২০২৬ সালের ২৯ জুন সোমবার সন্ধ্যা ৬টার দিকে ভোলার বিচ্ছিন্ন দ্বীপ উপজেলা মনপুরার মনপুরা ইউনিয়নের রামনেওয়াজ মৎস্য ঘাটে দুই কেজি ওজনের একটি রাজা ইলিশ ৯ হাজার ৩০০ টাকায় বিক্রি হয়েছে বলে সেদিন সন্ধ্যায় জাগো নিউজ জানায়। প্রকাশ্য নিলামে মাছটি কিনে নেন ঘাটের আড়তদার মমিন তালুকদার। তিনি উত্তর আমেরিকায় তখন চলমান ফুটবল বিশ্বকাপে ব্রাজিল দলের সমর্থক। পরদিন নিজের অন্যান্য ইলিশের সঙ্গে মাছটি ঢাকার নিউ মার্কেটে পাঠানোর পরিকল্পনা ছিল তাঁর।
মেঘনার জালে ধরা, রামনেওয়াজ ঘাটে নিলাম
আড়তদার মমিন তালুকদার জাগো নিউজকে জানান, দুপুরের দিকে উপজেলার কলাতলি ইউনিয়ন সংলগ্ন মেঘনা নদীতে ইসমাইল মাঝি নামের এক জেলের জালে মাছটি ধরা পড়ে। ইসমাইল মাঝি ও তাঁর সঙ্গী জেলেরা সারাদিন ট্রলার নিয়ে মাছ ধরেন। পরে সন্ধ্যা ৬টার দিকে দিনের ধরা নানা আকারের ইলিশের সঙ্গে বড় ইলিশটিও তিনি ঘাটে মমিন তালুকদারের আড়তে নিয়ে আসেন।
উপকূলের মৎস্য ঘাটগুলোর রীতি অনুযায়ী মাছটি সঙ্গে সঙ্গেই নিলামে তোলা হয়। প্রতিবেদন অনুযায়ী, সেখানে ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনার সমর্থক ১৭-১৮ জন আড়তদার এবং কয়েকজন খুচরা ক্রেতা উপস্থিত ছিলেন। নিলামে আর্জেন্টিনার সমর্থক আড়তদাররা একের পর এক দাম হাঁকাতে থাকেন। শেষ পর্যন্ত সর্বোচ্চ ৯ হাজার ৩০০ টাকা দর দিয়ে মাছটি কিনে নেন মমিন তালুকদার।
মমিন তালুকদার জানান, ৩০ জুন মঙ্গলবার দুপুরের দিকে রাজধানীতে পাঠানো অন্যান্য ইলিশের সঙ্গে রাজা ইলিশটিও ঢাকার নিউ মার্কেটে পাঠানো হবে। সেখানে মাছটি ১০ হাজার থেকে সাড়ে ১০ হাজার টাকায় বিক্রি করতে পারবেন বলে তিনি আশা করছিলেন।
ঘাটের এই ফুটবল-প্রতিযোগিতার পটভূমিও ছিল সেই সপ্তাহের। ২০২৬ সালের ফিফা বিশ্বকাপ শুরু হয় ১১ জুন। এটিই প্রথম বিশ্বকাপ, যাতে ৪৮টি দল অংশ নেয় এবং যার আয়োজক তিনটি দেশ: যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো ও কানাডা। ফাইনাল নির্ধারিত ছিল ১৯ জুলাই।

জেলা মৎস্য কর্মকর্তা যা বললেন
ভোলা জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. ইকবাল হোসেন জাগো নিউজকে বলেন, 'ইলিশের ভরা মৌসুম শুরু হয়েছে। বৃষ্টিপাতও বেড়েছে। তাই সাগর থেকে বড় বড় ইলিশ নদীতে উঠে আসছে। সেগুলো জেলেদের জালে ধরা পড়ছে।'
জাগো নিউজের প্রতিবেদনে বলা হয়, বাজারে সাধারণত দেড় কেজি থেকে শুরু করে দুই কেজি বা তার বেশি ওজনের ইলিশকে 'রাজা ইলিশ' বলা হয়। বড় আকারের ইলিশ বেশি পাওয়া যায় পদ্মা, মেঘনা ও তেঁতুলিয়ার মোহনায়। বিশেষ করে পদ্মার গভীর পানির বড় ইলিশের চাহিদা ও দাম বাজারে সবসময়ই অনেক বেশি।
বড় ইলিশের কদর কেন, গবেষকেরা তার ব্যাখ্যা দিয়েছেন। ভারতের কেন্দ্রীয় অভ্যন্তরীণ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিজ্ঞানীরা পদ্মা ও ভারতের হুগলি নদীর ইলিশ নিয়ে ২০১৮ সালে ফুড রিসার্চ ইন্টারন্যাশনাল সাময়িকীতে প্রকাশিত এক গবেষণায় ইলিশকে অনন্য স্বাদের তেলসমৃদ্ধ মাছ বলে বর্ণনা করেন। তাঁরা দেখেন, ইলিশের মাংসের পানি ধরে রাখার ক্ষমতা ৮০ শতাংশের বেশি, যা গবেষকদের মতে এর রসালো ও নরম মাংসের কারণ। আমিষের পরিমাণ পাওয়া যায় ১৮ থেকে ২১ শতাংশ, আর চর্বি হুগলির ইলিশে ৯.৯৪ শতাংশ ও পদ্মার ইলিশে ৭.৮৪ শতাংশ। উমামি ও মিষ্টি স্বাদের অ্যামিনো অ্যাসিডের প্রাধান্যও পাওয়া যায়, যা মাছটির স্বাদে ভূমিকা রাখতে পারে বলে গবেষকেরা মনে করেন। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ও পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা ২০২১ সালে হেলিয়ন সাময়িকীতে লেখেন, ইলিশের নরম গঠন ও স্বাদের মূলে আছে এর খুব বেশি চর্বি বা লিপিড, আর এই লিপিডই মাছটির সুস্বাদু হওয়ার কারণ।
দশ দিনের মধ্যে রামনেওয়াজ ঘাটে দ্বিতীয় রাজা ইলিশ
২৯ জুনের বিক্রিটি সেই মাসে একই ঘাটে প্রথম ঘটনা ছিল না। প্রথম আলো জানায়, ২০২৬ সালের ২০ জুন শনিবার ভোরে মনপুরার কলাতলীর চর এলাকার আবাসন খাল সংলগ্ন মেঘনা নদীতে ধরা পড়া একটি বড় ইলিশ রামনেওয়াজ ঘাটে আনা হলে ব্যবসায়ী, জেলে ও কৌতূহলী মানুষের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়।
মাছটির ওজন ও দাম নিয়ে প্রতিবেদনগুলোতে ভিন্নতা ছিল। যুগান্তর ২০ জুন জানায়, মাছটির ওজন দুই কেজি আটশ গ্রাম এবং তা ৯ হাজার টাকায় বিক্রি হয়েছে। প্রথম আলো যে আড়তে মাছটি নিলামে ওঠে সেই আড়তের ব্যবসায়ীকে উদ্ধৃত করে লেখে, ফেসবুকে কেউ ২ কেজি ৮০০ গ্রাম, কেউ ৩ কেজি এবং ৯ হাজার টাকায় বিক্রির কথা লিখলেও মাছটির প্রকৃত ওজন ছিল ২ কেজি ৪০০ গ্রাম, আর বিক্রি হয় ৮ হাজার ১০০ টাকায়। রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা বাসসও ২১ জুনের প্রতিবেদনে ২ কেজি ৪০০ গ্রাম ও ৮ হাজার ১০০ টাকার কথা জানায়।
ভোলা জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. ইকবাল হোসাইন প্রথম আলোকে এমন বড় মাছের জৈবিক ও মৌসুমি ব্যাখ্যা দেন। তিনি বলেন, এ আকারের ইলিশ সাধারণত বয়সে বড় হয়; ২০ জুন ধরা পড়া মাছটির বয়স দুই বছরের বেশি, এমনকি তিন বছরের কাছাকাছিও হতে পারে। মাছটির পেটে ডিম ছিল, এবং এটি ডিম ছাড়ার প্রস্তুতিতে নদীর ভেতরের দিকে উঠে আসা মাছ হতে পারে। তাঁর কথায়, ইলিশ সারা বছরই ডিম দিতে পারে, তবে ভাদ্র-আশ্বিনে বৃষ্টিপাত বাড়লে এবং নদীর পানির উচ্চতা ও স্রোত বাড়লে তারা দলে দলে আসে, তখন ডিম ছাড়ার প্রবণতাও বাড়ে।
বড় মাছের পেছনে সংরক্ষণ অভিযানের ভূমিকার কথাও বলেন তিনি। জাটকা ও মা ইলিশ রক্ষায় নদীতে নিয়মিত অভিযানের ফলে কিছু মাছ বড় হওয়ার সুযোগ পাচ্ছে বলে তিনি জানান। তবে ছোট আকারের মাছ নির্বিচারে ধরা বন্ধ না হলে ভবিষ্যতে এমন বড় ইলিশ পাওয়ার সম্ভাবনা কমে যাবে বলে সতর্ক করেন।
বাসস ২১ জুন জানায়, বঙ্গোপসাগরে ৫৮ দিনের নিষেধাজ্ঞা শেষে ভোলার সাগরগামী জেলেরা হতাশ হয়ে কূলে ফিরলেও জেলার নদীগুলোতে জেলেরা আশানুরূপ ইলিশ পাচ্ছিলেন। মেঘনা, তেঁতুলিয়া, কালাবদর, বুড়া গৌরাঙ্গ ও ইলিশা নদীতে বড় আকারের রাজা ইলিশ ধরা পড়ছিল। জেলেরা সংস্থাটিকে জানান, এসব ইলিশ আড়াই থেকে তিন কেজি ওজনের এবং প্রতি কেজির দাম হাঁকা হচ্ছিল তিন থেকে সাড়ে তিন হাজার টাকা। একই প্রতিবেদনে বলা হয়, মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে সাগর উত্তাল থাকায় সাগর-ফেরত বহু ট্রলার মনপুরার রামনেওয়াজ, হাজিরহাট, সাকুচিয়া ও পঁচা কোড়ালিয়া ঘাটে ভিড়ে ছিল।
মনপুরা ও ভোলা: ইলিশের দ্বীপজেলা
ভোলা বরিশাল বিভাগের একটি উপকূলীয় দ্বীপজেলা। বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটির জাতীয় জ্ঞানকোষ বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী জেলার আয়তন ৩,৪০৩.৪৮ বর্গকিলোমিটার। এর পূর্বে মেঘনা নদী ও শাহবাজপুর চ্যানেল, পশ্চিমে তেঁতুলিয়া নদী এবং পটুয়াখালী ও বরিশাল জেলা, আর দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর। মেঘনা ও তেঁতুলিয়া জেলার প্রধান নদী, আর জেলায় উপজেলা সাতটি।
এর মধ্যে সবচেয়ে বিচ্ছিন্ন মনপুরা, মেঘনার মোহনার একটি দ্বীপ। বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী উপজেলাটির আয়তন ৩৭৩.১৮ বর্গকিলোমিটার। এর উত্তরে তজুমদ্দিন উপজেলা, দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর, পূর্বে হাতিয়া উপজেলা এবং পশ্চিমে লালমোহন ও চরফ্যাশন উপজেলা। প্রধান নদী মেঘনা, আর উল্লেখযোগ্য জলধারা শাহবাজপুর চ্যানেল। ১৯৭০ সালের ২৫ ডিসেম্বর মনপুরা থানা গঠিত হয় এবং ১৯৮৩ সালের ৭ নভেম্বর তা উপজেলায় উন্নীত হয়। ২০১১ সালের আদমশুমারিতে উপজেলার চারটি ইউনিয়নে জনসংখ্যা ছিল ৭৬,৫৮২। ১৯৭০ সালের ১২ নভেম্বরের ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসে এখানকার বহু মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হন।
দেশের ইলিশের বড় একটি অংশ আসে ভোলার নদী ও মোহনা থেকে। ২০২৪ সালের আগস্টে তৎকালীন জেলা মৎস্য কর্মকর্তা বাসসকে জানান, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে জেলায় ১ লাখ ৮২ হাজার ৫০০ মেট্রিক টন লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে ১ লাখ ৮৪ হাজার মেট্রিক টন ইলিশ উৎপাদিত হয়, যা দেশের মোট ইলিশ উৎপাদনের ৩২ ভাগ, আর এর বাজারমূল্য ৭ থেকে ৮ হাজার কোটি টাকা। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে জেলার লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১ লাখ ৮৫ হাজার মেট্রিক টন। তিনি জানান, ভোলার ইলিশ হাতিয়া, লক্ষ্মীপুর, চাঁদপুর, বরিশাল, ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পাঠানো হয়।
জেলার বিপুলসংখ্যক মানুষের জীবিকা মাছ ধরা। দৈনিক ইত্তেফাক ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে জানায়, ভোলায় প্রায় ১ লাখ ৬৭ হাজার নিবন্ধিত জেলে এবং আরও প্রায় দুই লাখ অনিবন্ধিত জেলে রয়েছেন।

ইলিশ: জাতীয় মাছ ও তার জীবনচক্র
ইলিশের বৈজ্ঞানিক নাম টেনুয়ালোসা ইলিশা (Tenualosa ilisha)। এটি হেরিং গোত্রের ক্লুপিইডি পরিবারের মাছ এবং বাংলাদেশের জাতীয় মাছ। বাংলাপিডিয়ার বর্ণনায় মাছটির দেহ বেশ চাপা, আর দেহ ঢাকা থাকে সাজানো মাঝারি আকারের রুপালি আঁশে। দৈর্ঘ্যে ৬০ সেন্টিমিটার পর্যন্ত হতে পারে, যদিও সাধারণত ৩৫ থেকে ৪০ সেন্টিমিটারের মাছই পাওয়া যায়; বড় আকারের একটি ইলিশের ওজন প্রায় আড়াই কেজি। স্ত্রী ইলিশ দ্রুত বাড়ে এবং সাধারণত পুরুষের চেয়ে বড় হয়। ইলিশ দ্রুত সাঁতরায় এবং এক থেকে দুই বছরে প্রজননক্ষম হয়।
এই প্রজাতি সাগর, মোহনা ও নদী তিন জায়গাতেই থাকে; পারস্য উপসাগর, লোহিত সাগর ও আরব সাগর থেকে বঙ্গোপসাগর এবং ভিয়েতনাম ও চীন সাগর পর্যন্ত এর বিস্তার। বাংলাদেশে পদ্মা, যমুনা, মেঘনা, কর্ণফুলী ও উপকূলের অন্যান্য নদীতে ইলিশ পাওয়া যায়। ইলিশ অ্যানাড্রোমাস মাছ: প্রাপ্তবয়স্ক মাছ ডিম ছাড়তে সাগর থেকে মিঠা পানিতে উঠে আসে, ডিম পানিতে ভেসে বেড়ায়, পোনা নদীর খাতে বড় হয়ে খাবার ও বৃদ্ধির জন্য সাগরে নেমে যায়, তারপর প্রজননক্ষম হয়ে আবার নদীতে ফেরে। বড় একটি স্ত্রী ইলিশ ২০ লাখ পর্যন্ত ডিম দিতে পারে। বাংলাপিডিয়া বলছে, ইলিশ কমবেশি সারা বছর ডিম ছাড়ে; ফেব্রুয়ারি-মার্চে ছোট একটি এবং সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে প্রধান প্রজনন মৌসুম। মাছটির প্রধান খাবার প্লাংকটন: নীলাভ-সবুজ শৈবাল, ডায়াটম, কোপিপোড, রটিফার ও এ ধরনের অণুজীব।
ইলিশ বিষয়ক কর্মকর্তা ও বিশেষজ্ঞরা ২০২৬ সালের জুনে বিবিসি বাংলাকে বলেন, অক্টোবরে ডিম ছাড়ার পর ইলিশ ছয়-সাত মাস নদীতে থাকে, তারপর নদীর পানি ঘোলা হয়ে গেলে এপ্রিলের শেষে বা মে মাসের প্রথম সপ্তাহে সাগরে চলে যায়। তাঁদের ভাষায় ইলিশের প্রধান বিচরণ এলাকা চাঁদপুর সদর ও হাইমচর, মুন্সিগঞ্জের লৌহজং থেকে জাজিরা পর্যন্ত পদ্মা নদী, মেহেন্দীগঞ্জের গজারিয়া নদী, বরিশাল ও বরগুনার কিছু নদী এবং ভোলার তেঁতুলিয়া নদী অঞ্চল।
ইলিশ বাংলাদেশের নিবন্ধিত ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্যও। ডয়চে ভেলে ২০১৭ সালের আগস্টে জানায়, মৎস্য অধিদপ্তরের আবেদনে দুই মাসে কোনো আপত্তি না আসায় পেটেন্ট, ডিজাইন ও ট্রেডমার্কস অধিদপ্তর ইলিশকে জিআই পণ্যের স্বীকৃতি দিচ্ছে। আবেদনে মৎস্য অধিদপ্তর জানায়, ১৮২২ সাল থেকে ইলিশ বাংলাদেশের ঐতিহ্য ও কৃষ্টির সঙ্গে জড়িয়ে আছে, এবং অর্থনীতি, কর্মসংস্থান ও আমিষজাতীয় খাদ্যে এ মাছের ভূমিকা রয়েছে।

২০২৬ সালের মৌসুমের আগে দেশের ইলিশ উৎপাদন
রামনেওয়াজ ঘাটে বড় ইলিশ এমন সময়ে ধরা পড়ে, যখন দেশের মোট ইলিশ আহরণ নিয়ে উদ্বেগ ছিল। বিবিসি বাংলা ২০২৬ সালের ২২ জুন জানায়, প্রায় দুই দশক একটানা বাড়ার পর টানা তিন বছর ধরে ইলিশের উৎপাদন কমছিল, আর মাছটির গড় ওজনও কমতে শুরু করেছিল। মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী ২০০২-০৩ সময়ে দেশে ইলিশের উৎপাদন ছিল ১ লাখ ৯৯ হাজার মেট্রিক টন, এরপর থেকে গড়ে প্রতিবছর উৎপাদন বাড়ছিল। কর্মকর্তারা বিবিসিকে জানান, ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৫ লাখ ৭১ হাজার মেট্রিক টন, ২০২৩-২৪ সালে ৫ লাখ ২৯ হাজার মেট্রিক টন এবং ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৫ লাখ ৪ হাজার মেট্রিক টন ইলিশ উৎপাদিত হয়। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের আনুষ্ঠানিক হিসাব তখনো পাওয়া না গেলেও কর্মকর্তাদের ধারণায় উৎপাদন ৫ লাখ টনেরও কম।
মৎস্য অধিদপ্তরের ইলিশসম্পদ উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা প্রকল্পের পরিচালক বিবিসিকে বলেন, প্রজনন মৌসুমে ইলিশ ধরা বন্ধ রাখাসহ নানা পদক্ষেপের কারণে উৎপাদন ক্রমাগত বাড়ছিল, কিন্তু ২০২২-২৩ অর্থবছর থেকে তা হোঁচট খেতে শুরু করে। তিনি জানান, বড় ইলিশ মাঝেমধ্যে পাওয়া গেলেও এখন কম ওজনের ইলিশই বেশি আসছে। তাঁর মতে, উৎপাদন কমার প্রধান কারণ নদীর নাব্যতা সংকট ও দূষণ; চর পড়ে ইলিশের চলাচলের পথ, প্রজনন ক্ষেত্র ও নার্সারি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, আর নদী থেকে সাগরে যাওয়ার পথে মোহনায় ছোট ইলিশ ধরা পড়ছে। একই প্রতিবেদনে বিশেষজ্ঞরা বলেন, নদীতে কারেন্ট জাল দিয়ে ছোট ইলিশ ধরা হচ্ছে, আর সাগরে বাণিজ্যিক ট্রলারগুলোর বিরুদ্ধে ৪০ মিটারের কম গভীরতায় এসে ছোট ইলিশ ধরার অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে।
বিবিসির উদ্ধৃত বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট মৎস্য উৎপাদনের প্রায় ১২ শতাংশ আসে ইলিশ থেকে, আর পৃথিবীর মোট ইলিশের প্রায় ৬০ ভাগ উৎপন্ন হয় বাংলাদেশে; মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় এই হিস্যা ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ বলে থাকে। ২০১৮ সালে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীরা মাছটির পূর্ণাঙ্গ জীবনরহস্য বা জিনোম উন্মোচনের কথা জানান।
ঘাটতির সঙ্গে দামও বাড়ছিল। বিবিসির প্রতিবেদনের আগের সপ্তাহে চাঁদপুরের আড়তে একজন ক্রেতা ৯০০ থেকে ৯৫০ গ্রাম ওজনের ইলিশ কেজিপ্রতি প্রায় সাড়ে তিন হাজার টাকায় কেনার কথা জানান, আর ঢাকার কারওয়ান বাজারে ৮০০ থেকে ৯০০ গ্রামের ইলিশের কেজিপ্রতি দাম গড়ে দুই হাজার টাকার বেশি চাওয়া হচ্ছিল।
২০২৫-২৬ মৌসুমে কার্যকর মাছ ধরার নিষেধাজ্ঞা
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় ও মৎস্য অধিদপ্তর বছরজুড়ে ধাপে ধাপে নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে ইলিশ রক্ষা করে। মনপুরার বিক্রির সময় ২০২৫-২৬ মৌসুমের চিত্র ছিল এমন।
- মা ইলিশ রক্ষায় নিষেধাজ্ঞা: প্রধান প্রজনন মৌসুমে প্রজননক্ষম ইলিশ রক্ষায় ২০২৫ সালের ৪ থেকে ২৫ অক্টোবর পর্যন্ত ২২ দিন নদী ও সাগরে ইলিশ ধরা, পরিবহন, মজুত ও বিক্রি নিষিদ্ধ ছিল বলে বাংলা ট্রিবিউন জানায়।
- জাটকা নিষেধাজ্ঞা: ২০২৫ সালের ১ নভেম্বর থেকে ২০২৬ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত সারা দেশে ২৫ সেন্টিমিটারের ছোট ইলিশ বা জাটকা আহরণ, পরিবহন, বাজারজাতকরণ, ক্রয়-বিক্রয় ও মজুত নিষিদ্ধ ছিল। মন্ত্রণালয় জানায়, এ নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘন করলে অনধিক দুই বছরের সশ্রম কারাদণ্ড, অনধিক ৫ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড হতে পারে। মনপুরায় বিক্রির দিনও এ নিষেধাজ্ঞা বহাল ছিল।
- ভোলার অভয়াশ্রম: জাটকা বড় হওয়া ও অন্যান্য মাছের প্রজননের সুযোগ দিতে ২০২৬ সালের ১ মার্চ থেকে ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত টানা ৬১ দিন ভোলার মেঘনা ও তেঁতুলিয়া নদীর মোট ১৯০ কিলোমিটার এলাকায় সব ধরনের মাছ ধরা নিষিদ্ধ ছিল বলে ইত্তেফাক জানায়।
- জাটকা সংরক্ষণ সপ্তাহ: 'জাটকা ধরা থামাই যদি, ইলিশে ভরবে সাগর-নদী' প্রতিপাদ্যে ২০২৬ সালের ৭ থেকে ১৩ এপ্রিল দেশের ইলিশসমৃদ্ধ ২০টি জেলায় জাটকা সংরক্ষণ সপ্তাহ পালনের কথা ৬ এপ্রিল জানায় মন্ত্রণালয়।
- বঙ্গোপসাগরে নিষেধাজ্ঞা: ২০২৬ সালের ১৫ এপ্রিল থেকে ১১ জুন পর্যন্ত ৫৮ দিন বঙ্গোপসাগর ও তৎসংলগ্ন এলাকায় সব ধরনের মাছ ধরা নিষিদ্ধ ছিল। বাসস জানায়, ১১ জুন দিনগত রাত থেকে ভোলার সাগরগামী জেলেরা আবার সাগরে নামেন।
সাগরের নিষেধাজ্ঞার সময়সীমা আগে ভিন্ন ছিল। বিবিসি বাংলা জানায়, ২০১৫ সাল থেকে প্রতিবছর ২০ মে থেকে ২৩ জুলাই পর্যন্ত বঙ্গোপসাগরে মাছ ধরায় নিষেধাজ্ঞা দিত সরকার; ২০২৫ সাল থেকে নতুন সময়সীমা হয় ১৫ এপ্রিল থেকে ১১ জুন। একই প্রতিবেদন অনুযায়ী দেশে ইলিশের অভয়াশ্রম পাঁচটি: দুটি পদ্মা ও মেঘনায়, আর একটি করে তেঁতুলিয়া, গজারিয়া ও কালাবদর নদীতে; কলাপাড়ার আন্ধারমানিক নদীতে একটি অভয়াশ্রম থাকলেও সেটি আর কার্যকর নেই।
নিষেধাজ্ঞা শেষ হলে ভোলার জেলেদের মূল মৌসুম শুরু হয়। মৎস্য বিভাগ ২০২৬ সালের ১১ জুন বাসসকে জানায়, বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা ছাড়া সাগরে নিষেধাজ্ঞার সময় ভোলায় অভিযান সফল হয়েছে, আর এর ফলে ইলিশের উৎপাদন আগের বছরের চেয়ে অনেক বাড়বে বলে তারা আশা করছে। জেলা মৎস্য কর্মকর্তা সংস্থাটিকে বলেন, সমুদ্রসীমার ভিত্তিরেখা থেকে দুইশ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত বিস্তৃত বঙ্গোপসাগরে বাংলাদেশের একচ্ছত্র অর্থনৈতিক অঞ্চলে এবার জেলেদের বিপুল পরিমাণে ইলিশ ও অন্যান্য মাছ আহরণের সম্ভাবনা আছে, এবং ভোলা উপকূলের জেলেরা যাতে নির্বিঘ্নে মাছ ধরতে পারেন সেজন্য সরকার তাঁদের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা দেবে।
ছবি: ফাহাদ ফয়সাল / উইকিমিডিয়া কমন্স (সিসি বাই-এসএ ৪.০)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, প্রথম আলো, যুগান্তর, বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস), বিবিসি বাংলা, বাংলা ট্রিবিউন, দৈনিক ইত্তেফাক, ডয়চে ভেলে বাংলা, বাংলাপিডিয়া (বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি), এস. গাঙ্গুলী ও সহকর্মী, ফুড রিসার্চ ইন্টারন্যাশনাল (২০১৮), এ. এ. নওশাদ ও সহকর্মী, হেলিয়ন (২০২১), উইকিপিডিয়া (২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপ)।





মন্তব্য
(০)