সরাসরিবাজারদর
আটা (প্যাকেটজাত)৫৮—আদা - আমদানিকৃত১৬৭—আদা - দেশী১৫৪—আমন চাল - মাঝারি৫৬—আমন চাল - মোটা৪৮—আমন চাল - সরু৭২—আয়োডিনযুক্ত লবণ (প্যাকেটজাত)৩২—কাঁচা মরিচ২১৮—খামারের মুরগী১৬২—খাসী৯০০—চিনি (দেশী)১৩২—ছোলা - গোটা৮৫—ডিম ফার্ম - লাল৪৭—পেঁয়াজ - দেশী৬০—বোরো চাল - মাঝারি৫৫—বোরো চাল - মোটা৪৭—বোরো চাল - সরু৬৬—মাংসঃ– গরু৭২৯—মুগ ডাল১২২—রসুন - আমদানিকৃত১৯২—রসুন - দেশী১৭৩—সয়াবিন তেল১৬৩—
হালনাগাদ ১ অক্টোবর ২০২৬
ঢাকা২৭°আংশিক মেঘলাআর্দ্রতা ৮৫%বাতাস ৮ কিমি/ঘ

কফি চাষের প্রক্রিয়া এবং বাংলাদেশে কফি চাষের সম্ভাবনা

১৮ থেকে ২৪ ডিগ্রি তাপমাত্রা, ছায়া আর ৬০০ থেকে ১২০০ মিটার উচ্চতা। বীজ থেকে নার্সারি, রোপণ, পরিচর্যা, রোগ দমন ও ফসল তোলা পর্যন্ত কফি চাষের পুরো পথ; ব্রাজিল থেকে ভিয়েতনাম, শীর্ষ উৎপাদক দেশগুলোর পরিচয়; আর পার্বত্য বাংলাদেশে কফির সম্ভাবনা।

কফি চাষের প্রক্রিয়া এবং বাংলাদেশে কফি চাষের সম্ভাবনা
ইথিওপিয়া

বান্দরবানের কোনো পাহাড়ি ঢালে দাঁড়ালে এখন এমন গাছ চোখে পড়ে, যা এক প্রজন্ম আগেও এখানে প্রায় অচেনা ছিল। চকচকে গাঢ় সবুজ পাতা, ডালের গায়ে গুচ্ছ গুচ্ছ ছোট ফল; কাঁচা অবস্থায় সবুজ, পাকলে টকটকে লাল। এটিই কফি গাছ। যে পানীয় ছাড়া পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষের সকাল শুরু হয় না, তার উৎস এই লাল ফলের ভেতরের দুটি বীজ। কফি চাষ সময়সাপেক্ষ ও যত্নের কাজ, আর তা নির্ভর করে নির্দিষ্ট আবহাওয়া ও মাটির গুণের ওপর। বাংলাদেশে এই চাষ সম্প্রতি নতুন করে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। কেমন করে একটি কফি বীজ গাছ হয়ে ফল দেয়, পৃথিবীর কোন দেশগুলো এই ফসলে এগিয়ে, আর আমাদের পাহাড়ে এর সম্ভাবনা কতটা, সেই খোঁজ নিয়েই এই প্রতিবেদন।

কফি কোথায় ভালো জন্মায়


কফি গাছ খুব খুঁতখুঁতে। তাপমাত্রা, ছায়া, মাটি আর উচ্চতা, এই চারটির হিসাব না মিললে গাছ বাঁচলেও ভালো ফল দেয় না।

আবহাওয়ার দিক থেকে ১৮ থেকে ২৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা কফি চাষের জন্য আদর্শ ধরা হয়। ঠান্ডা ও ছায়াযুক্ত জায়গা কফির পছন্দ। কড়া রোদ আর অতিরিক্ত গরমে পাতা পুড়ে যায়, ফুল ঝরে পড়ে। বিশেষ করে অ্যারাবিকা জাত একটু ঠান্ডা আবহাওয়াই বেশি পছন্দ করে।

মাটির ক্ষেত্রে উর্বর দোআঁশ বা বেলে দোআঁশ মাটি ভালো, যেখানে পানি জমে থাকে না। কফির শিকড় জলাবদ্ধতা সহ্য করতে পারে না; বর্ষায় গোড়ায় পানি দাঁড়িয়ে থাকলে শিকড় পচে যায়। মাটির অম্লতা বা পিএইচ মান ৫.৫ থেকে ৬.৫ এর মধ্যে থাকা উচিত, অর্থাৎ মাটি হালকা অম্লীয় হলে কফি ভালো থাকে। পাহাড়ি ঢালের মাটি এদিক থেকে সুবিধাজনক, কারণ ঢালে পানি গড়িয়ে নেমে যায়।

উচ্চতার হিসাবে সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৬০০ থেকে ১২০০ মিটার উচ্চতা কফির জন্য উপযোগী বলে ধরা হয়। উঁচু জায়গায় রাত ঠান্ডা থাকে, ফল ধীরে পাকে, আর ধীরে পাকা ফলের বীজে স্বাদ ও সুগন্ধ গাঢ় হয়। এ কারণেই বিশ্বের নামকরা কফির বড় অংশ আসে পাহাড় থেকে।

দুই জাতের দুই স্বভাব: অ্যারাবিকা ও রোবাস্টা


সারা বিশ্বে মূলত দুই জাতের কফি চাষ হয়: অ্যারাবিকা ও রোবাস্টা। অ্যারাবিকার স্বাদ কোমল, সুগন্ধ বেশি, আর এর চাহিদা ও দামও বেশি। তবে এটি ঠান্ডা ও উঁচু জায়গা চায় এবং রোগের প্রতি তুলনামূলক দুর্বল। রোবাস্টা নাম থেকেই বোঝা যায়, এটি শক্তপোক্ত। গরম সহ্য করে, নিচু জায়গাতেও জন্মায়, রোগবালাই কম হয়, আর এর বীজে ক্যাফেইন বেশি থাকে বলে স্বাদ কড়া ও তেতো। ইনস্ট্যান্ট কফি ও অনেক মিশ্রণে রোবাস্টার ব্যবহার বেশি।

বাংলাদেশের জন্য এই পার্থক্য বোঝা জরুরি। আমাদের পাহাড়গুলো খুব উঁচু নয়, আর গ্রীষ্মে গরমও পড়ে ভালো। তাই কোন এলাকায় কোন জাত লাগানো হবে, তা উচ্চতা ও তাপমাত্রা দেখে ঠিক করতে হয়। দেশের চাষিরা এখন দুই জাতই চাষ করছেন।

বীজ থেকে চারা


কফি চাষের শুরু ভালো বীজ দিয়ে। উন্নত মানের, সুস্থ গাছের পাকা ফল থেকে বীজ বাছাই করতে হয়। বপনের আগে বীজ ২৪ ঘণ্টা পানিতে ভিজিয়ে রাখলে অঙ্কুর বের হতে সুবিধা হয়।

এরপর নার্সারি। দোআঁশ মাটি, জৈব সার ও বালি মিশিয়ে ঝুরঝুরে বীজতলা বা পলিব্যাগ তৈরি করা হয়। বীজ বপন করা হয় প্রায় ২ সেন্টিমিটার গভীরে। নার্সারিতে পর্যাপ্ত পানি আর ছায়ার ব্যবস্থা রাখতে হয়, কারণ কচি চারা রোদ সহ্য করতে পারে না। কফি বীজ থেকে চারা গজাতে সময় লাগে, আর চারাকে জমিতে নেওয়ার মতো শক্ত হতে লাগে আরও দীর্ঘ সময়। এই ধৈর্যের পরীক্ষাই কফি চাষের প্রথম পাঠ।

জমি তৈরি ও রোপণ


চারা যখন নার্সারিতে বড় হচ্ছে, তখন জমি প্রস্তুত করতে হয়। আগাছা পরিষ্কার করে মাটি আলগা করা হয়, জৈব সার দেওয়া হয়। গাছ লাগানোর জন্য প্রায় ২ মিটার দূরত্বে গর্ত করা হয়, যাতে বড় হলে একটি গাছ আরেকটির আলো-বাতাস না কাড়ে। পাহাড়ের ঢালে গর্তগুলো ঢালের আড়াআড়ি সারিতে করলে বৃষ্টির পানিতে মাটি কম ধুয়ে যায়।

নার্সারিতে ৮ থেকে ১২ মাস বয়স হলে চারা জমিতে রোপণের উপযুক্ত হয়। প্রতি গর্তে একটি করে চারা বসিয়ে গোড়ার মাটি ভালোভাবে চেপে দিতে হয়, যাতে শিকড়ের চারপাশে ফাঁকা না থাকে। বর্ষার শুরুতে লাগালে চারা মাটিতে তাড়াতাড়ি শিকড় ছড়াতে পারে।

বছরজুড়ে যত্ন


রোপণের পর কয়েক বছর চলে অপেক্ষা আর যত্নের পালা। নিয়মিত সেচ দিতে হয়, বিশেষ করে শুকনো মৌসুমে, যখন পাহাড়ের মাটি দ্রুত শুকিয়ে যায়। অতিরিক্ত ডালপালা ছেঁটে গাছের গঠন ঠিক রাখতে হয়; ছাঁটাই করলে গাছে আলো-বাতাস ঢোকে, নতুন ফলন্ত ডাল বাড়ে, আর ফল তোলাও সুবিধাজনক হয়।

কফি গাছের জন্য কিছুটা ছায়া দরকার, তাই আশপাশে অন্য গাছের ছায়া নিশ্চিত করতে হয়। অনেক দেশে বড় বনজ বা ফলদ গাছের নিচে কফি লাগানো হয়, যাকে বলে ছায়াঘেরা কফি চাষ। এতে মাটির আর্দ্রতা থাকে, পাখি ও উপকারী পোকা থাকে, আর চাষির জন্য বাড়তি আয়ের পথও খোলে।

সার প্রয়োগের ক্ষেত্রে বছরে দুইবার জৈব সার এবং প্রয়োজন অনুযায়ী রাসায়নিক সার দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। মাটি পরীক্ষা করে সার দিলে খরচও কমে, গাছও ঠিক পুষ্টি পায়।

সাদা ফুলের মৌসুম


কফি গাছের ফুল দেখার মতো। শুকনো মৌসুমের পর প্রথম ভালো বৃষ্টি হলে ডালের গাঁটে গাঁটে একসঙ্গে ফোটে সাদা ফুল, সুবাস অনেকটা জুঁই ফুলের মতো। ফুল থাকে মাত্র কয়েক দিন, তারপর ঝরে গিয়ে জন্ম নেয় ছোট সবুজ ফল। এই কারণে ফুল আসার সময় পানির জোগান আর আবহাওয়া ফলনের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ।

দুই জাতের পরাগায়নেও পার্থক্য আছে। অ্যারাবিকা নিজের ফুলের পরাগেই ফল ধরাতে পারে, তাই একটি গাছ থেকেও ফল পাওয়া যায়। রোবাস্টার ক্ষেত্রে অন্য গাছের পরাগ দরকার হয়; বাতাস আর মৌমাছির মতো পোকা এই কাজ করে। তাই রোবাস্টার বাগানে ভিন্ন ভিন্ন উৎসের চারা পাশাপাশি লাগালে ফল ধরা ভালো হয়, আর বাগানের আশপাশে মৌমাছির উপস্থিতি এখানে বড় সহায়। ফুল ফোটার সময় বাগানে কীটনাশক স্প্রে না করাই ভালো, কারণ তাতে পরাগায়নে সাহায্যকারী পোকারাই মারা পড়ে।

রোগ ও পোকার বিরুদ্ধে লড়াই


কফির সবচেয়ে কুখ্যাত শত্রু কফি রাস্ট বা পাতার মরিচা রোগ। এটি একটি ছত্রাকজনিত রোগ, যাতে পাতার নিচে কমলা-হলুদ গুঁড়ার মতো দাগ পড়ে, পরে পাতা ঝরে যায় এবং গাছ দুর্বল হয়ে পড়ে। ইতিহাসে এই রোগের ধ্বংসক্ষমতার বড় উদাহরণ আছে: উনিশ শতকে তৎকালীন সিলন, আজকের শ্রীলঙ্কায় এই রোগে কফি বাগান উজাড় হয়ে গিয়েছিল, আর তার পর সেখানে চায়ের বাগান গড়ে ওঠে। ব্লাইট বা ধসা রোগও কফির ক্ষতি করে। এসব রোগ দমনে অনুমোদিত ছত্রাকনাশক ব্যবহার করতে হয়, আর বাগান পরিষ্কার রাখা ও আক্রান্ত পাতা সরিয়ে ফেলা রোগ ছড়ানো কমায়।

পোকার মধ্যে পাতার পোকা ও ফলের পোকা প্রধান। ফলের ভেতরে ঢুকে বীজ নষ্ট করে এমন পোকা কফির দাম মাটিতে মিশিয়ে দিতে পারে। এগুলো দমনে প্রয়োজন হলে কীটনাশক প্রয়োগ করতে হয়, তবে তা করতে হবে কৃষি কর্মকর্তার পরামর্শে ও মাত্রা মেনে।

ফল তোলা থেকে কফির দানা


ধৈর্যের প্রতিদান আসে সাধারণত রোপণের ৩ থেকে ৪ বছর পর, যখন গাছ ফল দেওয়া শুরু করে। কফির ফল একসঙ্গে পাকে না; একই ডালে সবুজ, হলুদ আর লাল ফল পাশাপাশি থাকে। তাই লাল রঙের পাকা ফল বেছে বেছে হাতে তোলা হয়; বড় বাগানে মেশিনও ব্যবহার করা হয়। হাতে বেছে তোলা ফল থেকে ভালো মানের কফি হয়, কারণ কাঁচা বা অতিপাকা ফল বাদ পড়ে।

ফল তোলার পর বীজ আলাদা করে রোদে শুকানো হয়। প্রক্রিয়াজাতকরণের দুটি প্রচলিত পথ আছে। একটিতে পুরো ফল রোদে বিছিয়ে শুকানো হয়, তারপর শুকনো খোসা ছাড়িয়ে বীজ বের করা হয়; একে শুকনো বা প্রাকৃতিক পদ্ধতি বলে, আর এতে কফিতে ফলের মতো মিষ্টি স্বাদ আসে। অন্যটিতে টাটকা ফলের খোসা ও শাঁস যন্ত্রে ছাড়িয়ে বীজ পানিতে ধুয়ে তারপর শুকানো হয়; একে ভেজা বা ধোয়া পদ্ধতি বলে, আর এতে স্বাদ হয় পরিষ্কার ও উজ্জ্বল। দুটিতেই মূল শর্ত একটাই: বীজ যেন ঠিকভাবে শুকায়, ছত্রাক না ধরে। ভেজা অবস্থায় ফেলে রাখা বা বৃষ্টিতে ভেজা বীজ থেকে বাজে গন্ধ হয়, আর তখন সব পরিশ্রম বৃথা যায়। শুকনো বীজই হলো সবুজ কফি, যা পরে ভেজে বা রোস্ট করে গুঁড়া করা হয়। ভাজার মাত্রার ওপর নির্ভর করে কফির রং, স্বাদ আর গন্ধ। অর্থাৎ ফল তোলার পরও কফির মান গড়ে ওঠে প্রক্রিয়াজাতকরণের প্রতিটি ধাপে।

ইথিওপিয়া থেকে পৃথিবীজুড়ে


কফির এই বিশ্বযাত্রার ইতিহাসও কম চমকপ্রদ নয়। ইথিওপিয়ার বনে জন্ম নেওয়া এই গাছের বীজ থেকে পানীয় তৈরির প্রচলন ইতিহাসে প্রথম স্পষ্টভাবে পাওয়া যায় লোহিত সাগরের ওপারে ইয়েমেনে, পনেরো শতকে। সেখানকার সুফি সাধকেরা রাত জেগে ইবাদতের সময় সজাগ থাকতে কফি পান করতেন বলে ইতিহাসবিদেরা উল্লেখ করেন। ইয়েমেনের মোখা বন্দর দিয়েই কফি পৌঁছায় মুসলিম বিশ্বের নানা শহরে, পরে ইউরোপে। মোখা নামটি আজও কফির সঙ্গে জড়িয়ে আছে।

পরে ওলন্দাজরা কফি নিয়ে যায় তাদের উপনিবেশ জাভায়, আর সেখান থেকে জাভা শব্দটিই কফির আরেক নাম হয়ে ওঠে। আঠারো শতকে কফি পৌঁছায় লাতিন আমেরিকায়, যেখানে ব্রাজিল একসময় পুরো পৃথিবীর সবচেয়ে বড় কফি উৎপাদক হয়ে ওঠে। অর্থাৎ যে দেশগুলো আজ কফির জন্য বিখ্যাত, তাদের বেশির ভাগের কাছেই এই গাছ এসেছিল বাইরে থেকে। বাংলাদেশের পাহাড়ে কফির আগমনও সেই দীর্ঘ যাত্রারই নতুন অধ্যায়।

পৃথিবীর কফির মানচিত্র


কফি পৃথিবীর অন্যতম জনপ্রিয় পানীয়, প্রতিদিন কোটি কোটি মানুষের জীবনের অংশ। এর চাষ মূলত কেন্দ্রীভূত গ্রীষ্মমণ্ডলীয় অঞ্চলে, বিষুবরেখার দুই পাশের একটি বলয়ে। কয়েকটি দেশ এই বাজারের বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করে।

ব্রাজিল বিশ্বের শীর্ষ কফি উৎপাদনকারী দেশ। বিশ্বের মোট কফির প্রায় ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ আসে এই দেশ থেকে। অ্যারাবিকা ও রোবাস্টা দুই জাতেই তারা দক্ষ। মিনাস জেরাইস, সাও পাওলো ও পারানা সেখানকার বিখ্যাত উৎপাদন অঞ্চল। ব্রাজিলের কফি তার মৃদু স্বাদ ও ভারসাম্যপূর্ণ সুগন্ধের জন্য বিশ্বজুড়ে পরিচিত।

ভিয়েতনাম দ্বিতীয় বৃহত্তম উৎপাদক এবং রোবাস্টা কফিতে শীর্ষে। দেশটির দক্ষিণ মধ্যাঞ্চলে প্রচুর কফি চাষ হয়। তুলনামূলক কম দাম আর উচ্চ উৎপাদনশীলতার কারণে বিশ্বের রপ্তানি বাজারে ভিয়েতনামের কফির বড় ভূমিকা আছে।

কলম্বিয়া তৃতীয় বৃহত্তম উৎপাদক, অ্যারাবিকা কফির জন্য বিখ্যাত। আন্দিজ পর্বতের ঢালে জন্মানো এই কফি সুগন্ধ ও মসৃণ স্বাদের জন্য বিশ্বজুড়ে সমাদৃত।

ইন্দোনেশিয়া চতুর্থ বৃহত্তম। সুমাত্রা, জাভা ও বালির কফির আলাদা বৈশিষ্ট্য আছে। দেশটি রোবাস্টা উৎপাদনে দক্ষ, আর বিশেষ প্রক্রিয়ায় তৈরি কোপি লুয়াক কফি ইন্দোনেশিয়ার পরিচিতি বাড়িয়েছে।

ইথিওপিয়াকে বলা হয় কফির জন্মভূমি। প্রচলিত কিংবদন্তি অনুযায়ী, সেখানকার এক রাখাল লক্ষ করেছিলেন, তাঁর ছাগলগুলো একটি গাছের লাল ফল খেয়ে অস্বাভাবিক চনমনে হয়ে উঠছে। কাহিনি যা-ই হোক, অ্যারাবিকা কফির আদি উৎস ইথিওপিয়ার উঁচু বনভূমি। হারার, সিদামো ও ইয়ারগাচেফ অঞ্চলের কফি সুগন্ধ ও প্রাকৃতিক স্বাদের জন্য বিশেষভাবে সমাদৃত।

গুয়াতেমালায় উঁচু পাহাড়ি অঞ্চলে অ্যারাবিকা চাষ হয়, আর আগ্নেয়গিরির মাটি কফির মান বাড়ায়। অনন্য স্বাদ ও গভীর সুগন্ধের জন্য এই কফি বিখ্যাত।

আমাদের প্রতিবেশী ভারতে কফি চাষ হয় দক্ষিণের কর্ণাটক, কেরালা ও তামিলনাড়ুতে। দেশটি রোবাস্টা ও অ্যারাবিকা দুটোতেই পারদর্শী। সেখানকার মনসুনড মালাবার নামের বিশেষ প্রক্রিয়াজাত কফি পরিচিত; বর্ষার আর্দ্র বাতাসে কফির দানা রেখে এর বিশেষ স্বাদ তৈরি করা হয়।

কেনিয়ার কফি উজ্জ্বল অম্লতা আর ফলের মতো স্বাদের জন্য বিখ্যাত, আফ্রিকার অন্যতম সুস্বাদু কফি। কোস্টা রিকা পরিচিত পরিবেশবান্ধব উৎপাদন আর উচ্চমানের অ্যারাবিকার জন্য। মেক্সিকো অ্যারাবিকা উৎপাদনে দক্ষ এবং যুক্তরাষ্ট্রে কফি রপ্তানিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

এই তালিকা থেকে একটি বিষয় পরিষ্কার: কফির স্বাদ ও মান নির্ভর করে স্থানীয় আবহাওয়া, মাটি আর চাষপদ্ধতির ওপর। একই জাতের গাছ দুই দেশে দুই রকম কফি দেয়। বাংলাদেশ যদি কফিতে জায়গা করে নিতে চায়, তাকেও নিজের পাহাড়ের বৈশিষ্ট্য থেকে নিজের পরিচয় খুঁজে নিতে হবে।

বাংলাদেশের পাহাড়ে কফি: শুরু থেকে এখন


বাংলাদেশে কফি চাষ এখনো শুরুর পর্যায়ে থাকলেও এটি সম্ভাবনাময় খাত হিসেবে দেখা দিয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রামের বান্দরবান, রাঙামাটি ও খাগড়াছড়িতে কফির চাষ শুরু হয়েছে। দেশের উষ্ণ ও আর্দ্র জলবায়ু এবং পাহাড়ি মাটি কফির জন্য উপযোগী বলে মনে করা হয়।

এই চাষের ইতিহাস অবশ্য একেবারে নতুন নয়। দ্য ডেইলি স্টারের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, বান্দরবানের লামায় পঞ্চাশের দশকে কফি চাষ শুরু হয়েছিল; অ্যারাবিকা এসেছিল ভারতের মিজোরাম থেকে, পরে রোবাস্টা আসে ত্রিপুরা থেকে। সংগঠিতভাবে চাষ শুরু হয় ২০০১ সালে খাগড়াছড়ি কৃষি গবেষণা কেন্দ্রে। আর বড় পরিসরে সম্প্রসারণ শুরু হয় ২০২১ সাল থেকে। মাঝখানে ২০১৬ সালে পাহাড়ের ১১৬ জন কৃষককে প্রত্যেককে ২০০টি করে অ্যারাবিকার চারা দেওয়া হয়েছিল, যা ছিল কৃষকের জমিতে কফি পৌঁছে দেওয়ার প্রথম দিকের উদ্যোগগুলোর একটি। পুরোনো সেই জেলা বান্দরবান এখনো এগিয়ে; একই প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালে শুধু বান্দরবানেই প্রায় ১৬ টন কফি উৎপাদন হয়েছে।

সেই সম্প্রসারণের পেছনে আছে কৃষি মন্ত্রণালয়ের ২১১ কোটি টাকার কাজুবাদাম ও কফি গবেষণা, উন্নয়ন ও সম্প্রসারণ প্রকল্প। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর এর প্রধান বাস্তবায়নকারী সংস্থা, সঙ্গে আছে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট। প্রকল্পটি পার্বত্য চট্টগ্রামের বাইরেও ১৯ জেলার ৪৫টি উপজেলায় কফি চাষ নিয়ে যাচ্ছে; সিলেট, রংপুর, নীলফামারী, টাঙ্গাইলের মধুপুর গড় ও শেরপুরের নাম এই তালিকায় আছে।

ফলও চোখে পড়ছে। ডেইলি স্টারের প্রতিবেদনে উল্লিখিত হিসাবে, ২০২১ সালে দেশে ১২০ হেক্টর জমিতে কফি উৎপাদন হয়েছিল ৩৫ টন; ২০২৫ সালে প্রায় ২,০০০ হেক্টরে উৎপাদন দাঁড়িয়েছে ৯৫ টনে। সরকারের লক্ষ্য ২০৩০ সালের মধ্যে উৎপাদন ১,৫০০ টনে তোলা। তবু দেশের চাহিদার তুলনায় এটি সামান্য; একই প্রতিবেদন বলছে, দেশে উৎপাদিত কফি চাহিদার মাত্র প্রায় ৫ শতাংশ মেটায়। অর্থাৎ ঘরের বাজারই এখনো অনেক বড়, প্রায় পুরোটাই আমদানিনির্ভর।

উৎপাদন বাড়াতে যা দরকার


এগিয়ে যেতে হলে তিনটি বিষয় সবচেয়ে জরুরি। প্রথমত, উন্নত জাতের বীজ ও চারা, যা আমাদের পাহাড়ের উচ্চতা ও তাপমাত্রার সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারে। দ্বিতীয়ত, আধুনিক প্রযুক্তির প্রয়োগ, বিশেষ করে ফল তোলার পর প্রক্রিয়াজাতকরণে, কারণ ভালো ফলও ভুল শুকানো বা ভাজার কারণে নষ্ট হয়ে যায়। তৃতীয়ত, স্থানীয় কৃষকদের প্রশিক্ষণ। নতুন ফসল মানে নতুন দক্ষতা; কখন ছাঁটাই, কখন সার, কোন ফল তুলতে হবে, এসব হাতে-কলমে শেখা দরকার।

সতর্কতার কথাও আছে। আন্তর্জাতিক পরিবেশ বিষয়ক সংবাদমাধ্যম মঙ্গাবে ২০২৪ সালে এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, পার্বত্য চট্টগ্রামে কফির দ্রুত বিস্তারে সংরক্ষণবিদদের একাংশ উদ্বিগ্ন। তাঁদের আশঙ্কা, একক ফসলের চাষ মাটির উর্বরতা কমাতে পারে, রোগ বাড়াতে পারে, আর সার ও কীটনাশকের ব্যবহার বাড়াতে পারে। তাঁরা ছায়া গাছ হিসেবে চাপালিশ, গর্জন ও চিভিটের মতো দেশি গাছ লাগানোর পরামর্শ দিয়েছেন। কফির নিজের স্বভাবই এখানে সমাধানের পথ দেখায়: যে গাছ ছায়া চায়, তাকে বনের সঙ্গে মিলিয়েই চাষ করা যায়।

অর্থনীতির হিসাব ও কফির উপকারিতা


দামের হিসাবেই বোঝা যায়, প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন এত গুরুত্বপূর্ণ। দ্য ডেইলি স্টারের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশে কাঁচা কফি বিক্রি হয় কেজিপ্রতি প্রায় ৩৫০ থেকে ৪০০ টাকায়, অথচ প্রক্রিয়াজাত কফির দানার দাম কেজিপ্রতি ১,২০০ থেকে ২,০০০ টাকা পর্যন্ত ওঠে। অর্থাৎ ফল তোলার পর শুকানো, খোসা ছাড়ানো আর ভাজার কাজ যে যত ভালোভাবে করতে পারেন, লাভের বড় অংশ তাঁর ঘরেই যায়। পাহাড়ের কৃষকেরা যদি দল বেঁধে বা সমবায়ের মাধ্যমে প্রক্রিয়াজাতকরণের ব্যবস্থা গড়তে পারেন, তাহলে কাঁচা ফল কম দামে বিক্রি করে দেওয়ার বাধ্যবাধকতা কমবে।

কফি উচ্চমূল্যের অর্থকরী ফসল, আর দেশে-বিদেশে এর চাহিদা অনেক। দেশে শহুরে তরুণদের মধ্যে কফির কদর দ্রুত বাড়ছে, নতুন নতুন কফিশপ খুলছে। স্থানীয় উৎপাদন বাড়লে এই চাহিদার একটি অংশ ঘরেই মেটানো যাবে, আমদানির খরচ কমবে। আর মান ধরে রাখতে পারলে আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানির সুযোগও তৈরি হতে পারে।

পাহাড়ের জন্য কফির আরেকটি সুবিধা আছে। বহুবর্ষজীবী গাছ বলে এটি পাহাড়ি ঢালে মাটি ধরে রাখে, মাটির ক্ষয় রোধে সাহায্য করে; প্রতি বছর মাটি খুঁড়ে চাষ করতে হয় না। একবার বাগান দাঁড়িয়ে গেলে বহু বছর ধরে ফল দেয়, ফলে অন্য অনেক ফসলের তুলনায় দীর্ঘমেয়াদি আয়ের নিশ্চয়তা বেশি।

  • কফি উচ্চমূল্যের অর্থকরী ফসল।
  • দেশে-বিদেশে এর চাহিদা অনেক বেশি।
  • পাহাড়ি এলাকায় কফি চাষ মাটির ক্ষয় রোধে সাহায্য করে।
  • একবার বাগান দাঁড়ালে বহু বছর ধরে আয় আসে।

পাহাড়ের নতুন ফসলের পথ


বিশ্বজুড়ে কফির বৈচিত্র্য আর মান নির্ভর করে স্থানীয় আবহাওয়া, মাটি ও চাষপদ্ধতির ওপর। বাংলাদেশে কফি চাষের সম্প্রসারণ পাহাড়ের কৃষকদের আয় বাড়াতে পারে, আর দেশের অর্থনীতিতে খুলে দিতে পারে নতুন সম্ভাবনা। সঠিক পরিকল্পনা, যত্ন আর আধুনিক পদ্ধতি মেনে চললে কফি চাষ বিশেষ করে পাহাড়ি অঞ্চলে লাভজনক কৃষি উদ্যোগ হয়ে উঠতে পারে। তবে কফি তাড়াহুড়োর ফসল নয়; বীজ থেকে প্রথম ফল পর্যন্ত কয়েক বছরের অপেক্ষা। যে কৃষক আজ চারা লাগাচ্ছেন, তিনি আসলে কয়েক বছর পরের সকালের এক কাপ কফির জন্য বিনিয়োগ করছেন।

ছবি: রোবাস্টা কফির ফল (Coffea canephora), Jeevan Jose, Kerala, India / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)

তানিয়া চৌধুরীদা এগ্রো নিউজ

ইথিওপিয়া

সম্পর্কিত খবর

মতামত

শিশুর প্রথম এক হাজার দিনের পুষ্টি উন্নয়নের মাপকাঠি হোক: দেমেকে মেকোনেন

ইথিওপিয়ার সাবেক উপপ্রধানমন্ত্রী মনে করেন, গর্ভ থেকে দুই বছর বয়স পর্যন্ত শিশুর পুষ্টিকে জাতিসংঘের মানব উন্নয়ন সূচকে জায়গা দেওয়া উচিত, আর এর তথ্য দেশগুলোর হাতে এখনই আছে।

SciDev.Net৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬২ মিনিটের পড়া
ফসল

জিংকসমৃদ্ধ মেলকা গমে ইথিওপিয়ায় বাড়ল ফলন ও পুষ্টি

ইথিওপিয়ার গম অঞ্চলের ৬০০টির বেশি স্থানে বহু বছরের পরীক্ষায় দেখা গেছে, জিংক-দক্ষ মেলকা জাত ও লক্ষ্যভিত্তিক সার ব্যবস্থাপনা জিংকের ঘাটতির মাটিতেও উচ্চ ফলন ও দানায় বেশি জিংক পাওয়ার সম্ভাবনা বাড়ায়।

AgroPages২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬১ মিনিটের পড়া
ফসল

সপ্তাহ নয়, ৯০ মিনিটেই গমের ব্লাস্ট রোগ শনাক্ত করবে বহনযোগ্য পরীক্ষা

জন ইনস সেন্টার ও ইথিওপিয়ার বিজ্ঞানীরা সাধারণ যন্ত্রে চলা একটি ল্যাম্প পরীক্ষা মাঠে যাচাই করেছেন, যা গমের ব্লাস্ট ছত্রাক শনাক্ত করে; ইথিওপিয়া, বাংলাদেশ ও জাম্বিয়ার মতো দেশের জন্য এটি তৈরি।

গ্লোবাল এগ্রিকালচার২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬২ মিনিটের পড়া

মন্তব্য

(০)