মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জে ২০২৬ সালের ১৬ জুলাই বৃহস্পতিবার সংরক্ষিত বনের প্রায় ৫ একর জমি উদ্ধার করেছে বন বিভাগ। ওই জমিতে গড়ে তোলা মাল্টা, আনারস, লেবু ও সুপারির বাগান অভিযানে উচ্ছেদ করা হয়। বন বিভাগ ও স্থানীয় সূত্রের বরাতে জানা যায়, স্থানীয় প্রভাবশালীদের একটি মহল দীর্ঘদিন ধরে বনের এই বিশাল জায়গা অবৈধভাবে দখল করে এই চার ফসলের চাষ করে আসছিল। রাজকান্দি রেঞ্জের আদমপুর বিটের কালিঞ্জি বসতি নাসক এলাকায় দুপুরে এ অভিযান চালানো হয়। বন বিভাগ, উপজেলা প্রশাসন ও কমলগঞ্জ থানা পুলিশ যৌথভাবে অভিযানটি পরিচালনা করে বলে সেদিন সন্ধ্যায় জাগো নিউজ জানায়।
বাগানগুলো উচ্ছেদের পর চাষাবাদ করা জমি আবার বন বিভাগের নিয়ন্ত্রণে নেওয়া হয়। দুই কর্মকর্তা পত্রিকাটির কাছে ফলাফল নিশ্চিত করেন। সহকারী বন সংরক্ষক ও রাজকান্দি রেঞ্জ কর্মকর্তা প্রিতম বড়ুয়া জানান, সংরক্ষিত রাজকান্দি রেঞ্জের আদমপুর বিটের কালিঞ্জি বসতি নাসক এলাকায় উচ্ছেদ অভিযান চালিয়ে ৫ একর ভূমি উদ্ধার করা হয়েছে। কমলগঞ্জের সহকারী কমিশনার (ভূমি) রিয়াজ মাহমুদও অভিযানের বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, ৫ একর বনভূমি উদ্ধার করা হয়েছে।
যাঁদের বিরুদ্ধে জমিটি দখলে রাখার কথা বলা হয়েছে, প্রতিবেদনে তাঁদের নাম উল্লেখ করা হয়নি, তাঁদের কোনো বক্তব্যও ছিল না। দখলের ঘটনায় কোনো মামলা হয়েছে কি না, প্রতিবেদনে সে কথাও বলা হয়নি।
যৌথ দল যা উচ্ছেদ করল
ফলের বাগান ছাড়াও অভিযানে দুটি স্থাপনা ও একটি জলাশয়ের ব্যবস্থা নেওয়া হয়। প্রতিবেদন অনুযায়ী বনের ভেতরে অবৈধভাবে বাঁশ ও পলিথিন দিয়ে তৈরি করা দুটি শেড গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়।
দ্বিতীয় পদক্ষেপটি ছিল পানি নিয়ে। প্রতিবেদনে বলা হয়, সংরক্ষিত বনের ভেতরের একটি প্রাকৃতিক জলাশয়ে বাঁধ দিয়ে কৃত্রিমভাবে একটি পুকুর তৈরি করা হয়েছিল। অভিযানের সময় এই অবৈধ পুকুরের পাড় কেটে দেওয়া হয়, যাতে জলাশয়টির স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ আবার ফিরে আসতে পারে।
অভিযানটি ছিল যৌথ। সংরক্ষিত বন ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকা বন বিভাগের সঙ্গে ছিল উপজেলা প্রশাসন, যার প্রতিনিধিত্ব করেন সহকারী কমিশনার (ভূমি), এবং কমলগঞ্জ থানার পুলিশ।
রাজকান্দি রেঞ্জ ও আদমপুর বিট
কমলগঞ্জ সিলেট বিভাগের মৌলভীবাজার জেলার সাতটি উপজেলার একটি। এশিয়াটিক সোসাইটি অব বাংলাদেশের জাতীয় জ্ঞানকোষ বাংলাপিডিয়া উপজেলাটির আয়তন ৪৮৫.২৬ বর্গকিলোমিটার বলে উল্লেখ করেছে। এর উত্তরে রাজনগর উপজেলা, দক্ষিণে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্য, পূর্বে কুলাউড়া উপজেলা ও ভারতের আসাম রাজ্য এবং পশ্চিমে শ্রীমঙ্গল ও মৌলভীবাজার সদর উপজেলা। প্রধান নদী ধলাই। কমলগঞ্জ থানা গঠিত হয় ১৯২২ সালে, উপজেলা হয় ১৯৮৩ সালে। আদমপুর এই উপজেলার নয়টি ইউনিয়নের একটি।
উপজেলার জনগোষ্ঠী বৈচিত্র্যময়। বাংলাপিডিয়ায় উদ্ধৃত ২০১১ সালের আদমশুমারিতে এখানে ২ লাখ ৫৯ হাজার ১৩০ জন মানুষ গণনা করা হয়, আর জ্ঞানকোষটি এখানে বসবাসকারী আদিবাসী জনগোষ্ঠী হিসেবে মণিপুরি, খাসিয়া, ত্রিপুরা (টিপরা) ও হালামদের নাম উল্লেখ করেছে। ৩৯.৭৭ শতাংশ পরিবারের আয়ের প্রধান উৎস কৃষি। বাংলাপিডিয়ার তালিকায় উপজেলার প্রধান ফসল আমন ও আউশ ধান, গম, আখ, চা, সরিষা, আলু, পান ও সবজি; আর প্রধান ফল আম, কাঁঠাল, আনারস, জাম, লিচু, জাম্বুরা, তরমুজ ও সুপারি। চা, আখের গুড়, পান ও সবজি এখানকার প্রধান রপ্তানি পণ্য।
উপজেলাটি বনের জন্যও পরিচিত। ১৯৯৬ সালে ১ হাজার ২৫০ হেক্টর জমি নিয়ে প্রতিষ্ঠিত ও জাতীয় উদ্যান হিসেবে ঘোষিত লাউয়াছড়া কমলগঞ্জেই অবস্থিত, আর বাংলাপিডিয়া এলাকার অন্যান্য দর্শনীয় স্থানের মধ্যে মাধবপুর লেকের নাম উল্লেখ করেছে। রাজকান্দি সংরক্ষিত বনও এই উপজেলাতেই। আদমপুর বিট, যা কাউয়ারগলা নামেও পরিচিত, রাজকান্দি সংরক্ষিত বনের একটি বন বিট। উপজেলা সদর থেকে এর দূরত্ব প্রায় ১০ কিলোমিটার, আর বনের ঠিক ওপারেই ভারতের ত্রিপুরা রাজ্য। উঁচুনিচু টিলায় ছড়ানো নিরিবিলি এই বনের ভেতর দিয়ে পায়ে চলা পথ গেছে; কাছেই একটি খাসিয়া গ্রাম, আর বনের ভেতরে আছে বন বিভাগের একটি পরিদর্শন বাংলো।
আদমপুর বনের বর্ণনায় বড় বড় বাঁশঝাড়ের কথা আছে, যার মধ্যে মুলি (Melocanna baccifera), মিটিঙ্গা, ডলু ও রূপাই বাঁশ প্রধান; সঙ্গে আছে চাপালিশ, গর্জন, জারুল ও আগরের মতো দেশি গাছ। বনের গভীরে উল্লুকের ডাক শোনা যায়, আর এখানে দেখা পাওয়া প্রাণীর মধ্যে আছে মুখপোড়া হনুমান, ভালুক ও মায়া হরিণ। রাজকান্দি বনেই হাম হাম জলপ্রপাত, স্থানীয়ভাবে যার নাম চিতা ঝর্ণা। ২০১০ সালের দিকে একদল পর্যটক ও একজন স্থানীয় গাইডের মাধ্যমে এটি ব্যাপক পরিচিতি পায়, আর সেখানে যেতে হয় বনের ভেতর দিয়ে পায়ে হেঁটে।

সিলেটের পাহাড়ি বন
কমলগঞ্জের বন পাহাড়ি বন শ্রেণির, যা বাংলাদেশের প্রধান বনের ধরনগুলোর একটি। বাংলাপিডিয়ার বর্ণনায় পাহাড়ি বন হলো ক্রান্তীয় চিরসবুজ ও আধা-চিরসবুজ উদ্ভিদের বন, যা পার্বত্য চট্টগ্রাম, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, সিলেট, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জে দেখা যায়। এর আয়তন প্রায় ১৪ লাখ হেক্টর, যার প্রায় ৬ লাখ ৭০ হাজার হেক্টর বন বিভাগের নিয়ন্ত্রণে। এসব বনে গাছ, বাঁশ ও গুল্মের বিপুল বৈচিত্র্য রয়েছে; কাঠ ও জ্বালানি কাঠ ছাড়াও স্থানীয় চাহিদা ও শিল্পের জন্য এখান থেকে বাঁশ ও ছন সংগ্রহ করা হয়।
বন ও বনবিদ্যা বিষয়ক ভুক্তিতে বাংলাপিডিয়া উত্তর-পূর্বে মৌলভীবাজারের পাহাড়ি অংশে ক্রান্তীয় আর্দ্র চিরসবুজ বনের কথা বলেছে, যেখানে ওপরের স্তরের গাছ ৪৫ থেকে ৬২ মিটার উঁচু হয়; আর সিলেট থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত পাহাড়ি অঞ্চলে আছে ক্রান্তীয় আধা-চিরসবুজ বন। জ্ঞানকোষটি জানায়, আধা-চিরসবুজ বনে ৮০০টির বেশি প্রজাতির সপুষ্পক উদ্ভিদ নথিভুক্ত হয়েছে; এসব বন মিলিয়ে প্রায় ৬ লাখ ৪০ হাজার হেক্টর জমি জুড়ে আছে এবং দেশের বাণিজ্যিক কাঠের প্রায় ৪০ শতাংশ জোগায়। আগের সেগুন বাগানের পর রাবার বাগান চালু হওয়ায় এসব বনের প্রাকৃতিক চরিত্র ধীরে ধীরে বদলে যাচ্ছে বলেও এতে উল্লেখ আছে।
সিলেট অঞ্চলের বন বর্তমান ব্যবস্থায় এসেছে আলাদা পথে। বাংলাপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী ব্রিটিশ শাসনামলে সিলেট ছিল আসামের অংশ, আর ১৯৪৭ সালের দেশভাগে আসামের সিলেট বিভাগ পূর্ব পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হয়। তখন এখানকার বন চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও পার্বত্য চট্টগ্রামের সঙ্গে বন প্রশাসনের পূর্বাঞ্চলীয় সার্কেলে যুক্ত হয়, আর সিলেটে বনকর্মী প্রশিক্ষণের একটি স্কুল প্রতিষ্ঠা করা হয়। যে আইনের অধীনে আজও সংরক্ষিত বন ঘোষণা ও রক্ষা করা হয়, সেই বন আইন ১৯২৭ কার্যকর হয় সেই বছরেই, যে বছর বাংলার বন সার্কেল উত্তর ও দক্ষিণ দুই সার্কেলে ভাগ করা হয়।
বনভূমির ওপর চাপ পুরোনো। বন উজাড় বিষয়ক ভুক্তিতে বাংলাপিডিয়া বনভূমিকে কৃষি, শিল্প, বসতি ও অবকাঠামোর কাজে রূপান্তরকে বন হারানোর প্রধান কারণগুলোর মধ্যে উল্লেখ করেছে। জ্ঞানকোষটি আরও জানায়, বনভূমি অবৈধভাবে দখলও হয়েছে: ১৯৮৯ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন বন এলাকায় প্রায় ৭৬ হাজার ৫৯৬ হেক্টর বনভূমি দখল হয়ে যায়। বন উজাড়ের পরিবেশগত প্রভাব হিসেবে এতে আবাসস্থল হারানো, মাটির ক্ষয়, বন্যা ও ভূমিক্ষয়ের কথা বলা হয়েছে।
মাল্টা, আনারস, লেবু ও সুপারি
উদ্ধার করা জমিতে পাওয়া চারটি ফসলই বাংলাদেশে ব্যাপকভাবে চাষ হয়, আর এর দুটির সঙ্গে সিলেটের পাহাড়ের সম্পর্ক বহু পুরোনো। বাংলাপিডিয়া জানায়, আনারস ভারতের আসাম ও মণিপুর হয়ে বাংলাদেশে আসে এবং বিংশ শতাব্দীর শুরুতে প্রথম সিলেটে এর চাষ হয়। এখন প্রায় সব জেলায় আনারস হয়, তবে সিলেট, টাঙ্গাইল, ঢাকা ও রাঙামাটিতে এর আবাদ সবচেয়ে বেশি। জ্ঞানকোষটির হিসাবে দেশে প্রায় ৪৫ হাজার ৬৮৫ হেক্টর জমিতে আনারস চাষ হয় এবং মোট উৎপাদন প্রায় ২ লাখ ৩৪ হাজার ৮৬৫ টন। চাষ হওয়া জাতগুলো হলো জায়ান্ট কিউ (স্থানীয় নাম ক্যালেন্ডার), হানি কুইন (জলডুবি) ও রেড স্প্যানিশ (ঘোড়াশাল)। মার্চ থেকে মে মাসে আনারসে ফুল আসে, জুন থেকে সেপ্টেম্বরে ফল ধরে।

বাংলাদেশে বিক্রি হওয়া সবুজ মিষ্টি কমলা মাল্টা তুলনামূলক নতুন ফসল। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) হর্টিকালচার শাখার তথ্য উদ্ধৃত করে প্রথম আলো ২০২৫ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর জানায়, দেশে মাল্টার উৎপাদন ২০১৮-১৯ অর্থবছরের ১৭ হাজার টন থেকে বেড়ে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৮৪ হাজার টন ছাড়িয়েছে, আর মাল্টা বাগানের আয়তন ২ হাজার ৪৩৩ হেক্টর থেকে বেড়ে প্রায় ৮ হাজার হেক্টর হয়েছে। উৎপাদনে শীর্ষে বান্দরবান, এরপর খাগড়াছড়ি ও রাজশাহী; ততদিনে দেশের প্রায় সব জেলাতেই মাল্টার চাষ হচ্ছিল।
একই প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১৯৯০-এর দশকের দিকে ভারত থেকে প্রথম সবুজ মাল্টা বাংলাদেশে আসে এবং ভালোভাবে চাষ হওয়ার প্রমাণ মেলার পর এটি বারি মাল্টা-১ জাত হিসেবে স্বীকৃতি পায়। ডিএইর একজন উদ্যানতত্ত্ববিদের ভাষ্যে জাতটি চাষিদের কাছে জনপ্রিয় এবং দেশের আবহাওয়ার সঙ্গে ভালোভাবে খাপ খেয়েছে। ২০১৮ সালে বছরব্যাপী ফল উৎপাদন প্রকল্পের প্রদর্শনীর পর মাল্টা সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে। পাহাড়ি ও উপকূলীয় জেলাগুলোতে দেশি মাল্টা সাধারণত সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি পাকে। প্রতিবেদনটিতে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে মাল্টা আমদানির ব্যয় ১০ কোটি ডলার বলে উল্লেখ করা হয়।

লেবু ও সুপারি এ অঞ্চলের বহু পুরোনো ফসল। বাংলাপিডিয়া জানায়, লেবু (Citrus limon) সারা দেশে জন্মালেও এর উৎপাদন সিলেট, চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রামে কেন্দ্রীভূত; বসতবাড়ির আঙিনা ও বাগান দুই জায়গাতেই, মূলত কলম ও কাটিং থেকে এর চাষ হয়। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বারি) বারি লেবু-১ জাত অবমুক্ত করেছে, যা বড় আকারের ও এলাচের ঘ্রাণযুক্ত লেবু; আর বারি লেবু-২ ও বারি লেবু-৩ হলো কাগজি জাতের লেবু।
সুপারি হলো সুপারি গাছের (Areca catechu) ফল; গাছটি সরু, সোজা এবং ৩০ মিটার পর্যন্ত উঁচু হয়। বাংলাপিডিয়ার হিসাবে দেশে প্রায় ৩৬ হাজার ৫০০ হেক্টর জমিতে সুপারি চাষ হয় এবং বছরে উৎপাদন প্রায় ২৬ হাজার ৫০০ টন; সবচেয়ে বেশি হয় বরিশাল, রাঙামাটি ও খুলনায়। গাছটি খরার প্রতি খুব সংবেদনশীল, তাই যেখানে বছরে বৃষ্টিপাত ১ হাজার ২৫০ মিলিমিটারের কম, সেখানে সাধারণত সেচ দিতে হয়। পান ও চুনের সঙ্গে সুপারি চিবিয়ে খাওয়ার প্রচলন আছে।

সংরক্ষিত বনভূমি নিয়ে বন আইনে যা আছে
বাংলাদেশে সংরক্ষিত বন পরিচালিত হয় বন আইন, ১৯২৭ (১৯২৭ সালের ১৬ নম্বর আইন) অনুযায়ী, যার সংশোধনীসহ পাঠ সরকারি ওয়েবসাইট লজ অব বাংলাদেশে রয়েছে। আইনের ৩ ধারা অনুযায়ী সরকারের মালিকানাধীন বা সরকারের স্বত্ব আছে এমন যেকোনো বনভূমি, পতিত জমি বা বনায়নের উপযোগী জমিকে সরকার সংরক্ষিত বন ঘোষণা করতে পারে। ৪ ধারায় এ জন্য সরকারি গেজেটে প্রজ্ঞাপন জারি করতে হয়, যেখানে সিদ্ধান্তের ঘোষণা, জমির সীমানার বর্ণনা এবং জমির ওপর দাবি করা কোনো অধিকার তদন্তের জন্য একজন ফরেস্ট সেটেলমেন্ট অফিসার নিয়োগের কথা থাকে।
দাবি শুনানির সময়টাতেও আইন জমিটিকে সুরক্ষা দেয়। ৫ ধারা অনুযায়ী প্রজ্ঞাপন জারির পর উত্তরাধিকার অথবা সরকারের পক্ষে করা লিখিত অনুদান বা চুক্তি ছাড়া ওই জমির ওপর কোনো অধিকার অর্জন করা যায় না, আর সরকারের প্রণীত বিধি ছাড়া চাষাবাদ বা অন্য কোনো উদ্দেশ্যে নতুন করে জমি পরিষ্কার করা যায় না। ৬ ধারা অনুযায়ী সেটেলমেন্ট অফিসারকে আশপাশের প্রতিটি শহর ও গ্রামে বাংলায় ঘোষণা প্রকাশ করতে হয় এবং কেউ কোনো অধিকার দাবি করলে তা জানানোর জন্য তিন থেকে চার মাস সময় বেঁধে দিতে হয়। দাবি ও আপিল নিষ্পত্তির পর ২০ ধারায় চূড়ান্ত গেজেট প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে বনের সীমানা নির্ধারণ করে নির্দিষ্ট তারিখ থেকে সেটিকে সংরক্ষিত ঘোষণা করা হয়।
এরপর ২৩ ধারা নতুন দাবির পথ বন্ধ করে দেয়: উত্তরাধিকার অথবা সরকারের পক্ষে করা লিখিত অনুদান বা চুক্তি ছাড়া, কিংবা ২০ ধারার প্রজ্ঞাপন জারির সময় যাঁর ওপর এমন অধিকার ন্যস্ত ছিল তাঁর মাধ্যমে ছাড়া, সংরক্ষিত বনের ওপর কোনো ধরনের অধিকার অর্জন করা যায় না। অর্থাৎ সংরক্ষিত জমি দীর্ঘদিন দখলে রাখলেই তার ওপর অধিকার তৈরি হয় না।
২৬ ধারায় সংরক্ষিত বনে নিষিদ্ধ কাজের তালিকা আছে। বন (সংশোধন) আইন, ১৯৯০ দিয়ে প্রতিস্থাপিত এর (১ক) উপধারা অন্যান্যের মধ্যে সংরক্ষিত বনে এমন যেকোনো ব্যক্তির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, যিনি:
- ৫ ধারায় নিষিদ্ধ নতুন করে জমি পরিষ্কার করেন;
- কোনো গাছ কাটেন, গাছের বাকল কেটে বেড় দেন, ডাল ছাঁটেন, রস সংগ্রহের জন্য কাটেন বা পোড়ান, বাকল বা পাতা ছাড়িয়ে নেন অথবা অন্যভাবে গাছের ক্ষতি করেন;
- চাষাবাদ বা অন্য কোনো উদ্দেশ্যে জমি পরিষ্কার করেন বা ভাঙেন, অথবা অন্য কোনোভাবে জমি চাষ করেন বা চাষের চেষ্টা করেন (শেষ অংশটি বন (সংশোধন) আইন, ২০০০ দিয়ে যুক্ত);
- সরকারের বিধি লঙ্ঘন করে শিকার করেন, গুলি ছোড়েন, মাছ ধরেন, পানিতে বিষ দেন বা ফাঁদ পাতেন।
এ ধরনের অপরাধের শাস্তি অন্যূন ছয় মাস ও সর্বোচ্চ পাঁচ বছর কারাদণ্ড এবং অন্যূন ৫ হাজার টাকা ও সর্বোচ্চ ৫০ হাজার টাকা জরিমানা; এর বাইরে দণ্ড দেওয়া আদালত বনের ক্ষতির জন্য যে ক্ষতিপূরণ দিতে বলেন, তা-ও দিতে হয়। (১) উপধারার তুলনামূলক লঘু অপরাধ, যেমন অনধিকার প্রবেশ বা গবাদিপশু চরানোর শাস্তি সর্বোচ্চ ছয় মাস কারাদণ্ড এবং সর্বোচ্চ ২ হাজার টাকা জরিমানা। আইনের ২ ধারা অনুযায়ী 'গাছ' বলতে তাল-জাতীয় গাছ ও বাঁশও বোঝায়, আর বন থেকে পাওয়া বা আনা গাছ, উদ্ভিদ ও তাদের ফল এবং ওপরের মাটি ও পাথরও বনজ দ্রব্যের মধ্যে পড়ে।
এসব অপরাধ কীভাবে নিষ্পত্তি হবে, আইনে তা-ও বলা আছে। ৬৩ক ধারা অনুযায়ী ২৬(১ক) ধারার অপরাধ জামিন-অযোগ্য। ৬৪ ধারা যেকোনো বন কর্মকর্তা বা পুলিশ কর্মকর্তাকে এক মাস বা তার বেশি কারাদণ্ডযোগ্য বন অপরাধে জড়িত থাকার যুক্তিসংগত সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে পরোয়ানা ছাড়াই গ্রেপ্তারের ক্ষমতা দেয়, আর ৬৬ ধারা অনুযায়ী প্রত্যেক বন ও পুলিশ কর্মকর্তাকে বন অপরাধ প্রতিরোধ করতে হয়। ৬৮ ধারায় ক্ষমতাপ্রাপ্ত বন কর্মকর্তা কিছু বন অপরাধ ক্ষতিপূরণ নিয়ে মীমাংসা করতে পারেন, তবে ২৬(১ক) ধারার অপরাধ এর বাইরে রাখা হয়েছে স্পষ্টভাবে।
সরকারি বনভূমিতে গাছ ও ফসল ফলানোর একটি বৈধ পথও আইনে আছে। ২০০০ সালে যুক্ত ২৮ক ধারা অনুযায়ী সরকার নিজের জমিতে সামাজিক বনায়ন কর্মসূচি নিতে পারে; লিখিত চুক্তির মাধ্যমে ব্যবস্থাপনায় সহায়তাকারী মানুষকে বনজ দ্রব্যের অধিকার বা জমি ব্যবহারের অধিকার দেওয়া হয়। ২৮খ ধারা অনুযায়ী এমন চুক্তির আওতায় অধিকার প্রয়োগকে বন কর্মকর্তার লিখিত অনুমতি নিয়ে করা কাজ হিসেবে গণ্য করা হয়। ২৬ ধারাও বন কর্মকর্তার লিখিত অনুমতি নিয়ে বা সরকারের বিধি অনুযায়ী করা কোনো কাজ নিষিদ্ধ করে না।
সারা দেশে বনভূমি দখলের চিত্র
কমলগঞ্জের জমিটি অনেক বড় একটি সমস্যার ছোট অংশ। পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে বন বিভাগের দেওয়া একটি প্রতিবেদনে বনভূমির অবৈধ দখলদারদের হিসাব তুলে ধরা হয় বলে প্রথম আলো ২০২১ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি জানায়। সারা দেশে ১ লাখ ৬০ হাজার ৫৬৬ জন মানুষ ২ লাখ ৫৭ হাজার ১৫৮ একর বনভূমি দখল করে রেখেছিলেন; দেশে মোট বনভূমির পরিমাণ ৪৬ লাখ ৪৬ হাজার ৭০০ একর।
প্রতিবেদন অনুযায়ী এর মধ্যে ৮৮ হাজার ২১৫ জন দখল করে রেখেছিলেন ১ লাখ ৩৮ হাজার ৬১৩ দশমিক শূন্য ৬ একর সংরক্ষিত বনভূমি। সংরক্ষিত বনের মধ্যে ১৭২ জন ৮২০ একর জমিতে শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও কলকারখানা করেছিলেন; ৩ হাজার ৩২৯ জন হাটবাজার, দোকানপাট, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কটেজ, ফার্ম ও রিসোর্টের জন্য ৪ হাজার ৯১৪ একর দখল করেছিলেন; ৫৮ হাজার ৪০৭ জন ঘরবাড়ি করেছিলেন; আর ২৬ হাজার ৩০৭ জন স্থায়ী স্থাপনা ছাড়া কৃষিকাজ, বাগান ইত্যাদির মাধ্যমে জমি দখলে রেখেছিলেন। বন বিভাগ তখন জানায়, ইতিমধ্যে প্রায় ৫০০ একর জমি উদ্ধার করা হয়েছে।
কমলগঞ্জে যে ধরনের বাগান উচ্ছেদ করা হলো, তা ওই শেষ শ্রেণির মধ্যে পড়ে: স্থায়ী ভবন ছাড়া চাষাবাদের জন্য দখলে রাখা জমি।
একই রেঞ্জে এর আগের অভিযান
ওই মাসে রাজকান্দি রেঞ্জে কমলগঞ্জের অভিযানটিই প্রথম ছিল না। দৈনিক ইনকিলাব ২০২৬ সালের ৮ জুলাই জানায়, একই রেঞ্জের কুরমা বন বিটের কুরমা খাসিয়া পুঞ্জি সংলগ্ন ছোট পিকল এলাকায় সংরক্ষিত বনভূমিতে অবৈধভাবে গড়ে তোলা প্রায় ৩.২৯ হেক্টর পান বাগান উচ্ছেদ করেছে বন বিভাগ। মঙ্গলবার, ৭ জুলাই সকাল থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত চলা সেই অভিযানে আনুমানিক ১ হাজার পান চারা উপড়ে ফেলা হয়।
রেঞ্জ কর্মকর্তা প্রিতম বড়ুয়া তখন পত্রিকাটিকে জানান, সংরক্ষিত বনভূমি দখল ও অবৈধ পান চাষের বিরুদ্ধে চলমান অভিযানের অংশ হিসেবে ওই উচ্ছেদ চালানো হয়, এবং বন আইনে একটি পিওআর বন মামলা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে; তদন্ত শেষে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কুরমা বিট কর্মকর্তা ও বন বিভাগের কর্মীরা সেই অভিযানে অংশ নেন। বন বিভাগ জানায়, সংরক্ষিত বনভূমি ও জীববৈচিত্র্য রক্ষা এবং দখল ও অবৈধ চাষাবাদ প্রতিরোধে এমন অভিযান ভবিষ্যতেও চলবে। এর নয় দিন পর আদমপুর বিটের অভিযানে কালিঞ্জি বসতি নাসকের ৫ একর ফলবাগানের জমি উদ্ধার হয়।
ছবি: ANKAN / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: জাগো নিউজ, দৈনিক ইনকিলাব, প্রথম আলো, বাংলাপিডিয়া (এশিয়াটিক সোসাইটি অব বাংলাদেশ), বন আইন, ১৯২৭ (লজ অব বাংলাদেশ, লেজিসলেটিভ ও সংসদ বিষয়ক বিভাগ), উইকিপিডিয়া





মন্তব্য
(০)