বাঙালির রান্নাঘরে এমন দিন খুব কমই যায়, যেদিন মরিচ লাগে না। ভাতের পাশে একটি কাঁচা মরিচ, ডালে ফোড়ন, মাছের ঝোলে গুঁড়া মরিচ, আর বয়াম ভরা মরিচের আচার। অথচ এই ছোট ফসলটির পেছনে মাঠে চলে মাসের পর মাস যত্ন, আর একটি ভুলে ফলন অর্ধেকে নেমে আসতে পারে। পাতার নিচে লুকিয়ে থাকা প্রায় অদৃশ্য পোকা বা বর্ষার স্যাঁতসেঁতে আবহাওয়ায় ছড়ানো ছত্রাক পুরো খেতকে বিপদে ফেলতে পারে। মরিচ তাই যেমন লাভের ফসল, তেমনি হিসাব করে চাষ করার ফসলও। পুষ্টির দিক থেকেও মরিচ ফেলনা নয়: শুকনো মরিচে আমিষ, প্রচুর ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন সি থাকে।
রান্নাঘর থেকে ভেষজ গুণ
গ্রামবাংলায় প্রচলিত বিশ্বাস আছে যে নিয়মিত কাঁচা মরিচ খেলে মুখে ঘা হয় না। রান্নাবান্না আর মুখরোচক খাবার তৈরির বাইরেও মরিচ নানা ধরনের আচারের প্রধান উপাদান, আর অনেকে শুধু মরিচ দিয়েই আচার বানান। কাঁচা অবস্থায় সবুজ মরিচ বিক্রি হয় প্রতিদিনের বাজারে, আর পাকা লাল মরিচ রোদে শুকিয়ে গুঁড়া করে সারা বছর ব্যবহার হয়। ফলে কৃষকের সামনে দুটি পথ খোলা থাকে: দাম ভালো হলে কাঁচা মরিচ বিক্রি, না হলে পাকিয়ে শুকিয়ে মজুত।
কেমন জমি, কেমন মাটি
মরিচের জন্য এমন জমি দরকার, যেখানে প্রচুর আলো-বাতাস পৌঁছায় এবং সেচ ও পানি নিষ্কাশন, দুটোরই ব্যবস্থা আছে। দোআঁশ মাটি মরিচ চাষের জন্য সবচেয়ে উপযোগী। দোআঁশ হলো বালি, পলি আর কাদার মোটামুটি সুষম মিশ্রণ, যা পানি ধরে রাখে আবার অতিরিক্ত পানি বেরও করে দেয়। মরিচ গাছ গোড়ায় পানি জমে থাকা একেবারেই সহ্য করতে পারে না; দু-এক দিনের জলাবদ্ধতাতেই গাছ নেতিয়ে পড়ে এবং রোগ ছড়ায়। তাই নিচু, পানি জমে থাকা জমি এড়িয়ে চলাই ভালো।
জাত চেনা: ঝাল ও মিষ্টি
দেশে ঝাল ও মিষ্টি, দুই ধরনের মরিচই চাষ হয়। ঝাল মরিচের মধ্যে বগুড়া, চাঁদপুরী ও ফরিদপুরী জাত উল্লেখযোগ্য, অঞ্চলের নামেই যাদের পরিচয়। এ ছাড়া কামরাঙা, আকালী ও কালো মরিচ খুবই ঝাল। স্থানীয় এসব জাতের পাশাপাশি বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বারি) বারি মরিচ-১, বারি মরিচ-২ ও বারি মরিচ-৩ নামে উন্নত জাত উদ্ভাবন করেছে, যার মধ্যে বারি মরিচ-২ গ্রীষ্মকালে চাষের উপযোগী। বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটও (বিনা) উচ্চফলনশীল মরিচের জাত উদ্ভাবন করেছে। কোন এলাকায় কোন জাত ভালো ফল দেয়, সে বিষয়ে উপজেলা কৃষি অফিসের পরামর্শ নিয়ে বীজ বাছাই করা নিরাপদ।
বীজতলা থেকে চারা
মরিচের চারা আগে বীজতলায় তৈরি করে পরে মূল জমিতে লাগানো হয়। বীজতলার জমি ভালোভাবে চাষ ও মই দিয়ে ঝুরঝুরে করে আগাছা বেছে পরিষ্কার করতে হয়। তারপর ৩ মিটার লম্বা ও ১ মিটার চওড়া বীজতলা বানিয়ে তাতে বীজ বোনা হয়। এক মিটার চওড়া রাখার কারণ হলো, দুই পাশ থেকে হাত বাড়িয়ে যাতে বীজতলার মাঝখান পর্যন্ত আগাছা তোলা ও পানি দেওয়া যায়।
শীত মৌসুমের ফসলের জন্য ভাদ্র-আশ্বিন মাসে, অর্থাৎ মোটামুটি আগস্টের মাঝামাঝি থেকে অক্টোবরের মাঝামাঝি সময়ে বীজতলায় বীজ বোনা হয়। বর্ষা মৌসুমের ফসলের জন্য বীজ বোনা হয় ফাল্গুন-চৈত্র মাসে, অর্থাৎ ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি থেকে এপ্রিলের মাঝামাঝি। চারা ১০ সেন্টিমিটারের মতো উঁচু হলে, সাধারণত ৩০ থেকে ৩৫ দিন বয়সে, সেটি মূল জমিতে লাগানোর উপযোগী হয়।
চারা রোপণ: দূরত্বই ফলনের চাবি
মূল জমি আগাছামুক্ত করে ৪ থেকে ৫টি চাষ ও মই দিয়ে তৈরি করার পর চারা লাগানো হয়। সারি থেকে সারির দূরত্ব রাখতে হয় ৬০ থেকে ৭০ সেন্টিমিটার, আর সারিতে এক চারা থেকে আরেক চারার দূরত্ব ৩০ থেকে ৪০ সেন্টিমিটার। এই ফাঁকটুকু অপচয় নয়; এতে প্রতিটি গাছ যথেষ্ট আলো-বাতাস পায়, পাতা শুকনো থাকে বলে রোগ কম হয়, আর সারির মাঝ দিয়ে হেঁটে আগাছা পরিষ্কার, সার দেওয়া ও মরিচ তোলা যায়।
চারা লাগাতে হয় বিকেলে, যাতে রাতের ঠান্ডায় চারা ধকল সামলে নিতে পারে। রোপণের পর ২ থেকে ৩ দিন সকাল-বিকাল পানি দিতে হয়, যতদিন না চারা মাটিতে শিকড় গেড়ে সোজা হয়ে দাঁড়ায়।
সারের হিসাব: কখন কতটা
মরিচের জমিতে প্রতি হেক্টরে সার লাগে গোবর ১০ টন, ইউরিয়া ২৫০ কেজি, টিএসপি ২০০ কেজি এবং এমওপি ১৫০ কেজি। এক হেক্টর মানে প্রায় সাড়ে সাত বিঘা, তাই যার জমি কম, তিনি এই হিসাবকে ভাগ করে নেবেন। টিএসপি জোগায় ফসফরাস, যা শিকড় ও ফুলের জন্য দরকারি; এমওপি জোগায় পটাশ, যা গাছকে শক্ত করে ও ফলের মান বাড়ায়; আর ইউরিয়া জোগায় নাইট্রোজেন, যা গাছের সবুজ অংশ বাড়ায়।
সার একবারে দেওয়া হয় না, ভাগে ভাগে দেওয়া হয়:
- জমি তৈরির সময়: সবটুকু গোবর, সবটুকু টিএসপি আর ৫০ কেজি এমওপি।
- চারা রোপণের ২৫ দিন পর প্রথম উপরি প্রয়োগ: ৮৪ কেজি ইউরিয়া ও ৩৪ কেজি এমওপি।
- রোপণের ৫০ দিন পর দ্বিতীয় উপরি প্রয়োগ: ৮৩ কেজি ইউরিয়া ও ৩৩ কেজি এমওপি।
- রোপণের ৭০ দিন পর তৃতীয় উপরি প্রয়োগ: আবারও ৮৩ কেজি ইউরিয়া ও ৩৩ কেজি এমওপি।
উপরি প্রয়োগ মানে গাছ বেড়ে ওঠার সময় মাটির ওপরে, গাছের গোড়ার চারপাশে সার দেওয়া। ইউরিয়া ভাগে ভাগে দেওয়ার কারণ হলো, একবারে দিলে এর বড় অংশ পানিতে ধুয়ে বা বাতাসে উড়ে নষ্ট হয়, অথচ গাছের দরকার সারা মৌসুম ধরে।
সেচ, নিকাশ আর আগাছা
জমিতে রসের অভাব দেখা দিলেই সেচ দিতে হবে, আবার অতিরিক্ত পানি বের করে দেওয়ার জন্য নালার ব্যবস্থাও রাখতে হবে। আগাছা দেখা দিলে তা পরিষ্কার করতে হবে, কারণ আগাছা মরিচের ভাগের সার ও পানি কেড়ে নেয় এবং পোকামাকড়ের আশ্রয় হয়। প্রতিবার উপরি সার দেওয়ার সময় কোদাল দিয়ে গাছের চারপাশের মাটি কুপিয়ে আলগা করে দিতে হবে; এতে সার মাটিতে মেশে এবং শিকড় বাতাস পায়।
পাতার নিচের শত্রু: সাদা মাছি
মরিচ চাষে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করে ছোট ছোট রস চোষা পোকা। এদের প্রথমটি সাদা মাছি। সাদা রঙের এই পোকা থাকে পাতার নিচের দিকে, লম্বায় এক মিলিমিটারের সামান্য বেশি। পূর্ণবয়স্ক ও বাচ্চা, দুটোই পাতার নিচ থেকে রস চুষে খায়, ফলে পাতা কুঁচকে যায়। আরও বড় বিপদ হলো, এই পোকা পাতা কোঁকড়ানো ভাইরাস রোগ ছড়ায়।
সাদা মাছি পাতার নিচের দিকে অতি ক্ষুদ্র সাদা ডিম পাড়ে। ডিম পরে বাদামি রং ধারণ করে এবং ৩ থেকে ১৭ দিন পর ডিম ফুটে নিম্ফ বা বাচ্চা বের হয়। বাচ্চা দেখতে সবুজাভ সাদা, আর ২ থেকে ৬ সপ্তাহ নিম্ফ অবস্থায় থেকে পূর্ণাঙ্গ পোকায় পরিণত হয়। পূর্ণাঙ্গ পোকা ১০ থেকে ১৫ দিন বাঁচে।
দমনের জন্য হলুদ রঙের আঠালো ফাঁদ ব্যবহার করতে হবে; হলুদ রং এই পোকাকে টানে, আর আঠায় লেগে পোকা মারা পড়ে। প্রতি লিটার পানিতে ৫ গ্রাম কাপড় কাচার সাবান মিশিয়ে স্প্রে করলেও পোকা কমে। আক্রমণ বেশি হলে অনুমোদিত কীটনাশক নির্ধারিত মাত্রায় ব্যবহার করতে হবে।
থ্রিপস: খালি চোখে প্রায় অদৃশ্য
থ্রিপস একটি ক্ষুদ্র পোকা, খালি চোখে কোনোমতে দেখা যায়। বাইরে থেকে আক্রমণ বোঝা যায় না বলে ক্ষতির আশঙ্কা থাকে অনেক বেশি; তাই মাঝে মাঝে খেতে ঘুরে ফসলের অবস্থা দেখে আগে থেকেই ব্যবস্থা নিতে হয়। এই পোকা পাতার রস চুষে খায়, ফলে বেশি আক্রমণে পাতা কুঁচকে যায়, এমনকি গাছে কোনো ফুল-ফল নাও আসতে পারে। থ্রিপসও ভাইরাস রোগ ছড়ায়।
ক্ষতির লক্ষণ চেনা জরুরি। বাচ্চা ও পূর্ণাঙ্গ পোকা রস চুষে খাওয়ায় পাতা কুঁকড়ে অনেকটা নৌকার মতো দেখায়, পাতা বাদামি রং ধারণ করে, আর নতুন-পুরনো দুই ধরনের পাতাতেই আক্রমণ হয়। উষ্ণ ও শুষ্ক আবহাওয়ায় থ্রিপস বাড়ে।
একটি পূর্ণবয়স্ক থ্রিপস ৪৫ থেকে ৫০টি ডিম পাড়ে। ৫ থেকে ৬ দিনে ডিম থেকে বাচ্চা বের হয়, আর ৭ থেকে ৮ দিন পর বাচ্চা পূর্ণাঙ্গ পোকায় পরিণত হয়। পূর্ণাঙ্গ পোকা ৩১ দিন পর্যন্ত বাঁচে। পাতা নাড়াচাড়া করলে এরা উড়ে পালায়। দমনের জন্য সাদা রঙের আঠালো ফাঁদ ব্যবহার করা হয়। মাকড়সা থ্রিপস খায়, তাই খেতে মাকড়সার সংখ্যা বাড়ানো গেলে অল্প খরচেই থ্রিপস দমন করা যায়। প্রয়োজনে অনুমোদিত কীটনাশক সঠিক মাত্রায় প্রয়োগ করতে হবে।
জাব পোকা: দলে দলে রস চোষে
জাব পোকার পূর্ণাঙ্গ ও বাচ্চা পাতা, ফুল, কচি ফল ও ডগার রস চুষে খায়। বেশি আক্রমণে গাছের বাড়বাড়তি কমে যায়, ফলন কমে, আর এই পোকাও ভাইরাস রোগ ছড়ায়। জাব পোকা খুব ছোট, দেহ নরম, রং উজ্জ্বল কালো। ডানাওয়ালা জাব পোকা উড়তে পারে, কিন্তু বাচ্চা বা ডানাহীন পোকা পারে না। এরা দল বেঁধে থাকে।
আক্রমণে পাতা কুঁকড়ে যায়, গাছের বৃদ্ধি এবং ফুল ও ফল ধরা বাধাগ্রস্ত হয়। পোকার শরীর থেকে বের হওয়া মিষ্টি রসের ওপর কালো শুটি মোল্ড নামের ছত্রাক জন্মায়, যা পাতার ওপর কালো আস্তরণ ফেলে আলো আটকে দেয়। বাতাসে আর্দ্রতা বেশি ও আকাশ মেঘলা থাকলে জাব পোকা দ্রুত বাড়ে।
জাব পোকার বংশবৃদ্ধি চোখে পড়ার মতো দ্রুত। কোনো যৌন মিলন ছাড়াই একটি পোকা ১০ থেকে ১২ দিনের মধ্যে ৮ থেকে ৩০টি বাচ্চা জন্ম দিতে পারে। বাচ্চা অবস্থা থাকে ৫ থেকে ৮ দিন। ডানাহীন জাব পোকা ২৪ ঘণ্টার মধ্যে বাচ্চা দিতে পারে, আর এরা সারা বছরই বংশবিস্তার করে। আক্রমণের শুরুতে হাত দিয়ে পিষে মেরে ফেলা সবচেয়ে কার্যকর। লেডিবার্ড বিটলের পূর্ণাঙ্গ ও কীড়া এবং সিরফিড মাছির কীড়া জাব পোকা খায়; এদের রক্ষা করা ও সংখ্যা বাড়ানো গেলে জাব পোকা দ্রুত কমে। দরকার হলে অনুমোদিত কীটনাশক ব্যবহার করতে হবে।
ফলছিদ্রকারী পোকা: রাতের মথ, দিনের ক্ষতি
এই পোকার মথ নিশাচর, রাতের আলোয় আকৃষ্ট হয়, তাই দিনে মা পোকাকে সাধারণত দেখা যায় না। ক্ষতি করে এর কীড়া, যাকে ফলের ভেতরে পাওয়া যায়। কীড়া লম্বায় প্রায় ২ ইঞ্চি, গায়ের রং কালচে ধূসর থেকে হালকা বাদামি, আর শরীরের দুই পাশে লম্বালম্বি হালকা কালো ও বাদামি দাগ থাকে। কীড়া ফলের বোঁটার কাছে ছিদ্র করে ভেতরের অংশ খায়। একটি কীড়া একাধিক ফলে আক্রমণ করতে পারে, ফলের ভেতরে বিষ্ঠা ও পচন দেখা যায়, আর আক্রান্ত ফল অসময়ে পেকে যায়। ছিদ্রওয়ালা মরিচের বাজারদর কমে যায়। আশপাশে এই পোকার অন্য পোষক গাছ থাকলে আক্রমণ বাড়ে।
মথ পাতার নিচে ২০০ থেকে ৩০০টি ডিম পাড়ে। ৩ থেকে ৪ দিনে ডিম ফুটে কীড়া বের হয়। ছোট কীড়াগুলো একসঙ্গে থাকে, বড় হলে সারা মাঠে ছড়িয়ে পড়ে। ১৪ থেকে ১৬ দিন পর কীড়া পুত্তলিতে পরিণত হয়, আর পুত্তলি থাকে মাটির ২ থেকে ৩ ইঞ্চি গভীরে। ১০ থেকে ১৫ দিন পর পুত্তলি থেকে পূর্ণাঙ্গ মথ বের হয়। পুরো জীবনচক্র শেষ করতে লাগে ৩০ থেকে ৩৫ দিন, আর এরা বছরে ৮ বার বংশবিস্তার করে।
দমনের জন্য জমি থেকে ডিম ও কীড়া সংগ্রহ করে নষ্ট করতে হবে। প্রতি বিঘায় ১৫টি হারে সেক্স ফেরোমন ফাঁদ বসিয়ে পুরুষ মথ মেরে ফেলা যায়; এই ফাঁদে স্ত্রী মথের গন্ধের মতো রাসায়নিক থাকে, যা পুরুষ মথকে টেনে আনে। প্রতি সপ্তাহে একবার করে ট্রাইকোগ্রামা কাইলোনিজ নামের উপকারী পরজীবী পোকা ছাড়া যায়, হেক্টরপ্রতি ১ গ্রাম ডিম হারে; এরা ক্ষতিকর পোকার ডিমের ভেতরে ডিম পেড়ে সেগুলো নষ্ট করে। প্রয়োজনে অনুমোদিত কীটনাশক ব্যবহার করতে হবে।
চওড়া মাকড়: বালুকণার মতো ক্ষুদ্র
মাকড় পোকা নয়; এদের পা আটটি, তাই এদের মাকড় বলা হয়। বালুকণার মতো ক্ষুদ্র বলে খালি চোখে দেখা যায় না, কিন্তু এদের আক্রমণে ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়। রং সাদা বা হলদে, দেহ নরম ও ডিম্বাকৃতি, দেখতে কাঁকড়ার মতো। এরা পাতার নিচে মধ্যশিরা ঘিরে দল বেঁধে থাকে।
মাকড় পাতার নিচ থেকে রস চুষে খায়, ফলে শিরার মাঝের অংশ বাদামি হয়ে শুকিয়ে যায়। আক্রান্ত পাতা কুঁকড়ে যায়, কচি পাতা নিচের দিকে বেঁকে পেয়ালার মতো হয় ও সরু হয়ে যায়। ব্যাপক আক্রমণে পাতা ভেঙে যায় আর ফলন অনেক কমে যায়। আশপাশে বিকল্প পোষক গাছ থাকলে মাকড় বাড়ে।
স্ত্রী মাকড় পাতার নিচে ৩০ থেকে ৭৬টি ডিম পাড়ে। ২ থেকে ৩ দিনের মধ্যে ডিম থেকে কীড়া বের হয়, আরও ২ থেকে ৩ দিন পর কীড়া নিম্ফে পরিণত হয়, এবং এক দিন পরেই পূর্ণাঙ্গ মাকড় হয়ে যায়। পূর্ণাঙ্গ স্ত্রী মাকড় ৮ থেকে ১৩ দিন এবং পুরুষ মাকড় ৫ থেকে ৯ দিন বাঁচে। আক্রমণের শুরুতে আক্রান্ত পাতা হাত দিয়ে তুলে ধ্বংস করতে হবে। প্রতি লিটার পানিতে ৫ মিলি নিম তেল ও ৫ মিলি ট্রিকস মিশিয়ে পাতার নিচের দিকে স্প্রে করা যায়। পাইরিথ্রয়েড জাতীয় কীটনাশক যথাসম্ভব এড়িয়ে চলতে হবে, আর প্রয়োজনে অনুমোদিত মাকড়নাশক প্রয়োগ করতে হবে।
ক্ষত বা এনথ্রাকনোজ রোগ
পোকার পাশাপাশি মরিচে কয়েকটি রোগও বড় ক্ষতি করে। এর প্রথমটি ক্ষত, এনথ্রাকনোজ বা ডাইব্যাক রোগ, যা হয় কলিটোট্রিকাম ক্যাপসিসি নামের ছত্রাকের কারণে। এ রোগে গাছ বড় হয় না, পাতায় দাগ পড়ে, আর ডগা থেকে শুরু হয়ে পুরো গাছ মরে যেতে পারে। মরিচে আক্রমণ হলে ফলন কমে, আর রং বিবর্ণ হওয়ায় বাজারদরও কমে যায়।
চারা ও বয়স্ক গাছের পাতা, ডাল, ফুল ও ফল, সবই আক্রান্ত হয়। আক্রান্ত পাতা ঝরে যায়, ডগা ওপর থেকে মরতে শুরু করে, গাছ ফ্যাকাশে ও দুর্বল হয়ে ফল ধরার ক্ষমতা হারায়। ফলের ওপর গোলাকার কালো দাগ পড়ে, দাগের চারপাশে গাঢ় হলুদ বলয় থাকে; দাগ বড় হয়ে ফল পচিয়ে দেয় ও ঝরিয়ে ফেলে। আর্দ্র আবহাওয়া ও বেশি বৃষ্টি এ রোগ ছড়াতে সাহায্য করে। গাছের ফেলে রাখা অংশ ও বিকল্প পোষক থেকে বাতাস ও পানির মাধ্যমে, এমনকি বীজের মাধ্যমেও রোগটি ছড়ায়।
দমনের জন্য সুস্থ গাছ থেকে বীজ সংগ্রহ করতে হবে, আক্রান্ত গাছের ফেলে রাখা অংশ ধ্বংস করতে হবে, অনুমোদিত ছত্রাকনাশক দিয়ে বীজ শোধন করে বুনতে হবে, আর খেতে রোগ দেখামাত্র অনুমোদিত ছত্রাকনাশক প্রয়োগ করতে হবে।
পাতা পচা রোগ
চুয়ানিফোরা নামের ছত্রাকের আক্রমণে পাতা পচা রোগ হয়। খেতে আক্রমণ বেশি হলে পুরো ফসল নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে, তাই শুরু থেকেই সাবধান থাকতে হয়। চারা ও বয়স্ক গাছের শাখা-প্রশাখা, পাতা, ফুল ও ফল এ রোগে আক্রান্ত হয়। প্রথমে পাতায় পানিভেজা দাগ দেখা যায়, পরে দাগ বড় হয়ে আক্রান্ত অংশ বিবর্ণ ও কালচে হয়ে দ্রুত পচে যায়। অনুকূল পরিবেশে ৫ থেকে ৭ দিনের মধ্যে পুরো গাছ মরে যেতে পারে। উচ্চ তাপমাত্রা ও স্যাঁতসেঁতে আবহাওয়ায় রোগটি দ্রুত ছড়ায়, বাতাস ও আক্রান্ত অংশের মাধ্যমে। ফসলের ফেলে রাখা অংশ নষ্ট করতে হবে এবং গাছ আক্রান্ত হওয়ামাত্র অনুমোদিত ছত্রাকনাশক স্প্রে করতে হবে।
পাতা কোঁকড়ানো বা লিফ কার্ল
এই রোগের কারণ একধরনের ভাইরাস। যেকোনো বয়সের গাছ আক্রান্ত হতে পারে, তবে বয়স্ক গাছেই বেশি হয়। আক্রান্ত গাছের পাতা কুঁকড়ে যায় ও সাধারণ পাতার চেয়ে পুরু হয়, গাছের দুই গিঁটের মাঝের অংশ ছোট হয়ে গাছ খাটো হয়ে যায়, আর ফুল ও ফল ধরার ক্ষমতা কমে যায়। ভাইরাসে আক্রান্ত গাছ মরে না, কিন্তু আর কখনো স্বাভাবিকও হয় না। রোগটি ছড়ায় পোকার মাধ্যমে, বিশেষ করে রস চোষা পোকাগুলোর মাধ্যমে, আর আশপাশে বিকল্প পোষক থাকলে তা বাড়ে। দমনের জন্য আশপাশের বেগুন, টমেটোসহ সোলানেসি পরিবারের অন্যান্য পোষক আগাছা ও গাছ ধ্বংস করতে হবে এবং বাহক পোকা দমনে অনুমোদিত কীটনাশক সঠিক মাত্রায় প্রয়োগ করতে হবে। ভাইরাসের কোনো ওষুধ নেই, তাই বাহক পোকা ঠেকানোই একমাত্র ভরসা।
বালাইনাশক ব্যবহারে সতর্কতা
প্রতিটি পোকা ও রোগের শেষ উপায় হিসেবে বারবার একটি কথাই আসছে: অনুমোদিত কীটনাশক বা ছত্রাকনাশক, সঠিক মাত্রায়। এর মানে হলো সরকারের অনুমোদিত ওষুধ কিনতে হবে, প্যাকেটের গায়ে লেখা মাত্রা মেনে চলতে হবে, আর স্প্রে করার সময় মুখ ও হাত ঢেকে রাখতে হবে। মরিচ প্রায়ই কাঁচা খাওয়া হয়, তাই ওষুধ দেওয়ার পর প্যাকেটে উল্লিখিত অপেক্ষার সময় পার না করে মরিচ তোলা বা বিক্রি করা ঠিক নয়। অতিরিক্ত ওষুধ উপকারী মাকড়সা, লেডিবার্ড বিটল আর পরজীবী পোকাদেরও মেরে ফেলে, ফলে ক্ষতিকর পোকা আরও দ্রুত ফিরে আসে। কোন ওষুধ কতটা দিতে হবে, তা জানতে উপজেলা কৃষি অফিস বা কৃষি তথ্য সার্ভিসের ১৬১২৩ নম্বরের কল সেন্টারের পরামর্শ নেওয়া যায়।
মরিচ তোলা ও ফলনের হিসাব
ফুল আসার পর ১৫ থেকে ২০ দিনের মধ্যে কাঁচা মরিচ তোলা শুরু হয়। মরিচ লাল হয়ে পাকলে তুলে রোদে শুকিয়ে সংরক্ষণ করা যায়। একটি ভালোভাবে যত্ন নেওয়া খেত থেকে মৌসুমে বহুবার মরিচ তোলা যায়। প্রতি হেক্টরে কাঁচা মরিচের ফলন হয় ১০ থেকে ১১ টন, আর শুকনো মরিচের ফলন ১.৫ থেকে ২ টন।
এই হিসাবটাই মরিচ চাষের সারকথা বলে দেয়। সঠিক জাত, সময়মতো বীজতলা, মাপমতো দূরত্বে চারা, ভাগে ভাগে সার, আর পাতার নিচে নিয়মিত নজর রাখলে ছোট এই গাছ কৃষকের ঘরে বড় আয় এনে দিতে পারে। আর যে খেতে পোকা ধরা পড়ে শুরুতেই, সেখানে ওষুধও লাগে কম, খরচও কম, মরিচও থাকে নিরাপদ।
ছবি: খেতে মরিচ গাছ, Pascal Kings / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY 4.0)





মন্তব্য
(০)