বান্দরবানের কোনো পাহাড়ি ঢালে শীতের সকালে গেলে এখন এক নতুন দৃশ্য চোখে পড়ে। সবুজ ঝোপের মতো গাছের ডালে থোকায় থোকায় লাল টুকটুকে ফল, আর ঝুড়ি হাতে সেই ফল তুলছেন পাহাড়ি নারী-পুরুষ। ফলগুলো দেখতে চেরির মতো, কিন্তু খাওয়ার জন্য নয়। এর ভেতরের বীজ শুকিয়ে, ভেজে, গুঁড়া করে তৈরি হয় কফি। কয়েক বছর আগেও যে পানীয়কে বাংলাদেশে বিদেশি জিনিস ভাবা হতো, তার কাঁচামাল এখন জন্মাচ্ছে দেশের পাহাড়েই।
সারা বিশ্বে কফি চাষ কৃষকের জন্য অর্থনৈতিক উন্নতির বড় একটি পথ। কফি শুধু একটি সুস্বাদু পানীয় নয়, এটি বিশ্ববাজারে অত্যন্ত চাহিদাসম্পন্ন পণ্য। বাংলাদেশে এর চাষ এখনো নতুন, কিন্তু দ্রুত বাড়ছে। এই প্রতিবেদনে দেখা যাক কফি চাষের অর্থনৈতিক, পরিবেশগত, সামাজিক ও স্বাস্থ্যগত উপকারিতা কী, দেশে এর বর্তমান অবস্থা কেমন, আর সামনে কোন সম্ভাবনা ও ঝুঁকি অপেক্ষা করছে।
বিশ্বের কফি মানচিত্র
কফির জন্মস্থান আফ্রিকার ইথিওপিয়া। সেখান থেকে এটি ছড়িয়েছে আরব দেশে, তারপর এশিয়া, ইউরোপ আর লাতিন আমেরিকায়। আজ বিশ্বের সবচেয়ে বড় কফি উৎপাদনকারী দেশ ব্রাজিল, দ্বিতীয় ভিয়েতনাম, তৃতীয় কলম্বিয়া। ইন্দোনেশিয়া, ইথিওপিয়া, ভারত, মেক্সিকো, গুয়াতেমালা, কোস্টারিকা ও কেনিয়াও কফির জন্য পরিচিত নাম। এসব দেশের লাখো ক্ষুদ্র কৃষক কফি বিক্রির আয়ে সংসার চালান। প্রতিবেশী ভারতের দক্ষিণাঞ্চলের কর্ণাটক ও কেরালার পাহাড়ে বড় বড় গাছের ছায়ায় কফি বাগান বহু পুরোনো, আর উত্তর-পূর্ব ভারতের মিজোরাম ও ত্রিপুরাতেও কফির চাষ হয়। বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রামের আবহাওয়া ও ভূপ্রকৃতি এই প্রতিবেশী পাহাড়ি অঞ্চলগুলোর সঙ্গে অনেকটাই মেলে, যা দেশে কফি চাষের সম্ভাবনার একটি বড় যুক্তি।
আন্তর্জাতিক কফি সংস্থার (আইসিও) হিসাবে ২০২৩-২৪ মৌসুমে বিশ্বে কফি উৎপাদন হয়েছে প্রায় ১৭ কোটি ৮০ লাখ বস্তা, যার প্রতিটি বস্তার ওজন ৬০ কেজি। এর প্রায় ৫৭ শতাংশ অ্যারাবিকা, বাকিটা রোবাস্টা জাতের। অ্যারাবিকা সাধারণত উঁচু ও ঠান্ডা জায়গায় ভালো হয়, স্বাদ ও গন্ধ কোমল, দামও বেশি। রোবাস্টা তুলনামূলক নিচু ও গরম জায়গায় জন্মায়, স্বাদ কড়া, ক্যাফেইন বেশি, আর রোগবালাই সহ্য করার ক্ষমতাও বেশি। বাংলাদেশের পাহাড়ে দুই জাতেরই চাষ হচ্ছে।
কফি চাষের অর্থনৈতিক উপকারিতা
উচ্চ আয়ের সুযোগ: কফি একটি উচ্চমূল্যের ফসল। সঠিক পরিচর্যা ও উন্নত পদ্ধতি মেনে চাষ করলে প্রতি বছর ভালো মুনাফা করা সম্ভব। বিশ্ববাজারে কফির দাম প্রতিযোগিতামূলক, আর স্থানীয় বাজারে বিক্রির পাশাপাশি রপ্তানির মাধ্যমেও আয় বাড়ানোর সুযোগ আছে।
দেশের বাজারে দামের পার্থক্যটা লক্ষ করার মতো। দ্য ডেইলি স্টারে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে প্রকাশিত এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, কাঁচা কফি বিক্রি হচ্ছে কেজিপ্রতি ৩৫০ থেকে ৪০০ টাকায়, আর প্রক্রিয়াজাত কফি বিন বিক্রি হচ্ছে কেজিপ্রতি ১ হাজার ২০০ থেকে ২ হাজার টাকায়। অর্থাৎ কৃষক যদি শুধু ফল বিক্রি না করে শুকানো, খোসা ছাড়ানো আর ভাজার মতো প্রক্রিয়াজাতকরণের কাজ নিজে বা সমবায়ের মাধ্যমে করতে পারেন, তাহলে একই ফসল থেকে অনেক বেশি আয় সম্ভব।
বাণিজ্যিক প্রসারের সম্ভাবনা: কফি বিশ্বের সবচেয়ে বেশি কেনাবেচা হওয়া কৃষিপণ্যগুলোর একটি। উন্নত মানের কফি উৎপাদন করতে পারলে আন্তর্জাতিক বাজারে নিজস্ব ব্র্যান্ড গড়ে তোলার সুযোগ আছে। ইথিওপিয়ার ইয়ারগাচেফ বা কলম্বিয়ার কফির মতো অনেক কফি তার উৎপত্তিস্থলের নামেই পরিচিত। দেশের ভেতরেও এই কাজ শুরু হয়েছে; দেশি কয়েকটি রোস্টার প্রতিষ্ঠান পার্বত্য চট্টগ্রামের কৃষকের কাছ থেকে সরাসরি কফি কিনে পাহাড়ের নামে ব্লেন্ড বাজারে এনেছে।
নতুন কর্মসংস্থান: কফি চাষ কৃষিশ্রমিকদের জন্য কাজ তৈরি করে। নার্সারিতে চারা তৈরি, বাগানে চারা রোপণ, আগাছা পরিষ্কার, ফল তোলা, শুকানো, খোসা ছাড়ানো, বাছাই, ভাজা আর প্যাকেট করা, প্রতিটি ধাপে কাজের সুযোগ। কফির ফল একসঙ্গে পাকে না, তাই পাকা ফল বেছে বেছে কয়েক দফায় তুলতে হয়। এই কাজে অনেক হাত লাগে।
পরিবেশের জন্য কী সুফল
মাটির মান রক্ষা: কফি বহুবর্ষজীবী গাছ, একবার লাগালে বহু বছর ফল দেয়। প্রতি বছর জমি চাষ করতে হয় না বলে পাহাড়ের মাটি কম আলগা হয়। কফি গাছের শিকড় মাটি আঁকড়ে ধরে ভূমিক্ষয় রোধ করে, আর ঝরা পাতা মাটিতে মিশে জৈব পদার্থ বাড়ায়, মাটির জীববৈচিত্র্য উন্নত করে। পাহাড়ি অঞ্চলে যেখানে বৃষ্টিতে ঢালের মাটি ধুয়ে যাওয়া বড় সমস্যা, সেখানে এই গুণের মূল্য অনেক।
জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় সহায়তা: কফি সাধারণত বড় ছায়াগাছের নিচে চাষ করা হয়। ছায়াযুক্ত এই চাষে কফি গাছ আর ছায়াগাছ মিলে বাতাস থেকে কার্বন শোষণ করে কাঠ ও পাতায় জমা রাখে। ছায়াগাছ বাগানের তাপমাত্রাও কিছুটা কমিয়ে রাখে, যা কফি গাছের জন্য ভালো, আশপাশের পরিবেশের জন্যও।
পানি ব্যবস্থাপনা: কফি বাগান মাটির পানি ধরে রাখার ক্ষমতা বাড়ায়। ঝরা পাতার আস্তরণ আর গাছের শিকড় বৃষ্টির পানিকে দ্রুত গড়িয়ে যেতে না দিয়ে মাটিতে ঢোকার সুযোগ দেয়। এতে শুকনো মৌসুমেও মাটিতে কিছুটা আর্দ্রতা থাকে, পানির সাশ্রয় হয়।
সমাজে কী পরিবর্তন আনতে পারে
কৃষকের জীবনমান: কফি চাষে কৃষক একটি স্থায়ী আয়ের উৎস পান। পাহাড়ে অনেক পরিবার এখনো জুম চাষের ওপর নির্ভরশীল, যার ফলন অনিশ্চিত। কফির মতো বহুবর্ষজীবী অর্থকরী ফসল সেই অনিশ্চয়তা কিছুটা কমাতে পারে। জুম চাষে পাহাড়ের ঢালের জঙ্গল কেটে পুড়িয়ে এক বা দুই বছর ধান, মরিচ, তিল, সবজি একসঙ্গে চাষ করা হয়, তারপর জমি কয়েক বছর ফেলে রেখে অন্য ঢালে সরে যেতে হয়। জনসংখ্যা বাড়ায় এখন জমি ফেলে রাখার সময় কমে গেছে, ফলে মাটির উর্বরতাও কমছে। একই জমিতে বহু বছর টিকে থাকা কফি বাগান সেখানে একটি স্থায়ী বিকল্প হতে পারে। দ্য ডেইলি স্টারের ওই প্রতিবেদনে বান্দরবানের এক কৃষক মাংপং ম্রোর কথা এসেছে, যিনি ৬০০টি কফির চারা লাগিয়েছিলেন। প্রতিবেদন অনুযায়ী তাঁর বার্ষিক আয় ২ হাজার ৫০০ টাকা থেকে বেড়ে প্রায় ৪০ হাজার টাকায় পৌঁছেছে।
স্থানীয় অর্থনীতি: কফি চাষ ঘিরে স্থানীয় বাজারে চারা, সার, সরঞ্জাম আর পরিবহনের চাহিদা বাড়ে। প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্র, ছোট কারখানা আর কফির দোকান গড়ে উঠলে সেখানেও কাজ তৈরি হয়।
নারী ও তরুণদের ক্ষমতায়ন: কফি চাষের বিভিন্ন স্তরে নারী ও তরুণদের যুক্ত করে তাঁদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করা সম্ভব। ফল তোলা, বাছাই আর প্রক্রিয়াজাতকরণের মতো কাজে নারীরা ইতিমধ্যে বড় ভূমিকা রাখছেন। শিক্ষিত তরুণেরা কফি ভাজা, ব্র্যান্ডিং আর অনলাইনে বিক্রির মতো কাজে নতুন উদ্যোগ নিতে পারেন।
কফি ও স্বাস্থ্য
কফি শুধু একটি বাণিজ্যিক পণ্য নয়, পরিমিত পান করলে এটি মানুষের স্বাস্থ্যের জন্যও উপকারী হতে পারে। প্রধান দিকগুলো হলো:
- কফি অ্যান্টিঅক্সিডেন্টে সমৃদ্ধ, যা শরীরের ক্ষতিকর ফ্রি র্যাডিক্যাল কমাতে সাহায্য করে।
- কফি মনকে সতেজ রাখে, মনোযোগ ও উদ্যম বাড়ায়।
- পরিমিত ও নিয়মিত কফি পান হৃদ্যন্ত্রের স্বাস্থ্যের জন্য ভালো বলে বিবেচিত।
তবে পরিমিতিই আসল কথা। যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসন (এফডিএ) বলছে, সুস্থ প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য দিনে ৪০০ মিলিগ্রাম পর্যন্ত ক্যাফেইন সাধারণত ক্ষতিকর নয়, যা মোটামুটি চার থেকে পাঁচ কাপ কফির সমান। গর্ভবতী নারী, হৃদ্রোগী বা যাঁদের ঘুমের সমস্যা আছে, তাঁদের চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে কফি পান করা উচিত। আর চিনি ও ক্রিম বেশি মেশালে কফির উপকারিতার চেয়ে ক্ষতিই বেশি হতে পারে। মনে রাখা দরকার, চা, কোমল পানীয় আর চকলেটেও ক্যাফেইন থাকে, তাই দিনের মোট হিসাবটা এসব মিলিয়েই করতে হয়। সন্ধ্যার পর কফি পান করলে অনেকের ঘুমে ব্যাঘাত ঘটে, তাই সকালে বা দুপুরে পান করাই ভালো।
বাংলাদেশে কফির যাত্রা
বাংলাদেশে কফি চাষ একেবারে নতুন নয়, তবে সম্প্রতি এটি গতি পেয়েছে। দ্য ডেইলি স্টারের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত শতকের পঞ্চাশের দশকে ভারতের মিজোরাম থেকে অ্যারাবিকা জাতের কফি পার্বত্য চট্টগ্রামে আসে, পরে ত্রিপুরা থেকে আসে রোবাস্টা। ২০০১ সালে খাগড়াছড়ি কৃষি গবেষণা কেন্দ্রের মাধ্যমে সংগঠিত চাষ শুরু হয়।
উৎপাদনের সাম্প্রতিক বৃদ্ধি চোখে পড়ার মতো। একই প্রতিবেদন অনুযায়ী ২০২১ সালে দেশে ১২০ হেক্টর জমিতে কফি উৎপাদন হয়েছিল ৩৫ টন। ২০২৫ সালে জমি বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ২ হাজার হেক্টরে, উৎপাদন ৯৫ টনে। এর মধ্যে শুধু বান্দরবানেই উৎপাদন হয়েছে প্রায় ১৬ টন। সরকারের লক্ষ্য ২০৩০ সালের মধ্যে উৎপাদন ১ হাজার ৫০০ টনে তোলা।
এই বৃদ্ধির পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) কাজুবাদাম ও কফি গবেষণা, উন্নয়ন ও সম্প্রসারণ প্রকল্প। প্রকল্পটি ২০২১ সালে শুরু হয়। দ্য ডেইলি স্টারের হিসাবে এর ব্যয় ২১১ কোটি টাকা। প্রকল্পের আওতায় ২ হাজারের বেশি প্রান্তিক কৃষককে সহায়তা দেওয়া হয়েছে, আর প্রশিক্ষণ পেয়েছেন প্রায় ৪৯ হাজার ৫০০ কৃষক। বান্দরবানে প্রকল্পের আওতায় কফির প্রদর্শনী বাগানও করা হয়েছে।
কোথায় হচ্ছে কফি
বাংলাদেশের পাহাড়ি অঞ্চলগুলোতে কফি চাষের উপযোগী পরিবেশ রয়েছে। মূল তিনটি এলাকা হলো:
- বান্দরবান: দেশের কফি চাষের সবচেয়ে বড় কেন্দ্র।
- রাঙামাটি: পাহাড়ি ঢাল আর বনের ছায়ায় চাষের সুযোগ।
- খাগড়াছড়ি: এখানকার কৃষি গবেষণা কেন্দ্র থেকেই সংগঠিত চাষের শুরু।
পাহাড়ের বাইরেও চাষ ছড়াচ্ছে। দ্য ডেইলি স্টারের প্রতিবেদন অনুযায়ী ২০২১ সাল থেকে সিলেটের গোলাপগঞ্জ ও বিয়ানীবাজারে কফি চাষ হচ্ছে, আর রংপুর, নীলফামারী, টাঙ্গাইলের মধুপুর গড় ও শেরপুরেও এর বিস্তার ঘটছে। পাহাড়ের ঢালে পানি জমে না, মাটি ঝুরঝুরে, আবার বড় গাছের ছায়াও মেলে; কফির জন্য এগুলো উপযোগী পরিবেশ।
বাগান করতে যা জানা দরকার
কফি বাগান শুরু করার আগে মাটি, আবহাওয়া আর চাষের নিয়ম জানা জরুরি। কৃষি তথ্য সার্ভিসের (এআইএস) মাসিক পত্রিকা কৃষিকথায় ২০২২ সালের জানুয়ারিতে রাঙামাটির আঞ্চলিক কৃষি তথ্য কর্মকর্তা কৃষিবিদ প্রসেনজিৎ মিস্ত্রী বাণিজ্যিক কফি চাষের একটি বিস্তারিত নির্দেশনা দিয়েছেন। সেখান থেকে মূল কথাগুলো এ রকম।
মাটি ও আবহাওয়া: জৈব পদার্থসমৃদ্ধ, সামান্য অম্লীয় বেলে দোআঁশ মাটি কফির জন্য ভালো, যার পিএইচ ৬.০ থেকে ৬.৫। বছরে অন্তত ১২৫ সেন্টিমিটার বৃষ্টি দরকার। উষ্ণ ও আর্দ্র আবহাওয়ায় গাছ ভালো বাড়ে, তবে ফল পাকার সময় শুকনো আবহাওয়া দরকার। পাহাড়ের ঢাল আর উপত্যকা উপযোগী, কিন্তু যেখানে পানি জমে, সেখানে কফি লাগানো ঠিক নয়।
চারা রোপণ: বর্ষার শুরুতে মে থেকে জুন মাস চারা লাগানোর উপযুক্ত সময়। সাধারণত ১৬ থেকে ১৮ মাস বয়সী চারা লাগানো হয়। প্রতিটি চারার জন্য ৪৫ সেন্টিমিটার লম্বা, চওড়া ও গভীর গর্ত করতে হয়। অ্যারাবিকার জন্য গাছ থেকে গাছের দূরত্ব ২ থেকে আড়াই মিটার, আর রোবাস্টার জন্য আড়াই থেকে ৪ মিটার। শুরুতে ঘন করে লাগিয়ে দুই থেকে তিন বছর পর পাতলা করে দেওয়ার পদ্ধতিও চলে।
ছাঁটাই ও পরিচর্যা: বেশি ডালপালা ছড়ানোর জন্য অ্যারাবিকা গাছের আগা প্রায় ৭৫ সেন্টিমিটার উচ্চতায় আর রোবাস্টার আগা প্রায় ১১৫ সেন্টিমিটার উচ্চতায় কেটে দেওয়া হয়। গাছের সুস্থতার জন্য ছায়াগাছ দরকার। সার দিতে হয় গাছের গোড়া থেকে প্রায় ৩০ সেন্টিমিটার দূরে নালা করে। প্রতি তিন থেকে চার বছর পর ফল তোলা শেষ হলে বড় ধরনের ছাঁটাই করতে হয়।
ফুল থেকে ফল: ফুল ফোটা থেকে ফল পাকতে অ্যারাবিকায় ৮ থেকে ৯ মাস, রোবাস্টায় ১০ থেকে ১১ মাস লাগে। ফল তোলার মৌসুম নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি। একই গাছ থেকে ১০ থেকে ১৫ দিনের ব্যবধানে ৪ থেকে ৬ বারে হাতে পাকা ফল তুলতে হয়। রোপণের তৃতীয় বছর থেকে ফলন শুরু হয়, আর হেক্টরপ্রতি ফলন হতে পারে ৭৫০ থেকে ১ হাজার কেজি।
প্রক্রিয়াজাতকরণ: কফি প্রক্রিয়াজাত করার দুটি প্রচলিত পদ্ধতি আছে। ভেজা পদ্ধতিতে ফল তোলার পরপরই ওপরের নরম খোসা ও শাঁস ছাড়িয়ে বীজ প্রায় ২৪ ঘণ্টা গাঁজন বা ফারমেন্টেশনের জন্য রাখা হয়, তারপর ভালোভাবে ধুয়ে ৭ থেকে ১০ দিন রোদে শুকানো হয়। শুকনো পদ্ধতিতে পুরো ফল পরিষ্কার মেঝেতে ১২ থেকে ১৫ দিন রোদে শুকানো হয়। কোন পদ্ধতিতে প্রক্রিয়াজাত হলো, তার ওপর কফির স্বাদ অনেকটা নির্ভর করে।
বাজার গড়ছেন যাঁরা
উৎপাদন বাড়লেই হবে না, কফির জন্য বাজারও দরকার। সেই বাজার ধীরে ধীরে তৈরি হচ্ছে। দ্য ডেইলি স্টারের প্রতিবেদন অনুযায়ী দেশে কফির বাজার এখন প্রায় ৬০০ কোটি টাকার। শহরের বিশেষায়িত কফির দোকানে এক কাপ কফির দাম ৫০ থেকে ২৭০ টাকা, আর ২৫০ থেকে ৪০০ গ্রামের এক প্যাকেট দেশি কফি বিক্রি হচ্ছে ৮৯০ থেকে ১ হাজার ৪২৫ টাকায়।
পাহাড়ের কফি কিনতে এগিয়ে এসেছে বড় প্রতিষ্ঠানও। প্রতিবেদনে আবুল খায়ের গ্রুপ ও প্রাণ-আরএফএল গ্রুপকে বাণিজ্যিক ক্রেতা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। হেলেন কেলার ইন্টারন্যাশনাল ও পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশনের (পিকেএসএফ) মতো সংস্থাও কৃষকদের সহায়তা করছে। কফি প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানায় ২ হাজার থেকে ৩ হাজার ২০০ জনের কাজের সুযোগ তৈরির কথাও প্রতিবেদনে এসেছে।
স্থানীয় উদ্যোক্তারাও নিজেদের পথ তৈরি করছেন। বান্দরবানের চিং অং খুমী ফুরোমন কফি নামে একটি উদ্যোগ চালান; পাঁচ একরের বাগানে তাঁর ৩ হাজার কফি গাছ আছে। দ্য ডেইলি স্টারকে তিনি বলেছেন, তাঁদের লক্ষ্য শুধু কফি উৎপাদন নয়, পাহাড়ের কৃষকদের জন্য একটি টেকসই বাজার গড়ে তোলা। একই প্রতিবেদনে রিতলাং ম্রো নামে আরেক কৃষকের কথা আছে, যিনি ৭০০টি গাছ লাগিয়েছেন; আগের বছর ২০ কেজি কফি পেয়েছিলেন, এ বছর আশা করছেন এক মণ।
সরকারের পরিকল্পনাও বড়। পার্বত্য চট্টগ্রামের বাইরে ১৯টি জেলার ৪৫টি উপজেলায় কফি চাষ ছড়িয়ে দেওয়ার লক্ষ্য রয়েছে। ২০৩০ সালের ১ হাজার ৫০০ টনের লক্ষ্য পূরণ হলে প্রতিবেদনের হিসাবে এর বাজারমূল্য দাঁড়াবে প্রায় ৩০ কোটি টাকা।
ধৈর্যের ফসল
কফি চাষ দ্রুত লাভের ব্যবসা নয়। চারা লাগানোর পর প্রথম ফল পেতে সাধারণত তিন বছরের মতো অপেক্ষা করতে হয়। এই সময়ে বাগানের পরিচর্যা, আগাছা পরিষ্কার, ছায়াগাছের ব্যবস্থাপনা আর সারের খরচ চলতে থাকে, অথচ আয় আসে না। তাই যাঁরা কফি চাষ শুরু করতে চান, তাঁদের প্রথম কয়েক বছরের খরচের জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে। এই সময়ে বাগানের ফাঁকে আদা, হলুদের মতো ছায়া সইতে পারা সাথি ফসল চাষ করে কিছু আয়ের কথা ভাবা যায়।
ফলন বাড়াতে উন্নত জাতের বীজ বা চারা ব্যবহার এবং প্রশিক্ষণ জরুরি। কখন ফল তুলতে হবে, কীভাবে শুকাতে হবে, কীভাবে সংরক্ষণ করতে হবে, এসব ধাপে ভুল হলে কফির মান নষ্ট হয়, দামও পড়ে যায়। শুধু পাকা লাল ফল তোলা, পরিষ্কার জায়গায় সমানভাবে শুকানো, আর আর্দ্রতা থেকে দূরে রাখা, মানসম্মত কফির জন্য এগুলোই মূল কথা। মাটির ওপর সরাসরি না ছড়িয়ে মাচা, চাটাই বা পাকা মেঝেতে শুকালে ধুলা, ময়লা আর ছত্রাকের ঝুঁকি কমে। দিনে কয়েকবার নেড়ে দিলে সব বীজ সমানভাবে শুকায়। শুকানো কফি মেঝে থেকে উঁচুতে, শুকনো ও বাতাস চলাচলের জায়গায় বস্তায় রাখলে দীর্ঘদিন ভালো থাকে। পাহাড়ে বর্ষার আর্দ্রতা বেশি, তাই সংরক্ষণের এই নিয়মগুলো সেখানে আরও জরুরি।
সম্ভাবনার পাশে সতর্কতা
কফি চাষের প্রসার নিয়ে সবাই শুধু আশার কথাই বলছেন না। আন্তর্জাতিক পরিবেশ বিষয়ক সংবাদমাধ্যম মংগাবে ২০২৪ সালে এক প্রতিবেদনে পরিবেশবাদীদের উদ্বেগ তুলে ধরেছে। তাঁদের আশঙ্কা, পার্বত্য চট্টগ্রামের মতো জীববৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ এলাকায় বড় পরিসরে কফি চাষ হলে চাপালিশ, গর্জন, সিভিটের মতো দেশি বনের গাছ সরিয়ে একফসলি বাগান তৈরি হতে পারে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা একটি গবেষণা অনুযায়ী, একফসলি কফি চাষে অনেক সময় গাছের বৃদ্ধি খারাপ হয়, ফলন কমে এবং মাটিবাহিত রোগ বাড়ে। রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের অতিরিক্ত ব্যবহার মাটির ক্ষয় আর উর্বরতা হ্রাসের ঝুঁকিও বাড়ায়।
বন সংরক্ষণ নিয়ে কাজ করা আরণ্যক ফাউন্ডেশনের জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা ফরিদ উদ্দিন আহমেদ মংগাবেকে বলেছেন, অর্থকরী ফসলের চেয়ে দেশি বনজ গাছকে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত, কারণ দেশি গাছ পাহাড়ধস ঠেকাতে এবং প্রকৃতির নানা সেবা দিতে বেশি কার্যকর।
এই সতর্কতা কফি চাষের বিরোধিতা নয়, বরং সঠিক পথের ইঙ্গিত। কফি চাষের পরিবেশগত উপকারিতা মূলত আসে ছায়াযুক্ত চাষ থেকে, যেখানে বড় গাছ কেটে ফেলা হয় না, বরং তাদের নিচেই কফি গাছ লাগানো হয়। প্রাকৃতিক বন কেটে নয়, বরং পতিত বা আগে থেকে চাষ হওয়া জমিতে, দেশি গাছের ছায়ায় কফি লাগালে অর্থনীতি আর পরিবেশ দুটোই রক্ষা পায়। এ ধরনের মিশ্র বাগানে কফির পাশাপাশি ফল, মসলা আর কাঠ থেকেও আয় আসে।
পাহাড়ের কাপে ভবিষ্যৎ
কফি চাষ কেবল অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক নয়, সঠিকভাবে করলে পরিবেশ ও সমাজের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। সঠিক পদ্ধতি ও প্রযুক্তি ব্যবহার করলে কফি থেকে একদিকে স্থায়ী আয়, অন্যদিকে পরিবেশ সংরক্ষণ দুটোই সম্ভব। যাঁরা একটি লাভজনক ও পরিবেশবান্ধব কৃষি উদ্যোগে বিনিয়োগ করতে চান, তাঁদের জন্য কফি ভাবার মতো একটি বিকল্প।
শুরু করার আগে কয়েকটি বিষয় মাথায় রাখা ভালো। উপজেলা কৃষি অফিস বা পার্বত্য অঞ্চলের কৃষি গবেষণা কেন্দ্র থেকে এলাকার উপযোগী জাত আর মানসম্মত চারার খোঁজ নেওয়া, ছোট পরিসরে শুরু করে অভিজ্ঞতা বাড়ানো, প্রথম তিন বছরের খরচের পরিকল্পনা করা, আর ফল বিক্রির পাশাপাশি প্রক্রিয়াজাতকরণের সুযোগ খোঁজা। কয়েকজন কৃষক মিলে সমবায় গড়লে শুকানো, খোসা ছাড়ানো আর বাজারজাত করার খরচ ভাগাভাগি করা যায়, দর-কষাকষির ক্ষমতাও বাড়ে।
দেশে শহুরে তরুণদের মধ্যে কফি পানের অভ্যাস দ্রুত বাড়ছে, নতুন নতুন কফির দোকান খুলছে। এই চাহিদার বড় অংশ এখনো আমদানি করা কফিতে মেটে। পাহাড়ের কৃষক যদি মানসম্মত কফি উৎপাদন করতে পারেন, তাহলে শহরের কাপের কফির দামের একটি অংশ ফিরে যাবে পাহাড়ের ঢালে, সেই কৃষকের হাতে, যিনি শীতের সকালে ঝুড়ি ভরে লাল ফল তোলেন।
ছবি: কফি গাছে পাকা ফল, Jeevan Jose, Kerala, India / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)





মন্তব্য
(০)