বাংলাদেশের সার ভর্তুকি সরকারের জন্য আর্থিক ঝুঁকি হয়ে উঠেছে এবং এর সুবিধার বড় অংশ পাচ্ছে বড় খামার; তাই ভর্তুকি তুলে না দিয়ে ধাপে ধাপে সংস্কার করা উচিত। আন্তর্জাতিক ভুট্টা ও গম উন্নয়ন কেন্দ্র International Maize and Wheat Improvement Center (সিমিট)-এর প্রকাশিত এক নীতিপত্রে এ যুক্তি দিয়েছেন সিমিটের নীতি ও খাদ্যব্যবস্থা অর্থনীতিবিদ ড. রবি নন্দী এবং বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের (বিএআরসি) সাবেক নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. ওয়াইস কবির।
নীতিপত্র অনুযায়ী, ইউরিয়া, ডিএপি, টিএসপি ও এমওপিসহ দেশের সারের চাহিদার প্রায় ৭৫-৮০ শতাংশ আমদানি করতে হয়, আর দেশে ইউরিয়া উৎপাদন সীমিত মূলত গ্যাসের অভাবে। বোরো ও আমন মৌসুমের আগে গেজেটে খুচরা দাম বেঁধে দেওয়ায় পরে বিশ্ববাজারে দাম বাড়লে তার প্রায় পুরো বোঝা সরকারকে বইতে হয়। এ বছর হরমুজ প্রণালীতে সংকটের পর ইউরিয়ার দাম টনপ্রতি প্রায় ৪০০-৪৯০ ডলার থেকে ২০২৬ সালের এপ্রিলে ৮৫০ ডলার ছাড়ায়, আর গ্যাস সংকটে দেশের ছয়টি ইউরিয়া কারখানার পাঁচটি বন্ধ ছিল। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের সময় ২০২১-২২ অর্থবছরে বাজেটে বরাদ্দ ছিল ৯ হাজার ৫০০ কোটি টাকা, অথচ মন্ত্রণালয়ের হিসাবে প্রয়োজন ছিল ২৮ হাজার কোটি টাকা।
২০২৬ সালের জুনের বিশ্বব্যাংকের এক মূল্যায়ন উদ্ধৃত করে লেখকেরা বলেন, সার ভর্তুকি কৃষি মন্ত্রণালয়ের বাজেটের প্রায় ৮০ শতাংশ নিয়ে নেয় এবং তা অতিমাত্রায় ধাননির্ভর। জমির আকারে শীর্ষ ২০ শতাংশ কৃষক ভর্তুকির প্রায় অর্ধেক সুবিধা পান, আর নিচের ৪০ শতাংশ পান মাত্র ১৫ শতাংশের মতো। মাত্র ৫ শতাংশ কৃষক নাইট্রোজেন, ফসফরাস, পটাশিয়াম ও সালফার সুপারিশকৃত মাত্রায় দেন; প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ ফসফরাস বেশি দেন, প্রায় ৯০ শতাংশ সালফার কম দেন। নীতিপত্রের হিসাবে, সুষম সার ব্যবহারে মোট সার না বাড়িয়েই বোরোতে প্রায় ৩৩ শতাংশ, আমনে ৬৫ শতাংশ ও আলুতে ৮৭ শতাংশ ফলন বাড়তে পারে।
নীতিপত্রে খাতভিত্তিক লাভের তুলনাও আছে। সরাসরি কৃষি ভর্তুকির ৮৫-৯০ শতাংশ পায় শস্য খাত, কিন্তু তার বার্ষিক প্রবৃদ্ধি প্রায় আড়াই শতাংশ; অথচ মৎস্য, প্রাণিসম্পদ ও পোলট্রি খাত বেড়েছে প্রায় সাড়ে ৩ থেকে ৫ শতাংশ হারে, কৃষি জিডিপির প্রায় ৩৯ শতাংশ তাদের, আর তারা নির্ভর করে মূলত পরোক্ষ সহায়তার ওপর। মানুষের খাদ্যাভ্যাসও সবজি, ফল, মাছ, মাংস ও দুধের দিকে সরছে, আর বৈচিত্র্যময় চাষে একফসলি চাষের তুলনায় রাসায়নিক উপকরণ ৪০ শতাংশ পর্যন্ত কম লাগে।
অঞ্চলের অভিজ্ঞতা সতর্ক হওয়ার পরামর্শ দেয়। ২০২১ সালে শ্রীলঙ্কা হঠাৎ পুরোপুরি জৈব সারে চলে গেলে ৪৪ শতাংশ কৃষকের ফলন কমে এবং খাদ্য মূল্যস্ফীতি ৫০ শতাংশ ছাড়ায়। লেখকদের মতে, ভারতের সরাসরি সুবিধা হস্তান্তর দেখায় প্রযুক্তিনির্ভর লক্ষ্যভিত্তিক বিতরণে ভর্তুকি না তুলেও অপচয় কমানো যায়, আর শুধু দাম বদলালে কৃষকের সার ব্যবহারের ধরন খুব একটা বদলায় না।
তাঁদের প্রস্তাবিত পথনকশা ধাপে ধাপে: আমদানির উৎস বাড়ানো ও মজুত গড়ে তোলা; জমির আকার, ফসল ও মাটি অনুযায়ী সহায়তা দিতে কৃষক কার্ড ও ই-ভাউচার পরীক্ষামূলকভাবে চালু করা, যাতে বর্গাচাষি ও ভাগচাষিরাও বাদ না পড়েন; আর মাটি পরীক্ষার সঙ্গে শক্তিশালী সম্প্রসারণ সেবা ও ফসল বহুমুখীকরণ, সবই খাদ্য নিরাপত্তা ও কৃষকের আয় রক্ষা করে।
ছবি: Press Information Department / উইকিমিডিয়া কমন্স (পাবলিক ডোমেইন)
সূত্র: CIMMYT





মন্তব্য
(০)