সরাসরিবাজারদর
আটা (প্যাকেটজাত)৫৮—আদা - আমদানিকৃত১৬৭—আদা - দেশী১৫৪—আমন চাল - মাঝারি৫৬—আমন চাল - মোটা৪৮—আমন চাল - সরু৭২—আয়োডিনযুক্ত লবণ (প্যাকেটজাত)৩২—কাঁচা মরিচ২১৮—খামারের মুরগী১৬২—খাসী৯০০—চিনি (দেশী)১৩২—ছোলা - গোটা৮৫—ডিম ফার্ম - লাল৪৭—পেঁয়াজ - দেশী৬০—বোরো চাল - মাঝারি৫৫—বোরো চাল - মোটা৪৭—বোরো চাল - সরু৬৬—মাংসঃ– গরু৭২৯—মুগ ডাল১২২—রসুন - আমদানিকৃত১৯২—রসুন - দেশী১৭৩—সয়াবিন তেল১৬৩—
হালনাগাদ ২ অক্টোবর ২০২৬
ঢাকা৩৩°মূলত পরিষ্কারআর্দ্রতা ৫০%বাতাস ৮ কিমি/ঘ

দেশি সুস্বাদু ও লাভজনক শিং মাছের চাষ: সঠিক পদ্ধতিতে বেশি লাভ

বাজারে সারা বছর চাহিদা, অল্প জায়গায় চাষ, খাবারও লাগে কম। বন্যামুক্ত মজবুত পাড়ের পুকুর, প্রতি শতাংশে ৫০০ থেকে ১,০০০ পোনা, ৩২ শতাংশ প্রোটিনের খাবার আর নিয়মিত পরিচর্যায় ছয়-সাত মাসে প্রতিটি শিং হয় ৬০ থেকে ৭০ গ্রাম। পুকুর বাছাই থেকে মাছ ধরা পর্যন্ত পুরো পদ্ধতি।

দেশি সুস্বাদু ও লাভজনক শিং মাছের চাষ: সঠিক পদ্ধতিতে বেশি লাভ
মৎস্য

বাজারে মাছের সারিতে জ্যান্ত শিং দেখলে ক্রেতার চোখ আটকে যায়। দাম অন্য অনেক মাছের চেয়ে বেশি, তবু চাহিদা কমে না। অসুস্থ মানুষের পথ্য হিসেবে যেমন এর কদর, সুস্থ মানুষের পাতেও তেমনি প্রিয়। এই চাহিদার কারণেই শিং মাছের চাষ এখন বাংলাদেশের জনপ্রিয় ও লাভজনক একটি উদ্যোগ। সঠিক পদ্ধতি, যত্ন এবং আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারে শিং মাছের উৎপাদন লাভজনক করে তোলা যায়, আর নিয়ম মেনে শুরু করলে এটি হতে পারে একটি পরিবারের আয়ের অন্যতম প্রধান উৎস।

খালবিলের মাছ থেকে পুকুরের ফসল


দেশি শিং বা জিয়ল মাছ একসময় আমাদের খালবিলে প্রচুর পাওয়া যেত। বর্ষার পানি নেমে গেলে ডোবা-নালার কাদায় হাত দিলেই শিং উঠে আসত। বিভিন্ন কারণে সেই প্রাচুর্য আর নেই। আগে শিং মাছ পুকুরে চাষ করা হতো না, প্রকৃতি থেকে ধরাই ছিল একমাত্র উৎস। ফলে প্রাকৃতিক আবাস কমে আসার সঙ্গে সঙ্গে মাছটি প্রায় বিলুপ্তির পথে চলে গিয়েছিল।

পরিস্থিতি বদলেছে কৃত্রিম প্রজননের মাধ্যমে। হ্যাচারিতে মা-মাছকে হরমোন ইনজেকশন দিয়ে ডিম ছাড়ানো এবং সেই ডিম থেকে পোনা উৎপাদনের কৌশল দেশের মৎস্য খামারিরা আয়ত্ত করেছেন। যশোর অঞ্চলের হ্যাচারি নিয়ে প্রকাশিত গবেষণায় দেখা যায়, সেখানে পিটুইটারি গ্রন্থির নির্যাস দিয়ে শিংয়ের প্রজনন করানো হয়। এভাবে পোনা উৎপাদন করে খামারিরা শিং মাছকে বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষা করতে পেরেছেন।

ময়মনসিংহের ত্রিশাল উপজেলার ধলা এলাকা এর বড় উদাহরণ। এগ্রিকেয়ার ডেস্কের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সেখানকার মাছচাষিরা দেশি শিং চাষ করে আর্থিক সচ্ছলতা অর্জন করেছেন। এক শতাংশের ছোট একটি পুকুরে শিং চাষ করে প্রতি ছয় মাসে ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকা আয়ের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন তাঁরা। মাছ চাষকে কেন্দ্র করে ধলায় গড়ে উঠেছে ৩৫টি মৎস্য হ্যাচারি। অন্তত ৫০০ পরিবার সরাসরি মাছ চাষের সঙ্গে জড়িত, আর কর্মসংস্থান হয়েছে প্রায় ১০ হাজার মানুষের।

তাঁদের সাফল্য দেখে অন্য এলাকার আগ্রহী চাষিদের জন্যও পথ খুলেছে, লাভজনক হওয়ায় দিন দিন বাড়ছে এ মাছ চাষের ব্যাপকতা। গ্রামে গ্রামে যেসব ছোট দেশি পুকুর বা পরিত্যক্ত ডোবা পড়ে আছে, সেগুলো শিং চাষের আওতায় আনা গেলে এই মাছের উৎপাদনে সত্যিকারের বিপ্লব ঘটানো সম্ভব।

কেন শিং


শিং মাছের কিছু বৈশিষ্ট্য একে ছোট চাষিদের জন্য বিশেষভাবে উপযোগী করেছে। মাছটির ফুলকার পেছন থেকে দেহের দুই পাশ বরাবর একজোড়া লম্বা বায়ুথলি থাকে, যা দিয়ে সে সরাসরি বাতাস থেকে শ্বাস নিতে পারে। এ কারণেই অক্সিজেন কম থাকা ডোবা, জলাশয় বা শুকিয়ে আসা নালাতেও শিং টিকে থাকে, যেখানে রুই-কাতলা বাঁচতে পারে না।

চাষের দিক থেকে শিংয়ের সুবিধাগুলো এরকম:

  • উচ্চ বাজারমূল্য: দেশি শিং সব সময় চাহিদাসম্পন্ন এবং বাজারে ভালো দাম পায়।
  • অল্প জায়গায় চাষ: ডোবা, ছোট পরিত্যক্ত পুকুর এবং পরিকল্পিত পুকুর, সবখানেই চাষ করা যায়।
  • কম খাবারে টিকে থাকা: অন্যান্য মাছের তুলনায় কম খাদ্যে বাঁচে এবং সাধারণ প্রতিকূল অবস্থা কাটিয়ে উঠতে পারে।
  • পুষ্টিগুণ: শিং মাছ প্রোটিনসহ নানা পুষ্টি উপাদানে ভরপুর।
  • পোনার নিশ্চয়তা: হ্যাচারিতে পোনা উৎপাদন করা যায়, আর মাছটি সম্পূরক খাবারে দ্রুত অভ্যস্ত হয়।
  • চাষের ধরন: এককভাবে এবং অন্য মাছের সঙ্গে মিশ্রভাবে, দুইভাবেই চাষ করা যায়।
  • দ্রুত ফলন: সঠিক খাদ্য ও যত্নে অল্প সময়ে বিক্রয়যোগ্য আকার পায়।

পুকুর বাছাই: পাড়ই আসল পাহারাদার


শিং চাষে পুকুর বাছাইয়ের সময় কয়েকটি দিক বিশেষভাবে খেয়াল রাখতে হয়। এই মাছ বর্ষার রাতে পাড় বেয়ে, এমনকি ভেজা মাটির ওপর দিয়েও অন্য জলাশয়ে চলে যেতে পারে। তাই পুকুরের গঠন এখানে অন্য মাছের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

  • পুকুর অবশ্যই বন্যামুক্ত হতে হবে।
  • পুকুরের পাড় মজবুত হতে হবে। পাড়ে কোনো ধরনের ছিদ্র থাকলে সেই পথে সব শিং মাছ বেরিয়ে যাবে।
  • বর্ষাকালে বৃষ্টির সময়ও পানির উচ্চতা ৪ ফুটের বেশি হবে না, এমন পুকুর বেছে নিতে হবে।
  • চাষের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, আয়তাকার পুকুরে ভালো ফল পাওয়া যায়। একই হারে খাদ্য ও ব্যবস্থাপনায় বর্গাকার পুকুরের চেয়ে আয়তাকার পুকুরে কমপক্ষে ১০ ভাগ বেশি উৎপাদন হয়।
  • পুকুরের আয়তন ৩০ থেকে ৫০ শতাংশের মধ্যে হওয়া ভালো, এবং পুকুরের এক প্রান্ত অন্য প্রান্তের চেয়ে ১ ফুট ঢালু রাখতে হবে, যাতে পানি নিষ্কাশন ও মাছ ধরা সুবিধাজনক হয়।

শেষ বিষয়টি, অর্থাৎ ঢালের গুরুত্ব, মাছ ধরার সময় সবচেয়ে ভালো বোঝা যায়। সে প্রসঙ্গে পরে আসা যাবে।

পুকুর প্রস্তুতি


সাধারণত ৩০ থেকে ৫০ শতাংশের পুকুর শিং চাষের জন্য বেশি উপযোগী, তবে এক একরের পুকুরেও চাষ করা যায়। প্রথম কাজ হলো সেচ দিয়ে পুকুরের পানি শুকিয়ে তলদেশে রোদ লাগানো। এতে তলার ক্ষতিকর জীবাণু ও গ্যাস অনেকটা দূর হয়। নতুন করে পাড় কাটা পুকুর হলে এই সময়েই নিজেদের পছন্দমতো আকার ও ঢাল দিয়ে পুকুর তৈরি করে নেওয়া যায়।

পুকুর শুকানো সম্ভব না হলে পানিভর্তি অবস্থাতেই রোটেনন প্রয়োগ করে অবাঞ্ছিত ও রাক্ষুসে মাছ দূর করতে হয়। শোল, টাকি বা বোয়ালের মতো রাক্ষুসে মাছ থেকে গেলে ছোট শিং পোনা তাদের খাবার হয়ে যায়।

এরপর প্রতি শতাংশে এক কেজি হারে চুন প্রয়োগের মধ্য দিয়ে মূল প্রস্তুতি শুরু হয়। চুন পানির অম্লতা ঠিক রাখে এবং জীবাণু কমায়। মূল প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চুন দেওয়ার পর প্রতি শতাংশে ২৫০ গ্রাম দানাদার পণ্য (শিং ব্রাইট গোল্ড নামে বাজারে পরিচিত) প্রয়োগ করলে পানির রং স্থির থাকে। এরপর প্রতি শতাংশে পাঁচ কেজি গোবর, ১০০ গ্রাম ইউরিয়া এবং ৫০ গ্রাম টিএসপি একসঙ্গে গুলে পুকুরে ছিটিয়ে দিতে হবে। এই সারে পানিতে প্রাকৃতিক খাবার, অর্থাৎ ক্ষুদ্র উদ্ভিদ ও প্রাণিকণা জন্মায়। সার প্রয়োগের পাঁচ থেকে ছয় দিন পর ২ থেকে ৩ ইঞ্চি আকারের শিং পোনা মজুদ করা যায়।

পোনা মজুদ: প্রথম সপ্তাহটাই সবচেয়ে ঝুঁকির


পুকুর প্রস্তুত হলে ভালো মানের পোনা উৎপাদনকারী হ্যাচারি থেকে প্রায় ২ ইঞ্চি আকারের পোনা এনে ছাড়তে হবে। পোনা উৎপাদনের প্রযুক্তি এখন দেশে বেশ প্রচলিত হওয়ায় অনেক হ্যাচারিই শিংয়ের পোনা তৈরি করে। কিন্তু পোনা কীভাবে মজুদ করলে মৃত্যুহার কম হবে এবং আনুষঙ্গিক ব্যবস্থাপনা কী হবে, তা অধিকাংশ হ্যাচারি না জানায় মজুদের পর ব্যাপক হারে মড়ক দেখা দেয়।

করণীয় হলো তিন ধাপে পোনাকে সুরক্ষা দেওয়া। প্রথমত, হ্যাচারিতে পোনা তোলার পর কন্ডিশনিং করে, অর্থাৎ কিছু সময় পরিষ্কার পানিতে রেখে ধকল কাটিয়ে, ছত্রাকরোধী ওষুধে গোসল দিয়ে তারপর সরবরাহ করতে হবে। দ্বিতীয়ত, পরিবহনের পর আবার ছত্রাকরোধী ওষুধে গোসল দিয়ে পুকুরে ছাড়তে হবে। তা না হলে পুকুরে ছাড়ার পর পোনা ক্ষতরোগে আক্রান্ত হতে পারে। তৃতীয়ত, পুকুরে ছাড়ার ২ থেকে ৩ দিন পর একই ধরনের ওষুধ দিয়ে আবার চিকিৎসা দিতে হবে। এভাবে চললে মজুদের পর পোনায় রোগবালাই দেখা দেওয়ার আশঙ্কা অনেক কমে যায়।

হ্যাচারি থেকে আনা খুব ছোট পোনা সরাসরি চাষের পুকুরে না দিয়ে আলাদা নার্সারি পুকুরে লালন করে ২ থেকে ৩ ইঞ্চি হলে তারপর চাষের পুকুরে দেওয়া উত্তম। নার্সিংয়ের সময় ২ থেকে ২.৫ ফুট পানিই যথেষ্ট।

কত পোনা ছাড়বেন


একক চাষে প্রতি শতাংশে ৫০০ থেকে ১,০০০টি শিং পোনা ছাড়া যায়। সংখ্যাটা বেশ বড়, তাই পোনা ছাড়ার আগে ও পরে পুকুরের পানির গুণাগুণ রক্ষা করা জরুরি। পানি বদলানোর সুযোগ না থাকলে পোনা কম ছাড়াই ভালো। ঘনত্ব যত বেশি, পানির মান নষ্ট হওয়ার ঝুঁকিও তত বেশি।

মিশ্র চাষে মাগুর ও কৈ মাছের সঙ্গেও শিং ভালো হয়। এই তিনটি মাছই বাতাস থেকে শ্বাস নিতে পারে এবং তুলনামূলক কম পানিতে টিকে থাকে, তাই একসঙ্গে ভালো মানায়। তবে যেকোনো ক্ষেত্রেই মানসম্পন্ন, স্বাস্থ্যবান পোনা অপরিহার্য।

খাবার: প্রোটিনে কার্পণ্য নয়


শিং মাছ পুকুরের তলদেশের জলজ কীট খেয়ে থাকে, কিন্তু লাভজনক চাষের জন্য মানসম্মত সম্পূরক খাবার অপরিহার্য। খাবারে কমপক্ষে ৩২ শতাংশ প্রোটিন থাকতে হবে। কারখানায় তৈরি মানসম্মত খাবার সবচেয়ে ভালো। মানসম্মত ভাসমান খাবার দিয়েও শিং চাষ করা যায়, আর এর একটা বাড়তি সুবিধা আছে: খাবার পানির ওপর ভেসে থাকে বলে অখাওয়া অংশ তলায় জমে পচে না, তলদেশের পরিবেশ স্বাস্থ্যকর থাকে।

পোনা ছাড়ার পর থেকে নিয়মিত ও পরিমিত খাবার দিতে হবে। দিনের মোট খাবার দুই থেকে তিনবারে ভাগ করে দেওয়া ভালো। নিজেরা খাবার তৈরি করলে প্রাণিজ প্রোটিন হিসেবে মিট অ্যান্ড বোন মিলের বদলে ভালো মানের ফিশমিল ব্যবহার করা আবশ্যক। মূল প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, খাবারের সঙ্গে হজমসহায়ক এনজাইম (বায়োজাইম) এবং বৃদ্ধিসহায়ক উপাদান (র‌্যাপিড গ্রো) মেশালে ভালো ফল পাওয়া যায়। সার কথা হলো, মানসম্মত খাবার ছাড়া শিং চাষ লাভবান হয় না।

খাবারের পরিমাণ ঠিক রাখার একটি ব্যবহারিক কৌশল হলো পুকুরের নির্দিষ্ট কয়েকটি জায়গায় খাবার দেওয়া এবং কিছু সময় পর দেখে নেওয়া, খাবার শেষ হয়েছে কি না। প্রতিবার খাবার অবশিষ্ট থাকলে বুঝতে হবে পরিমাণ বেশি হচ্ছে, পরের বেলায় কমাতে হবে। মেঘলা দিন বা হঠাৎ ঠান্ডা পড়লে মাছের খাওয়া কমে যায়, তখনও খাবার কম দেওয়াই নিরাপদ। প্রতিদিন কত খাবার দেওয়া হলো, একটি খাতায় লিখে রাখলে মাস শেষে খরচ ও বৃদ্ধির হিসাব মেলানো সুবিধাজনক হয়।

কখন শুরু, কত দিনে বিক্রি


এপ্রিল-মে মাস থেকে শিং চাষ শুরু করা যায়। যাঁরা আগের বছরের শেষ দিকে নার্সারিতে পোনা রেখে দেন, তাঁরা ফেব্রুয়ারির শেষ থেকেই পরিকল্পিত চাষ শুরু করতে পারেন। তবে প্রতিবছর মে-জুন মাস থেকে পোনা পাওয়া সবচেয়ে সুবিধাজনক হয়।

মানসম্মত পোনা, সুষম খাবার এবং আদর্শ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা গেলে ছয় থেকে সাত মাসে প্রতিটি শিং মাছ ৬০ থেকে ৭০ গ্রাম ওজনের হয়। এই সময়ে নিয়মিত পানির গুণাগুণ আদর্শ মাত্রায় রাখা গেলে আরও ভালো ফল আশা করা যায়।

পানি ও পুকুরের যত্ন


শিং চাষে খুব বেশি পানি দরকার হয় না। নার্সিংয়ের সময় ২ থেকে ২.৫ ফুট এবং পরে ৩ থেকে ৩.৫ ফুট পানিতেই শিং চাষ করা যায়। কিন্তু পানির পরিমাণ কম লাগলেও মান নিয়ে আপস চলে না। পুকুরের পানির গুণাগুণ আর তলদেশের পরিবেশের সঙ্গে শিং মাছের বৃদ্ধির সরাসরি সম্পর্ক আছে।

মূল প্রতিবেদনের পরামর্শ অনুযায়ী, মাসে একবার প্রোবায়োটিকযুক্ত পণ্য (অ্যাকোয়া ম্যাজিক প্লাস) প্রয়োগ করলে তলদেশ ও পানির মান ধরে রাখতে সুবিধা হয়। প্রোবায়োটিক হলো উপকারী জীবাণু, যা তলার জৈব বর্জ্য ভাঙতে সাহায্য করে।

আরেকটি পুরোনো কৌশল হলো পুকুরের ভেতরে বা এক পাশে বাঁশের বেষ্টনী দিয়ে কিছু কচুরিপানা রাখা। এতে পানির পরিবেশ শিং মাছের জন্য উপযোগী হয়; কচুরিপানার শিকড়ের নিচে মাছ ছায়া ও আশ্রয় পায়। বেষ্টনী থাকায় কচুরিপানা পুরো পুকুর ঢেকে ফেলতে পারে না।

রোগবালাই ও অ্যামোনিয়া


কখনো কখনো পোনার ত্বক ও ঠোঁটে তুলার মতো সাদা দাগ দেখা দেয়। সেপ্রোলেগনিয়া নামের একটি ছত্রাক এর জন্য দায়ী। মূল প্রতিবেদন অনুযায়ী, এ ক্ষেত্রে প্রতি একরে প্রতি ৩ ফুট পানির জন্য ৫০০ থেকে ৬০০ মিলিলিটার পলগার্ড প্লাস পরপর দুই দিন দুই ডোজ ব্যবহার করলে সুফল পাওয়া যায়। ফরমালিন বা ম্যালাকাইট গ্রিন দিয়েও চিকিৎসা করা যায়, তবে ম্যালাকাইট গ্রিন খাদ্য মাছে ব্যবহার অনেক দেশে নিষিদ্ধ, তাই এর ব্যবহার নিয়ে উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তার পরামর্শ নেওয়া জরুরি। পরজীবী বা প্রোটোজোয়ার আক্রমণ হলে উপযুক্ত পরজীবীনাশক প্রয়োগে ভালো ফল মেলে।

শিং চাষের সবচেয়ে বড় শত্রু অবশ্য কোনো জীবাণু নয়, অ্যামোনিয়া গ্যাস। বেশি খাবার দিলে বা পুকুরে জৈব পদার্থ পচলে পানিতে অ্যামোনিয়ার মাত্রা বেড়ে যায়, আর তখন খুব দ্রুত মাছ মারা যেতে পারে। মূল প্রতিবেদন অনুযায়ী, এ সমস্যায় প্রতি একরে ৩০০ থেকে ৪০০ গ্রাম গ্যাসোনেক্স প্লাস বালির সঙ্গে মিশিয়ে সারা পুকুরে ছিটিয়ে দিলে তাৎক্ষণিক সুফল পাওয়া যায়। সঙ্গে পানি বদলাতে পারলে আরও ভালো। এ কারণেই খাবারের মাপ নিয়ন্ত্রণে রাখা এত জরুরি: অতিরিক্ত খাবার লাভ বাড়ায় না, বিপদ বাড়ায়।

রোগ প্রতিরোধের জন্য চাষের দ্বিতীয় মাস থেকে একটি মাসিক রুটিন মেনে চলার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে: প্রতি মাসের প্রথম সপ্তাহে পলগার্ড প্লাস অথবা পন্ড সেফ, দ্বিতীয় সপ্তাহে গ্যাসোনেক্স প্লাস এবং তৃতীয় সপ্তাহে অ্যাকোয়া ম্যাজিক প্লাস। এর পাশাপাশি মাঝে মাঝে জাল ফেলে মাছের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা আবশ্যক। যেকোনো ওষুধের মাত্রা প্যাকেটের নির্দেশনা ও স্থানীয় মৎস্য অফিসের পরামর্শ মিলিয়ে ঠিক করাই নিরাপদ।

মাছ ধরা: ভোরের কাজ, সাবধানের কাজ


অন্য মাছ জাল টেনে ধরা গেলেও শিং মাছ জাল টেনে ধরা যায় না; কাদায় ঢুকে জালের নিচ দিয়ে বেরিয়ে যায়। শিং ধরতে হলে শেষ রাতের দিকে সেচ দিয়ে পুকুর শুকিয়ে ফেলতে হয়। মাছ ধরার সবচেয়ে ভালো সময় ভোর থেকে সকাল ৮টা পর্যন্ত। রোদ উঠে গেলে ধরলে মাছ মারা যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।

এক দিনে সব মাছ ধরা না গেলে শ্যালো পাম্প দিয়ে কমপক্ষে ২ ফুট ঠান্ডা পানি দিয়ে পুকুর আবার ভরে রাখতে হয়, পরদিন একই নিয়মে আবার ধরা হয়। ধরার কৌশলটিও একটু আলাদা: এক হাতে নুডলসের প্লাস্টিকের ছাঁকনি, অন্য হাতে স্টিলের ছোট গামলা নিয়ে মাছ তুলে প্লাস্টিকের বড় পাত্রে রাখতে হয়, তারপর মাছগুলো হাপায়, অর্থাৎ পানিতে টানানো সূক্ষ্ম জালের খাঁচায় ছাড়তে হয়।

এখানেই পুকুরের ঢালের গুরুত্ব। পুকুর এক পাশে ঢালু থাকলে সেচ দেওয়ার পর সব মাছ নিচু দিকটায় চলে আসে। ঢাল না থাকলে মাছ পুরো পুকুরজুড়ে কাদায় ছড়িয়ে থাকে, আর ধরতে খুব সমস্যা হয়।

শিং ধরার সময় সাবধান থাকা দরকার। মাছটির বুকের পাখনার কাঁটার গোড়ায় বিষগ্রন্থি থাকে, তাই কাঁটা বিঁধলে সেখানে প্রচণ্ড ব্যথা হয়। বিঁধে যাওয়া জায়গায় ব্যথানাশক মলম লাগিয়ে গরম পানির সেঁক দিলে সঙ্গে সঙ্গে কিছুটা উপশম হয়। মলম লাগিয়ে গরম বালির সেঁক দিলেও আরাম পাওয়া যায়। তাই মাছ ধরার আগে এমন ব্যবস্থা হাতের কাছে রাখা ভালো, যদিও একটু সাবধান থাকলে এসবের দরকারই পড়ে না।

বিক্রির সময়ও শিংয়ের বায়ুথলি চাষির কাজে আসে। বাতাস থেকে শ্বাস নিতে পারে বলে সামান্য পানিতেই মাছটি দীর্ঘ সময় জ্যান্ত থাকে, আর বাজারে জ্যান্ত শিংয়ের দামই সবচেয়ে বেশি। তাই ধরার পর হাপায় রেখে মাছকে ধকল কাটাতে দেওয়া, তারপর অল্প পানিসহ পাত্রে করে বাজারে পাঠানো ভালো। মরা বা আঘাত পাওয়া মাছের দাম অনেক কমে যায়, তাই ধরা ও পরিবহনের পুরো সময়টাই যত্নের সঙ্গে সামলাতে হয়।

উৎপাদন ও আয়-ব্যয়ের হিসাব


শিং বাজারের একটি দামি মাছ। চিকিৎসকেরা নানা রোগীর পথ্য হিসেবে শিং খাওয়ার পরামর্শ দেন, আর লোকমুখে প্রচলিত কথা আছে, শিং মাছ খেলে শরীরে দ্রুত রক্ত বাড়ে। মূল প্রতিবেদনের হিসাবে, এখানে বর্ণিত পদ্ধতিতে চাষ করলে ১০ মাসে এক একরে প্রায় ৪ টন শিং উৎপাদন সম্ভব, যা চাষির আর্থিক অবস্থার উন্নতির পাশাপাশি মাছটিকেও বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষা করবে।

প্রতিবেদনে এক হেক্টর পুকুরে শিং ও মাগুরের মিশ্র চাষের একটি বার্ষিক আয়-ব্যয়ের হিসাবও দেওয়া হয়েছে। ব্যয়ের খাতগুলো এরকম:

  • পুকুর শুকানো বা মাছ মারার ওষুধ: ৪,০০০ টাকা
  • চুন ২৫০ কেজি: ২,০০০ টাকা
  • জৈব সার ২,০০০ কেজি: ২,০০০ টাকা
  • ইউরিয়া ২৫০ কেজি: ২,০০০ টাকা
  • টিএসপি ১২৫ কেজি: ১,৮৭৫ টাকা
  • এমপি ১০০ কেজি: ৭০০ টাকা
  • সম্পূরক খাদ্য ৩,৬০০ কেজি: ৫৪,০০০ টাকা
  • ৪ থেকে ৬ সেন্টিমিটার আকারের ২৫,০০০ পোনা: ৩৭,০০০ টাকা
  • ওষুধ ও রাসায়নিক: ১,০০০ টাকা
  • মাছ আহরণ ও বাজারজাতকরণ: ৪,৫০০ টাকা
  • বিবিধ: ১,৪০০ টাকা

সব মিলিয়ে মোট ব্যয় ১,১০,৪৭৫ টাকা। পুকুর ভাড়া নিয়ে এবং ব্যাংক ঋণ নিয়ে চাষ করলে আরও ২৮,০০০ টাকা বেশি খরচ হবে। উৎপাদন ধরা হয়েছে ১,৮০০ কেজি মাছ, প্রতি কেজি ১২৫ টাকা দরে যার বিক্রয়মূল্য ২,২৫,০০০ টাকা। ফলে মুনাফা দাঁড়ায় ২,২৫,০০০ থেকে ১,১০,৪৭৫ বাদ দিয়ে ১,১৪,৫২৫ টাকা।

এই হিসাব পড়ার সময় একটি বিষয় মনে রাখা দরকার। টাকার অঙ্কগুলো আগের একটি সময়ের বাজারদরে তৈরি; খাবার, পোনা, সার ও মাছের দাম এখন অনেক বদলেছে। তাই প্রতিবেদনেও বলা হয়েছে, হিসাবগুলো সময়ের সঙ্গে মিলিয়ে নিতে হবে। নিজের এলাকার বর্তমান দর বসিয়ে নতুন করে হিসাব কষে নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ। হিসাবটির আসল শিক্ষা হলো অনুপাতে: মোট খরচের প্রায় অর্ধেক যায় খাবারে, আর এক-তৃতীয়াংশের বেশি পোনায়। খাবারের অপচয় কমানো এবং ভালো পোনা বেছে মৃত্যুহার কমানোই তাই লাভ বাড়ানোর মূল চাবি।

ছোট পুকুরে বড় সম্ভাবনা


শিং চাষ এখন সত্যিকার অর্থেই লাভজনক একটি উদ্যোগ। দেশের স্থানীয় বাজারে এর বিপুল চাহিদা, আর রপ্তানির সম্ভাবনাও বেশ ভালো। সঠিক পরিকল্পনা ও পরিচর্যায় এই চাষ একজন চাষির জন্য আর্থিক সাফল্যের দরজা খুলে দিতে পারে। নতুন চাষিদের জন্য ভালো পথ হলো প্রথম মৌসুমে ছোট পুকুরে, পরিমিত সংখ্যক পোনা দিয়ে শুরু করা এবং শুরুর আগেই উপজেলা মৎস্য অফিসে গিয়ে পরামর্শ ও প্রশিক্ষণের খোঁজ নেওয়া। প্রথম বছরের অভিজ্ঞতা থেকেই বোঝা যায়, পরের বছর কতটা বড় পরিসরে যাওয়া সম্ভব।

বাড়ির পাশে যে ডোবাটা বছরের পর বছর কচুরিপানায় ঢাকা পড়ে আছে, মজবুত পাড়, পরিষ্কার পানি, ভালো পোনা আর মানসম্মত খাবারের ব্যবস্থা করলে সেটিই হয়ে উঠতে পারে পরিবারের আয়ের নির্ভরযোগ্য উৎস। ধলার চাষিরা সেই পথ দেখিয়েছেন।

ছবি: দেশি শিং মাছ (Heteropneustes fossilis), দিব্য দত্ত (Dibya Dutta) / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)

তানিয়া চৌধুরীদা এগ্রো নিউজ

মৎস্য

সম্পর্কিত খবর

মৎস্য

ঘূর্ণিঝড়, গরম আর লবণাক্ততা সামলাতে কী চান মোংলার জেলেরা

সুন্দরবনের কাছে উলুবুনিয়া গ্রামে ওয়ার্ল্ডফিশের এক কর্মশালায় মোংলার জেলে পরিবারগুলো চারটি অগ্রাধিকার ঠিক করেছে: নিরাপদ পানি ও লবণাক্ততা নিয়ন্ত্রণ, আগাম সতর্কতা ও আশ্রয়কেন্দ্র, বিকল্প জীবিকা এবং শক্তিশালী স্থানীয় সেবা।

CGIAR২ অক্টোবর ২০২৬২ মিনিটের পড়া
মৎস্য

নেছারাবাদের ১৮ গ্রামে এখনো বাঁশের ‘চাই’ বুনে জীবিকা, যুক্ত প্রায় ১৫ হাজার মানুষ

পিরোজপুরের নেছারাবাদের অন্তত ১৮টি গ্রামের প্রায় ১৫ হাজার মানুষ বাঁশের মাছ ধরার ফাঁদ ‘চাই’ তৈরি, বিক্রি ও তা দিয়ে মাছ শিকারে যুক্ত; একটি চাই বিক্রি হয় ৩০০ থেকে ৪০০ টাকায়।

বাংলা ট্রিবিউন২ অক্টোবর ২০২৬২ মিনিটের পড়া
শাকসবজি

১৬ শতকের পুকুরে মাছ, পাড়ে সবজি: হোমনার ওয়ালি উল্লাহর সমন্বিত খামার

কুমিল্লার হোমনায় বাড়ির পাশের ১৬ শতকের পুকুরে মাছ আর পাড়ে শাকসবজি চাষ করে পরিবারের পুষ্টি মেটাচ্ছেন, বাড়তি আয়ও করছেন চাষি ওয়ালি উল্লাহ।

কৃষি সময়২ অক্টোবর ২০২৬২ মিনিটের পড়া

মন্তব্য

(০)