সমুদ্র ও কয়েকটি নদীর মতো দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের হাওরেও বছরের একটি নির্দিষ্ট সময় মাছ ধরা নিষিদ্ধ করার উদ্যোগ নিয়েছে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়। ২০২৫ সালের ২৫ মার্চ মন্ত্রণালয় মাছ সংরক্ষণ বিধিমালা সংশোধনের যে প্রাক-প্রস্তাবের প্রজ্ঞাপন প্রকাশ করে, তাতে বলা হয়েছে, সাত জেলার হাওরে প্রতি বছর ২৯ মে থেকে ২৮ জুন পর্যন্ত, অর্থাৎ বাংলা ১৫ জ্যৈষ্ঠ থেকে ১৪ আষাঢ় পর্যন্ত এক মাস মাছ ধরা নিষিদ্ধ থাকবে। জাগো নিউজ ২৪ খবরটি প্রকাশ করে ২০২৫ সালের ৩০ মার্চ।
প্রস্তাবে যে সাতটি জেলার নাম রয়েছে, সেগুলো হলো কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোনা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, সিলেট, সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ ও মৌলভীবাজার। ৩০ মার্চ পর্যন্ত বিষয়টি ছিল প্রস্তাব পর্যায়ে: প্রজ্ঞাপনে জনসাধারণের আপত্তি ও পরামর্শ চাওয়া হয়েছিল, তখনো এটি কার্যকর নিষেধাজ্ঞা হয়নি।
প্রস্তাবিত বিধিতে যা বলা হয়েছে
প্রতিবেদন অনুযায়ী, সরকার ‘প্রোটেকশন অ্যান্ড কনজারভেশন অব ফিস অ্যাক্ট, ১৯৫০’-এ দেওয়া ক্ষমতাবলে ‘প্রোটেকশন অ্যান্ড কনজারভেশন অব ফিস রুলস, ১৯৮৫’ সংশোধন করে হাওরে মাছ ধরা নিষিদ্ধ করতে যাচ্ছে। এ জন্য বিধিমালায় নতুন একটি বিধি যোগ করার প্রস্তাব করা হয়েছে। সেই নতুন বিধি অনুযায়ী সাত জেলার হাওরে প্রতি বছর ২৯ মে থেকে ২৮ জুন পর্যন্ত মাছ ধরা বন্ধ থাকবে।
প্রতিবেদনে যেভাবে এসেছে, প্রস্তাবটি একবারের জন্য কোনো নিষেধাজ্ঞা নয়, বরং প্রতি বছর একই তারিখে ফিরে আসা একটি নির্দিষ্ট সময়সীমা। এতে আলাদা আলাদা হাওরের নাম নয়, জেলার নাম দেওয়া হয়েছে; ফলে প্রকাশিত ভাষ্য অনুযায়ী এটি সাত জেলার সব হাওরে প্রযোজ্য হবে। নতুন বিধির কোনো ব্যতিক্রম, জেলেদের জন্য কোনো সহায়তা বা এই বিধির জন্য আলাদা কোনো শাস্তির কথা প্রতিবেদনে বলা হয়নি; সেদিন প্রকাশিত তথ্যের মধ্যে এসব বিষয় ছিল না।
- কে: মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ সরকার।
- কী: মাছ সংরক্ষণ বিধিমালা, ১৯৮৫-তে হাওরে মাছ ধরা নিষিদ্ধ করার একটি নতুন বিধির প্রস্তাব।
- কোথায়: কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোনা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, সিলেট, সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ ও মৌলভীবাজারের হাওর।
- কখন: প্রতি বছর ২৯ মে থেকে ২৮ জুন (১৫ জ্যৈষ্ঠ থেকে ১৪ আষাঢ়)।
- ২০২৫ সালের ৩০ মার্চের অবস্থা: ২৫ মার্চ প্রকাশিত খসড়া, যার ওপর আপত্তি ও পরামর্শ দেওয়ার সুযোগ ছিল।
খসড়া থেকে বিধি: ৬০ দিনের সময়সীমা
প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, এই সংশোধনী নিয়ে কারও কোনো আপত্তি বা পরামর্শ থাকলে প্রজ্ঞাপন সরকারি গেজেটে প্রকাশের সর্বোচ্চ ৬০ দিনের মধ্যে তা মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ে পৌঁছাতে হবে। প্রয়োজনে সরকার তা বিবেচনা করবে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কোনো আপত্তি বা পরামর্শ না পাওয়া গেলে সংশোধনী চূড়ান্ত বলে গণ্য হবে।
বিধি চূড়ান্ত করার আগে খসড়া আকারে প্রকাশের এই ধাপটি সরকার যে আইনের ক্ষমতায় কাজ করছে, সেই আইনেরই অংশ। ১৯৮৫ সালের বিধিমালাতেই তা লেখা আছে: মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের ১৯৮৫ সালের ১৬ অক্টোবরের প্রজ্ঞাপন নং এস.আর.ও. ৪৪২-এল/৮৫-এর ভূমিকায় বলা হয়েছে, প্রোটেকশন অ্যান্ড কনজারভেশন অব ফিস অ্যাক্ট, ১৯৫০ (পূর্ববঙ্গ আইন নং ১৮, ১৯৫০)-এর ৩ ধারায় দেওয়া ক্ষমতাবলে বিধিগুলো প্রণয়ন করা হয় এবং ওই ধারার ৫ উপধারার শর্ত অনুযায়ী আগে সেগুলো প্রকাশ করা হয়েছিল। বিধিমালাটি বাংলাদেশ গেজেটের অতিরিক্ত সংখ্যায় প্রকাশিত হয় ১৯৮৫ সালের ১৭ অক্টোবর।
এরপর একই পথে বিধিমালাটি বহুবার সংশোধিত হয়েছে। মৎস্য অধিদপ্তরের ২০১১ সালের ২ অক্টোবর পর্যন্ত হালনাগাদ করা সংকলন অনুযায়ী, মাছ ধরার জাল নিয়ে ১২ নম্বর বিধি যোগ হয় ১৯৮৭ সালের নভেম্বরে, মোহনা ও উপকূলীয় জলসীমায় পোনা ধরা নিয়ে একটি উপবিধি যোগ হয় ২০০০ সালের সেপ্টেম্বরে, ইলিশের অভয়াশ্রম নিয়ে ১৩ নম্বর বিধি যোগ হয় ২০০৫ সালের অক্টোবরে এবং তা প্রতিস্থাপিত হয় ২০১১ সালের সেপ্টেম্বরে, হালদা নদী নিয়ে ১৪ ও ১৫ নম্বর বিধি যোগ হয় ২০০৭ সালের জুলাইয়ে এবং পিরানহা নিয়ে ১৬ নম্বর বিধি যোগ হয় ২০০৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে। ২০২৫ সালের মার্চে প্রস্তাবিত হাওরের বিধিটি হবে এ ধরনের আরেকটি সংযোজন।
ফেব্রুয়ারিতেই উঠেছিল হাওরে নিষেধাজ্ঞার কথা
খসড়া প্রকাশের প্রায় ছয় সপ্তাহ আগেই হাওরে মাছ ধরা বন্ধ রাখার বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে। ২০২৫ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় সচিবালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ উপদেষ্টা জানান, বঙ্গোপসাগরে বার্ষিক মাছ ধরার নিষেধাজ্ঞা ৬৫ দিন থেকে কমিয়ে ৫৮ দিন করা হচ্ছে, যা চলবে ১৫ এপ্রিল থেকে ১১ জুন পর্যন্ত। সেদিন ইউএনবি ও ঢাকা ট্রিবিউনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সমুদ্রের এই নিষেধাজ্ঞা সব ধরনের মাছ, চিংড়ি, কাঁকড়া, লবস্টার ও অন্যান্য খোলসযুক্ত প্রাণীর জন্য প্রযোজ্য।
প্রতিবেদনগুলোতে বলা হয়, মৎস্য অধিদপ্তর, বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট ও অন্যান্য অংশীজনের বিশেষজ্ঞদের নিয়ে গঠিত একটি কারিগরি কমিটি ৫৮ দিনের এই সময়ের সুপারিশ করে, কারণ এটি বঙ্গোপসাগরের বাণিজ্যিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ বেশির ভাগ মাছের প্রজননকালের সঙ্গে মেলে। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, আগের ৬৫ দিনের নিষেধাজ্ঞার ফলে সামুদ্রিক মৎস্যসম্পদ রেকর্ড ১২ দশমিক ৭৮ শতাংশ বেড়েছে বলে ধরা হয়, আর বাংলাদেশের নিষেধাজ্ঞার সময় প্রতিবেশী দেশের জেলেরা মাছ ধরছিলেন বলে মৎস্যজীবী সংগঠনগুলো আরও সমন্বিত ব্যবস্থার দাবি জানিয়েছিল।
দুটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, একই ব্রিফিংয়ে জানানো হয় যে স্থানীয় মাছের মজুত রক্ষায় হাওরাঞ্চলে ১৫ মে থেকে ১৪ জুন পর্যন্ত আলাদাভাবে প্রায় ২০ দিন, সর্বোচ্চ এক মাস মাছ ধরা বন্ধ রাখার বিষয়ে কর্মকর্তারা আলোচনা করছেন। ২৫ মার্চ প্রকাশিত খসড়ায় পুরো এক মাসের সময় রাখা হয় এবং সময়সীমা দুই সপ্তাহ পিছিয়ে ২৯ মে থেকে ২৮ জুন করা হয়।

হাওর অববাহিকা ও সাত জেলা
এশিয়াটিক সোসাইটি অব বাংলাদেশ প্রকাশিত জাতীয় জ্ঞানকোষ বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী, হাওর হলো বাটির মতো আকৃতির বিশাল ভূগাঠনিক নিম্নভূমি, যেখানে নদী ও খালের পানি এসে জমা হয়। বর্ষায় এটি বিশাল জলাশয়ে পরিণত হয় এবং বর্ষা শেষে বেশির ভাগ অংশ শুকিয়ে যায়। শব্দটি এসেছে সংস্কৃত ‘সাগর’ থেকে, সিলেট ও বৃহত্তর ময়মনসিংহের উত্তর-পূর্বাংশের মানুষ যাকে ‘হাওর’ উচ্চারণ করেন। হাওরের ভেতরের ছোট স্থায়ী জলাশয়গুলোকে বলা হয় বিল।
বাংলাপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, হাওর মূলত বৃহত্তর সিলেট ও বৃহত্তর ময়মনসিংহে অবস্থিত। এই অববাহিকার উত্তরে ভারতের মেঘালয়ের পাহাড়, দক্ষিণে ত্রিপুরা ও মিজোরামের পাহাড় এবং পূর্বে মণিপুরের উচ্চভূমি। পুরো সুনামগঞ্জ জেলা এবং হবিগঞ্জ জেলার বড় অংশ হাওরে ঢাকা; সিলেট সদর উপজেলার কিছু অংশ এবং মৌলভীবাজারেরও কিছু অংশ হাওর এলাকা। অববাহিকায় প্রায় ৪৭টি বড় হাওর এবং ছোট-বড় প্রায় ৬ হাজার ৩০০ বিল আছে, যার মধ্যে প্রায় ৩ হাজার ৫০০টি স্থায়ী ও ২ হাজার ৮০০টি মৌসুমি।
ভারতের পাহাড় থেকে নেমে আসা নদীগুলো বর্ষায় সমভূমিকে সর্বোচ্চ ৬ মিটার গভীর পর্যন্ত প্লাবিত করে, আর জমি প্রায় সাত থেকে আট মাস পানির নিচে থাকে। তখন হাওর হয়ে ওঠে এক অন্তর্দেশীয় সাগর, যেখানে গ্রামগুলো দ্বীপের মতো জেগে থাকে; জুলাই থেকে সেপ্টেম্বরে প্রবল বাতাসে ওঠা ঢেউ বসতবাড়ির ক্ষতি করতে পারে। শুকনো মৌসুমে বেশির ভাগ পানি নেমে যায়, থেকে যায় এক বা একাধিক অগভীর বিল।
সেন্টার ফর এনভায়রনমেন্টাল অ্যান্ড জিওগ্রাফিক ইনফরমেশন সার্ভিসেস (সিইজিআইএস) ২০১২ সালে বাংলাদেশ হাওর ও জলাভূমি উন্নয়ন বোর্ডের জন্য যে হাওর এলাকার মহাপরিকল্পনা তৈরি করে, তাতে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সাত জেলায় ৩৭৩টি হাওর ও জলাভূমি গণনা করা হয়েছে, যার আয়তন প্রায় ৮ লাখ ৫৯ হাজার হেক্টর। ২০১৯ সালে দ্য ডেইলি স্টারে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর এক পরিসংখ্যান কর্মকর্তার লেখায় এ তথ্য রয়েছে। একই মাসে পত্রিকাটির আরেকটি লেখায় সাত জেলার নাম দেওয়া হয়েছে সুনামগঞ্জ, সিলেট, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার, নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া, এবং বলা হয়েছে, হাওর জলাভূমি এই জেলাগুলোর মোট আয়তনের প্রায় ৪৩ শতাংশ জুড়ে রয়েছে। ২০২৫ সালের মার্চের খসড়া বিধিতেও এই সাত জেলারই নাম রয়েছে। মহাপরিকল্পনাটি ২০ বছর মেয়াদি; এর পরিকল্পিত বিনিয়োগ ১৭টি খাতে বিস্তৃত, যার একটি মৎস্য।

টাঙ্গুয়ার ও হাকালুকি: প্রস্তাবিত এলাকার দুই হাওর
দেশের সবচেয়ে পরিচিত দুটি হাওর খসড়ায় থাকা জেলাগুলোর মধ্যেই পড়েছে। বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী, টাঙ্গুয়ার হাওর সুনামগঞ্জ জেলার ধর্মপাশা ও তাহিরপুর উপজেলার ১০টি মৌজাজুড়ে বিস্তৃত। হাওরের ভেতরের ৪৬টি গ্রামসহ এর আয়তন প্রায় ১০০ বর্গকিলোমিটার; এর মধ্যে ২ হাজার ৮০২ দশমিক ৩৬ হেক্টর জলাভূমি এবং ছোট-বড় ১২০টি বিল রয়েছে। সরকার আন্তর্জাতিক জলাভূমি বিষয়ক রামসার কনভেনশনের আওতায় এটিকে রামসার এলাকা হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে।
বাংলাপিডিয়ায় টাঙ্গুয়ার হাওরে ১৪০টির বেশি প্রজাতির মিঠাপানির মাছের কথা বলা হয়েছে, যার মধ্যে আছে আইড়, গাং মাগুর, বাইম, তারা বাইম, গুতুম, গুলশা, টেংরা, তিতনা, গারিয়া, বেতি ও কাকিয়া। প্রতি শীতে প্রায় ২০০ ধরনের পরিযায়ী পাখি আসে। এখানকার বিপন্ন জলাবনের গাছের মধ্যে আছে হিজল (Barringtonia acutangula) ও করচ (Pongamia pinnata); হাওরের ১০ কিলোমিটারের মধ্যে গ্যাস বা তেলকূপ খনন নিষিদ্ধ। এখানকার বেশির ভাগ বাসিন্দা ভূমিহীন বা প্রান্তিক কৃষক, আর জমিতে বছরে একটিমাত্র ফসল হয়।
হাকালুকি হাওর ভারতের আসাম সীমান্তঘেঁষা, যা পাঁচটি উপজেলায় বিস্তৃত: মৌলভীবাজার জেলার কুলাউড়া, জুড়ী ও বড়লেখা এবং সিলেট জেলার গোলাপগঞ্জ ও ফেঞ্চুগঞ্জ। বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী এর মোট আয়তন প্রায় ১৮১ দশমিক ১৫ বর্গকিলোমিটার, যার প্রায় ৪০ শতাংশ বড়লেখায়; এখানে পরস্পর সংযুক্ত ২৩৮টির বেশি বিল আছে, কিছু স্থায়ী, কিছু মৌসুমি। বর্ষায় এর বিস্তার দাঁড়ায় প্রায় ১৮ হাজার ৩৮৩ হেক্টরে এবং পাঁচ মাস পর্যন্ত তা পানির নিচে থাকে। এর পানির উৎস নদীগুলোর মধ্যে আছে জুড়ী বা কন্টিনালা, সোনাই বা বরদল, দামাই, ফানাই ও কুইয়াছড়া।
সরকার ১৯৯৯ সালে বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইনের আওতায় হাকালুকিকে প্রতিবেশগতভাবে সংকটাপন্ন এলাকা (ইসিএ) ঘোষণা করে। বাংলাপিডিয়ায় এখানে ৪১৭ প্রজাতির পাখি এবং সব মিলিয়ে ৫৫৮ প্রজাতির প্রাণী ও পাখির কথা বলা হয়েছে; হাওরের চারপাশে প্রায় ২ লাখ মানুষ বাস করেন, যাদের বেশির ভাগের জীবিকা হাওরের সম্পদের ওপর নির্ভরশীল।

বর্ষার শুরু কেন হাওরের মাছের জন্য গুরুত্বপূর্ণ
বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী, হাওর দেশের সবচেয়ে উৎপাদনশীল জলাভূমিগুলোর অন্যতম এবং মাছ ধরার গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। পলি জমে তৈরি হওয়া নলখাগড়া ও জলজ ঘাস মাছ ও অন্যান্য জলজ প্রাণীর খাদ্য ও আশ্রয় জোগায়; হাওর প্রাকৃতিক জলাধার হিসেবে মেঘনা নদীব্যবস্থার পানিপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করে এবং স্থায়ী ও পরিযায়ী পাখির অভয়ারণ্য হিসেবে কাজ করে। বন্যার পানি নামতে শুরু করলে ছোট মাছ, ঝিনুক, শামুক ও অন্যান্য খোলসযুক্ত প্রাণী হাওরের মানুষের নাগালে আসে।
অঞ্চলটি থেকে আগের বছরগুলোর প্রতিবেদনে হাওরের মাছের প্রজননকালকে বর্ষা আসার আগে-পরের মাসগুলোর সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। ২০১৭ সালের মে মাসে কুলাউড়ার এক জ্যেষ্ঠ উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, মাছ বিভিন্ন সময়ে, বিশেষ করে মার্চ থেকে জুলাইয়ের মধ্যে নদী ও হাওরের অগভীর অংশে ডিম ছাড়ে। ২০২০ সালের মে মাসে একই পত্রিকা জানায়, টাকি, শোল, গজার ও আইড়ের মতো দেশি প্রজাতির মাছ এপ্রিল-মে মাসে ডিম ফোটায়।
জাগো নিউজ ২৪-এর প্রতিবেদনে বা তাতে বর্ণিত প্রজ্ঞাপনে ২৯ মে থেকে ২৮ জুন সময়টি বেছে নেওয়ার কারণ উল্লেখ করা হয়নি। ফেব্রুয়ারির প্রতিবেদনগুলোতে কেবল বলা হয়েছিল, হাওরের প্রস্তাবটির উদ্দেশ্য স্থানীয় মাছের মজুত রক্ষা করা।
হাওরের জলাশয়ে আগে থেকেই যেসব বিধি প্রযোজ্য
প্রস্তাবিত এক মাসের নিষেধাজ্ঞা হাওর জেলাগুলোসহ দেশের অভ্যন্তরীণ জলাশয়ের জন্য ১৯৮৫ সালের বিধিমালায় আগে থেকে থাকা সুরক্ষার সঙ্গে যুক্ত হবে। মৎস্য অধিদপ্তরের ২০১১ সালের অক্টোবর পর্যন্ত হালনাগাদ সংকলন অনুযায়ী:
- ৩ নম্বর বিধিতে নদী, খাল ও বিলে স্থায়ী স্থাপনা (ফিক্সড ইঞ্জিন) বসানো বা ব্যবহার নিষিদ্ধ; এমন স্থাপনা এবং তা দিয়ে ধরা মাছ জব্দ ও বাজেয়াপ্ত করা যায়।
- ৪ নম্বর বিধিতে সেচ, বন্যা নিয়ন্ত্রণ বা পানি নিষ্কাশন ছাড়া অন্য কোনো উদ্দেশ্যে নদী, খাল বা বিলে বাঁধ, আড়বাঁধ বা অন্য কোনো স্থাপনা নির্মাণ নিষিদ্ধ।
- ৫ নম্বর বিধিতে অভ্যন্তরীণ জলাশয় বা উপকূলীয় রাষ্ট্রীয় জলসীমায় বিস্ফোরক, বন্দুক বা তীর-ধনুক দিয়ে মাছ নিধন এবং ৬ নম্বর বিধিতে পানিতে বিষ প্রয়োগ বা দূষণের মাধ্যমে মাছ নিধন নিষিদ্ধ।
- ৭ নম্বর বিধিতে প্রতি বছর ১ এপ্রিল থেকে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত নদী, খাল, বিল ও এগুলোর সঙ্গে সংযুক্ত জলাশয়ে ঝাঁক বেঁধে চলা শোল, গজার ও টাকির পোনা অথবা পোনা পাহারারত মা মাছ ধরা বা ধ্বংস করা নিষিদ্ধ; তবে কার্পজাতীয় মাছ চাষের প্রয়োজনে এর ব্যতিক্রম আছে।
- ৮ নম্বর বিধি ও প্রথম তফসিল অনুযায়ী তালিকাভুক্ত জলাশয়ে লাইসেন্স ছাড়া রুই, কাতলা, মৃগেল, কালবাউস ও ঘনিয়া ধরা নিষিদ্ধ; কুশিয়ারা ও সুরমা নদীর কয়েকটি অংশ, হাকালুকি হাওর পর্যন্ত লুলা খাল এবং হবিগঞ্জের মাকালকান্দি ও মোকার হাওরমুখী কয়েকটি খালের জন্য এই সময় প্রতি বছর ১ এপ্রিল থেকে ৩০ জুন।
- ১২ নম্বর বিধিতে সরকার গেজেট প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে যেকোনো ধরনের জাল নিষিদ্ধ বা জালের ফাঁসের আকার নির্ধারণ করতে পারে; এর আওতায় ১৯৮৮ সালের ২৫ জানুয়ারির প্রজ্ঞাপনে ৪ দশমিক ৫ সেন্টিমিটার বা তার কম ফাঁসের কারেন্ট জালসহ ফাঁস জাল নিষিদ্ধ করা হয়।
১৩ থেকে ১৫ নম্বর বিধিতে ইলিশের অভয়াশ্রম ও প্রজনন এলাকা এবং চট্টগ্রামের হালদা নদীর কিছু অংশে মৌসুমভিত্তিক নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। সেগুলোতে নদীর নির্দিষ্ট অংশের নাম দেওয়া, কিন্তু প্রতিবেদন অনুযায়ী প্রস্তাবিত হাওরের বিধিটি পুরো জেলার হাওরে প্রতি বছর একটি নির্দিষ্ট মাসের জন্য প্রযোজ্য হবে।

আগের বছরগুলোতে হাওরের মাছ নিয়ে যে চাপের খবর এসেছে
খসড়া প্রকাশের আগের বছরগুলোতে সংবাদপত্রের প্রতিবেদনে এমন বিধির প্রয়োজন তৈরি করা চাপগুলোর কথা উঠে এসেছে। ২০১৭ সালের মে মাসে দ্য ডেইলি স্টার জানায়, সুরমা, কুশিয়ারা, বাশিয়া, মনু ও খোয়াই নদীসহ সিলেট বিভাগের হাওর এলাকায় জেলেরা মশারি জাল ও কারেন্ট জাল দিয়ে পোনা ও মা মাছ ধরছেন; হাকালুকি হাওরে পানি কমার সঙ্গে সঙ্গে প্রতিদিনই তা চলছিল। কুলাউড়া উপজেলায় হাকালুকির কাছে এক কেজি পোনা বিক্রি হচ্ছিল ৩৯০ টাকায়। সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের মাৎস্যবিজ্ঞান অনুষদের ডিন পত্রিকাটিকে বলেন, এভাবে জাল দিয়ে ধরায় এলাকার ৫৪ জাতের মাছ হুমকিতে পড়ছে; মৎস্য অধিদপ্তরের সিলেট বিভাগের উপপরিচালক জানান, জেলা প্রশাসনের সহায়তায় ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান চলছে।
২০২০ সালের মে মাসে সুনামগঞ্জের তাহিরপুর থেকে পত্রিকাটি জানায়, এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে অবৈধভাবে পোনা ধরা শুরু হয়ে কয়েক মাস চলে; নিষিদ্ধ জাল ব্যবহার হচ্ছিল এবং টাঙ্গুয়ার হাওরের অভয়াশ্রমের ভেতরেও মাছ ধরা চলছিল। সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক বলেন, ধান রক্ষায় তৈরি বাঁধের কারণে পানির স্তর কম থাকে, যা মানুষকে পোনা ধরার সুযোগ করে দেয়। মৎস্য অধিদপ্তরের সিলেটের উপপরিচালক এত বড় জলাশয় তদারকিতে জনবল সংকটের কথা বলেন, আর কোভিড-১৯ লকডাউনের কারণে তখন অভিযান বন্ধ ছিল। স্থানীয় একটি হাওর সংগঠন পোনা ধরা ও বিক্রিতে দুই মাসের পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা এবং আর্থিক কষ্টে থাকা জেলেদের জন্য প্রণোদনার দাবি জানায়; সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের জলজ সম্পদ ব্যবস্থাপনা বিভাগের এক অধ্যাপক বলেন, জেলে ও স্থানীয় মানুষের সচেতনতা ছাড়া শুধু অভিযান দিয়ে সমস্যার সমাধান হবে না।
২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে দ্য ডেইলি স্টারে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর এক পরিসংখ্যান কর্মকর্তার মতামত নিবন্ধে হাওরের জন্য হুমকি হিসেবে ধানখেতে ব্যবহৃত কীটনাশক, মাছের অতিরিক্ত আহরণ, বাড়তে থাকা বসতি এবং সংরক্ষণ বিষয়ে স্থানীয় মানুষের কম সচেতনতার কথা বলা হয়। তাতে আরও বলা হয়, অঞ্চলটিতে প্রায় প্রতি দুই-তিন বছরে আকস্মিক বন্যা হয় এবং তা বোরো ধানের ক্ষতি করে, যার ওপর বেশির ভাগ বাসিন্দার জীবিকা নির্ভরশীল।
ছবি: বলরাম মহলদার / উইকিমিডিয়া কমন্স (সিসি বাই-এসএ ৩.০)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, ইউএনবি, ঢাকা ট্রিবিউন, মৎস্য অধিদপ্তর (মাছ সংরক্ষণ বিধিমালা ১৯৮৫, ২০১১ পর্যন্ত সংকলিত), বাংলাপিডিয়া, দ্য ডেইলি স্টার





মন্তব্য
(০)