নরসিংদীর চরসিন্দুরের চরে একসময় ক্ষীরাখেত পাহারা দিতে গিয়ে কৃষকেরা রাতে যে সাপের মতো প্রাণী তাড়াতেন, সেটি আসলে মাছ: বাহোক, বাসুকি বা ক্ষীরাবাইম নামে পরিচিত ইন্ডিয়ান মটলড ইল (Anguilla bengalensis)। প্রথম আলোয় প্রকাশিত লেখায় বন্য প্রাণী সংরক্ষক ও লেখক সরওয়ার পাঠান লিখেছেন, নিজের অনুসন্ধানে গত ২০ বছরে শীতলক্ষ্যার কোথাও তিনি এ মাছের খোঁজ পাননি।
লেখক কৃষক বুরুজ মিয়ার একটি রাতের বর্ণনা দিয়েছেন: নদী থেকে খেতে ওঠার পথে শুকনা ছাই ছিটিয়ে রেখে প্রাণীটিকে তাড়া দিতেন, ছাইয়ে এসে সেটি গড়াগড়ি খেলে লাঠি দিয়ে ধরতেন। সেবার ধরা পড়া মাছটি প্রায় চার ফুট লম্বা, ওজন সাত কেজি। ১৯৮৮ সালে চরসিন্দুরের বান্ধব কটন মিলের কেয়ারটেকার রহমান মিয়ার বড়শিতে ওঠা একটি বাহোক ছিল প্রায় ৯ কেজি, পাঁচ ফুট লম্বা।
ক্ষীরা, শসা, শর্ষে বা গোলার ধান খেতে বাহোকের ডাঙায় ওঠার গল্প স্থানীয় মানুষের মুখে মুখে ফেরে, তবে লেখক নিজেই মনে করিয়ে দিয়েছেন, এগুলো লোককথা। বৈজ্ঞানিক তথ্যে বাহোক নিশাচর মাংসাশী মাছ, খাবার ছোট মাছ, কাঁকড়া, ব্যাঙ, চিংড়ি ও অন্যান্য জলজ প্রাণী। নদীর খাড়া পাড়ের গভীর গর্তে থাকতে পছন্দ করে।
এর জীবনচক্র ইলিশের উল্টো। বাহোকের জন্ম সমুদ্রে; ডিম ফোটা স্বচ্ছ, পাতার মতো লার্ভা স্রোতে ভেসে উপকূলে আসে, গ্লাস ইল হয়ে নদীতে ঢোকে। মিঠাপানিতে কয়েক বছর কাটিয়ে প্রজননের জন্য আবার সমুদ্রে ফেরে। বড় হতে হতে স্বচ্ছ দেহ ধূসর, বাদামি বা জলপাই রঙের হয়, গায়ে পড়ে গাঢ় ছোপ। লেখক হরিপদ দত্তের স্মৃতি উদ্ধৃত করে তিনি লিখেছেন, বাহোকের ছানা কাচকির ঝাঁকের সঙ্গে মিশে বৈশাখে বেলজালে উঠে আসত।
তেলকোমা, বাওবাইম, বামোশ নামেও পরিচিত এ মাছ একসময় দেশের নানা নদী ও পাহাড়ি ছড়ায় মিলত। লেখকের মতে নদীদূষণ, আবাসস্থলের অবক্ষয় আর অতিরিক্ত আহরণ এখন এর বড় হুমকি। তবু দেশের কোনো কোনো হাটবাজার, এমনকি ঢাকার মাছের আড়তেও মাঝেমধ্যে বাহোক দেখা যায়।
বাহোকের বিচরণ, খাদ্যাভ্যাস, প্রজনন ও আবাসস্থল নিয়ে আরও গবেষণার তাগিদ দিয়েছেন সরওয়ার পাঠান, যাতে নদী থেকে হারানো এ মাছের গল্প শুধু লোককথা হয়ে না থাকে। সমুদ্র আর নদীর মধ্যে যাতায়াত করা মাছ হিসেবে বাহোকের টিকে থাকা নির্ভর করে নদীর পথ খোলা ও পরিষ্কার থাকার ওপর, যে প্রশ্ন শীতলক্ষ্যার মতো শিল্পাঞ্চলের নদীতে সবচেয়ে জরুরি। লেখার মত লেখকের নিজের।
ছবি: Nandini Velho / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 3.0)
সূত্র: প্রথম আলো





মন্তব্য
(০)