সরাসরিবাজারদর
আটা (প্যাকেটজাত)৫৮+০.০%আদা - আমদানিকৃত১৬৭+০.০%আদা - দেশী১৫৪+০.০%আমন চাল - মাঝারি৫৬+০.০%আমন চাল - মোটা৪৮+০.০%আমন চাল - সরু৭২+০.০%আয়োডিনযুক্ত লবণ (প্যাকেটজাত)৩২+০.০%কাঁচা মরিচ২১৮+০.০%খামারের মুরগী১৬২+০.০%খাসী৯০০+০.০%চিনি (দেশী)১৩২+০.০%ছোলা - গোটা৮৫+০.০%ডিম ফার্ম - লাল৪৭+০.০%পেঁয়াজ - দেশী৬০+০.০%বোরো চাল - মাঝারি৫৫+০.০%বোরো চাল - মোটা৪৭+০.০%বোরো চাল - সরু৬৬+০.০%মাংসঃ– গরু৭২৯+০.০%মুগ ডাল১২২+০.০%রসুন - আমদানিকৃত১৯২+০.০%রসুন - দেশী১৭৩+০.০%সয়াবিন তেল১৬৩+০.০%
হালনাগাদ ১ নভেম্বর ২০২৬
ঢাকা৩২°মূলত পরিষ্কারআর্দ্রতা ৫৫%বাতাস ৫ কিমি/ঘ

কমলগঞ্জের সংরক্ষিত বনে উচ্ছেদে ১২০০ কমলা গাছ কাটা, বন বিভাগের বিরুদ্ধে মাসোহারার অভিযোগ

মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জে সংরক্ষিত বনে ২০২৬ সালের ১৬ জুলাই উচ্ছেদ অভিযানে একটি পরিবারের প্রায় ১ হাজার ২০০ কমলা গাছের বাগান কেটে ফেলা হয়। পরিবারের অভিযোগ, এক বন কর্মকর্তাকে নিয়মিত মাসোহারা দেওয়া বন্ধ করায় তাদের বাগান ধ্বংস করা হয়েছে; বন বিভাগের বক্তব্য, সংরক্ষিত বনে ফল বাগান অবৈধ এবং অভিযান আইন অনুযায়ীই হয়েছে।

কমলগঞ্জের সংরক্ষিত বনে উচ্ছেদে ১২০০ কমলা গাছ কাটা, বন বিভাগের বিরুদ্ধে মাসোহারার অভিযোগ
পরিবেশ

মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জের রাজকান্দি সংরক্ষিত বনে ২০২৬ সালের ১৬ জুলাই পরিচালিত এক যৌথ উচ্ছেদ অভিযানে একটি পরিবারের প্রায় ১ হাজার ২০০ কমলা গাছ কেটে ফেলা হয়। ভুক্তভোগী পরিবারের অভিযোগ, এক বন কর্মকর্তাকে দীর্ঘদিন ধরে দেওয়া নিয়মিত মাসোহারা বন্ধ করে দেওয়ায় ঠিক ফল ধরার আগমুহূর্তে তাদের বাগান ধ্বংস করা হয়েছে। অন্যদিকে বন বিভাগের বক্তব্য, সংরক্ষিত বনভূমিতে ফল বাগান সম্পূর্ণ অবৈধ এবং দখল হওয়া রাষ্ট্রীয় বনভূমি উদ্ধারে আইন অনুযায়ীই এ অভিযান চালানো হয়েছে। কাটা গাছের অনেকগুলোতেই মাস দুয়েকের মধ্যে ফল পাকার কথা ছিল; ধ্বংস হওয়া বাগানের ছবি ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।

১৬ জুলাইয়ের উচ্ছেদ অভিযান


অভিযানটি পরিচালিত হয় ২০২৬ সালের ১৬ জুলাই বৃহস্পতিবার, কমলগঞ্জ উপজেলার রাজকান্দি রেঞ্জের অধীন আদমপুর বিটের কালিঞ্জি এলাকায়। বন বিভাগের ভাষ্য অনুযায়ী, উপজেলা প্রশাসন ও কমলগঞ্জ থানা পুলিশের সমন্বয়ে এবং উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি)-এর উপস্থিতিতে প্রায় চার ঘণ্টাব্যাপী এ অভিযান চালানো হয়। বন বিভাগ জানায়, রাজকান্দি রেঞ্জের বন আইনের ২০ ধারাভুক্ত প্রায় পাঁচ একর সংরক্ষিত বনভূমি স্থানীয় প্রভাবশালীদের দখল থেকে উদ্ধার করা হয়েছে।

অভিযানের নিজস্ব বিবরণে বন বিভাগ জানায়, উদ্ধার হওয়া জমিতে বাণিজ্যিকভাবে কমলা, আনারস, লেবু ও সুপারির চাষ করা হচ্ছিল। বাঁশ ও পলিথিনে তৈরি দুটি ছাউনি এবং একটি পাহারা-ঘর ভেঙে ফেলা হয়, আর প্রাকৃতিক জলধারা আটকে তৈরি একটি পুকুর কেটে দিয়ে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনা হয়। কর্মকর্তারা জানান, জড়িতদের বিরুদ্ধে বন আইনে একটি মামলা (পিওআর) প্রক্রিয়াধীন রয়েছে এবং উদ্ধার হওয়া জমিতে সরকারের বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির আওতায় আবার বনায়ন করা হবে। তাঁদের ভাষায়, দখল রোধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির অংশ হিসেবে প্রতি মাসেই এমন একাধিক উচ্ছেদ অভিযান চলছে।

উদ্ধার হওয়া জমির কেন্দ্রেই ছিল বাগানটি। পরিবারের দাবি, প্রায় তিন একর জায়গায় গড়ে তোলা বাগানে কমলার পাশাপাশি পেঁপে ও লাউও ছিল এবং প্রায় ১ হাজার ২০০ কমলা গাছ কাটা পড়ে। কোনো কোনো প্রতিবেদনে গাছের সংখ্যা ছয় শতাধিক বলা হয়েছে; সঠিক সংখ্যা নিয়ে ভিন্নতা আছে। তবে একটি ফলন্ত বাগান এক বিকেলেই কেটে ফেলা হয়েছে, এ নিয়ে কোনো বিতর্ক নেই।

কমলগঞ্জের এ অভিযানই এলাকায় সাম্প্রতিক একমাত্র তৎপরতা নয়। ২০২৬ সালের জুলাইয়ের শুরুর দিকে একই রাজকান্দি রেঞ্জের কুরমা বিটে সংরক্ষিত বনভূমিতে অবৈধভাবে গড়ে তোলা পান বাগান উচ্ছেদ করা হয় এবং সেখানেও বন আইনে একটি মামলা প্রক্রিয়াধীন ছিল। কর্মকর্তারা এসব পদক্ষেপকে এ যুক্তির প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরেন যে, বন বিভাগ কোনো একটি পরিবারের বিরুদ্ধে নয়, বরং পুরো রেঞ্জজুড়েই দখলের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়। তাঁদের ভাষ্য, কমলগঞ্জে উদ্ধার হওয়া জমিতে সরকারের অগ্রাধিকার কর্মসূচির আওতায় পাঁচ বছরে সারা দেশে ২৫ কোটি গাছ রোপণের অংশ হিসেবে আবার চারা রোপণ করা হবে।

পরিবারের মাসোহারার অভিযোগ


বাগানের মালিক মোছা. সালমা বেগম ও তাঁর স্বামী আলিম উল্লাহ জানান, প্রায় তিন একর বনভূমিতে আট বছর ধরে তাঁরা এ বাগান গড়ে তোলেন এবং এতে ১৫ থেকে ২০ লাখ টাকা বিনিয়োগ করেন, যার বেশির ভাগই বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা (এনজিও) থেকে চড়া সুদে নেওয়া ঋণ। তাঁদের পরিকল্পনা ছিল, আরও প্রায় তিন মাস পর বাগান থেকে ২৫ থেকে ২৬ লাখ টাকার ফল বিক্রি করে ঋণের বড় একটি অংশ শোধ করবেন।

পরিবারের অভিযোগ, শুরু থেকেই তাঁরা বন বিটের কর্মকর্তাকে নিয়মিত টাকা দিয়ে আসছিলেন; এবার পারিবারিক আর্থিক সংকটে সেই টাকা দিতে না পারায় পুরো বাগান কেটে ফেলা হয়েছে। সালমা বেগম বলেন, ‘আট বছরে এ বাগান গড়তে ১৫ থেকে ২০ লাখ টাকা খরচ হয়েছে। নিজের টাকা নয়, বিভিন্ন এনজিও থেকে চড়া সুদে ঋণ নিয়ে এই টাকা বাগানে খাটিয়েছিলাম। ভেবেছিলাম, এবার ফল বিক্রি করে ঋণ শোধ করব। অথচ বন বিভাগ আমাদের সব শেষ করে দিল। এখন এই ঋণের বোঝা নিয়ে আমরা কোথায় যাব, কীভাবে ঋণ শোধ করব?’ পরিবারের আরও অভিযোগ, অভিযানে অংশ নেওয়া ব্যক্তিরা শুধু গাছ কেটেই ক্ষান্ত হননি, তাঁদের একমাত্র সেচের মেশিনটিও ভেঙে ফেলেছেন, যাতে অবশিষ্ট গাছগুলোও বাঁচানো না যায়।

এগুলো ঘটনাস্থলে সাংবাদিকদের কাছে করা পরিবারের অভিযোগ; কোনোটিই এখনো প্রমাণিত নয়। বন বিভাগ কোনো টাকা নেওয়ার কথা স্বীকার করেনি এবং অভিযোগের বিষয়ে কর্মকর্তাদের বক্তব্য নিচে তুলে ধরা হলো। অভিযানের পর সরেজমিনে দেখা যায়, কাটা কমলা গাছের ডালপালা চারপাশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে এবং ঋণের কিস্তি ও জীবিকা নিয়ে অনিশ্চয়তায় পরিবারের সদস্যরা সেখানে নির্বাক বসে আছেন।

যে কারণে স্থানীয়রা অভিযানকে একতরফা বলছেন


মূল প্রতিবেদনে উদ্ধৃত স্থানীয় বাসিন্দারা অভিযানটিকে একতরফা বলে বর্ণনা করেন। তাঁরা বলেন, সরকারি জমি উদ্ধারের নামে অভিযান চালানো হলেও তা কেবল একটি পরিবারকে লক্ষ্যবস্তু করেছে। তাঁদের প্রশ্ন, বাগানটি যদি অবৈধই হয়ে থাকে, তবে গাছ রোপণের সময় বা প্রথম এক-দুই বছরের মধ্যে কেন ব্যবস্থা নেওয়া হলো না, আর ঠিক ফল ধরার সময়েই, আট বছর পর কেন এ অভিযান?

কেউ কেউ অভিযানের সময়কে সাম্প্রতিক সংবাদের সঙ্গেও যুক্ত করেন। তাঁরা দাবি করেন, অভিযানের কয়েক দিন আগে বন বিভাগের কথিত লিজ বাণিজ্য ও মাসোহারা নেওয়ার অভিযোগ নিয়ে কয়েকটি গণমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশ পায়, আর সেই ক্ষোভ থেকেই পরিবারটিকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। তাঁদের আরও অভিযোগ, বন বিভাগের জমি দীর্ঘদিন ধরে টাকার বিনিময়ে অলিখিতভাবে পান ও জুম চাষের জন্য ব্যবহার করতে দেওয়া হয়েছে, অথচ সেসব জায়গায় কোনো অভিযান না চালিয়ে শুধু এ পরিবারের বাগান ধ্বংস করা হয়েছে। এর সবই স্থানীয় বাসিন্দা ও ভুক্তভোগী পরিবারের অভিযোগ; কোনোটিই প্রমাণিত নয় এবং বন বিভাগ অভিযানকে আইনসম্মত কার্যক্রম ছাড়া অন্য কিছু বলতে রাজি নয়।

বন বিভাগের বক্তব্য


রাজকান্দি রেঞ্জের সহকারী বন সংরক্ষক ও রেঞ্জ কর্মকর্তা প্রীতম বড়ুয়া বলেন, সংরক্ষিত বনের ভেতরে পান, কমলা কিংবা আনারস যা-ই হোক, যেকোনো ধরনের দখল সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য ও বেআইনি এবং বনভূমি অবমুক্ত করতে বন বিভাগের তৎপরতা সব সময় চলমান। তিনি বলেন, ‘এটি একটি দখল; আট বছর হোক আর দশ বছর, যত বছরই হোক, এটি বেআইনি। বন বিভাগ সব সময় যেকোনো দখল উচ্ছেদে বদ্ধপরিকর। রাজকান্দি রেঞ্জের অধীনে যত দখল আছে, ধীরে ধীরে তা অবমুক্ত করার চেষ্টা চলছে এবং প্রতি মাসেই এমন একাধিক অভিযান পরিচালিত হয়।’ টাকা দিলে একটি বাগান আট বছর বৈধ থাকে আর টাকা না দিলে কীভাবে তা অবৈধ হয়ে যায়, এ প্রশ্নের সরাসরি কোনো জবাব এই কর্মকর্তা দেননি।

সিলেট বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মোহাম্মদ আব্দুর রহমান বিষয়টিকে বনভূমিতে পরিবারগুলোর বসবাসের ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে ব্যাখ্যা করেন। তিনি বলেন, আনুমানিক ১৯২০ সালের দিকে যখন প্রথম ভিলেজার (বনগ্রাম) ব্যবস্থা চালু হয়, তখন একেক পরিবারকে কেবল ভ্যালি বা নিচু জমিতে ধান চাষের জন্য জমি দেওয়া হতো; পাহাড় বা টিলার ওপর ফল বাগান করার কোনো বিধান বন আইনে নেই। কখন, কে এ বাগান লাগানোর অনুমতি দিয়েছে তারও কোনো ভিত্তি নেই। বনভূমিতে ফল বাগান নয়, বনায়ন হবে এ নীতি অনুযায়ীই বাগানটি কেটে জমি পুনরুদ্ধার করা হয়েছে বলে তিনি জানান। তিনি আরও বলেন, বন বিভাগের কেউ এসব অনিয়মে জড়িত থাকলে তথ্যপ্রমাণ পাওয়া সাপেক্ষে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

রাজকান্দি সংরক্ষিত বন ও আদমপুর বিট


যে আদমপুর বিটে অভিযান হয়েছে, সেটি রাজকান্দি সংরক্ষিত বনের একটি বন ইউনিট, যা সিলেট বিভাগের মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জ উপজেলায় অবস্থিত। কাউয়ারগলা নামেও পরিচিত এ বিটের আয়তন প্রায় ১৩ হাজার ৮০ একর, অর্থাৎ প্রায় ৫ হাজার ২৯০ হেক্টর; এটি উপজেলা সদর থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার দূরে, ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের সীমান্তঘেঁষা এলাকায়। পাহাড়ি ও অনেকটাই নির্জন এ বনে হাঁটাপথ ছড়িয়ে আছে, কাছেই রয়েছে একটি খাসিয়া পুঞ্জি এবং বনের ভেতরে একটি পরিদর্শন বাংলো; এর ঝিরিপথ ধরে এগোলে পৌঁছানো যায় হামহাম জলপ্রপাতে।

এ বনের গাছপালার মধ্যে রয়েছে মুলি, মিটিঙ্গা, ডলু ও রুপাইয়ের মতো বড় বাঁশঝাড় এবং সাল, গর্জন, চাপালিশ, জারুল ও চাঁপার মতো দেশি কাঠগাছ; প্রবেশপথের কাছে আগর বাগানও আছে। বন্যপ্রাণীর মধ্যে রয়েছে উল্লুক (হুলক গিবন), যার ডাক বনের গভীর থেকে ভেসে আসে, এ ছাড়া মুখপোড়া হনুমান, বনবিড়াল, মেছোবিড়াল, মায়া হরিণ এবং পাহাড়ি ময়না ও টিয়ার মতো পাখি। বন বিভাগের ভাষ্য, এই প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষার জন্যই তাদের উচ্ছেদ কার্যক্রম।

কমলগঞ্জ উপজেলার আয়তন প্রায় ৪৮৫ বর্গকিলোমিটার এবং ২০২২ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী জনসংখ্যা ২ লাখ ৯০ হাজার ১০৮ জন। উপজেলাটি প্রায় চৌদ্দটি চা-বাগান এবং লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের জন্য পরিচিত; লাউয়াছড়া পশ্চিম ভানুগাছ সংরক্ষিত বনের ভেতরে অবস্থিত এবং উত্তর-পূর্বাঞ্চলের অন্যতম পরিচিত আধা-চিরহরিৎ বন। বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলে বন সংরক্ষণের প্রক্রিয়া শুরু হয় ১৯১৪ সালে এবং প্রথম ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা কার্যকর হয় ১৯৩৮ সালে; বাংলায় রাষ্ট্রীয় বন ব্যবস্থাপনার সূচনা ১৮৭৬ সালে পৃথক বন বিভাগ গঠনের মধ্য দিয়ে।

মৌলভীবাজার জেলার পাহাড়ি ঢালে একটি চা-বাগান; এ জেলার পাহাড়েই চা ও বনের পাশাপাশি কমলার বাগানও গড়ে ওঠে। ছবি: Anaf Ibn Shahibul / উইকিমিডিয়া কমন্স (সিসি বাই-এসএ ৪.০)
মৌলভীবাজার জেলার পাহাড়ি ঢালে একটি চা-বাগান; এ জেলার পাহাড়েই চা ও বনের পাশাপাশি কমলার বাগানও গড়ে ওঠে। ছবি: Anaf Ibn Shahibul / উইকিমিডিয়া কমন্স (সিসি বাই-এসএ ৪.০)

সংরক্ষিত বন কী এবং বন আইন


বিতর্কিত এ জমি পরিচালিত হয় ১৯২৭ সালের বন আইনের অধীনে, যা এখনো বাংলাদেশে রাষ্ট্রীয় বনের প্রধান আইন। এ আইনে রাষ্ট্রীয় বনকে কয়েকটি শ্রেণিতে ভাগ করা হয়েছে, যার মধ্যে সংরক্ষিত বন (রিজার্ভ ফরেস্ট) সবচেয়ে কঠোরভাবে সুরক্ষিত। সংরক্ষিত বন ঘোষণার একটি আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া আছে: সরকার প্রথমে বন সংরক্ষণের অভিপ্রায় জানিয়ে বিজ্ঞপ্তি দেয়, এরপর একজন বন বন্দোবস্ত কর্মকর্তা জমিতে ব্যক্তিগত অধিকারের দাবি আহ্বান করে তা নিষ্পত্তি করেন, এবং সবশেষে আইনের ২০ ধারায় বিজ্ঞপ্তি দিয়ে বনটিকে সংরক্ষিত ঘোষণা করা হয়। কমলগঞ্জে উদ্ধার হওয়া জমিকে কর্মকর্তারা এই ২০ ধারাভুক্ত বলে উল্লেখ করেছেন।

কোনো বন চূড়ান্তভাবে সংরক্ষিত ঘোষণার আগে আইনে একটি জনসম্পৃক্ত ধাপ রাখা হয়েছে, যার উদ্দেশ্য বিদ্যমান অধিকার রক্ষা করা। অভিপ্রায়ের প্রথম বিজ্ঞপ্তির পর একজন বন বন্দোবস্ত কর্মকর্তা বনের আশপাশে ঘোষণা প্রকাশ করেন এবং অন্তত তিন মাসের একটি সময়সীমা নির্ধারণ করেন, যার মধ্যে জমিতে অধিকার দাবিকারী যে কাউকে এগিয়ে আসতে হয়; এরপর তিনি সেসব দাবি তদন্ত করে নিষ্পত্তি করেন এবং অবশিষ্ট জমিই ২০ ধারায় সংরক্ষিত ঘোষণা করা হয়। কর্মকর্তাদের ভাষ্য, যে পাহাড়ি জমিতে বাগানটি ছিল, সেখানে এমন কোনো ব্যক্তিগত অধিকার কখনো স্বীকৃত হয়নি।

একবার কোনো জমি সংরক্ষিত বন হয়ে গেলে আইন তাকে সম্পূর্ণ রাষ্ট্রীয় সম্পত্তি হিসেবে গণ্য করে এবং সুনির্দিষ্ট অনুমতি ছাড়া সেখানে ব্যক্তিগত ব্যবহার বন্ধ থাকে। সংরক্ষিত বনে চাষের জন্য জমি পরিষ্কার বা খনন করা, অনধিকার প্রবেশ ও গবাদিপশু চরানো, এবং গাছ কাটা, বাকল তোলা বা অন্যভাবে গাছের ক্ষতি করা আইনে নিষিদ্ধ এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এ কারণেই বন বিভাগ বলছে, যত পুরোনোই হোক, সংরক্ষিত বনে গড়ে তোলা কোনো ফল বাগান জমির ওপর কোনো অধিকার অর্জন করতে পারে না।

বিভাগীয় কর্মকর্তা যে ভিলেজার বা বনগ্রাম ব্যবস্থার কথা বলেছেন, তা একটি পৃথক ও পুরোনো ব্যবস্থা, যার আওতায় কিছু পরিবারকে মূলত বনের কাজে শ্রম জোগানোর জন্য বনের ভেতরে বা প্রান্তে বসতি দেওয়া হতো এবং সীমিত জমিতে চাষের অনুমতি থাকত। কর্মকর্তাদের ভাষ্য, সেই ব্যবস্থা কখনোই পাহাড়ের ওপর বাণিজ্যিক ফল বাগান পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল না। উদ্ধার হওয়া জমিতে বন বিভাগ যে বনায়নের কথা বলেছে, তা সারা দেশে কয়েক বছর ধরে বিপুলসংখ্যক চারা রোপণের জাতীয় কর্মসূচিরই অংশ।

মৌলভীবাজারের লাউয়াছড়া সংরক্ষিত বনে বন্যপ্রাণী; একই জেলায় রয়েছে রাজকান্দি সংরক্ষিত বন। ছবি: Syed07 / উইকিমিডিয়া কমন্স (সিসি বাই-এসএ ৪.০)
মৌলভীবাজারের লাউয়াছড়া সংরক্ষিত বনে বন্যপ্রাণী; একই জেলায় রয়েছে রাজকান্দি সংরক্ষিত বন। ছবি: Syed07 / উইকিমিডিয়া কমন্স (সিসি বাই-এসএ ৪.০)

মৌলভীবাজারে কমলা ও মাল্টা চাষ


বিতর্কের কেন্দ্রে থাকা ফসলটির জন্যই মৌলভীবাজারের পাহাড় সুপরিচিত। এখানে চাষ হওয়া ‘কমলা’ হলো ম্যান্ডারিন বা Citrus reticulata, যা রুটেসি (Rutaceae) পরিবারের সাইট্রাস গোত্রের কয়েকটি সদস্যের একটি; আর তুলনামূলক মিষ্টি ‘মাল্টা’ হলো সুইট অরেঞ্জ বা Citrus sinensis। বাংলাদেশে কমলা ও মাল্টা মূলত সিলেটের কিছু অংশ, পার্বত্য চট্টগ্রাম এবং পঞ্চগড় ও রংপুরের মতো উত্তরের জেলায়, ঢালু ও পাহাড়ি জমিতে চাষ হয়, যা এ গাছের জন্য উপযোগী।

কমলা সাইট্রাস (Citrus) গণের অন্তর্গত এবং ধারণা করা হয়, এর উৎপত্তি চীনে, যেখানে প্রায় ৪ হাজার বছর আগে এর চাষ হতো; ম্যান্ডারিন ফলের খোসা আলগা এবং ভেতরে ৮ থেকে ১০টি সহজে আলাদা হওয়া কোয়া থাকে। খুব বেশি দিন আগেও দেশে কমলার বাণিজ্যিক উৎপাদন ছিল কম, ২০০৫-০৬ সালে যা ছিল মাত্র প্রায় ১ হাজার টন; এ কারণেই এত কমলা আমদানি করতে হয়েছে এবং কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর দেশে উৎপাদন বাড়াতে জোর দিয়েছে।

মৌলভীবাজারের মধ্যে কমলা চাষ মূলত জুড়ী, কুলাউড়া ও বড়লেখা উপজেলার পাহাড়ি এলাকায় কেন্দ্রীভূত। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (ডিএই) বছরের পর বছর এ ফসলের বিস্তার নথিভুক্ত করেছে: অধিদপ্তরের মৌলভীবাজারের উপপরিচালকের তথ্য অনুযায়ী, একা জুড়ী উপজেলার ছয়টি ইউনিয়নেই ছিল ৪১৫টি কমলা বাগান এবং মৌলভীবাজার এলাকায় প্রায় ৯৯ হেক্টর জমি ছিল বাগানের আওতায়; ২০০১ থেকে ২০০৮ সালের মধ্যে সম্প্রসারণ প্রকল্পের মাধ্যমে এ এলাকায় কমলা চাষ শুরু হয়। জুড়ীর উৎপাদন ২০১৪-১৫ মৌসুমের প্রায় ১৪৫ টন থেকে বেড়ে ২০১৫-১৬ মৌসুমে দাঁড়ায় ৩০০ টনে, আর সফল চাষিরা এক মৌসুমে ৩ লাখ টাকারও বেশি আয় করতেন বলে জানা যায়।

জাতীয় পর্যায়েও সাইট্রাস চাষের এলাকা দ্রুত বেড়েছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যে ২০১৯-২০ অর্থবছরে কমলার বাগান ছিল ৪ হাজার হেক্টরের বেশি জমিতে এবং কমলা-মাল্টাসহ সব সাইট্রাস মিলিয়ে প্রায় ৭ হাজার ৫০০ হেক্টরে, যা ছয় বছর আগের প্রায় ২ হাজার হেক্টর থেকে অনেক বেশি; ২০১৮-১৯ অর্থবছরে সাইট্রাস আমদানি ছিল প্রায় ২ লাখ ৫০ হাজার ৭০০ টন। কর্মকর্তারা এ বৃদ্ধির জন্য স্বাস্থ্যসচেতনতা, চাহিদা ও তুলনামূলক ভালো দামকে এবং অধিদপ্তরের কলমের চারা উৎপাদন ও কৃষক প্রশিক্ষণকে কৃতিত্ব দেন।

মৌলভীবাজারের বাগান-গ্রামগুলোতে কৃষকেরা বছরের পর বছর ধরে বড় বাগান গড়ে তুলেছেন। এক প্রতিবেদনে জেলার একজন চাষির কথা বলা হয়েছে, যিনি প্রায় পনেরো বছর আগে মাত্র ৫০টি গাছ দিয়ে শুরু করে এখন প্রায় ১ হাজার ২০০টি গাছ দেখাশোনা করেন এবং তাঁর গ্রামের প্রতিটি পরিবারেই তিন শতাধিক গাছ আছে। ম্যান্ডারিন কমলায় সাধারণত বসন্তে ফুল আসে এবং ফুল আসার পর ফল পরিপক্ব হতে প্রায় আট মাস লাগে, তাই ফল সংগ্রহ হয় শরৎ ও শীতের শুরুতে; জেলার চাষিরা পোকামাকড়, পাকা ফলে বানরের হানা এবং আমদানি করা কমলার সঙ্গে প্রতিযোগিতায় ক্ষতির কথাও জানিয়েছেন।

চাষের ধরনই বুঝিয়ে দেয়, কেন অভিযানের সময়টা পরিবারের কাছে এত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। কমলা ও মাল্টার চারা বীজ থেকে নয়, কলম (গ্রাফটিং বা বাডিং) করে তৈরি করা হয় এবং সাধারণত রোপণের চার থেকে পাঁচ বছর পর গাছে ফল ধরতে শুরু করে; বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বারি) অবমুক্ত জাত বারি কমলা লেবু ১-এর একটি পূর্ণবয়স্ক গাছে গড়ে প্রায় ১৯০ গ্রাম ওজনের ৩০০ থেকে ৪০০টি ফল ধরতে পারে। ফুল আসার পর ফল পরিপক্ব হতে কয়েক মাস লাগে। ফলে আট বছর বয়সী একটি বাগান থাকে উৎপাদনের চূড়ায় বা তার কাছাকাছি, আর এ কারণেই পরিবারটি বলছে, বছরের পর বছরের বিনিয়োগ যখন ফল দিতে যাচ্ছিল, ঠিক তখনই গাছগুলো কাটা হয়।

ম্যান্ডারিন কমলা (Citrus reticulata), মৌলভীবাজারের পাহাড়ে যে ধরনের ‘কমলা’ চাষ হয়। ছবি: George Chernilevsky / উইকিমিডিয়া কমন্স (পাবলিক ডোমেইন)
ম্যান্ডারিন কমলা (Citrus reticulata), মৌলভীবাজারের পাহাড়ে যে ধরনের ‘কমলা’ চাষ হয়। ছবি: George Chernilevsky / উইকিমিডিয়া কমন্স (পাবলিক ডোমেইন)

ছবি: AerobicFox / উইকিমিডিয়া কমন্স (সিসি০)। লিড ছবিতে গাছে থাকা একটি কাঁচা কমলা দেখা যাচ্ছে, যা ফসলটির প্রতীকী পটভূমি-চিত্র।

সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, দ্য ডেইলি ইনকিলাব, দ্য ডেইলি স্টার, বাংলাপিডিয়া, বন আইন ১৯২৭ (bdlaws.minlaw.gov.bd), উইকিপিডিয়া। প্রথম প্রকাশ বাংলায় দ্য এগ্রো নিউজে।

অনলাইন ডেস্কদা এগ্রো নিউজ

পরিবেশ

সম্পর্কিত খবর

বাংলাদেশ

AEZ-০৭: সক্রিয় ব্রহ্মপুত্র-যমুনা প্লাবনভূমি, যেখানে নদী জমি গড়ে আবার কেড়েও নেয়

নদীভাঙন, নতুন চর, বালু-পলির মাটি আর অনিশ্চিত বন্যার মৌসুম। কুড়িগ্রাম থেকে মানিকগঞ্জ পর্যন্ত প্রায় ৩ লাখ ১৯ হাজার হেক্টরের এই অঞ্চলে কৃষিকে টেকসই করতে দরকার জমিভিত্তিক তথ্য, উপগ্রহচিত্রের পর্যবেক্ষণ আর সময়মতো পরিকল্পনা।

তানিয়া চৌধুরী১ নভেম্বর ২০২৬১৩ মিনিটের পড়া
পরিবেশ

বরেন্দ্রে বছরে ০.৬ মিটার পর্যন্ত নামছে পানির স্তর, সমন্বিত পানিনীতির দাবি

রাজশাহীতে নীতি সংলাপে বিশেষজ্ঞ ও জনপ্রতিনিধিরা ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে ভূ-উপরিস্থ পানি, খাল-বিল সংস্কার, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ ও কম পানির ফসলের ওপর জোর দিয়েছেন।

বাসস১ নভেম্বর ২০২৬২ মিনিটের পড়া
পরিবেশ

দুই উৎসের বর্জ্য ঠেকালে হালদার ৮০ শতাংশ দূষণ কমতে পারে, বলছেন গবেষকেরা

অনন্যা আবাসিক এলাকা হয়ে আসা সিটি করপোরেশনের বর্জ্য আর বাহির সিগন্যাল শিল্প এলাকার বর্জ্য সামলাতে পারলে হালদার দূষণ অনেকটাই কমবে; এ বছর মা-মাছের ডিম মিলেছে প্রায় ৬ হাজার কেজি।

দৈনিক বাংলা১ নভেম্বর ২০২৬২ মিনিটের পড়া

মন্তব্য

(০)