরে কখনও না যাওয়া ইলিশকে আসল ইলিশ বলা যায় কি না, তা নিয়ে মৎস্যবিজ্ঞানী ও খাদ্যরসিকদের মধ্যে দুই রকম মত থাকার কথাও বিবিসি উল্লেখ করেছিল। তবে গবেষকদের পর্যবেক্ষণ ছিল, গঙ্গার জেলেরা সেই ইলিশ সারা বছরই পাচ্ছেন।

ছবি: Prabirghose / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: বিবিসি বাংলা, এফএও বে অব বেঙ্গল প্রোগ্রাম (বি টি অ্যান্টনি রাজা, ১৯৮৫), নোয়া ফিশারিজ, উইকিপিডিয়া





মন্তব্য
(০)