২০২৬ সালের জুলাইয়ের দ্বিতীয় সপ্তাহে টানা ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে চট্টগ্রাম জেলার বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়। ১০ জুলাই সন্ধ্যার মধ্যে জেলা মৎস্য অফিস ও জেলা কৃষি অফিস বন্যায় চাষিদের ক্ষতির প্রথম হিসাব দেয়। সেদিন সন্ধ্যায় জাগো নিউজের প্রতিবেদনে প্রকাশিত এই প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, জেলার প্রায় ১০ হাজার পুকুর, দিঘি ও চিংড়ি ঘের এবং ১৪ হাজার হেক্টরের বেশি কৃষিজমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। মাছ ও ফসলে শত কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা করা হচ্ছিল। ক্ষয়ক্ষতির চূড়ান্ত হিসাব নিতে এবং ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক ও মৎস্যচাষিদের পুনর্বাসনের প্রস্তুতি নিতে সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলো তখন কাজ শুরু করে।
প্রায় ১০ হাজার পুকুর ও ঘের পানির নিচে
জেলা মৎস্য অফিসের তথ্য অনুযায়ী, বন্যায় জেলার ১৫টি উপজেলার ১৫৩টি ইউনিয়নের ৯ হাজার ৯৩৩টি পুকুর ও দিঘি এবং ৩২০টি চিংড়ি ঘের ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এতে প্রায় ৪ হাজার ১০০ হেক্টর জলাশয়ের মাছচাষ ক্ষতির মুখে পড়ে।
জেলা মৎস্য কর্মকর্তা সালমা বেগম জাগো নিউজকে বলেন, 'চট্টগ্রামে এবার স্মরণকালের বড় বন্যা হয়েছে। বিশেষ করে দক্ষিণ চট্টগ্রামের উপজেলাগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অতিবর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে এখনো সাতকানিয়া ও বাঁশখালীর অধিকাংশ এলাকার মানুষ পানিবন্দি।'
তিনি আরও বলেন, 'জেলার ১৫টি উপজেলার প্রায় সব এলাকাতেই কমবেশি পুকুর, দিঘি ও চিংড়ি ঘের বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্রাথমিক হিসাবে ১০ হাজারের বেশি পুকুর, দিঘি ও ঘের ক্ষতির মুখে পড়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে বাঁশখালী উপজেলায়। এখন পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, বন্যার পানিতে ৯০ কোটি টাকারও বেশি মূল্যের মাছ পানিতে তলিয়ে গেছে।'
সালমা বেগম জানান, বন্যা পরবর্তী সময়ে মৎস্যচাষিদের পাশে দাঁড়াতে জেলা মৎস্য অফিস থেকে পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে এবং প্রাথমিকভাবে মৎস্য অধিদপ্তরে ক্ষয়ক্ষতির প্রতিবেদন পাঠানো হয়েছে। মৎস্য অধিদপ্তর দেশজুড়ে মৎস্য খাতের উন্নয়ন ও সম্প্রসারণের দায়িত্বে থাকা সরকারি সংস্থা।
মাছের সবচেয়ে বেশি ক্ষতি বাঁশখালী ও সাতকানিয়ায়
মৎস্য অফিসের উপজেলাভিত্তিক হিসাবে দেখা যায়, ক্ষতির বড় অংশ জেলার দক্ষিণাঞ্চলে। বাঁশখালীতে প্রায় আড়াই হাজার পুকুর এবং ৩১০টি চিংড়ি ঘের তলিয়ে যায়, আর পুরো উপজেলায় প্রায় ৪১ কোটি ৫০ লাখ টাকার মাছ বন্যার পানিতে ভেসে যায়। সাতকানিয়ায় ৪৬৬ হেক্টর পুকুর ও দিঘির প্রায় ১০ কোটি ৭৫ লাখ টাকার মাছ পানিতে ভেসে যায়।
অন্য উপজেলাগুলোর জন্য মৎস্য অফিসের প্রাথমিক হিসাব ছিল এমন:
- লোহাগাড়া: ১ হাজার ৬২০টি পুকুরে প্রায় সাড়ে ৮ কোটি টাকা
- কর্ণফুলী: ৫৫৭টি পুকুর ও দিঘিতে প্রায় ৬ কোটি টাকা
- চন্দনাইশ: ৩৮৩টি পুকুর ও দিঘিতে প্রায় ৫ কোটি ৯৪ লাখ টাকা
- বোয়ালখালী: ৭৫৬টি পুকুর ও দিঘিতে প্রায় সাড়ে ৪ কোটি টাকা
- পটিয়া: ১ হাজার ৪৩৫টি পুকুর ও দিঘিতে প্রায় ৩ কোটি ৬৮ লাখ টাকা
- ফটিকছড়ি: ৫৩৩টি পুকুরে প্রায় ২ কোটি ৭০ লাখ টাকা
- আনোয়ারা: প্রায় ১ হাজার ১০০টি পুকুর ও ১০টি চিংড়ি ঘেরে প্রায় দেড় কোটি টাকা
পুকুরের পাড় উপচে বা ভেঙে পানি ঢুকলে চাষের মাছ খাল, মাঠ ও নদীতে বেরিয়ে যায়, ফলে মাসের পর মাস খাবার দিয়ে বড় করা মাছ হারান চাষি। চিংড়ি ঘেরের হিসাবে বাঁশখালী আলাদা করে চোখে পড়ে, কারণ এটি উপকূলীয় উপজেলা। এশিয়াটিক সোসাইটি অব বাংলাদেশের জাতীয় জ্ঞানকোষ বাংলাপিডিয়া জানায়, উপজেলাটির পশ্চিমে বঙ্গোপসাগর ও কুতুবদিয়া চ্যানেল, আর এর প্রধান রপ্তানিপণ্যের তালিকায় পান, লিচু, চা, আদা ও লবণের সঙ্গে চিংড়ি ও সামুদ্রিক মাছও রয়েছে। বাংলাপিডিয়ার মৎস্য নিবন্ধে বলা হয়েছে, চট্টগ্রাম অঞ্চলে পালাক্রমে চিংড়ি চাষ ও লবণ উৎপাদন করা হয়।
আউশ ধান, আমনের বীজতলা ও গ্রীষ্মকালীন সবজি
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) জেলা কৃষি অফিসের তথ্য অনুযায়ী, বন্যা ও জলাবদ্ধতায় চট্টগ্রামের সব উপজেলাতেই কমবেশি কৃষিজমির ক্ষতি হয়। প্রাথমিক হিসাবে জেলার ৮ হাজার ৭৬৮ হেক্টর আউশ ধানের আবাদ, ৬৫২ হেক্টর আমনের বীজতলা এবং ৪ হাজার ৯০৭ হেক্টর গ্রীষ্মকালীন সবজিখেত ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
ফসলের সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয় বাঁশখালী, চন্দনাইশ, সীতাকুণ্ড, সন্দ্বীপ ও সাতকানিয়া উপজেলায়। আউশ ধানের মধ্যে বাঁশখালীতে ২ হাজার ১৫০ হেক্টর, চন্দনাইশে ২ হাজার ১২০ হেক্টর, সীতাকুণ্ডে ১ হাজার ৫০০ হেক্টর এবং সন্দ্বীপে ১ হাজার হেক্টর জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
গ্রীষ্মকালীন সবজির ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয় চন্দনাইশে, ৮৩০ হেক্টর জমিতে। এ ছাড়া সীতাকুণ্ডে ৭০০ হেক্টর, সন্দ্বীপে ৬০০ হেক্টর, ফটিকছড়িতে ৪৭৫ হেক্টর, সাতকানিয়ায় ৪৬০ হেক্টর, পটিয়ায় ৪৫৫ হেক্টর, বাঁশখালীতে ৪০০ হেক্টর এবং রাউজানে ৩১০ হেক্টর জমির সবজি আবাদ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
জেলা কৃষি কর্মকর্তা আপ্রু মারমা জাগো নিউজকে বলেন, 'বন্যা ও পাহাড়ি ঢলে চট্টগ্রামের কয়েকটি উপজেলা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে সীতাকুণ্ড, বাঁশখালী, চন্দনাইশ ও সন্দ্বীপে আউশ ধানের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। বিশেষ করে চন্দনাইশে আউশ ধান ও গ্রীষ্মকালীন সবজির অধিকাংশ জমিই পানিতে তলিয়ে গেছে।'
তিনি বলেন, 'বন্যায় কৃষি খাতই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আমরা প্রাথমিকভাবে ক্ষয়ক্ষতির একটি হিসাব করেছি। পানি পুরোপুরি নেমে গেলে চূড়ান্ত প্রতিবেদন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে। সেখানে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক এবং জমির পরিমাণ উল্লেখ থাকবে।'

কৃষিপঞ্জিকায় আউশ ও আমনের জায়গা
বাংলাদেশে বছরে তিন মৌসুমে ধান হয়: আউশ, আমন ও বোরো। বাংলাপিডিয়া জানায়, আবাদি জমির হিসাবে রোপা আমনই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, আর আউশ বেশির ভাগ জেলায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে চাষ হয়। তিন মৌসুমের মধ্যে আউশ সবচেয়ে ছোট। দ্য ডেইলি স্টার ২০২৬ সালের ২১ জুনে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) যে তথ্য প্রকাশ করে, তাতে দেখা যায়, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে জুলাই-আগস্টে কাটা সর্বশেষ আউশ মৌসুমে উৎপাদন হয় ২৭ লাখ টন, আগের বছর যা ছিল ২৭ দশমিক ৯ লাখ টন। আউশের আবাদি জমি ৯ দশমিক ৫৮ লাখ হেক্টর থেকে কমে ৯ দশমিক ৪৫ লাখ হেক্টরে নামে, আর হেক্টরপ্রতি ফলন দাঁড়ায় ২ দশমিক ৮৬৫ টন। বিবিএস জানায়, বেশি লাভের আশায় কৃষকেরা আউশ ছেড়ে অন্য মৌসুমি ফসলের দিকে ঝুঁকছেন, আর দেশের বার্ষিক চাল উৎপাদনে আউশের অংশ এক-দশমাংশেরও কম।
এই কৃষিপঞ্জিকার কারণেই বন্যার সময়টি গুরুত্বপূর্ণ। জুলাইয়ে মাঠে থাকা আউশ ধানই জুলাই-আগস্টে কাটা হয়। আর আমনের বীজতলা হলো সেই নার্সারি, যেখান থেকে চারা তুলে বর্ষা মৌসুমের প্রধান ফসল আমন রোপণ করা হয়। ২০২৩ সালের আগস্টের বন্যার সময় চট্টগ্রামে ডিএইর উপপরিচালক দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেছিলেন, সেই মাসের শেষে কাটার কথা ছিল এমন বিপুল পরিমাণ আউশ ধান বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
কৃষি অফিসের হিসাবের তৃতীয় ফসল সবজি চন্দনাইশের কৃষির অন্যতম ভিত্তি, আর ২০২৬ সালের জুলাইয়ে এই উপজেলাতেই সবচেয়ে বেশি জমির সবজি নষ্ট হয়। বাংলাপিডিয়া চন্দনাইশের প্রধান ফসল ও প্রধান রপ্তানিপণ্যের তালিকায় পেয়ারা, লেবু ও আনারসের সঙ্গে সবজির কথা উল্লেখ করেছে। ২০২৩ সালে চট্টগ্রামে ডিএইর একজন অতিরিক্ত পরিচালক উপজেলার দোহাজারী এলাকাকে চট্টগ্রামের সবজিভান্ডার হিসেবে পরিচিত বলে বর্ণনা করেন; সে বছর চন্দনাইশে ১ হাজার ২৪৫ হেক্টর জমিতে সবজি চাষ হয়েছিল।
রেকর্ড বৃষ্টি, পাহাড়ি ঢল ও বিপৎসীমার ওপরে নদী
এই বন্যার আগে স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি বৃষ্টি হয়। প্রথম আলো ২০২৬ সালের ৭ জুলাই জানায়, ৬ জুলাই সোমবার বেলা তিনটা থেকে ৭ জুলাই মঙ্গলবার বেলা তিনটা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় চট্টগ্রামে ৪১২ দশমিক ৩ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়, যা ১৯৮৩ সালের পর গত ৪৩ বছরে এক দিনে সর্বোচ্চ। চট্টগ্রাম নগর, রাঙ্গুনিয়াসহ অঞ্চলের বিভিন্ন স্থানে দেয়াল ও পাহাড়ধস হয়, আর রেললাইনে পানি জমে থাকায় প্রায় এক হাজার যাত্রী নিয়ে কক্সবাজারগামী একটি ট্রেন নগরে আটকে পড়ে।
চার দিনের একটানা অতিভারী বৃষ্টির পর ৮ জুলাই একই পত্রিকা জানায়, পাহাড়ি ঢলে চট্টগ্রাম অঞ্চলের পাঁচ জেলার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে; চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড, বাঁশখালী, লোহাগাড়া, সাতকানিয়া, রাউজান, হাটহাজারী, রাঙ্গুনিয়া ও ফটিকছড়ির নিচু এলাকা ডুবে গেছে। সাতকানিয়া ও লোহাগাড়ায় সাঙ্গুর পানি বিপৎসীমার কিছুটা নিচ দিয়ে এবং ডলু ও টঙ্কাবতীর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। বেড়িবাঁধ ভেঙে পানি ঢুকে সাতকানিয়ার ধর্মপুর, বাজালিয়া ও চরতী ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চল এবং লোহাগাড়ার আমিরাবাদ, বড়হাতিয়া, পুটিবিলা ও আধুনগর ইউনিয়নের কিছু এলাকা প্লাবিত হয়, তলিয়ে যায় কৃষকের ফসল। বাঁশখালীতে পাহাড়ি ঢল ও জোয়ারের পানিতে পৌর সদর, শীলকূপ এবং ছনুয়া, নাপোড়া, চাম্বল, শেখেরখীল, খানখানাবাদ ও পুকুরিয়া ইউনিয়ন প্লাবিত হয়, ভেসে যায় পুকুর, জলাশয় ও ঘেরের মাছ। পত্রিকাটি তখন জানায়, কোথাও থেকে সুনির্দিষ্ট ক্ষয়ক্ষতির হিসাব পাওয়া যায়নি।
কৃষি ও মৎস্যের ক্ষতির হিসাব প্রকাশের কয়েক ঘণ্টা আগে, ১০ জুলাই বিকেলে, জাগো নিউজ জেলা প্রশাসনের তথ্য তুলে ধরে জানায়, জেলায় অন্তত সাড়ে চার লাখ মানুষ পানিবন্দি, বন্যা ও পাহাড়ধসে পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে এবং ৬২৯টি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে। সবচেয়ে নাজুক অবস্থা ছিল সাতকানিয়ায়: ডলু খালের বাঁধ ভেঙে উপজেলার ১৭টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভার প্রায় ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ এলাকা পানিতে তলিয়ে যায় এবং দুই লাখের বেশি মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েন। উপজেলা প্রশাসন সেখানে ৮৯টি আশ্রয়কেন্দ্র খোলে। বাঁশখালীর ১৫টি ইউনিয়নের ২১২টি গ্রামের অধিকাংশই বন্যাকবলিত হয়, ধসে পড়ে শত শত মাটির ঘর; উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা দাপ্তরিক হিসাবে প্রায় ৪৫ হাজার মানুষ পানিবন্দি বলে জানান এবং বলেন, পানি নামতে শুরু করেছে। চন্দনাইশে দুটি পৌরসভা ও আটটি ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়ে অন্তত ২০ হাজার মানুষ পানিবন্দি হন, আর সাঙ্গুর পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করে। একই প্রতিবেদনে বলা হয়, হাজার হাজার হেক্টর কৃষিজমি তলিয়ে গেছে এবং আমন বীজতলা, সবজিখেত ও মাছের ঘের ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

পাহাড়, নদী আর দ্রুত বাড়া পানির জেলা
চট্টগ্রাম জেলার আয়তন ৫ হাজার ২৮২ দশমিক ৯২ বর্গকিলোমিটার, এর একদিকে পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়, অন্যদিকে বঙ্গোপসাগর। বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী জেলার উত্তরে খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি ও ভারতের ত্রিপুরা রাজ্য, দক্ষিণে কক্সবাজার, পূর্বে বান্দরবান, রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ি এবং পশ্চিমে নোয়াখালী ও বঙ্গোপসাগর। জেলার প্রধান নদী কর্ণফুলী, হালদা ও সাঙ্গু, আর বাংলাপিডিয়ায় জেলার মোট বার্ষিক বৃষ্টিপাত ৩ হাজার ১৯৪ মিলিমিটার উল্লেখ করা হয়েছে।
দক্ষিণ চট্টগ্রামে যা ঘটেছে, তার অনেকটা বোঝা যায় সাঙ্গু নদী দিয়ে। নদীটির উৎপত্তি উত্তর আরাকান পাহাড়ে; পার্বত্য চট্টগ্রামের ভেতর দিয়ে উত্তরে বান্দরবান পর্যন্ত এসে এটি পশ্চিমে বাঁক নিয়ে চট্টগ্রাম জেলা পেরিয়ে বঙ্গোপসাগরে পড়েছে। এর মোট দৈর্ঘ্য ২৭০ কিলোমিটার, যার ১৭৩ কিলোমিটার বাংলাদেশে। এর প্রধান উপনদী ডলু খাল সাতকানিয়ার সমতলের পানি নিষ্কাশন করে, আর সাঙ্গু নিজে পটিয়া, সাতকানিয়া ও বাঁশখালী এই তিন উপজেলার পানি বয়ে নেয়। বাংলাপিডিয়া একে অগভীর নদী বলে বর্ণনা করেছে, যা বর্ষায় তীব্র স্রোত নিয়ে ভয়াল হয়ে ওঠে।
ওই পাহাড় থেকে পানি নামে দ্রুত। বাংলাপিডিয়া বাংলাদেশের বন্যাকে তিন ভাগে ভাগ করেছে: মৌসুমি বন্যা, আকস্মিক বন্যা বা ঢল এবং জোয়ারজনিত বন্যা। আকস্মিক বন্যায় পানি হঠাৎ বাড়ে ও হঠাৎ কমে, সাধারণত পাহাড়ি এলাকার উপত্যকায় এমন হয়। জ্ঞানকোষটি বলছে, দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে নেমে আসা পাহাড়ি অববাহিকার বন্যা বেশির ভাগ সময় স্বল্পস্থায়ী, তবে কখন কতটা তীব্র হবে, তা আগে বলা কঠিন। বাঁশখালীতে পাহাড়ের পানির সঙ্গে যুক্ত হয় জোয়ার; ৮ জুলাইয়ের প্রতিবেদন অনুযায়ী তাতে উপকূলীয় ইউনিয়নগুলো প্লাবিত হয় এবং বেড়িবাঁধ ঝুঁকিতে পড়ে।
সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত উপজেলাগুলো কৃষিনির্ভর। আদমশুমারির তথ্য উদ্ধৃত করে বাংলাপিডিয়া জানায়, বাঁশখালীর ৫৮ দশমিক ৭৩ শতাংশ, চন্দনাইশের ৩৬ দশমিক ৪১ শতাংশ এবং সাতকানিয়ার ৩৫ দশমিক ৬৪ শতাংশ পরিবারের আয়ের প্রধান উৎস কৃষি। সাতকানিয়ার প্রধান ফসলের তালিকায় আছে ধান, আলু, সরিষা, চীনাবাদাম, কলাই, হলুদ, তুলা ও সবজি; বাঁশখালীর তালিকায় ধান, পাট, চা, আলু, আদা, পান ও সবজি।
পুকুরের মাছ ও অর্থনীতিতে এর গুরুত্ব
বাংলাদেশের মাছচাষের মূল ভিত্তি পুকুর। প্রথম আলো ২০২৪ সালের জুনে বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিএফআরআই) তথ্য উদ্ধৃত করে জানায়, ২০২৩ সালে দেশে মোট ৪৮ লাখ টন মাছ উৎপাদন হয়, যার ৩২ লাখ টন খামারে চাষ করা, প্রায় ১৩ লাখ টন মুক্ত জলাশয়ের মিঠা পানির মাছ এবং বাকিটা সাগরের। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) ২০২২ সালের তথ্যভিত্তিক 'দ্য স্টেট অব ওয়ার্ল্ড ফিশারিজ অ্যান্ড অ্যাকুয়াকালচার ২০২৪' প্রতিবেদনে মুক্ত জলাশয়ের মিঠা পানির মাছ আহরণে বাংলাদেশ ভারতের পরে বিশ্বে দ্বিতীয় স্থানে উঠে আসে।
বাংলাপিডিয়া পুকুরে মাছচাষের প্রচলিত পদ্ধতিকে মিশ্রচাষ বা পলিকালচার বলে বর্ণনা করেছে: ভিন্ন ভিন্ন খাদ্যাভ্যাসের কয়েকটি দ্রুতবর্ধনশীল প্রজাতি একসঙ্গে ছাড়া হয়, যাতে পানির প্রতিটি স্তর কাজে লাগে। সাধারণ সমন্বয় হলো কাতলা, রুই ও মৃগেল এই তিন ভারতীয় প্রধান কার্প, সঙ্গে প্রায়ই সিলভার কার্প, গ্রাস কার্প, কমন কার্প, তেলাপিয়াসহ অন্যান্য প্রজাতি। জ্ঞানকোষটির মৎস্য নিবন্ধে বলা হয়েছে, দেশের মানুষের প্রাণিজ আমিষের প্রায় ৬০ শতাংশ আসে শুধু মাছ থেকে; তাই একটি পুকুরের ক্ষতি মানে আয়ের পাশাপাশি খাদ্যেরও ক্ষতি।
মৌসুমও ক্ষতি বাড়ায়। ২০২৩ সালের আগস্টে চট্টগ্রামে মৎস্য অধিদপ্তরের একজন জরিপ কর্মকর্তা দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেছিলেন, জুলাই-আগস্ট চাষিদের মাছ ধরার ভরা মৌসুম, আর পরের মাসে নতুন পোনা ছাড়ার কথা ছিল; ফলে পানি আসায় মাছচাষি ও পোনা উৎপাদনকারী দুই পক্ষই বড় ক্ষতির মুখে পড়েন।

২০২৩ সালের আগস্টের বন্যা: কাছাকাছি সময়ের তুলনা
তিন বছর আগেও দক্ষিণ চট্টগ্রাম একই ধরনের দুর্যোগের মুখে পড়েছিল। দ্য ডেইলি স্টার ২০২৩ সালের আগস্টে জানায়, জেলার পাঁচ উপজেলায় বন্যায় অন্তত ১৬ জনের মৃত্যু হয়; সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত ছিল সাতকানিয়া, বাঁশখালী ও চন্দনাইশ, আর পটিয়া ও আনোয়ারার নিম্নাঞ্চল এবং উত্তরের কয়েকটি উপজেলাতেও ক্ষতি হয়। দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস ২০২৩ সালের ১৮ আগস্ট জানায়, সে বছর ১ থেকে ৪ আগস্ট জেলায় বন্যা হয়েছিল।
তখনো ক্ষতির হিসাব হয়েছিল এই দুই খাতেই। দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড ২০২৩ সালের ১১ আগস্ট চট্টগ্রাম মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্য তুলে ধরে জানায়, বন্যায় ১৩ হাজার ৩৭৯টি পুকুর ও মাছের ঘের প্লাবিত হয় এবং ৪ হাজার ১৫৪ টন রুই, কাতলা, মৃগেল, তেলাপিয়া ও পাঙাশ মাছ ও প্রায় ১৮৫ দশমিক ৩৫ লাখ পোনা ভেসে যায়; ওই জরিপ কর্মকর্তার হিসাবে অবকাঠামোসহ খাতটির মোট ক্ষতি ছিল ৭৫ কোটি টাকার বেশি। ডিএই জানায়, প্রায় ২৭ হাজার হেক্টর জমির ফসল তলিয়ে যায়, যার মধ্যে ১৪ হাজার হেক্টরে আমন, ৪ হাজার ৫০০ হেক্টরে আউশ, ৩ হাজার ৭০০ হেক্টরে আমনের বীজতলা এবং ৫ হাজার ১০০ হেক্টরে সবজি। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর গবাদিপশু ও হাঁস-মুরগিতে প্রায় ২৮ কোটি টাকার ক্ষতির হিসাব দেয়। এক সপ্তাহ পরে দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস জেলার মৎস্য খাতে ৬৯ কোটি ৩৮ লাখ টাকার ক্ষতির কথা জানায়, যেখানে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত চার উপজেলা ছিল সাতকানিয়া, লোহাগাড়া, পটিয়া ও চন্দনাইশ।
ওই হিসাবগুলো ছিল পানি নেমে যাওয়ার পরের চূড়ান্ত হিসাব। ২০২৬ সালের জুলাইয়ের সংখ্যাগুলো ছিল প্রথম গণনা, যখন সাতকানিয়া ও বাঁশখালীর বড় অংশ তখনো পানির নিচে, আর জেলার দুই দপ্তরই জানিয়েছিল, মাঠপর্যায়ে যাচাইয়ের পর হিসাব হালনাগাদ করা হবে।
ত্রাণ, প্রতিবেদন ও কর্মকর্তাদের জানানো পরবর্তী পদক্ষেপ
জেলা প্রশাসন ১০ জুলাই জানায়, ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয় বন্যার জন্য ২০০ মেট্রিক টন চাল ও ১০ লাখ টাকা বরাদ্দ দিয়েছে, যা পর্যায়ক্রমে বিভিন্ন উপজেলায় বিতরণ করা হচ্ছে; উদ্ধার কার্যক্রম জোরদার করতে সাতকানিয়ার জন্য জরুরি ভিত্তিতে ১০টি স্পিডবোট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। জেলা প্রশাসনের সব কর্মকর্তা-কর্মচারীর ছুটি বাতিল করা হয় এবং জেলা প্রশাসকের কার্যালয়সহ প্রতিটি উপজেলায় ২৪ ঘণ্টার নিয়ন্ত্রণকক্ষ চালু রাখা হয়।
কৃষক ও মৎস্যচাষিদের জন্য কর্মকর্তারা দুই ধাপের প্রক্রিয়ার কথা জানান। মৎস্য অফিস প্রাথমিক ক্ষয়ক্ষতির প্রতিবেদন মৎস্য অধিদপ্তরে পাঠিয়েছে, আর কৃষি অফিস জানায়, পানি পুরোপুরি নেমে গেলে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক ও জমির পরিমাণসহ চূড়ান্ত প্রতিবেদন মন্ত্রণালয়ে যাবে। বন্যাকবলিত এলাকার বাসিন্দারা জাগো নিউজকে বলেন, প্রায় প্রতি বর্ষায় একই বন্যা ও জলাবদ্ধতা ফিরে আসে; ত্রাণের পাশাপাশি তাঁরা নদী খনন, খাল পুনরুদ্ধার, টেকসই বাঁধ নির্মাণ ও পানি নিষ্কাশনব্যবস্থার উন্নয়নের দাবি জানান।
ছবি: Owais Al Qarni / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, প্রথম আলো, বাংলাপিডিয়া (এশিয়াটিক সোসাইটি অব বাংলাদেশ), দ্য ডেইলি স্টারে প্রকাশিত বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য, প্রথম আলোয় প্রকাশিত বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট ও এফএওর তথ্য, দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস, দ্য ডেইলি স্টার





মন্তব্য
(০)