কক্সবাজারের বাঁকখালী নদীর দখলমুক্ত করা প্রায় ৬৩ একর জমিতে রিসোর্ট, রেস্তোরাঁ, ইকোপার্ক ও এশিয়ার বৃহত্তম সুইমিংপুল নির্মাণসহ দুই হাজার কোটি টাকার একটি প্রকল্প প্রস্তাব করেছে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ)। প্রকল্পের নাম 'বাঁকখালী নদী সুরক্ষা এবং আনুষঙ্গিক সুবিধাসহ কক্সবাজার (কস্তুরাঘাট) নদীবন্দর উন্নয়ন প্রকল্প'। প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এই নদী ঘিরে এমন পরিকল্পনায় আপত্তি তুলেছেন পরিবেশকর্মীরা।
সমকালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত বছরের ১ থেকে ৫ সেপ্টেম্বর আদালতের নির্দেশনা ও আন্তঃসংস্থা সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী জেলা প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সহায়তায় বিআইডব্লিউটিএ নদী ও তীরভূমির ৪৯৬টি অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করে প্রায় ৬৩ একর জায়গা উদ্ধার করে। কিন্তু জায়গাটি অরক্ষিত থাকায় কস্তুরাঘাট থেকে খুরুশকুল নতুন সেতু পর্যন্ত তীরে অন্তত ১৫টি নতুন ঘর উঠেছে। এর আগে ২০২৩ সালের মার্চে চার শতাধিক স্থাপনা উচ্ছেদের পরও আবার দখল হয়েছিল।
দখল ঠেকানোর যুক্তিতেই প্রকল্পটির প্রস্তাব এসেছে। গত ১১ মার্চ পরিকল্পনা বিভাগে চিঠি পাঠান বিআইডব্লিউটিএর বন্দর ও পরিবহন বিভাগের উপপরিচালক (তীরভূমি) মো. আবু ছালেহ কাইয়ুম। তিনি সমকালকে বলেন, প্রস্তাবটি কক্সবাজার থেকে প্রাথমিক পর্যায়ে এসেছে; জমিতে কী করা যাবে আর কী যাবে না, তা সম্ভাব্যতা যাচাইয়ে ঠিক হবে, এরপর পরিকল্পনা কমিশন ও মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ ঘুরে চূড়ান্ত অনুমোদনের প্রশ্ন আসবে। পরিকল্পনা বিভাগের যুগ্ম পরিচালক মো. মোতাহার হোসেন বলেছেন, প্রকল্পটি আদৌ বাস্তবায়িত হবে কিনা, তা নিয়ে সন্দেহ আছে।
প্রস্তাবে ১৫টি কার্যক্রমের কথা আছে: কস্তুরাঘাটে রেস্তোরাঁ, রিসোর্ট, ভাসমান রাইড, সুইমিংপুল ও ভাসমান ইকোপার্ক; কস্তুরাঘাট, খুরুশকুলসহ নৌপথে নতুন ঘাট এবং বাঁকখালী, নুনিয়ারছড়া ও গোরকঘাটা-মহেশখালী ঘাটের আধুনিকায়ন; দুই তীরে সংযোগ সড়ক, সেতু, ওয়াকওয়ে ও বনায়ন; দখলদার উচ্ছেদ ও দরিদ্র পরিবারের পুনর্বাসন। নদীবন্দর কার্যালয়ের এক চিঠিতে দাবি করা হয়েছে, গত দুই দশকে প্রায় ৫০০ একর নদী, তীরভূমি ও নৌচ্যানেল ভরাট হয়েছে, যার আর্থিক মূল্য প্রায় পাঁচ হাজার কোটি টাকা।
বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) প্রধান নির্বাহী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান সমকালকে বলেন, কক্সবাজারের মানুষ ও পরিবেশকর্মীরা প্রাকৃতিক বাঁকখালী ফিরে পেতে দীর্ঘদিন আন্দোলন করছেন; নদী যখন ফিরে পাওয়ার পথে, তখন একটি সরকারি প্রতিষ্ঠানের সুইমিংপুল ও রিসোর্টের প্রস্তাব কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) কক্সবাজারের সাধারণ সম্পাদক কলিম উল্লাহও এমন কার্যক্রম থেকে সরে আসার আহ্বান জানিয়েছেন।
বেলার ২০১৪ সালের রিটের পরিপ্রেক্ষিতে হাইকোর্ট ৮০ কিলোমিটার দীর্ঘ বাঁকখালী নদী ও আশপাশের এলাকাকে চার মাসের মধ্যে প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা ঘোষণা করে গেজেট প্রকাশ, সীমানা নির্ধারণ, সব দখলদার উচ্ছেদ, দূষণমুক্তকরণ এবং দুই তীরের উজাড় হওয়া উপকূলীয় বন পুনরুদ্ধারের নির্দেশ দিয়েছেন। রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি প্রকাশিত হয় গত ৮ সেপ্টেম্বর; অগ্রগতি প্রতিবেদন প্রতি ছয় মাসে আদালতে জমা দিতে হবে।
বন্দর কর্তৃপক্ষের চিঠির যুক্তি, বাঁকখালী সমুদ্রসৈকত থেকে মাত্র দুই কিলোমিটার দূরে; সমুদ্রের ঢেউয়ের তুলনায় নদীতে ঝুঁকি কম, তাই নৌকেন্দ্রিক পর্যটনের সম্ভাবনা আছে। অন্যদিকে নদীর প্যারাবন এরই মধ্যে প্রায় ধ্বংস, আর আদালত দুই তীরে উপকূলীয় বন ফেরানোর নির্দেশ দিয়েছেন। উদ্ধার হওয়া জমি কোন কাজে যাবে, তা এখন সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের ওপর নির্ভর করছে।
ছবি: প্রেস ইনফরমেশন ডিপার্টমেন্ট / উইকিমিডিয়া কমন্স (পাবলিক ডোমেইন)
সূত্র: সমকাল





মন্তব্য
(০)