কিশোরগঞ্জের ভৈরবে আমন ধানের খেতে পোকা শনাক্ত করতে আলোক ফাঁদ বসাচ্ছে কৃষি বিভাগ। ফাঁদ দেখতে কৃষকেরা ভিড় করছেন, কর্মকর্তাদের কথাও শুনছেন। কিন্তু ফাঁদের তথ্য দেখে কীটনাশক না দেওয়ার যে পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে, তাতে অনেকেই ভরসা পাচ্ছেন না।
আলোক ফাঁদ হলো রাতে আলো জ্বেলে রাখা একটি সহজ ব্যবস্থা। আলোর প্রতি আকৃষ্ট হয়ে মাজরা পোকা, পামরি পোকা, পাতা মোড়ানো পোকার মতো ক্ষতিকর পোকা উড়ে এসে ধরা পড়ে। কোন পোকা কতটা আছে তা দেখে ঠিক করা হয় খেতে কী করণীয়। কম খরচের ও পরিবেশবান্ধব পদ্ধতি হিসেবে এটি পরিচিত।
উপজেলা কৃষি কার্যালয় জানায়, চলতি মৌসুমে ভৈরবে ২ হাজার ৪৬৫ হেক্টর জমিতে রোপা আমন হয়েছে। পোকা পর্যবেক্ষণে ২২টি ব্লকে ২২০টি ফাঁদের কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে, এর মধ্যে ১৭৫টি বসানো হয়েছে। প্রতিটি ফাঁদ ২০ হেক্টর জমির পর্যবেক্ষণ দেয়; একবারে এক থেকে দেড় ঘণ্টা ফাঁদ বসানো হয়, একই জায়গায় দ্বিতীয়বার নয়।
গত মঙ্গলবার সন্ধ্যায় পৌরসভা ব্লকের দড়িচন্ডিবের এলাকার এক ফাঁদে ২টি মাজরা পোকা, ৩টি পাতা মোড়ানো পোকা, ৩টি সবুজ পাতা ফড়িং ও ২৫টি খাটো ঘাসফড়িং ধরা পড়ে। কিছু উপকারী পোকাও মেলে, তবে ধানের বড় শত্রু বাদামি গাছফড়িং পাওয়া যায়নি। কর্মকর্তারা তাই আপাতত কীটনাশক না দিয়ে পার্চিং করতে বলেন, অর্থাৎ খেতে কঞ্চি বা ডাল পুঁতে পোকাখেকো পাখির বসার ব্যবস্থা।
সেখানে উপস্থিত কৃষক মুরাদ মিয়া এবার ৬৫ শতাংশ জমিতে আমন করেছেন। তাঁর প্রশ্ন, বিষ না দিলে ধান রক্ষা হবে কীভাবে। ৩৫ শতাংশ জমির চাষি জহির মিয়া বলেন, "আবার যদি সব ধান খাইয়া ফেলে?" ভিন্ন অভিজ্ঞতার কথা জানান নবী হোসেন: আগে ৭০ শতাংশ জমিতে প্রায় আড়াই হাজার টাকার কীটনাশক লাগত, পরামর্শ মেনে এবার লেগেছে ৮০০ টাকার, আর এখন পর্যন্ত ধান ভালো আছে।
উপসহকারী উদ্ভিদ সংরক্ষণ কর্মকর্তা মিজানুর রহমান বলেন, কৃষকদের আগ্রহ আছে, কিন্তু সময়মতো বিষ না দিলে ফসল নষ্ট হওয়ার ভয় থেকে অনেকে পরামর্শে আস্থা রাখতে পারেন না। ঝগড়ারচর ব্লকের উপসহকারী কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা চন্দন কুমার সূত্রধরের মতে, ফাঁদের সুফল কৃষকের চোখে সরাসরি ধরা পড়ে না বলেই সংশয় থাকে। কর্মকর্তারা এটাও মানেন, ফাঁদে কোনো পোকা না এলেই আশপাশের জমিতে তা নেই, এমন নিশ্চিত বলা যায় না।
ফাঁদ থেকে পাওয়া তথ্য ব্লকের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তারা নথিভুক্ত করেন, বিশ্লেষণ করে জেলা কার্যালয়ে প্রতিবেদন পাঠানো হয়। চলতি বছরের কোনো ফাঁদেই বাদামি গাছফড়িং পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছে কৃষি বিভাগ। কম কীটনাশকে ধান রক্ষার এই পদ্ধতিতে কৃষকের আস্থা ফেরানোই এখন কৃষি বিভাগের সামনে মূল কাজ।
প্রতিবেদনটি প্রথম আলোর ভৈরব প্রতিনিধি সুমন মোল্লার খবরের ভিত্তিতে লেখা।
ছবি: রাতে আলো জ্বেলে পোকা ধরার ফাঁদ, Forest & Kim Starr / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY 3.0)
সূত্র: প্রথম আলো





মন্তব্য
(০)