সরাসরিবাজারদর
আটা (প্যাকেটজাত)৫৮—আদা - আমদানিকৃত১৬৭—আদা - দেশী১৫৪—আমন চাল - মাঝারি৫৬—আমন চাল - মোটা৪৮—আমন চাল - সরু৭২—আয়োডিনযুক্ত লবণ (প্যাকেটজাত)৩২—কাঁচা মরিচ২১৮—খামারের মুরগী১৬২—খাসী৯০০—চিনি (দেশী)১৩২—ছোলা - গোটা৮৫—ডিম ফার্ম - লাল৪৭—পেঁয়াজ - দেশী৬০—বোরো চাল - মাঝারি৫৫—বোরো চাল - মোটা৪৭—বোরো চাল - সরু৬৬—মাংসঃ– গরু৭২৯—মুগ ডাল১২২—রসুন - আমদানিকৃত১৯২—রসুন - দেশী১৭৩—সয়াবিন তেল১৬৩—
হালনাগাদ ২ অক্টোবর ২০২৬
ঢাকা৩০°পরিষ্কার আকাশআর্দ্রতা ৭৩%বাতাস ৭ কিমি/ঘ

ড্রাম সিডার: কম খরচে, কম সময়ে সারি ধরে বীজ বোনার যন্ত্র

চারা তোলা আর রোপণের ঝামেলা ছাড়াই অঙ্কুরিত বীজ সারি ধরে কাদামাটিতে ফেলে দেয় ড্রাম সিডার। সময় লাগে প্রচলিত পদ্ধতির অর্ধেক, শ্রম কমে প্রায় ৩০ শতাংশ, বীজের অপচয়ও কমে। ধান, গম, পাট ও সরিষার চাষিদের জন্য যন্ত্রটি কীভাবে কাজ করে, কোথায় সতর্ক থাকতে হয়, তা নিয়ে এই প্রতিবেদন।

ড্রাম সিডার: কম খরচে, কম সময়ে সারি ধরে বীজ বোনার যন্ত্র
এগ্রোটেক

বোরো বা আমনের মৌসুমে গ্রামের মাঠে একটা চেনা দৃশ্য আছে। বীজতলা থেকে চারা তুলে আঁটি বাঁধা হচ্ছে, মাথায় করে সেই আঁটি নেওয়া হচ্ছে জমিতে, তারপর সারি ধরে কোমর বাঁকিয়ে একটি একটি করে চারা পোঁতা। কাজটা যেমন খাটুনির, তেমনি সময়সাপেক্ষ। আর ঠিক এই সময়েই গ্রামে শ্রমিক পাওয়া যায় না, মজুরিও চড়ে যায়। অনেক কৃষক তাই রোপণের দিন পিছিয়ে দিতে বাধ্য হন, আর দেরিতে রোপণের দাম দিতে হয় ফলনে। এই সমস্যার একটি হাতের কাছের সমাধান হলো ড্রাম সিডার: কয়েকটি ছিদ্রওয়ালা ড্রাম লাগানো একটি হালকা যন্ত্র, যা একজন মানুষ টেনে নিয়ে গেলেই কাদামাটিতে সারি ধরে অঙ্কুরিত বীজ পড়ে যায়।

কৃষিতে উৎপাদন বাড়াতে আধুনিক যন্ত্রপাতির ব্যবহার দিন দিন বাড়ছে। কম্বাইন হারভেস্টার বা রাইস ট্রান্সপ্লান্টারের মতো বড় যন্ত্রের কথা সবাই জানেন, কিন্তু সেগুলোর দাম লাখ লাখ টাকা। ড্রাম সিডার সেই তুলনায় একেবারে সাধারণ, হাতে টানা যন্ত্র। দামে কম, চালাতে জ্বালানি লাগে না, রক্ষণাবেক্ষণের ঝামেলাও নেই বললেই চলে। অথচ জমিতে ঠিক সময়ে, ঠিক নিয়মে বীজ বোনার ক্ষেত্রে এটি কার্যকর একটি উপায়। ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকের জন্য যান্ত্রিক চাষের দুনিয়ায় ঢোকার সবচেয়ে কম খরচের দরজা বলা যায় একে।

যন্ত্রটি দেখতে কেমন, কাজ করে কীভাবে


ড্রাম সিডার মূলত একটি অক্ষদণ্ড বা অ্যাক্সেলের ওপর পাশাপাশি বসানো কয়েকটি ফাঁপা ড্রাম। প্রতিটি ড্রামের গায়ে নির্দিষ্ট দূরত্বে সারি করে ছোট ছোট ছিদ্র থাকে। দুই পাশে থাকে দুটি চাকা, আর সামনে থাকে টানার জন্য একটি হাতল। ড্রামের ভেতরে অঙ্কুরিত বীজ ভরে কাদা করা জমির ওপর দিয়ে যন্ত্রটি টেনে নিলে চাকা ঘোরে, সঙ্গে ড্রামও ঘোরে। ঘোরার সময় ছিদ্র দিয়ে বীজ ঝরে পড়ে মাটিতে, একটি নির্দিষ্ট লাইনে। ফলে জমিতে তৈরি হয় সোজা সারি, প্রতিটি সারির মধ্যে সমান দূরত্ব।

যন্ত্রটির ধারণা প্রথম কাজে লাগে ধানের জন্য। আন্তর্জাতিক ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ইরি) হাতে চালানো ড্রাম ধরনের সারি বপন যন্ত্র তৈরি করেছিল কাদা করা নিচু জমির জন্য। পরে বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি) দেশের মাটি ও চাষের ধরন অনুযায়ী যন্ত্রটিতে পরিবর্তন আনে। ব্রির জ্ঞানভান্ডার বা রাইস নলেজ ব্যাংকে এই পদ্ধতির নাম দেওয়া হয়েছে ভেজা জমিতে সরাসরি বপন। সেখানে বলা হয়েছে, প্রচলিত রোপণের বদলে এ পদ্ধতিতে কাদা করা ভালোভাবে তৈরি জমিতে সরাসরি অঙ্কুরিত বীজ বোনা হয়।

বাজারে সাধারণত চার, ছয় বা আট সারির ড্রাম সিডার পাওয়া যায়। ভারতের কৃষি সম্প্রসারণ বিষয়ক নেটওয়ার্ক এইসা (এগ্রিকালচারাল এক্সটেনশন ইন সাউথ এশিয়া) একটি মাঠ প্রতিবেদনে আট সারির একটি ফাইবারের তৈরি যন্ত্রের কথা লিখেছে। তাদের হিসাবে সারি থেকে সারির দূরত্ব ২০ সেন্টিমিটার, আর একটি সারির মধ্যে এক গোছা থেকে আরেক গোছার দূরত্ব ৫ থেকে ৮ সেন্টিমিটার। হালকা উপকরণে তৈরি বলে যন্ত্রটি টানতে বেশি জোর লাগে না।

রোপণের বদলে সরাসরি বপন: পার্থক্যটা কোথায়


প্রচলিত পদ্ধতিতে ধান চাষ হয় দুই ধাপে। প্রথমে বীজতলায় চারা তৈরি, তারপর ২০ থেকে ৪০ দিন বয়সী সেই চারা তুলে মূল জমিতে রোপণ। এতে বীজতলা তৈরি, পরিচর্যা, চারা তোলা, বহন আর রোপণ, এই প্রতিটি কাজে আলাদা আলাদা শ্রমিক লাগে। ড্রাম সিডার এই পুরো পর্বটাকে বাদ দিয়ে দেয়। বীজ সরাসরি মূল জমিতে পড়ে, সেখানেই গজায়, সেখানেই বড় হয়।

চারা তোলার সময় শিকড় ছিঁড়ে যায়, রোপণের পর গাছকে কয়েক দিন ধকল সামলে নতুন করে শিকড় ছড়াতে হয়। সরাসরি বপনে গাছের এই ধাক্কা লাগে না। এইসার মাঠ প্রতিবেদন অনুযায়ী, এ কারণে ড্রাম সিডারে বোনা ধান রোপণ করা ধানের চেয়ে ৭ থেকে ১০ দিন আগে পাকে। এক সপ্তাহের বেশি আগে ফসল ঘরে তোলা মানে পরের ফসলের জন্য বাড়তি সময় পাওয়া, কিংবা আগাম বন্যা বা ঝড়ের আগে ধান কেটে ফেলার সুযোগ।

সময় আর শ্রমের হিসাব


ড্রাম সিডারের সবচেয়ে বড় সুবিধা সময় ও শ্রমের সাশ্রয়। প্রচলিত পদ্ধতির তুলনায় এতে সময় লাগে প্রায় অর্ধেক, আর শ্রম সাশ্রয় হয় ৩০ শতাংশ পর্যন্ত। দ্রুত এবং সমানভাবে বীজ বোনার জন্য যন্ত্রটি প্রায় নিখুঁত।

এইসার প্রতিবেদনে এর একটি মাঠের হিসাবও দেওয়া আছে। সেখানে দেখা গেছে, একজন মানুষ ড্রাম সিডার টেনে পাঁচ থেকে ছয় ঘণ্টায় এক হেক্টর, অর্থাৎ প্রায় সাড়ে সাত বিঘা জমি বুনে ফেলতে পারেন। একই জমিতে হাতে রোপণ করতে লাগে তিন থেকে চার দিন এবং ৩০ থেকে ৪০ জন শ্রমিক। ড্রাম সিডারে সেই কাজ তিনজন শ্রমিকেই হয়ে যায়। ব্রির রাইস নলেজ ব্যাংক বলছে, এই প্রযুক্তি শ্রমিক সংকটের সমস্যা মোকাবিলায় সাহায্য করে, খরচ কমায় এবং রোপণ করা ধানের চেয়ে ১০ থেকে ১৫ শতাংশ বেশি ফলন দিতে পারে।

বাংলাদেশে এই হিসাবের গুরুত্ব আরও বেশি। শহরমুখী অভিবাসন, পোশাক কারখানা আর বিদেশে কাজের সুযোগের কারণে গ্রামে কৃষিশ্রমিক কমছে। বোরো রোপণ বা আমন রোপণের ভরা মৌসুমে এক দিনের মজুরি অনেক জায়গায় কৃষকের নাগালের বাইরে চলে যায়। যে যন্ত্র তিন দিনের কাজ এক বেলায় শেষ করে, সেটি কৃষকের হাতে সময় এবং টাকা দুটোই ফিরিয়ে দেয়।

বীজ বাঁচে, গাছ বাড়ে সমানভাবে


হাতে ছিটিয়ে বীজ বুনলে কোথাও বীজ পড়ে গাদা হয়ে, কোথাও ফাঁকা থেকে যায়। গাদা জায়গায় গাছগুলো আলো, পানি আর খাবার নিয়ে নিজেদের মধ্যে লড়াই করে, আর ফাঁকা জায়গায় আগাছা জন্মায়। ড্রাম সিডার বীজ সঠিক পরিমাণে এবং নির্দিষ্ট দূরত্বে ফেলে। এতে বীজের অপচয় কমে, আর সঠিকভাবে বোনার কারণে চারার বৃদ্ধিও ভালো হয়।

বীজের পরিমাণে পার্থক্যটা চোখে পড়ার মতো। এইসার প্রতিবেদন অনুযায়ী ড্রাম সিডারে প্রতি হেক্টরে ২৫ থেকে সাড়ে ৩৭ কেজি বীজ লাগে, যেখানে প্রচলিত পদ্ধতিতে লাগে প্রায় ৭৫ কেজি। ব্রির বিজ্ঞানীদের পরিবর্তিত ড্রাম সিডার নিয়ে প্রকাশিত গবেষণায় প্রতি হেক্টরে ৬০ কেজি বীজহারের কথাও এসেছে। সঠিক বীজহার নির্ভর করে ধানের জাত, বীজের আকার এবং ড্রাম কতটা ভরা হচ্ছে তার ওপর। উচ্চফলনশীল জাতের দামি বীজ বা হাইব্রিড বীজ যাঁরা কেনেন, তাঁদের জন্য এই সাশ্রয় সরাসরি টাকার হিসাবে ধরা পড়ে।

সমান দূরত্বে বোনা হলে প্রতিটি গাছ সমানভাবে পুষ্টি পায়। গাছের গোড়ায় বাতাস চলাচল ভালো হয়, রোদ পৌঁছায় নিচ পর্যন্ত। এতে রোগবালাইয়ের চাপ কমে, আর জমিতে ফলনের পরিমাণ ও দানার মান দুটোই বাড়ে।

কম খরচে বেশি উৎপাদন


জমিতে গাছের সংখ্যা ঠিক থাকলে সার, পানি আর কীটনাশক অকারণে নষ্ট হয় না। মাটির গঠন অনুযায়ী ঠিকঠাক বীজ পড়ার ফলে সার, পানি এবং কীটনাশকের ব্যবহার কম হয়। বীজতলার খরচ, চারা তোলা আর রোপণের মজুরি বাদ যায়। সব মিলিয়ে উৎপাদন খরচ কমে যায় এবং লাভের পরিমাণ বাড়ে।

এইসার মাঠের হিসাবে ড্রাম সিডার ব্যবহারে প্রতি হেক্টরে ৯ হাজার থেকে ১৪ হাজার ভারতীয় রুপি পর্যন্ত খরচ কমেছে, আর নিট আয় প্রচলিত পদ্ধতির চেয়ে বেশি হয়েছে। বাংলাদেশের মাঠে এই অঙ্ক হুবহু মিলবে না, কারণ মজুরি, বীজের দাম আর জমির অবস্থা আলাদা। তবে দিকটা একই: শ্রম আর বীজে যা বাঁচে, তা কৃষকের পকেটেই থাকে।

শুধু ধান নয়


ড্রাম সিডার সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয় ধানে, কিন্তু এর ব্যবহার বহুমুখী। ধান, গম, পাট, সরিষাসহ বিভিন্ন ফসলের বীজ বোনার উপযোগী যন্ত্র পাওয়া যায়। ছোট বীজের ফসলে সারি ধরে বপন করলে পরে নিড়ানি দেওয়া, সেচ দেওয়া বা ফসল কাটা, সব কাজই গুছিয়ে করা যায়। ছোট ও বড় দুই ধরনের কৃষিজমিতেই যন্ত্রটি চলে। ছোট জমিতে একজন কৃষক নিজেই টেনে নিতে পারেন, আর বড় খামারে কয়েকটি যন্ত্র একসঙ্গে চালিয়ে অল্প সময়ে অনেক জমি বোনা যায়।

তবে প্রতিটি ফসলের জন্য ড্রামের ছিদ্রের মাপ আলাদা হওয়া দরকার। ধানের জন্য তৈরি ড্রামে সরিষার মতো ছোট বীজ দিলে অনেক বেশি বীজ পড়ে যেতে পারে। তাই কেনার আগে যন্ত্রটি কোন ফসলের জন্য তৈরি, ছিদ্র বদলানো বা বন্ধ করার ব্যবস্থা আছে কি না, সেটা জেনে নেওয়া ভালো।

বীজ তৈরি: অঙ্কুরের মাপই আসল কথা


ড্রাম সিডারে শুকনো বীজ দেওয়া হয় না, দেওয়া হয় অঙ্কুরিত বীজ। বীজ ঠিকমতো তৈরি না হলে যন্ত্র যত ভালোই হোক, ফল ভালো হবে না। ইরির রাইস নলেজ ব্যাংকের পরামর্শ অনুযায়ী ধাপগুলো মোটামুটি এ রকম:

  • প্রথমে ভালো, পুষ্ট ও রোগমুক্ত বীজ বেছে নিন। পানিতে ভাসিয়ে হালকা ও চিটা বীজ সরিয়ে ফেলুন।
  • বীজ ২৪ ঘণ্টা পরিষ্কার পানিতে ভিজিয়ে রাখুন।
  • পানি ঝরিয়ে বীজ চটের বস্তা বা কাপড়ে ঢেকে আরও ২৪ ঘণ্টা রাখুন। এ সময় বীজ থেকে ২ থেকে ৩ মিলিমিটার লম্বা শিকড় বের হবে।
  • বোনার আগে অঙ্কুরিত বীজ ছায়ায় ১০ থেকে ১৫ মিনিট মেলে রাখুন, যাতে বীজগুলো একটি আরেকটির সঙ্গে লেগে না থাকে।
  • ড্রাম পুরো ভরবেন না। গবেষণায় দেখা গেছে, ড্রামের প্রায় এক চতুর্থাংশ ভরলে বীজহার সবচেয়ে উপযোগী হয়।

অঙ্কুর বেশি লম্বা হয়ে গেলে ড্রামের ভেতর ঘষা খেয়ে ভেঙে যায়, ছিদ্রে আটকে যায়। তাই ২৪ ঘণ্টার বেশি ঢেকে রাখা ঠিক নয়। ছোট শিকড়ওয়ালা বীজই ড্রাম সিডারের জন্য সবচেয়ে ভালো।

জমি তৈরি: সমতল আর পানি ঝরানো


ড্রাম সিডারের সাফল্যের অর্ধেকটাই নির্ভর করে জমির ওপর। জমি ভালোভাবে চাষ দিয়ে কাদা করতে হবে, তারপর মই দিয়ে যতটা সম্ভব সমান করতে হবে। কোথাও নিচু থাকলে সেখানে পানি জমে বীজ পচে যাবে, কোথাও উঁচু থাকলে বীজ শুকিয়ে মরবে।

বোনার আগে জমি থেকে জমে থাকা পানি বের করে দিতে হয়। মাটি থাকবে নরম কাদা, কিন্তু ওপরে দাঁড়ানো পানি থাকবে না। জমির চারপাশে এবং মাঝখান দিয়ে সরু নালা কেটে রাখলে বৃষ্টির পানি দ্রুত সরে যায়। বোনার পর দুই থেকে তিন দিন সেচ দেওয়া যাবে না, যাতে শিকড় মাটিতে শক্ত করে বসতে পারে। তারপর গাছ বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ধীরে ধীরে পানির উচ্চতা বাড়াতে হয়, তবে চারা যেন পুরোপুরি ডুবে না যায়। এইসার প্রতিবেদনে কাইচ থোড় আসা পর্যন্ত দুই থেকে তিন দিন পর পর হালকা সেচ, তারপর দুই থেকে তিন সেন্টিমিটার দাঁড়ানো পানি রাখা এবং কাটার ১০ দিন আগে সেচ বন্ধ করার কথা বলা হয়েছে।

মাঠে যন্ত্র চালানোর খুঁটিনাটি


জমি আর বীজ তৈরি হয়ে গেলে আসে আসল কাজ, যন্ত্র টানা। প্রথম সারিটি সোজা হওয়া সবচেয়ে জরুরি, কারণ পরের সব সারি সেটিকেই অনুসরণ করবে। অনেক কৃষক জমির এক আল থেকে আরেক আল পর্যন্ত একটি দড়ি টানটান করে বেঁধে প্রথম সারির দিক ঠিক করে নেন। তারপর যন্ত্রের পাশের চাকার দাগ দেখে পরের সারিগুলো টানা হয়।

যন্ত্র টানতে হয় সমান গতিতে, খুব দ্রুতও নয়, খুব ধীরেও নয়। হঠাৎ জোরে টানলে বা থেমে থেমে চললে কোথাও বীজ বেশি পড়ে, কোথাও কম। জমির শেষ মাথায় ঘোরানোর সময় যন্ত্রটি একটু উঁচু করে ঘোরানো ভালো, তাহলে এক জায়গায় গাদা হয়ে বীজ পড়ে না। কিছুক্ষণ পর পর ড্রামের ভেতরে দেখে নিতে হয় বীজ কমে গেল কি না, আর কোনো ছিদ্র কাদা বা অঙ্কুরে আটকে গেল কি না। ড্রামে বীজ সবসময় প্রায় এক চতুর্থাংশ রাখলে বীজ পড়ার হার মোটামুটি একই থাকে।

বোনার এক সপ্তাহের মধ্যে জমিটা একবার ঘুরে দেখা দরকার। কোথাও বীজ না গজিয়ে ফাঁকা থাকলে সেখানে হাতে কিছু অঙ্কুরিত বীজ বা পাশের ঘন জায়গা থেকে চারা তুলে বসিয়ে দেওয়া যায়। এতে পুরো জমিতে গাছের সংখ্যা ঠিক থাকে।

যান্ত্রিক রাইস ট্রান্সপ্লান্টারের সঙ্গে তুলনা করলে ড্রাম সিডারের সুবিধাটা আরও পরিষ্কার হয়। ট্রান্সপ্লান্টার চালাতে ট্রে বা মাদুরের মতো বিশেষ বীজতলায় চারা তৈরি করতে হয়, যন্ত্রের দাম বেশি, চালাতে জ্বালানি আর দক্ষ চালক লাগে। ড্রাম সিডারে বীজতলারই দরকার নেই, আর যে কৃষক একবার দেখে শিখেছেন, তিনিই যন্ত্রটি চালাতে পারেন।

যন্ত্রের গঠন ও বৈশিষ্ট্য


কৃষকের কাছে ড্রাম সিডারের আকর্ষণ এর গঠনের কারণেই। মূল বৈশিষ্ট্যগুলো হলো:

  • সাদামাটা নকশা: চালানো এবং রক্ষণাবেক্ষণ দুটোই ঝামেলাহীন। কাজ শেষে ধুয়ে শুকিয়ে রাখলেই হয়।
  • টেকসই গঠন: প্লাস্টিক বা ফাইবারের ড্রাম আর ধাতব অক্ষদণ্ডে তৈরি যন্ত্র দীর্ঘদিন টেকে, মজবুতও।
  • বহনযোগ্য: ওজন কম, তাই এক জমি থেকে আরেক জমিতে কাঁধে বা ভ্যানে করে নেওয়া যায়।
  • জ্বালানি খরচ নেই বললেই চলে: হাতে টানা যন্ত্রে তেল লাগে না, খরচও তাই কম।

দামে কম বলে কয়েকজন কৃষক মিলে একটি যন্ত্র কিনে পালা করে ব্যবহার করতে পারেন। অনেক এলাকায় কৃষকদল বা সমবায় এভাবে যন্ত্র ভাগাভাগি করে নেয়।

সাবধান হওয়ার জায়গাগুলো


প্রতিটি প্রযুক্তির মতো ড্রাম সিডারেরও কিছু দুর্বল দিক আছে, আর সেগুলো জেনে রাখলে ক্ষতি এড়ানো যায়।

প্রথম সমস্যা আগাছা। রোপণ করা জমিতে চারা কয়েক সপ্তাহ বড় হয়ে জমিতে যায়, আর দাঁড়ানো পানি আগাছাকে দমিয়ে রাখে। সরাসরি বপনে ধানের চারা আর আগাছা একসঙ্গে গজায়, তাই প্রতিযোগিতা বেশি। ইরি সতর্ক করেছে, ভেজা ও শুকনো দুই ধরনের সরাসরি বপনেই আগাছা খুব বড় সমস্যা। জমি তৈরি দেরি হলে আগাছার চাপ আরও বাড়ে। তবে এখানেই ড্রাম সিডারের সোজা সারি কাজে আসে। সারির মাঝখান দিয়ে হাতে টানা নিড়ানি যন্ত্র বা রোটারি উইডার চালানো যায়, হাতে নিড়ানিও দ্রুত হয়। প্রয়োজন হলে স্থানীয় কৃষি কর্মকর্তার পরামর্শে অনুমোদিত আগাছানাশক ব্যবহার করা যায়।

দ্বিতীয় সমস্যা শামুক, ইঁদুর ও পাখি। ভেজা জমিতে বোনা বীজ আর কচি চারা শামুকের প্রিয় খাবার। পাখি আর ইঁদুরও বীজ খেয়ে জমিতে ফাঁকা করে দিতে পারে। বোনার পর প্রথম কয়েক দিন জমিতে নজর রাখা, নালায় পানি রেখে জমির পানি সরিয়ে রাখা এবং পাখি তাড়ানোর ব্যবস্থা করা এ জন্য জরুরি।

তৃতীয় সমস্যা আবহাওয়া। বোনার ঠিক পরেই ভারী বৃষ্টি হলে বীজ ভেসে যেতে পারে বা জমে থাকা পানিতে পচে যেতে পারে। তাই আবহাওয়ার পূর্বাভাস দেখে বোনার দিন ঠিক করা বুদ্ধিমানের কাজ। নিচু, জলাবদ্ধ জমি যেখানে পানি সরানোর উপায় নেই, সেখানে ড্রাম সিডার ভালো ফল দেয় না।

সরকারি যান্ত্রিকীকরণ উদ্যোগের প্রেক্ষাপট


কৃষিকে যন্ত্রনির্ভর করতে সরকারও উদ্যোগ নিয়েছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (ডিএই) ২০২০ সালের জুলাই থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত মেয়াদে ৩ হাজার ২০ কোটি টাকার সমন্বিত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে কৃষি যান্ত্রিকীকরণ প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে। এই প্রকল্পে কৃষকেরা যন্ত্রের দামের ওপর সাধারণ এলাকায় ৫০ শতাংশ এবং হাওর অঞ্চলে ৭০ শতাংশ পর্যন্ত ভর্তুকি পেয়েছেন। ভর্তুকির তালিকায় কম্বাইন হারভেস্টার, রিপার, রাইস ট্রান্সপ্লান্টার, সিডার ও বেড প্লান্টার, পাওয়ার থ্রেশারসহ নানা যন্ত্র ছিল। তবে বেশির ভাগ বরাদ্দ গেছে বড় যন্ত্রে, বিশেষ করে কম্বাইন হারভেস্টারে।

ড্রাম সিডারের মতো ছোট যন্ত্র এ দিক থেকে আলাদা। এর জন্য বড় বিনিয়োগ বা ভর্তুকির অপেক্ষায় থাকতে হয় না। কোন এলাকায় যন্ত্রটি কোথায় পাওয়া যায়, প্রশিক্ষণ বা প্রদর্শনী প্লট আছে কি না, তা জানতে উপজেলা কৃষি অফিস বা ব্রির আঞ্চলিক কার্যালয়ে যোগাযোগ করা যেতে পারে।

কেন জমিতে ড্রাম সিডার


সব মিলিয়ে কৃষকের জমিতে ড্রাম সিডার ব্যবহারের পক্ষে যুক্তিগুলো দাঁড়ায় এ রকম:

  • সঠিক দূরত্বে বপন নিশ্চিত করে, ফলে জমির উর্বরতার পুরো সুবিধা নেওয়া যায়।
  • বীজ, সার এবং কীটনাশকের অপচয় কমায়।
  • বীজতলা ও রোপণের ধাপ বাদ দেওয়ায় ফসল আগে পাকে, দ্রুত ঘরে তোলার সুযোগ মেলে।
  • পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি: জ্বালানি পোড়ে না, সার ও কীটনাশক কম লাগে, মাটির স্বাস্থ্য রক্ষা পায়।

শেষ দাবিটির পেছনে একটি বাড়তি যুক্তিও আছে। সার ও কীটনাশক কম লাগলে তা পানি আর মাটিতে কম মেশে, জলাশয়ের মাছ আর উপকারী পোকামাকড়ও কম ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আর যেহেতু যন্ত্রটি হাতে চলে, এতে ডিজেল পোড়ানোর প্রশ্নই নেই।

ছোট যন্ত্রে বড় পরিবর্তনের সম্ভাবনা


ড্রাম সিডার শুধু কৃষকের কাজের চাপ কমাচ্ছে না, লাভের পথও খুলে দিচ্ছে। প্রযুক্তিনির্ভর চাষাবাদ কৃষি খাতকে আরও আধুনিক, লাভজনক এবং টেকসই করে তুলছে, আর সেই পরিবর্তনের সবচেয়ে সাশ্রয়ী উদাহরণগুলোর একটি এই হাতে টানা যন্ত্র। কম খরচে বেশি ফলনের একটি আধুনিক উপায় হিসেবে এটি প্রান্তিক কৃষকের নাগালের মধ্যেই আছে।

তবে যন্ত্র কিনলেই কাজ শেষ হয় না। প্রথম মৌসুমে ছোট একটি জমিতে পরীক্ষা করে দেখা, বীজ অঙ্কুরিত করার কৌশল হাতে-কলমে শেখা, জমি সমান করা আর আগাছা দমনের পরিকল্পনা আগে থেকে করে রাখা, এগুলোই ঠিক করে দেবে ফল কেমন হবে। যে কৃষক এই ধাপগুলো মেনে চলবেন, তাঁর জমিতে সারি সারি সবুজ ধানগাছ দেখেই প্রতিবেশীরা জানতে চাইবেন, যন্ত্রটা কোথায় পাওয়া যায়।

মাঠে এখন যাঁরা ড্রাম সিডার ব্যবহার করছেন, তাঁদের অভিজ্ঞতা থেকে শেখার সুযোগও আছে। উপজেলা কৃষি অফিসের মাঠ দিবস বা প্রদর্শনী প্লট ঘুরে দেখলে বোঝা যায়, কোন জাতে, কোন মৌসুমে, কোন ধরনের জমিতে যন্ত্রটি সবচেয়ে ভালো চলে। প্রযুক্তি যত সাধারণই হোক, নিজের জমির বাস্তবতায় তাকে মানিয়ে নেওয়ার কাজটা কৃষকেরই। মাঠ দিবসে অন্য কৃষকের সঙ্গে কথা বললে জানা যায়, প্রথম মৌসুমে তাঁরা কোথায় ভুল করেছিলেন, কোন জমিতে শামুক বেশি লেগেছিল, কোন জাতের বীজ ড্রাম থেকে সবচেয়ে ভালোভাবে পড়েছে। এই অভিজ্ঞতাগুলো কোনো বইয়ে লেখা থাকে না, অথচ নতুন কৃষকের জন্য এগুলোর দাম অনেক। একজনের সাফল্য দেখে পাশের জমির কৃষকও যখন যন্ত্রটি হাতে নেন, তখনই একটি প্রযুক্তি সত্যিকার অর্থে গ্রামে শিকড় গাড়ে।

ছবি: ড্রাম সিডারে বোনার জন্য অঙ্কুরিত ধানের বীজ, Prajna Prabhu / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)

তানিয়া চৌধুরীদা এগ্রো নিউজ

এগ্রোটেক

সম্পর্কিত খবর

এগ্রোটেক

নিজে চলে খামারঘর ধোয়া-জীবাণুমুক্ত করবে রোবট, কানাডার শূকর খামারে আসছে

নেদারল্যান্ডসের এমএস শিপারসের স্মার্ট ক্লিনিং রোবট একবারে ফোম দেওয়া, উচ্চচাপে ধোয়া ও জীবাণুনাশ করে। থ্রিডি লিডার সেন্সরে পথ চিনে নেয় বলে আগে থেকে প্রোগ্রাম করতে হয় না।

Farms.com২ অক্টোবর ২০২৬২ মিনিটের পড়া
এগ্রোবিজ

কানাডায় খামার ও কৃষিপ্রযুক্তির বিনিয়োগে পুরো খরচ একবারে করছাড়

প্রোডাক্টিভিটি মেগা ডিডাকশন নামের নতুন কর সুবিধায় তাৎক্ষণিক খরচ হিসেবে বাদ দেওয়া যাবে এমন সম্পদের ভাগ প্রায় ১৫ থেকে বেড়ে ৬৫ শতাংশের বেশি হচ্ছে, যার মধ্যে আছে গ্রিনহাউস, সফটওয়্যার, যানবাহন ও গবেষণা।

Farms.com২ অক্টোবর ২০২৬২ মিনিটের পড়া
এগ্রোবিজ

বাজেট চাপের মধ্যে কৃষি গবেষণা দ্রুত মাঠে পৌঁছাতে চায় ইউরোপীয় ইউনিয়ন

ব্রাসেলসে এগ্রি ২০৪০ সম্মেলনে ইউরোপীয় কর্মকর্তা ও কৃষকেরা বলেছেন, কৃষি গবেষণাকে আরও দ্রুত খামারে পৌঁছাতে হবে: কম আমলাতন্ত্র, বেশি অংশীদারত্ব আর নতুন পণ্যের চাহিদা তৈরি করে।

এজিফান্ডনিউজ২ অক্টোবর ২০২৬৩ মিনিটের পড়া

মন্তব্য

(০)