সরাসরিবাজারদর
আটা (প্যাকেটজাত)৫৮+০.০%আদা - আমদানিকৃত১৬৭+০.০%আদা - দেশী১৫৪+০.০%আমন চাল - মাঝারি৫৬+০.০%আমন চাল - মোটা৪৮+০.০%আমন চাল - সরু৭২+০.০%আয়োডিনযুক্ত লবণ (প্যাকেটজাত)৩২+০.০%কাঁচা মরিচ২১৮+০.০%খামারের মুরগী১৬২+০.০%খাসী৯০০+০.০%চিনি (দেশী)১৩২+০.০%ছোলা - গোটা৮৫+০.০%ডিম ফার্ম - লাল৪৭+০.০%পেঁয়াজ - দেশী৬০+০.০%বোরো চাল - মাঝারি৫৫+০.০%বোরো চাল - মোটা৪৭+০.০%বোরো চাল - সরু৬৬+০.০%মাংসঃ– গরু৭২৯+০.০%মুগ ডাল১২২+০.০%রসুন - আমদানিকৃত১৯২+০.০%রসুন - দেশী১৭৩+০.০%সয়াবিন তেল১৬৩+০.০%
হালনাগাদ ১ নভেম্বর ২০২৬
ঢাকা৩৩°হালকা বৃষ্টির সম্ভাবনাআর্দ্রতা ৫১%বাতাস ৪ কিমি/ঘবৃষ্টি ০.১ মিমি

পাহাড়ে বাড়ছে ফলের উৎপাদন, চট্টগ্রাম থেকে রপ্তানিতে প্রতিবন্ধকতা

চট্টগ্রামের তিন পার্বত্য জেলা রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবানে আম, কাঁঠাল, আনারস, ড্রাগন ফলের ফলন বাড়লেও কার্গো ফ্লাইটের অভাব, বেশি বিমান ভাড়া ও বাগানে কোয়ারেনটাইন না থাকায় চট্টগ্রাম থেকে তাজা ফল রপ্তানি বাড়ছে না বলে জানিয়েছেন রপ্তানিকারক ও কৃষি কর্মকর্তারা।

পাহাড়ে বাড়ছে ফলের উৎপাদন, চট্টগ্রাম থেকে রপ্তানিতে প্রতিবন্ধকতা
ফল

চট্টগ্রামের তিন পার্বত্য জেলা রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবানে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ফলের উৎপাদন ক্রমাগত বাড়ছে, কিন্তু এই ফলের সামান্য অংশই পৌঁছাচ্ছে বিদেশের বাজারে। ২০২৬ সালের জুনের শেষ দিকে ফল উৎপাদন, ব্যবসা ও রপ্তানির সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা এ কথা জানান। পাহাড়ি এলাকায় আম, কাঁঠাল, আনারস ও ড্রাগন ফল প্রচুর পরিমাণে উৎপাদিত হচ্ছে। তবে রপ্তানিকারকদের ভাষ্য, চট্টগ্রামে কার্গো ফ্লাইট না থাকা, প্রতিবেশী ভারতের তুলনায় অনেক বেশি বিমান ভাড়া এবং বাগানে কোয়ারেনটাইন ব্যবস্থাপনা না থাকার কারণে এ অঞ্চলের ফল ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার মূল্যবান বাজারে পৌঁছানো যাচ্ছে না।

আম উৎপাদনের জন্য দেশে সবচেয়ে পরিচিত জেলাগুলো এখনো রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নওগাঁ ও সাতক্ষীরা। এসব জেলার আম যাচ্ছে ইউরোপ, যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের নানা দেশে। অথচ চট্টগ্রামের পাহাড়ি এলাকায় বছরের পর বছর আমের ফলন বাড়লেও সেখানকার চাষিদের জন্য সেরকম কোনো রপ্তানির পথ খোলেনি। ব্যবসায়ী ও কৃষি কর্মকর্তারা বলছেন, এই ব্যবধানের কারণ ফলের মান নয়, বরং যোগাযোগ ও অবকাঠামো এবং সনদের সমস্যা।

পাহাড়ে বাড়ছে ফলের ফলন


কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট ফল উৎপাদনের প্রায় ১৫ থেকে ২০ শতাংশ উৎপাদিত হয় তিন পার্বত্য জেলায়। আম, কাঁঠাল, আনারস, কলা, পেঁপে, কমলাসহ ৪৪ জাতের ফল উৎপাদিত হচ্ছে রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবানে। এ তিন জেলায় বছরে কমবেশি প্রায় ১৫ লাখ টন ফল উৎপাদিত হয় বলে অধিদপ্তরের হিসাব। দেশের মোট আয়তনের মাত্র এক-দশমাংশ এলাকা থেকে এত বড় অংশের ফল আসা পাহাড়ি কৃষির গুরুত্বকেই তুলে ধরে, আর কর্মকর্তাদের ভাষ্যমতে প্রতি বছর বিশেষ করে আমের ফলন বাড়ছে।

আমের পাশাপাশি তিন পার্বত্য জেলায় কাঁঠাল, আনারস ও ড্রাগন ফলের বাম্পার ফলন হচ্ছে। পাহাড়ের বাগানগুলোতে কলা, পেঁপে ও কমলার চাষও বাড়ছে। চাষি ও বাগানমালিকদের ভাষ্য, প্রতি মৌসুমে পাহাড়ের বাগানগুলো থেকে ফলের সরবরাহ বাড়ছে। অধিকাংশ মৌসুমি ফল গ্রীষ্ম ও বর্ষায় পাকে, ফলে অল্প সময়ের মধ্যে বিপুল পরিমাণ ফল একসঙ্গে বাজারে আসে। দ্রুত বিপণন বা সংরক্ষণের ব্যবস্থা না থাকলে এতে অপচয় ও দরপতন ঘটে।

পাহাড়ি ফল স্বাদে-গুণে ভালো বলে পরিচিত এবং অনেক ক্ষেত্রে সমতলের চেয়ে কিছুটা দেরিতে বাজারে আসে। তবে পচনশীল এই ফল দ্রুত নষ্ট হয়, তাই উৎপাদনস্থল থেকে বাজার বা রপ্তানিবন্দর পর্যন্ত শীতল সংরক্ষণ ও দ্রুত পরিবহন ব্যবস্থা জরুরি। পাহাড়ে এ ধরনের কোল্ড চেইন ও প্রক্রিয়াজাত সুবিধা এখনো পর্যাপ্তভাবে গড়ে ওঠেনি।

উৎপাদন যত বাড়ছে, রপ্তানির সুযোগ সেই অনুপাতে তৈরি হচ্ছে না। ফলে মৌসুমে পাহাড়ে ফলের দাম পড়ে যায় এবং চাষিরা ন্যায্য দাম থেকে বঞ্চিত হন। পাহাড়ের ফল সুস্বাদু ও সুমিষ্ট হলেও তা সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও দ্রুত বাজারে পৌঁছানোর অবকাঠামো এখনো সীমিত। এর ফলে উৎপাদন বাড়ার সুফল পুরোপুরি ঘরে তুলতে পারছেন না পাহাড়ের উৎপাদকরা। রপ্তানির সুযোগ তৈরি হলে এ চিত্র বদলে যেতে পারে বলে ব্যবসায়ী ও কর্মকর্তারা মনে করছেন।

তিন পার্বত্য জেলার পরিচয়


দেশের মোট আয়তনের এক দশমাংশের বেশি সীমানা রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান এই তিন পার্বত্য জেলার। বাংলাপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, পার্বত্য চট্টগ্রামের আয়তন প্রায় ১৩,১৮৪ বর্গকিলোমিটার, যা দেশের মোট আয়তনের প্রায় এক-দশমাংশ। এটি বাংলাদেশের একমাত্র বিস্তৃত পাহাড়ি অঞ্চল। ১৯৮০-এর দশকের শুরুর দিকে পার্বত্য চট্টগ্রামকে রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান এই তিন জেলায় ভাগ করা হয়।

তিন জেলার মধ্যে রাঙ্গামাটি আয়তনে সবচেয়ে বড়; বান্দরবান সবচেয়ে পাহাড়ি, যেখানে কেওক্রাডং (প্রায় ৯৮৬ মিটার), তাজিংডং ও সাকা হাফংয়ের মতো দেশের উঁচু চূড়াগুলো রয়েছে; আর খাগড়াছড়ি ভারতের ত্রিপুরা সীমান্তঘেঁষা। ২০২২ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী তিন জেলায় মিলিয়ে প্রায় ১৮ লাখ ৪২ হাজার মানুষের বাস, যার একটি বড় অংশ চাকমা, মারমাসহ বিভিন্ন নৃগোষ্ঠীর।

এ অঞ্চলের মাটি মূলত হলদে-বাদামি থেকে লালচে-বাদামি দো-আঁশ, যা ভাঙা শেল বা বেলেপাথরের ওপর গঠিত এবং অত্যন্ত অম্লধর্মী। সমতলের পলিমাটির তুলনায় এই মাটি কম উর্বর। পাহাড়ের ঢালে ঐতিহ্যগতভাবে জুম (স্থানান্তরিত) চাষ হয়, আর পাহাড়ের মাঝের উপত্যকায় ধান, তুলা, তেলবীজসহ নানা ফসল ফলে। বাংলাপিডিয়ার তথ্যমতে, উত্তর ও পূর্বাঞ্চলে গড় বার্ষিক বৃষ্টিপাত প্রায় ২,৫৪০ মিলিমিটার এবং দক্ষিণ ও পশ্চিমাঞ্চলে তা ২,৫৪০ থেকে ৩,৮১০ মিলিমিটার পর্যন্ত।

পার্বত্য চট্টগ্রামের বনে সেগুন, গর্জন ও বাঁশ জন্মে, আর কাঠ ও বাঁশ এখানকার গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক সম্পদ। পাহাড়ের ঢালে দীর্ঘদিন ধরে চলা জুম চাষ মাটিক্ষয় ও ভূমি অবক্ষয়ের কারণ হচ্ছে বলে উদ্বেগ রয়েছে। এই ভূপ্রকৃতি ও ভূমি ব্যবস্থাপনার বাস্তবতার মধ্যেই পাহাড়ে ফলের বাগান গড়ে উঠছে এবং ধীরে ধীরে সম্প্রসারিত হচ্ছে।

এ অঞ্চলের প্রধান নদী কর্ণফুলী; এ ছাড়া সাঙ্গু, মাতামুহুরী ও ফেনী উল্লেখযোগ্য নদী। কর্ণফুলীতে কাপ্তাই বাঁধ দিয়ে তৈরি হয়েছে কাপ্তাই হ্রদ, যাকে দেশের বৃহত্তম কৃত্রিম হ্রদ বলা হয়। পাহাড়, ঘন বন ও নদী-হ্রদে ঘেরা এই ভূপ্রকৃতির কারণেই এখানে সড়ক ও যোগাযোগ অবকাঠামো গড়ে তোলা কঠিন, আর এই অনুন্নত যোগাযোগই পাহাড়ের ফল বাজারে ও রপ্তানিতে পৌঁছানোর পথে একটি বড় বাধা।

রাঙ্গামাটির কাপ্তাই হ্রদের ঝুলন্ত সেতু; পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড় ও হ্রদঘেরা ভূপ্রকৃতি যোগাযোগ অবকাঠামো গড়তে কঠিন করে তোলে। ছবি: Muntasir du / উইকিমিডিয়া কমন্স (পাবলিক ডোমেইন)
রাঙ্গামাটির কাপ্তাই হ্রদের ঝুলন্ত সেতু; পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড় ও হ্রদঘেরা ভূপ্রকৃতি যোগাযোগ অবকাঠামো গড়তে কঠিন করে তোলে। ছবি: Muntasir du / উইকিমিডিয়া কমন্স (পাবলিক ডোমেইন)

রপ্তানিতে যেসব বাধা


বিশ্বের বিভিন্ন দেশে তাজা ফল রপ্তানি করে চট্টগ্রামের সাগরিকা এলাকার ইবকো ফুড ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড। প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান ইকবাল আহমেদ অভি জাগো নিউজকে বলেন, 'আমরা আম, কাঁঠালসহ মৌসুমি ফল রপ্তানি করি। ইউরোপের বাজারে আমাদের ফল রপ্তানি হয়। সমুদ্রপথে রপ্তানিতে রেফার কনটেইনারে ফ্রেইট (জাহাজ ভাড়া) যা খরচ হয়, উড়োজাহাজের ফ্রেইট তার চেয়ে অনেক বেশি হয়।'

পচনশীল তাজা ফল দূরের বাজারে পাঠাতে হয় হয় শীতল রেফার কনটেইনারে সমুদ্রপথে, নয়তো উড়োজাহাজে। সমুদ্রপথে খরচ কম হলেও সময় বেশি লাগে; উড়োজাহাজে দ্রুত পৌঁছানো গেলেও ভাড়া অনেক বেশি। রপ্তানিকারকদের ভাষ্য, এই উচ্চ বিমান ভাড়া ও সরাসরি কার্গো ফ্লাইট না থাকাই পাহাড়ের তাজা ফল দূরবর্তী বাজারে পাঠানোর প্রধান প্রতিবন্ধকতা।

চট্টগ্রামের পার্বত্য এলাকায় ফলের ফলন বেশি হলেও ইউরোপের বাজারে এখানকার ফল রপ্তানির সুযোগ নেই জানিয়ে তিনি বলেন, 'আমরা ইউকেতে যে আম পাঠাই সেগুলো চাঁপাইনবাবগঞ্জ, রাজশাহী এলাকা থেকে সংগ্রহ করি। কারণ ওখানকার বাগানগুলো সরকারিভাবে তদারকি করা হয়।' তিনি আরও বলেন, 'বাগানগুলোতে কোয়ারেনটাইন মানা হয়। কিন্তু আমাদের পার্বত্য এলাকাগুলোতে সরকারিভাবে কোয়ারেনটাইন ব্যবস্থাপনা নেই। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন বাইন্ডিংসের কারণে ইউরোপের বাজারে এখানকার তাজা ফল রপ্তানির সুযোগ নেই।'

চিটাগাং ফ্রেশ ফ্রুটস ভেজিটেবল এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট মাহবুব রানা নিজেও তাজা ফল রপ্তানির সঙ্গে জড়িত। তিনি জাগো নিউজকে বলেন, 'চট্টগ্রামসহ তিন পার্বত্য জেলায় গত কয়েক বছর ধরে প্রচুর আম, আনারস, কাঁঠাল উৎপাদন হচ্ছে। কিন্তু সুযোগের অভাবে এসব ফল রপ্তানি করা সম্ভব হচ্ছে না। তাজা ফল রপ্তানিতে অনেক বাধা। এসব বাধা পেরিয়ে খুব কম সংখ্যক ফল রপ্তানি হচ্ছে।'

তাজা ফল রপ্তানিতে অত্যধিক বিমান ভাড়া প্রধান অন্তরায় বলে দাবি করে মাহবুব রানা বলেন, পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত থেকে কানাডায় এক কেজি আম পাঠাতে সর্বোচ্চ ৩৫০ টাকা উড়োজাহাজ ভাড়ায় খরচ হয়। কিন্তু বাংলাদেশ থেকে কানাডায় এক কেজি আম রপ্তানি করতে শুধু উড়োজাহাজ ভাড়াই লাগে ৭০০ টাকা। এ কারণে রপ্তানি বাড়ছে না বলে তাঁর ভাষ্য। তিনি বলেন, 'পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত যে সুযোগ কাজে লাগাচ্ছে, সেখানে আমরা ব্যর্থ হয়ে যাচ্ছি।'

চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরকে নামেই আন্তর্জাতিক উল্লেখ করে এই ব্যবসায়ী নেতা বলেন, 'চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এখনো কার্গো ফ্লাইট অপারেট হয় না। এখানে মধ্যপ্রাচ্যে কিছু ফ্লাইট রয়েছে, যা দিয়ে সবজির সঙ্গে কিছু তাজা ফল রপ্তানি হয়। কিন্তু ইউরোপে কোনো ফ্লাইট নেই। যারা তাজা ফল রপ্তানি করতে চান, তাদের ঢাকা হয়ে রপ্তানি করতে হয়।'

গাছে পাকা আম (ভারতে তোলা, প্রসঙ্গ-ছবি); পাহাড়ের আম কম দামে বিক্রি হলেও রপ্তানির সুযোগ সীমিত। ছবি: মৌচুমী / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 3.0)
গাছে পাকা আম (ভারতে তোলা, প্রসঙ্গ-ছবি); পাহাড়ের আম কম দামে বিক্রি হলেও রপ্তানির সুযোগ সীমিত। ছবি: মৌচুমী / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 3.0)

কোয়ারেনটাইন কী


কোয়ারেনটাইন বা সঙ্গনিরোধ হলো কোনো সংক্রামক রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে এমন কোনো সুস্থ ব্যক্তি বা প্রাণীকে একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য অন্যদের থেকে আলাদা রাখা। এর মূল উদ্দেশ্য হলো, ওই ব্যক্তি সত্যিই সংক্রমিত হয়েছেন কি না, তা নিশ্চিত করা এবং রোগের বিস্তার রোধ করা।

একইভাবে ফলের বাগানে কোয়ারেনটাইন বলতে সুরক্ষামূলক ব্যবস্থাকে বোঝায়। এর মাধ্যমে কোনো নির্দিষ্ট ফলের বাগানে বাইরে থেকে নতুন রোগবালাই বা ক্ষতিকর পোকার প্রবেশ ঠেকানো হয়। একই সঙ্গে, বাগানে কোনো রোগ দেখা দিলে তা যেন আশপাশের অন্য কোনো সুস্থ বাগানে বা অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়তে না পারে, সেটিও নিয়ন্ত্রণ করা হয়।

ইউরোপ-আমেরিকাসহ উন্নত বিশ্বের দেশগুলোতে তাজা ফল রপ্তানির ক্ষেত্রে আমদানিকারক দেশ সাধারণত উদ্ভিদ-স্বাস্থ্য (ফাইটোস্যানিটারি) সনদ দাবি করে। অর্থাৎ ফল যে বাগানে উৎপাদিত হয়েছে, সেই বাগান যে রোগবালাই ও ক্ষতিকর পোকামাকড় থেকে মুক্ত, তা নিশ্চিত করতে হয়। এ কারণেই সরকারিভাবে তদারকি হওয়া ও কোয়ারেনটাইনের আওতায় থাকা বাগান থেকেই রপ্তানিযোগ্য ফল সংগ্রহ করা হয়।

ফাইটোস্যানিটারি সনদ পেতে হলে সাধারণত বাগান নিবন্ধন, নিয়মিত পরিদর্শন এবং রোগ ও পোকামাকড় নিয়ন্ত্রণের নথিভুক্ত ব্যবস্থা থাকতে হয়। পাহাড়ের অধিকাংশ বাগান এখনো এই প্রক্রিয়ার বাইরে থাকায় সেখান থেকে সরাসরি উন্নত দেশের বাজারে তাজা ফল পাঠানো কঠিন। রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের রপ্তানিমুখী আমবাগানগুলো এই তদারকির আওতায় থাকায় সেখান থেকে ইউরোপে আম পাঠানো সহজ হয়।

রপ্তানির পরিসংখ্যান


চট্টগ্রাম বন্দর দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর এবং পতেঙ্গায় অবস্থিত শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর চট্টগ্রামের প্রধান বিমানবন্দর। এই দুই পথেই চট্টগ্রাম থেকে তাজা ও প্রক্রিয়াজাত ফল বিদেশে যায়। চট্টগ্রাম বন্দরের উদ্ভিদ সঙ্গনিরোধ কেন্দ্র (প্ল্যান্ট কোয়ারেনটাইন স্টেশন) সূত্রে জানা যায়, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের মে পর্যন্ত প্রথম ১১ মাসে ২৩৫ টন ৪১২ কেজি তাজা ফল রপ্তানি হয়েছে। একইভাবে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ১০৫ টন ৭২৯ কেজি এবং ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ১১৬ টন ৪০০ কেজি তাজা ফল রপ্তানি হয়েছিল।

শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর উদ্ভিদ সঙ্গনিরোধ কেন্দ্র সূত্র জানায়, এই বিমানবন্দর দিয়ে যাত্রী উড়োজাহাজের মাধ্যমে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৪০৮ টন ৮৮১ কেজি, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৪২৩ টন ৫৬০ কেজি এবং ২০২২-২৩ অর্থবছরে ২৮৮ টন ৬১৮ কেজি তাজা ফল রপ্তানি হয়েছে।

এসব ফলের মধ্যে রয়েছে আম, কাঁঠাল, আনারস, লেবু, জাম, পেয়ারা, বরই, নারিকেল, আমড়া, জলপাই, সাতকড়া, বেল, তেঁতুল, কাঁচা তাল, লিচু, চালতা ও জাম্বুরা। এর মধ্যে লেবু, আম, কাঁঠাল, আমড়া ও জলপাই বেশি রপ্তানি হয়।

এসব তাজা ফল রপ্তানি হয় সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাই ও আবুধাবি, সৌদি আরব, কাতার, ওমান, কুয়েত, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, যুক্তরাজ্য, ইতালি, জার্মানি, ফ্রান্স, সুইজারল্যান্ড ও সুইডেনে। এর মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে রপ্তানি হয় বেশি।

চট্টগ্রাম বন্দর; এই বন্দর ও শাহ আমানত বিমানবন্দর দিয়ে তাজা ও প্রক্রিয়াজাত ফল রপ্তানি হয়। ছবি: Tazmeem / উইকিমিডিয়া কমন্স (পাবলিক ডোমেইন)
চট্টগ্রাম বন্দর; এই বন্দর ও শাহ আমানত বিমানবন্দর দিয়ে তাজা ও প্রক্রিয়াজাত ফল রপ্তানি হয়। ছবি: Tazmeem / উইকিমিডিয়া কমন্স (পাবলিক ডোমেইন)

প্রক্রিয়াজাত শিল্পের উদ্বেগ


কৃষি প্রক্রিয়াজাত শিল্প উদ্যোক্তাদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাগ্রো প্রসেসর অ্যাসোসিয়েশনের (বাপা) সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ মোহাম্মদ শোয়াইব হাসান জাগো নিউজকে বলেন, 'অ্যাগ্রো প্রসেসড ফুড রপ্তানিতে এখনো শত বাধা রয়েছে। নেতিবাচক সমালোচনা এ শিল্পের প্রধান অন্তরায়।'

অভিযানের নামে 'খাদ্যে প্রতারণা' শব্দটি ব্যবহার করে পুরো সেক্টরকে অপরাধী হিসেবে চিত্রায়ন করা হচ্ছে বলে তিনি অভিযোগ করেন। তিনি বলেন, 'এ সমালোচনা এড়িয়ে ফল প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পকে ইতিবাচক হিসেবে তুলে ধরতে গণমাধ্যমকে ভূমিকা রাখতে হবে।'

প্রক্রিয়াজাত খাদ্যশিল্পে অভিজ্ঞদের নিয়ে নীতিমালা তৈরি করতে সরকারকে পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, 'মন্ত্রণালয়ে বসে নীতিমালা করা হয়, যে নীতিমালা কোনো সুফল বয়ে আনতে পারে না। প্রক্রিয়াজাত খাদ্যশিল্পের সঙ্গে শিল্প ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের পাশাপাশি কৃষি মন্ত্রণালয়ের বড় সম্পৃক্ততা রয়েছে। তাই কৃষি মন্ত্রণালয়কে অন্যতম সহযোগী হিসেবে সামনে আসতে হবে। তাহলে প্রক্রিয়াজাত ফল ও খাদ্য রপ্তানির বাজার সম্প্রসারণ করা সম্ভব। এতে বৈদেশিক মুদ্রা আহরণের পথ আরও অবারিত হবে।'

পাহাড়ের ফল: আম, কাঁঠাল, আনারস


পাহাড়ে যেসব ফলের ফলন বাড়ছে, তার মধ্যে আম অন্যতম। বাংলাপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী আমের বৈজ্ঞানিক নাম Mangifera indica, যা অ্যানাকার্ডিয়েসি গোত্রের উদ্ভিদ। বাংলাদেশে আম প্রায় সর্বত্রই জন্মে এবং বেশির ভাগই বসতবাড়ির আঙিনায় লাগানো হয়, তবে উন্নত বাণিজ্যিক জাতগুলো মূলত রাজশাহী, নবাবগঞ্জ (চাঁপাইনবাবগঞ্জ) ও দিনাজপুরে চাষ হয়। ফজলি, লেংড়া (লংড়া), হিমসাগর, খিরসাপাত, গোপালভোগসহ অসংখ্য জাত রয়েছে। আমগাছে ফুল আসে জানুয়ারি থেকে মার্চে, আর এ সময়ের কুয়াশা, বৃষ্টি বা মেঘলা আবহাওয়া ফুল ও গুটি ধরে রাখায় ক্ষতি করে। বাংলাপিডিয়ার হিসাবে ২০০৫-০৬ সালে দেশে প্রায় ৬ লাখ ৩৯ হাজার ৮২০ মেট্রিক টন আম উৎপাদিত হয়েছিল এবং উৎপাদন বছরভেদে ওঠানামা করে।

কাঁঠালকে বাংলাদেশের জাতীয় ফল হিসেবে বিবেচনা করা হয়; এর বৈজ্ঞানিক নাম Artocarpus heterophyllus। কাঁঠাল ভারতীয় উপমহাদেশের স্থানীয় ফল এবং এখন উভয় গোলার্ধের গ্রীষ্মমণ্ডলীয় নিম্নভূমিতে চাষ হয়। সাধারণত ১,০০০ মিটার উচ্চতার নিচে এটি ভালো জন্মে এবং আর্দ্র ঢালে প্রায় ১,৫০০ মিটার পর্যন্ত জন্মাতে পারে, যদিও উঁচুতে ফলের মান কমে। বাংলাপিডিয়ার তথ্যমতে (বিবিএসের ২০০০-২০০৭ সময়ের হিসাবে) দেশে প্রায় ২৫,১১০ হেক্টর জমিতে কাঁঠাল চাষ হয় এবং বছরে প্রায় ৪ লাখ ৬৯ হাজার ৫০০ টন উৎপাদিত হয়, যা দেশের মোট ফল উৎপাদনের প্রায় ২২ শতাংশ। গাছে ফুল আসে ডিসেম্বর-মার্চে এবং ফল পাকে মে থেকে আগস্টে।

আনারসের বৈজ্ঞানিক নাম Ananas comosus। বাংলাপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী আসাম ও মণিপুর হয়ে এই ফল দেশে আসে এবং বিশ শতকের শুরুতে প্রথম সিলেটে চাষ শুরু হয়। সিলেট, টাঙ্গাইল, ঢাকা ও রাঙ্গামাটিতে আনারসের চাষ সবচেয়ে বেশি। জায়ান্ট কিউ (স্থানীয় নাম কালেন্দার), হানি কুইন (জলডুবি) ও রেড স্প্যানিশ (ঘোড়াশাল) এর প্রধান জাত। গাছে ফুল আসে মার্চ-মে এবং ফল ধরে জুন থেকে সেপ্টেম্বরে। এর বাইরে ড্রাগন ফল তুলনামূলক নতুন বাণিজ্যিক ফসল হিসেবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পাহাড়সহ দেশের নানা জায়গায় চাষ বাড়ছে।

ফলসহ কাঁঠাল গাছ (প্রসঙ্গ-ছবি); কাঁঠাল বাংলাদেশের জাতীয় ফল এবং পাহাড়েও প্রচুর উৎপাদিত হয়। ছবি: Forest & Kim Starr / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY 3.0)
ফলসহ কাঁঠাল গাছ (প্রসঙ্গ-ছবি); কাঁঠাল বাংলাদেশের জাতীয় ফল এবং পাহাড়েও প্রচুর উৎপাদিত হয়। ছবি: Forest & Kim Starr / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY 3.0)

কৃষি কর্মকর্তা যা বললেন


তিন পার্বত্য জেলার পাশাপাশি কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, ফেনী, লক্ষ্মীপুর ও নোয়াখালী জেলার কৃষি কার্যক্রম তদারক করেন কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর চট্টগ্রাম অঞ্চলের অতিরিক্ত পরিচালক মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ। তিনি জাগো নিউজকে বলেন, 'আমাদের তিন পার্বত্য জেলায় প্রচুর মৌসুমি ফল উৎপাদন হচ্ছে। প্রতি বছর আমের ফলন বাড়ছে। এসব ফল সুস্বাদু ও সুমিষ্ট। তবে যোগাযোগ অবকাঠামো অনুন্নত থাকার কারণে ফলের বাগানগুলোকে কোয়ারেনটাইনের আওতায় আনা সম্ভব হচ্ছে না।'

ইউরোপসহ উন্নত বিশ্বের দেশগুলোতে তাজা ফল রপ্তানি করতে হলে উৎপাদনের শুরু থেকে কোয়ারেনটাইন মেনটেন করতে হয় জানিয়ে তিনি বলেন, 'পার্বত্য জেলাগুলোতে এখনো সে সুবিধা গড়ে ওঠেনি। তবে সরকারের এ বিষয়ে পরিকল্পনা রয়েছে। বান্দরবানে কোয়ারেনটাইন নিয়ে সীমিত পর্যায়ে আমাদের একটি প্রকল্প চলমান। খাগড়াছড়িতে একটি বাগান থেকে আম রপ্তানির প্রত্যয়ন করা হয়েছে। তবে বড় আকারে রপ্তানির সুযোগ তৈরি হচ্ছে না।'

পাহাড়ের যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত হলে ফলের বাগানগুলোকে কোয়ারেনটাইনের আওতায় আনা সম্ভব হবে জানিয়ে তিনি বলেন, 'এখন পার্বত্য জেলাগুলোতে মৌসুমে ফলের প্রচুর ফলন হলেও উৎপাদনকারীরা ভালো দাম পান না। পাহাড়ে ২০, ২৫, ৩০ টাকা কেজিতে ভালো আম বিক্রি হচ্ছে, যেগুলো চট্টগ্রামে ৭০-৮০ টাকায় বিক্রি হয়।'

এই কৃষি কর্মকর্তা বলেন, 'রপ্তানি করার সুযোগ তৈরি হলে উৎপাদনকারী কিংবা বাগান উদ্যোক্তারা ভালো দাম পাবেন। এতে তারা উপকৃত হবেন। নতুন নতুন বাগানও তৈরি হবে। একসময় দেখা যাবে চট্টগ্রামের তিন পাহাড়ি এলাকা রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জের সুনাম পাচ্ছে।'

ছবি: RafidAlvi / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)

সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, বাংলাপিডিয়া

অনলাইন ডেস্কদা এগ্রো নিউজ

ফল

সম্পর্কিত খবর

ইসলাম

স্পেনের জলপাই খামারে আন্দালুসের ইসলামি ঐতিহ্য তুলে ধরছেন এক মুসলিম দম্পতি

মালাগার কাছে ৩৫ একরের খামারবাড়ি কিনে ‘হাউস অব আন্দালুস’ গড়ছেন হেনরিয়েটা সোভাতি ও ইমাম আজমল মাসরুর; সেখানে ৪০০ জলপাইগাছ, পরিকল্পনা কোরআনিক বাগান ও গ্রন্থাগারের।

বার্তা২৪১ নভেম্বর ২০২৬২ মিনিটের পড়া
এগ্রোটেক

বিনায় চালু হলো গামা ইরেডিয়েশন প্রযুক্তি, কৃষিপণ্য রপ্তানিতে নতুন সুযোগ

গাজীপুরে বিনার আঞ্চলিক কেন্দ্রে ৮৯ কোটি টাকার গামা ইরেডিয়েশন সেন্টার চালু হয়েছে; এতে আম-কাঁঠালের মতো কৃষিপণ্য জীবাণুমুক্ত করে বেশি দিন রাখা যাবে।

এগ্রিকেয়ার২৪১ নভেম্বর ২০২৬১ মিনিটের পড়া
ফল

ফুলবাড়িয়ার ছয় গ্রামে লেবুর বাগান, এক মৌসুমে ৯৫ কোটি টাকা বিক্রির আশা

ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়ায় এবার ৭৫৪ হেক্টরের বেশি জমিতে লেবুর আবাদ; কৃষি বিভাগের হিসাবে এ মৌসুমে প্রায় ৯৫ কোটি টাকার লেবু বিক্রি হতে পারে।

এগ্রিকেয়ার২৪১ নভেম্বর ২০২৬১ মিনিটের পড়া

মন্তব্য

(০)