পাহাড়ি বনের সুদর্শন বৃক্ষ চালমুগরা (Hydnocarpus kurzii), যার আরেক নাম ডালমুগরি, এখন মহাবিপন্ন। ২০২৪ সালে বাংলাদেশ ন্যাশনাল হার্বেরিয়াম ও আইইউসিএন প্রকাশিত রেড লিস্টে গাছটিকে মহাবিপন্ন উদ্ভিদের তালিকায় রাখা হয়েছে। প্রকৃতি ও পরিবেশবিষয়ক লেখক মোকারম হোসেন প্রথম আলোয় গাছটির বর্তমান অবস্থা তুলে ধরেছেন।
বান্দরবান, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি ও মৌলভীবাজারের কিছু বনে মোট ১০টি স্থানে প্রাকৃতিক আবাসে গাছটির টিকে থাকার তথ্য পাওয়া গেছে। ২০২২ সালের সর্বশেষ জরিপে প্রতিটি স্থানে মাত্র ১ থেকে ৩টি পূর্ণবয়স্ক গাছ দেখা গেছে। সব মিলিয়ে প্রাকৃতিক আবাসে গাছের সংখ্যা ১০০-র কম, গড়ে প্রতিটি স্থানে পাঁচটির নিচে, যা 'অত্যন্ত বিপন্ন' বিবেচনার নির্ধারিত সূচকের চেয়েও অনেক কম। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ ও ভারতে গত ১০ বছরে প্রজাতিটির সংখ্যা ৫০ শতাংশ কমেছে।
দ্রুত বিলুপ্তির প্রধান কারণ বীজের অতিরিক্ত আহরণ। চালমুগরার বীজের তেল কুষ্ঠ ও অন্যান্য চর্মরোগের লোকজ চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়, তাই বন থেকে বীজ তুলে নেওয়া হয়। তার ওপর গাছটির প্রাকৃতিক বংশবৃদ্ধির হারও খুব কম।
গাছটি দেখা যায় বান্দরবানের পলি ও রেমাক্রি প্রাংসায়; চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড, হাজারীখিল, বারোইয়াধলা ও ধোপাছড়িতে; কক্সবাজারের ভোমারিঘোনায়; খাগড়াছড়ির আলুটিলার কাছে; রাঙামাটির রামপাহাড়, দামাইছড়ি, ফারুয়া, কাসালং-মাসালং ও পাবলাখালীতে; এবং মৌলভীবাজারের লাউয়াছড়া ও শ্রীমঙ্গলে। সম্প্রতি কয়েকটি স্থানে গাছটি রোপণও করা হয়েছে, আর ঢাকার মিরপুরে জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যানেও চালমুগরা আছে।
চালমুগরা চিরসবুজ মাঝারি আকারের বৃক্ষ, ১২ থেকে ১৫ মিটার পর্যন্ত উঁচু হয়। কাণ্ড সরল, গোলাকার ও সোজা; বাকল মসৃণ, পুরু, সবুজাভ ধূসর। পাতা পুরু ও ভল্লাকার, আগা সুচালো, দুই পাশ ঢেউখেলানো, রং গাঢ় সবুজ। গ্রীষ্ম থেকে বর্ষায় হালকা হলুদ সুগন্ধি ফুল কখনো একা, কখনো থোকায় ফোটে; হেমন্তে পাকে গোলাকার, শক্ত, পুরু ও বাদামি ফল, ভেতরে থাকে কয়েকটি বীজ।
গাছটি আর্দ্র গ্রীষ্মমণ্ডলীয় অঞ্চলের, সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ১ হাজার ৮০০ মিটার উচ্চতা পর্যন্ত জন্মাতে পারে। দিনের তাপমাত্রা ২৮ থেকে ৩৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস আর বছরে ৩ হাজার ৫০০ থেকে ৬ হাজার ৫০০ মিলিমিটার বৃষ্টি হয় এমন জায়গায় ভালো বাড়ে। পূর্ণ রোদ বা হালকা ছায়া দুটোই সয়, প্রায় সব মাটিতে জন্মায়, তবে সুনিষ্কাশিত বেলে-পলি মাটিতে বৃদ্ধি ভালো। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, গ্রীষ্মমণ্ডলীয় আফ্রিকা ও দক্ষিণ আমেরিকায় গাছটির চাষও হয়।
প্রতিবেদন: মোকারম হোসেন, প্রকৃতি ও পরিবেশবিষয়ক লেখক, প্রথম আলো।
ছবি: লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানে চালমুগরা গাছ, Salim_Khandoker / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 3.0)
সূত্র: প্রথম আলো





মন্তব্য
(০)