ঢাকার উত্তরে গাজীপুর জেলার শ্রীপুর ও কাপাসিয়া উপজেলার হাটে ২০২৫ সালের জুনের শেষ দিকে রেকর্ড পরিমাণ কাঁঠাল বিক্রি হচ্ছিল। সেখানকার ব্যবসায়ীরা জানান, এই কাঁঠাল মধ্যপ্রাচ্যসহ ১৫টি দেশে নিয়মিত যাচ্ছে। ২০২৫ সালের ২৬ জুন জাগো নিউজ ২৪ এ খবর প্রকাশ করে, সরকার গাজীপুরের কাঁঠালকে ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্যের তালিকায় তোলার দুই মাস পর। একই প্রতিবেদনে উঠে আসে চাষিদের অভিযোগও: শ্রীপুরে কাঁঠাল রাখার কোনো হিমাগার নেই, কাপাসিয়ার হাটে মৌসুমি ফল বিক্রির আলাদা জায়গা নেই, আর কাঁঠাল চাষের জন্য নেই ব্যাংকঋণ বা সরকারি প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা।
এই ব্যবসা কেন গুরুত্বপূর্ণ, তা গাজীপুরের নিজস্ব হিসাবেই বোঝা যায়। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) জেলা কার্যালয়ের তথ্যমতে, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে গাজীপুরে ৯ হাজার ১০৩ হেক্টর জমিতে কাঁঠালের আবাদ হয় এবং উৎপাদন হয় ২ লাখ ৪৯ হাজার ৭৯২ মেট্রিক টন। প্রতিবেদনে বলা হয়, ঢাকার অদূরের এ অঞ্চলে প্রতি বছর গড়ে প্রায় আড়াই লাখ মেট্রিক টন কাঁঠাল উৎপাদন হয়।
জাতীয় ফলের জিআই সনদ
গাজীপুরের কাঁঠাল জিআই সনদ পায় ২০২৫ সালের ৩০ এপ্রিল। দ্য ডেইলি স্টার বাংলা ও বিডিনিউজ২৪ ডটকমের খবর অনুযায়ী, সেদিন শিল্প মন্ত্রণালয়ের পেটেন্ট, শিল্প-নকশা ও ট্রেডমার্কস অধিদপ্তর (ডিপিডিটি) ঢাকার ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে বিশ্ব মেধাসম্পদ দিবস ২০২৫ উপলক্ষে আয়োজিত আলোচনা সভায় ২৪টি পণ্যের প্রতিনিধিদের হাতে জিআই সনদ তুলে দেয়। গাজীপুরের কাঁঠাল নিবন্ধিত হয় ৪৬ নম্বর জিআই পণ্য হিসেবে। পত্রিকা দুটি জানায়, নতুন ২৪টি মিলিয়ে দেশে মোট জিআই পণ্যের সংখ্যা দাঁড়ায় ৫৫টিতে।
একই দফায় সনদ পাওয়া অন্য কৃষিপণ্যের মধ্যে ছিল নরসিংদীর লটকন, মধুপুরের আনারস, মাগুরার হাজরাপুরী লিচু, কিশোরগঞ্জের রাতা বোরো ধান, বরিশালের আমড়া, দিনাজপুরের বেদানা লিচু, নওগাঁর নাক ফজলি আম ও সুন্দরবনের মধু। জাগো নিউজ লিখেছিল, নানা সময়ে দেশের বিভিন্ন পণ্য জিআই স্বীকৃতি পেলেও এবার স্বীকৃতি পেল জাতীয় ফলটি। মূল প্রতিবেদনে স্বীকৃতিটিকে শ্রীপুরের কাঁঠালের বলে উল্লেখ করা হয়েছিল; তবে এপ্রিলের তালিকায় নিবন্ধিত নাম ‘গাজীপুরের কাঁঠাল’, যা পুরো জেলাকে বোঝায়। জেলার মধ্যে সবচেয়ে বেশি কাঁঠাল হয় শ্রীপুরে।
বাংলাদেশে জিআই নিবন্ধনের আইনি ভিত্তি ভৌগোলিক নির্দেশক পণ্য (নিবন্ধন ও সুরক্ষা) আইন, ২০১৩ (২০১৩ সনের ৫৪ নং আইন, ১০ নভেম্বর ২০১৩)। আইনে ভৌগোলিক নির্দেশক পণ্য বলতে এমন কৃষিজাত, প্রকৃতিজাত বা প্রস্তুতকৃত পণ্যকে বোঝানো হয়েছে, যার দ্বারা পণ্যটি কোনো বিশেষ দেশ, ভূখণ্ড বা অঞ্চলে জাত বা প্রস্তুত বলে বোঝা যায় এবং যার বিশেষ গুণাগুণ, সুনাম বা অনন্য বৈশিষ্ট্য আবশ্যিকভাবে সেই ভৌগোলিক উৎপত্তিস্থলের ওপর নির্ভরশীল। আইনের অধীন রাখা নিবন্ধন বহিতে পণ্যের অনুমোদিত ব্যবহারকারীদের নাম লেখা থাকে।
স্থানীয় প্রশাসনও কাঁঠালকে শ্রীপুরের পরিচয় হিসেবে তুলে ধরছিল। জেলা প্রশাসন উপজেলা প্রশাসন চত্বরে কাঁঠালের একটি বিশাল ভাস্কর্য তৈরি করে, যার অফিসিয়াল স্লোগান ‘সবুজে শ্যামলে শ্রীপুর, মিষ্টি কাঁঠালে ভরপুর’।

গাজীপুরের কোথায় কত কাঁঠাল
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ২০২৩-২৪ অর্থবছরে গাজীপুরের পাঁচ উপজেলায় কাঁঠাল আবাদের যে হিসাব দেয়, তা এরকম:
- শ্রীপুর: ৩ হাজার ৫৫২ হেক্টর
- গাজীপুর সদর: ২ হাজার ৫০ হেক্টর
- কাপাসিয়া: ১ হাজার ৭৬০ হেক্টর
- কালীগঞ্জ: ১ হাজার ১৯১ হেক্টর
- কালিয়াকৈর: ৫৫০ হেক্টর
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর গাজীপুরের উপপরিচালক মো. রফিকুল ইসলাম খান বলেন, ‘২০২৩-২৪ অর্থবছরে গাজীপুরে মোট ৯ হাজার ১০৩ হেক্টর জমিতে কাঁঠালের আবাদ হয়। এতে ২ লাখ ৪৯ হাজার ৭৯২ মেট্রিক টন কাঁঠাল উৎপাদন হয়েছে। কাঁঠাল চাষিদের প্রশিক্ষণ, বাজারজাতকরণ, গুণগতমান রক্ষাসহ নানা বিষয়ে প্রশিক্ষণ ও পরামর্শ দেওয়া হয়ে থাকে।’
প্রতিবেদন অনুযায়ী, এ অঞ্চলে তিন ধরনের কাঁঠাল হয়: খাজা, গালা ও দুরসা। জাতীয় জ্ঞানকোষ বাংলাপিডিয়াও এ তিনটিকে বাংলাদেশের প্রধান তিন ধরনের কাঁঠাল বলে বর্ণনা করেছে। খাজা কাঁঠালের খোসা শক্ত এবং কোষ দৃঢ়; গালা কাঁঠাল খুব রসালো, কোষ নরম; আর দুরসা (দোরসা নামেও লেখা হয়) এ দুইয়ের মাঝামাঝি, মোটামুটি দৃঢ় ও রসালো।
প্রতিবেদনে দেশের ‘কাঁঠালের রাজধানী’ হিসেবে পরিচিত কাপাসিয়া ও শ্রীপুরে ২০২৫ সালেও বাম্পার ফলনের কথা বলা হয়। সহজ সড়ক যোগাযোগের কারণে রাজধানী ঢাকা ও দেশের অন্যান্য এলাকা থেকে ব্যবসায়ীরা প্রত্যন্ত গ্রামে গিয়ে চাষিদের কাছ থেকে সরাসরি কাঁঠাল কিনছিলেন, কখনো গাছ ধরে, কখনো পুরো বাগান।
বাংলাপিডিয়া দুই উপজেলারই প্রধান ফলের তালিকায় প্রথমে রেখেছে কাঁঠালকে। শ্রীপুর উপজেলার আয়তন ৪৬২.৯৪ বর্গকিলোমিটার, ইউনিয়ন নয়টি: কাওরাইদ, গাজীপুর, গোসিংগা, তেলিহাটি, প্রহ্লাদপুর, বরমী, মাওনা, রাজাবাড়ি ও শ্রীপুর। প্রধান নদী বানার, কাওরাইদ ও লবণদহ। এখানকার অন্য ফলের মধ্যে আছে পেঁপে, আনারস, কলা, আম, লিচু ও পেয়ারা। শ্রীপুরের পূর্বে কাপাসিয়া উপজেলার আয়তন ৩৫৬.৯৮ বর্গকিলোমিটার, ইউনিয়ন ১১টি; শীতলক্ষ্যা, পুরাতন ব্রহ্মপুত্র ও বানার নদী এর ভেতর দিয়ে বয়ে গেছে।
জৈনা বাজার ও মহাসড়কের হাট
কাঁঠালের সবচেয়ে বড় হাট বসে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের পাশে শ্রীপুরের জৈনা বাজারে। এলাকাবাসী ও ব্যবসায়ীদের সূত্রে জানা যায়, সেখানে প্রতিদিন হাজার হাজার কাঁঠাল বিক্রি হয়। দিনে-রাতে প্রায় সব সময় বেচাকেনা চলে, সবচেয়ে জমজমাট থাকে ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত। বাগান থেকে বাজারে আনা, কেনাবেচা, গাড়িতে ওঠানো-নামানোসহ নানা কাজ করেন শত শত মানুষ। জৈনা বাজারের আশপাশে অনেক কাঁঠালবাগান আছে। ভালো যোগাযোগব্যবস্থা এবং পাইকারদের থাকা-খাওয়ার সুবিধার কারণে জৈনা বাজার হয়ে উঠেছে এলাকার সবচেয়ে বড় কাঁঠালের বাজার।
এ ছাড়া গাজীপুর ইউনিয়নের নগরহাওলা, মাওনা ইউনিয়নের চকপাড়া, তেলিহাটি ইউনিয়নের টেপিরবাড়ি, রাজাবাড়ি ইউনিয়নের রাজাবাড়ি বাজার, ছাতির বাজার এবং শ্রীপুর পৌরসভার কেওয়া ও চন্নাপাড়ায় ছোট-বড় হাট বসে। মহাসড়ক ঘেঁষে সিডস্টোর, মাওনা চৌরাস্তা বাজার, বাঘের বাজার, বানিয়ারচালা ও ভবানীপুর বাজারেও বড় বড় কাঁঠালের বাজার বসে। জ্যৈষ্ঠের শুরু থেকে আষাঢ়ের শেষ পর্যন্ত, অর্থাৎ মোটামুটি মে মাসের মাঝামাঝি থেকে জুলাইয়ের মাঝামাঝি পর্যন্ত চলে এই মৌসুম।
দূর-দূরান্ত থেকে পাইকাররা কম দামে ভালো কাঁঠাল কিনতে আসেন। রাজধানীর কারওয়ান বাজার, যাত্রাবাড়ী, হেমায়েতপুর ও উত্তরার অনেক পাইকার এসব হাট থেকে কাঁঠাল কেনেন, আর ট্রাকে ট্রাকে তা চলে যায় দেশের বিভিন্ন জেলায়। চাহিদা বেশি থাকায় কাঁঠাল ছোট (মুচি) থাকতেই বাগান মালিকেরা অনেক সময় পাইকারদের কাছে গাছ বিক্রি করে দেন। ২০২৫ সালের জুনে বাগান মালিকেরা ভোরে পাকা কাঁঠাল পেড়ে ভ্যান ও ঠেলাগাড়িতে করে বাজারে আনছিলেন, আর কাঁঠাল সংগ্রহে সহযোগিতা করছিলেন বাড়ির নারীরাও। বিকেল হলেই মহাসড়কে ট্রাকের সারি দেখা যেত, আড়তের সামনে থেকে ট্রাকে উঠত কাঁঠাল। প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই মৌসুমি ব্যবসায় অন্তত কয়েক হাজার শ্রমিকের কাজ হয়, আর এলাকায় কাঁঠালের প্রাচুর্যের কারণে মৌসুমে দাম থাকে খুবই কম।

১৫ দেশে রপ্তানি
বিদেশে রপ্তানি নিয়ে গড়গড়িয়া মাস্টারবাড়ি বাজারের কামাল হোসেন জাগো নিউজকে জানান, শ্রীপুরের কাঁঠাল পৃথিবীর বহু দেশে রপ্তানি হচ্ছে, মধ্যপ্রাচ্যসহ ১৫টি দেশে যাচ্ছে নিয়মিত। প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রতি বছর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মাধ্যমে ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যে এসব জাতের কাঁঠাল রপ্তানি হয়। স্থানীয়রা আরও জানান, মৌসুম শুরু হলে ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কাসহ বিভিন্ন দেশের কাঁঠাল ক্রেতা ও ব্যবসায়ীরা এলাকায় আসেন, আর তাদের মাধ্যমে প্রতিদিন ট্রাক ও পিকআপে করে কাঁঠাল বিমানবন্দর হয়ে বিভিন্ন দেশে চলে যায়। প্রতিবেদনে গাজীপুর থেকে রপ্তানির পরিমাণ দেওয়া হয়নি, ১৫টি দেশের কোনো সরকারি তালিকাও প্রকাশ করা হয়নি।
দেশের মোট রপ্তানি উৎপাদনের তুলনায় সামান্য। ২০২৩ সালের জুনে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উদ্ভিদ সংগনিরোধ উইংয়ের পরিচালক দ্য ডেইলি স্টারকে জানান, সে অর্থবছরের ১৫ জুন পর্যন্ত বাংলাদেশ ৪৬৯ টন কাঁঠাল রপ্তানি করেছে, আর আগের বছর রপ্তানি হয়েছিল ১ হাজার ৩০০ টন। একই প্রতিবেদনে ডিএইর হিসাব উদ্ধৃত করে বলা হয়, ২০২১-২২ অর্থবছরে দেশে প্রায় ১৯ লাখ টন কাঁঠাল উৎপাদন হয়েছিল, যার বেশির ভাগই দেশে খাওয়া হয়; সবচেয়ে বেশি উৎপাদন ঢাকা অঞ্চলে, তার পরেই চট্টগ্রাম।
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে বাংলাদেশের কাঁঠাল নিয়ে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে দেশটিকে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম কাঁঠাল উৎপাদনকারী বলে উল্লেখ করে। সংস্থাটি জানায়, সেকেলে জীবিকাভিত্তিক চাষপদ্ধতি ও দুর্বল সংরক্ষণব্যবস্থার কারণে অনেক কাঁঠাল বাজারে পৌঁছানোর আগেই পচে যায়। আরও বড় আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছাতে বাংলাদেশের কাঁঠালের আরও আধুনিকায়ন দরকার, যেমন ভ্যাকুয়াম প্যাকেজিং, এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ড মেনে চলা দরকার বলেও এফএও উল্লেখ করে।
হিমাগার, বাজার ও ঋণ: চাষিদের অভিযোগ
কামাল হোসেনের অভিযোগ, শ্রীপুরে কাঁঠাল সংরক্ষণের জন্য কোনো হিমাগার গড়ে ওঠেনি, আর শুধু সংরক্ষণের অভাবে প্রতি মৌসুমে লাখ লাখ টাকার কাঁঠাল নষ্ট হয়। কাপাসিয়ার স্থানীয়রা জানান, উপজেলার ১১টি ইউনিয়নের ৩২টি হাট-বাজারে মৌসুমি ফল বিক্রির জন্য আলাদা বাজার বা জায়গা না থাকায় কৃষকেরা সমস্যায় পড়েন, হয়রানিরও শিকার হন। উপজেলার সবচেয়ে বড় বাজার কাপাসিয়া সদর বাজারেও আলাদা কোনো ব্যবস্থা নেই। তাদের ভাষ্য, এ কারণে অনেক কৃষক নিজের কাঁঠাল বাজারে নিয়ে বিক্রি করতে পারেন না; ফড়িয়ারা বাজারদরের চেয়ে কম দাম দেন, আর কৃষকেরা কম দামে বিক্রি করতে বাধ্য হন।
চাষিরা আরও জানান, কাঁঠাল উপজেলার অন্যতম অর্থকরী ফসল হলেও এর চাষে কোনো সরকারি উদ্যোগ নেই, নেই ব্যাংকঋণের ব্যবস্থা। সরকারিভাবে কাঁঠাল চাষ বাড়ানোর প্রশিক্ষণ থাকলে আরও বেশি ফলন পাওয়া যেত বলে তাদের মত। অন্যদিকে, আগে উদ্ধৃত বক্তব্যে ডিএইর উপপরিচালক জানান, চাষিদের বাজারজাতকরণ ও গুণগত মান রক্ষাসহ নানা বিষয়ে প্রশিক্ষণ ও পরামর্শ দেওয়া হয়।
ক্ষতি কতটা হতে পারে, গবেষণায় তার আভাস মেলে। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বারি) বিজ্ঞানীদের একটি গবেষণা ২০১৭ সালে বাংলাদেশ জার্নাল অব অ্যাগ্রিকালচারাল রিসার্চে প্রকাশিত হয়। দেশের পার্বত্য অঞ্চলের ছয়টি প্রধান ফলের সংগ্রহোত্তর ক্ষতি মেপে গবেষকেরা দেখেন, কৃষক ও ব্যবসায়ী পর্যায়ে কাঁঠালের ক্ষতি টনপ্রতি ৩৮০ কেজি, যা মোট উৎপাদনের প্রায় ৩৮ শতাংশ; ছয়টি ফলের মধ্যে এটিই সবচেয়ে বেশি। খামার পর্যায়ে ক্ষতির প্রধান কারণ ছিল পোকামাকড়, বাদুড়, কাঠবিড়ালি ও বানর, আর ব্যবসায়ীদের বড় ক্ষতি হয় পরিবহনের সময়। গবেষণাটি পার্বত্য জেলাগুলোর, গাজীপুরের নয়; তবে গাজীপুরের চাষিরা যে দুর্বলতার কথা বলেছেন, সেই রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিবহনের দুর্বলতাই এতে উঠে এসেছে।
পাকা কাঁঠাল বেশি দিন টেকে না। যুক্তরাষ্ট্রের পারডু বিশ্ববিদ্যালয়ের অনলাইনে প্রকাশিত জুলিয়া মর্টনের ‘ফ্রুটস অব ওয়ার্ম ক্লাইমেটস’ (১৯৮৭) গ্রন্থে বলা হয়েছে, পাকা কাঁঠাল দ্রুত নষ্ট হয় ও বাদামি হয়ে যায়; তবে ১১ থেকে ১৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা এবং ৮৫ থেকে ৯৫ শতাংশ আপেক্ষিক আর্দ্রতায় হিমাগারে রাখলে পাকা কাঁঠাল তিন থেকে ছয় সপ্তাহ ভালো থাকে। শ্রীপুরের ব্যবসায়ীরা ঠিক এমন সুবিধারই অভাবের কথা বলেছেন।
কেন এই মাটিতে কাঁঠাল ভালো হয়
প্রতিবেদনে উদ্ধৃত কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, কাঁঠাল চাষের জন্য যে মাটি ও আবহাওয়া দরকার, তার সবই কাপাসিয়া ও শ্রীপুরের সব ইউনিয়নে আছে। তাই চাষিরা কাঁঠালকে বেশি গুরুত্ব দিয়ে প্রতি বছর উঁচু জমিতে নতুন নতুন বাগান করছেন। এলাকা বন্যামুক্ত হওয়ায় কাঁঠাল চাষ সহজ। প্রতি বছর বৈশাখ মাসে (মোটামুটি এপ্রিলের মাঝামাঝি থেকে মের মাঝামাঝি) কৃষকেরা বোরো ধান কাটা শুরু করেন, আর ধান কাটা শেষ না হতেই শুরু হয় কাঁঠাল বিক্রির মৌসুম।
এই উঁচু জমি মধুপুর গড়ের অংশ। বাংলাপিডিয়ার বর্ণনায়, ৪ হাজার ২৪৪ বর্গকিলোমিটারের এই প্রাচীন সোপানভূমি জামালপুরের একটু দক্ষিণ থেকে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা পর্যন্ত বিস্তৃত, আশপাশের প্লাবনভূমি থেকে এক থেকে দশ মিটার উঁচু। এর মাটি মূলত মধুপুর কর্দমের ওপর গঠিত, পুষ্টি কম ও সামান্য অম্লীয়, রং লাল বা বাদামি। গড়ের দক্ষিণাংশ ভাওয়াল গড় নামে পরিচিত। একসময় এর বনে শালই ছিল প্রধান গাছ। বাংলাপিডিয়া আরও জানায়, গড়ের উঁচু জমিতে কাঁঠালবাগান সাধারণ দৃশ্য, এবং এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত এখান থেকে প্রচুর কাঁঠাল বাইরে পাঠানো হয়।
কাঁঠালগাছের জন্য বন্যামুক্ত জমি জরুরি। মর্টন লিখেছেন, কাঁঠালগাছ মাঝারি বা হালকা বুনটের উর্বর, গভীর মাটি পছন্দ করে এবং জলাবদ্ধতা সহ্য করতে পারে না: শিকড় পানির সংস্পর্শে এলে গাছে ফল ধরে না, এমনকি গাছ মরেও যেতে পারে। গাছটি খরা সহ্য করতে পারে না, আর চারা অবস্থায় তুষারপাতে সংবেদনশীল।
গাজীপুর জেলার আয়তন ১ হাজার ৮০৬.৩৬ বর্গকিলোমিটার; জেলা গঠিত হয় ১৯৮৪ সালে। এর উত্তরে ময়মনসিংহ ও কিশোরগঞ্জ, দক্ষিণে ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ ও নরসিংদী, পূর্বে নরসিংদী এবং পশ্চিমে ঢাকা ও টাঙ্গাইল জেলা। বাংলাপিডিয়া জেলায় ১৭টি নদীর কথা বলেছে, যার মধ্যে আছে পুরাতন ব্রহ্মপুত্র, শীতলক্ষ্যা, তুরাগ, বংশী, বালু ও বানার। ২০১১ সালের আদমশুমারিতে জেলার জনসংখ্যা ছিল ৩৪ লাখ ৩ হাজার ৯১২।

কাঁঠাল ফলটি সম্পর্কে
কাঁঠালের বৈজ্ঞানিক নাম Artocarpus heterophyllus; এটি তুঁত গোত্রের (মোরেসি) উদ্ভিদ। মর্টন লিখেছেন, এর উৎপত্তিস্থল নিশ্চিত নয়, তবে ধারণা করা হয় ভারতের পশ্চিমঘাট পর্বতমালার বৃষ্টিবনে এর আদি নিবাস; বাংলাপিডিয়া একে ভারতীয় উপমহাদেশের স্থানীয় ফল বলেছে। চিরসবুজ এই গাছ ৯ থেকে ২১ মিটার উঁচু হয়, আর গাছের সব অংশেই থাকে আঠালো সাদা কষ। গাছে ধরা ফলের মধ্যে কাঁঠালই সবচেয়ে বড়: সাধারণত ২০ থেকে ৯০ সেন্টিমিটার লম্বা এবং ৪.৫ থেকে ২০ কেজি ওজনের, কখনো কখনো ৫০ কেজি পর্যন্ত। প্রতিটি ফলে ১০০ থেকে ৫০০টি বীজ থাকে, যেগুলো ঘিরে থাকে খাওয়ার উপযোগী হলুদ, সুগন্ধি কোষ। ফুল আসার তিন থেকে আট মাস পর ফল পরিপক্ব হয়।
বাংলাপিডিয়া কাঁঠালকে বাংলাদেশের জাতীয় ফল হিসেবে বর্ণনা করেছে। জ্ঞানকোষটির উদ্ধৃত ২০০০ থেকে ২০০৭ সালের বিবিএস হিসাবে আবাদি জমির দিক থেকে কাঁঠাল ছিল ফলের মধ্যে তৃতীয় এবং উৎপাদনে দ্বিতীয়; আবাদ হতো ২৫ হাজার ১১০ হেক্টরে, বার্ষিক উৎপাদন ৪ লাখ ৬৯ হাজার ৫০০ টন, যা দেশের মোট ফল উৎপাদনের প্রায় ২২ শতাংশ। আগে উল্লেখিত ২০২১-২২ অর্থবছরের প্রায় ১৯ লাখ টনের হিসাবটি ভিন্ন সংস্থা ডিএইর, এবং তা আরও সাম্প্রতিক।
কাঁঠালগাছের প্রায় সব অংশই কাজে লাগে। বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী, পাকা কোষ টাটকা খাওয়া হয় বা সংরক্ষণ করা হয়; কাঁচা কাঁঠাল রান্না হয় সবজি হিসেবে; বড় বীজ সেদ্ধ বা ভেজে খাওয়া হয়; খোসা ও পাতা গবাদিপশুর খাবার; কষ ব্যবহৃত হয় ফাঁক বন্ধের কাজে; আর গাছের হলুদ সারকাঠ মূল্যবান কাঠ, তা থেকে হলুদ রংও পাওয়া যায়। মর্টন যোগ করেছেন, এই কাঠ দিয়ে আসবাব, ঘরবাড়ি ও বাদ্যযন্ত্র তৈরি হয়। বাংলাপিডিয়া (আসেদো, ১৯৯২ সূত্রে) জানায়, প্রতি ১০০ গ্রাম পাকা কোষে থাকে ৯৪ থেকে ৯৮ ক্যালরি এবং ২২.৪ থেকে ২৪.০ গ্রাম শর্করা।
গবেষণা ও সহায়তা
দেশের কাঁঠাল গবেষণার বড় অংশই হয় গাজীপুরে। ১৯০৮ সালে ঢাকায় প্রতিষ্ঠিত কৃষি গবেষণাগার থেকে যাত্রা শুরু করে ১৯৭৬ সালে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বারি) নাম পাওয়া প্রতিষ্ঠানটির কেন্দ্রীয় গবেষণাকেন্দ্র গাজীপুরের জয়দেবপুরে, ১৬৫ হেক্টর জায়গাজুড়ে। ধান, পাট, আখ ও চা ছাড়া সব ফসলের গবেষণার দায়িত্ব বারির, এবং এর বিভাগগুলোর মধ্যে আছে পোস্টহারভেস্ট টেকনোলজি বা সংগ্রহোত্তর প্রযুক্তি বিভাগ। ২০২৩ সালের জুনে দ্য ডেইলি স্টার জানায়, বারি কাঁঠালের তিনটি জাত উদ্ভাবন করেছে: বারি কাঁঠাল-১, বারি কাঁঠাল-২ ও বারি কাঁঠাল-৩। বাংলাপিডিয়া আরও জানায়, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে কাঁঠালের ৮৪টি জার্মপ্লাজমের একটি বাগান আছে; এর মধ্যে বিস্তারিতভাবে পরীক্ষা করা ৪৫টির ২১টিকে উৎকৃষ্ট হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
এফএওর ‘এক দেশ এক অগ্রাধিকার পণ্য’ (ওসিওপি) উদ্যোগেও বাংলাদেশের পণ্য কাঁঠাল। বাংলাদেশ এ উদ্যোগে যুক্ত হয় ২০২২ সালে। কৃষি মন্ত্রণালয়ের একজন অতিরিক্ত সচিব ও বাংলাদেশে এফএওর প্রতিনিধির যৌথ সভাপতিত্বে উদ্যোগটির জাতীয় টাস্কফোর্সের প্রথম সভা হয় ২০২৩ সালের জুলাইয়ে ঢাকায়, টেকসই কাঁঠাল ভ্যালু চেইন গড়ে তুলতে সহায়তার লক্ষ্যে। কাজের মূল জোর পরিবেশবান্ধবভাবে এই ভ্যালু চেইনের উন্নয়নে, যার মধ্যে আছে জলবায়ু-সহিষ্ণু চর্চা এবং উৎপাদন, সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বাজারজাতকরণে উন্নতি।
২০২৫ সালের জানুয়ারির প্রতিবেদনে এফএও শ্রীপুর উপজেলার এক কৃষকের কথা জানায়, যিনি ২০২৩ সালে সংস্থাটির আধুনিক চাষপদ্ধতির প্রশিক্ষণ নেন, যার মধ্যে ছিল জৈব সার, রাসায়নিক সার ও বালাই দমনের সঠিক ব্যবহার। পরের মৌসুমে তার ফলন ৩০ শতাংশ বাড়ে এবং আগের বছরের দ্বিগুণেরও বেশি দামে তিনি কাঁঠাল বিক্রি করেন। গাজীপুরের এক উদ্যোক্তার কথাও প্রতিবেদনে আছে, যিনি পাঁচজন কর্মী নিয়ে দিনে প্রায় ১০০ কেজি কাঁঠাল থেকে আচার, জ্যাম, বার্গার, কেক, পিৎজা ও উদ্ভিদভিত্তিক চামড়া তৈরি করেন। স্থানীয় বাজারে এখন কাঁঠালের নানা নাশতা ও মিষ্টান্ন বিক্রি হয় বলেও সংস্থাটি উল্লেখ করে। শ্রীপুরের ব্যবসায়ীরা যে অপচয়ের কথা বলেছেন, এ ধরনের প্রক্রিয়াজাতকরণ তার একটি সমাধান: যে কাঁঠাল টাটকা বিক্রি হয় না, তা দিয়েও টেকসই পণ্য তৈরি করা যায়।
ছবি: মাজহার জারিফ / উইকিমিডিয়া কমন্স (সিসি বাই-এসএ ৪.০)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, দ্য ডেইলি স্টার বাংলা, বিডিনিউজ২৪ ডটকম, ভৌগোলিক নির্দেশক পণ্য (নিবন্ধন ও সুরক্ষা) আইন, ২০১৩ (বিডিলজ), দ্য ডেইলি স্টার, জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও), বাংলাপিডিয়া, বাংলাদেশ জার্নাল অব অ্যাগ্রিকালচারাল রিসার্চ, পারডু বিশ্ববিদ্যালয় নিউক্রপ (মর্টন, ফ্রুটস অব ওয়ার্ম ক্লাইমেটস)





মন্তব্য
(০)