'ঘরের সঙ্গেই নদী থাকত যদি, তাহলে প্রতিদিনের সকালটা শুরু হতো ঢেউয়ের শব্দে, আর সন্ধ্যা নামত নদীর বুকে রোদের শেষ আলো মেখে। ঘরের পেছনেই নদী, আহা, এমনই কোনো জায়গায় আমার বাড়ি থাকত যদি!' হয়তো এমন আবেগী ভাবনা ও কল্পনা অনেকের মনেই উঁকি দেয়। বিশেষ করে, যারা শহরে থাকেন কিংবা যাদের বেড়ে ওঠার জীবনে নদীর সান্নিধ্য ছিল না; তাদের মনে নদীকেন্দ্রিক এমন স্বপ্ন আনন্দের খোরাক হতে পারে।
কিন্তু যাদের শৈশবের সঙ্গে নদী জড়িয়ে ছিল কিংবা এখনো আছে; তাদের কাছে নদীকে ঘিরে এই আবেগের অর্থ কী? কখনো কি তাদের কাছে জানতে চেয়েছেন, যে নদী মায়ের স্নেহের মতো আগলে রাখে; সেই নদীই তাদের কতটা ভাবায়, কতটা কাঁদায়? যদি আজ নদীপাড়ে বসবাসকারী মানুষের সুবিধা ও অসুবিধার তুলনা করি, তাহলে নদীকে ঘিরে এক ভিন্ন বাস্তবতা সামনে আসে।
প্রথমেই বলি, নদীর সঙ্গে নদীপাড়ের সভ্যতার ভালোবাসার গল্পের কথা। নদী তার তীরবর্তী জনপদকে অনেক কিছুই দেয়, বিনিময়ে মানুষের কাছ থেকে কিছু চায় না। নদীপাড়ের মানুষ নদীকে কেবল পানির প্রবাহ হিসেবে দেখে না; দেখে নীরব জীবনদাতা হিসেবে। নদী ও নদীপাড়ের মানুষের সম্পর্ক শুধু জীবিকা বা অর্থনৈতিক সুবিধার নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে খাদ্য, কৃষি, প্রকৃতি, আবহাওয়া, সংস্কৃতি, স্মৃতি, আবেগ এবং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে গড়ে ওঠা এক জীবনব্যবস্থা।
নদী জোগান দেয় মাছ, মেটায় মানুষের নানা দৈনন্দিন চাহিদা। নদীর ছোট-বড় মাছ, চিংড়ি, শামুক ও কাঁকড়া অনেক পরিবারের খাদ্য ও পুষ্টির গুরুত্বপূর্ণ উৎস। কখনো রান্নার পানি, কখনো গোসল কিংবা গৃহস্থালির কাজে নদীর পানি হয়ে ওঠে নদীতীরের মানুষের নিত্যসঙ্গী। হাঁস-মুরগি ও গবাদিপশুর পরিচর্যা, নৌকা চালানো এবং কৃষিকাজসহ নানা প্রয়োজনে নদীর পানি ব্যবহার করা হয়।
নদীর বুক থেকে বয়ে আসা বাতাস গরমের দিনে ক্লান্ত শরীরকে মুহূর্তেই শীতল করে দেয়। নদীর জলরাশি, আশপাশের আর্দ্রতা ও খোলা পরিবেশ স্থানীয় আবহাওয়ায় প্রভাব ফেলে এবং মানুষের স্বস্তি বাড়ায়। নদীতে সাঁতার কাটা, নৌকায় ঘুরে বেড়ানো, বিকেলে নদীর পাড়ে বসে বাতাস খাওয়া কিংবা সূর্যাস্ত দেখা, এসব নদীপাড়ের মানুষের জীবনেরই অংশ। নদী তাদের ক্লান্তি ও একঘেয়েমি দূর করার পাশাপাশি মানসিক প্রশান্তিরও একটি প্রাকৃতিক আশ্রয়।
জানেন, নদীপাড়ের অনেক বাড়ির ফলগাছ কেন এত সতেজ আর ফলবান হয়ে ওঠে? এর পেছনেও রয়েছে নদীর অবদান। নদীর কাছাকাছি এলাকার আর্দ্রতা, পলিমিশ্রিত উর্বর মাটি এবং অনুকূল প্রাকৃতিক পরিবেশ গাছপালার বেড়ে ওঠায় সহায়তা করে। আম, জাম, কাঁঠাল, পেয়ারা, নারকেলসহ নানা ফলদ গাছের সমৃদ্ধির পেছনে নদীর ভূমিকা রয়েছে। শুধু ফলদ গাছই নয়, নদীতীরের গাছপালা, চর ও জলাভূমি নানা প্রজাতির পাখি, মাছ, সরীসৃপ এবং অন্যান্য প্রাণীরও আশ্রয়স্থল। এসব প্রাকৃতিক পরিবেশ জীববৈচিত্র্য ও প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
নদীকেন্দ্রিক জনপদের বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, নদীর পানি কৃষিকাজে সেচের অন্যতম উৎস। ধান, শাক-সবজি, ডাল, মরিচসহ নানা ফসল উৎপাদনে নদীর অবদান রয়েছে। নদীর পলি জমে অনেক এলাকায় মাটির উর্বরতা বাড়ে, যা কৃষির জন্য সহায়ক। নদীর চর ও তীরবর্তী ঘাসজমিতে গরু, মহিষ ও ছাগল চরে বেড়ায়। এসব এলাকায় গবাদিপশুর খাদ্য ও পানির জোগানেও নদীর ভূমিকা রয়েছে।
জানা যায়, অনেক নদীপাড়ের মানুষের কাছে নদীই যাতায়াতের অন্যতম পথ। নৌকা, ট্রলার ও লঞ্চে মানুষ এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যাতায়াত করে। কৃষিপণ্যসহ নানা ধরনের মালামাল পরিবহনেও নদীপথ তাদের একমাত্র ভরসা। এতে অনেক ক্ষেত্রে পরিবহন ব্যয় কমে আসে। নদীকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে হাট-বাজার, মাছের আড়ত, নৌবন্দর ও ব্যবসাকেন্দ্র। এসব কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে নদী স্থানীয় অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরিতেও অবদান রাখে।
নদীকে ঘিরে গড়ে উঠেছে ভাটিয়ালি গান, নৌকাবাইচ, মাঝি-মাল্লার জীবন, লোককথা, উৎসব ও নানা সামাজিক প্রথা। নদী অনেক জনপদের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ। নদীর সঙ্গে মানুষের দৈনন্দিন জীবন যেমন জড়িয়ে আছে; তেমনই জড়িয়ে আছে তাদের শৈশব, স্মৃতি, ভালোবাসা, পারিবারিক গল্প, আনন্দ-বেদনা এবং পূর্বপুরুষের বসতির ইতিহাস।
নদীর পলি জমে কোথাও কোথাও নতুন চর জেগে ওঠে। এসব চরে কৃষিকাজ, পশুপালন ও নতুন বসতি গড়ে তোলার সুযোগ তৈরি হয়। নদী বৃষ্টির পানি বহন করে, প্লাবনভূমির সঙ্গে পানির সংযোগ রক্ষা করে এবং জলজ বাস্তুতন্ত্রকে সচল রাখে। অনেক ক্ষেত্রে ভূগর্ভস্থ পানির পুনর্ভরণেও নদী ভূমিকা রাখে।
নদীপাড়ের মানুষের জীবনে প্রকৃতির সৌন্দর্যও এক বিশেষ প্রাপ্তি। কুয়াশায় ঢাকা নদীর সকাল, খোলা আকাশ, সূর্যোদয়, বিকেলের সোনালি আলো কিংবা নদীর বুকে সূর্যাস্ত, এসব দৃশ্য মানুষের জীবনকে প্রকৃতির আরও কাছাকাছি নিয়ে যায়। অন্যদিকে, দুর্যোগের পরও নদী মানুষের জীবিকা পুনর্গঠনে সহায়তা করতে পারে। নদীর পানি সেচের কাজে এবং মাছ ও অন্যান্য জলজ সম্পদ খাদ্য ও আয়ের উৎস হিসেবে ব্যবহৃত হয়। ফলে বিপর্যয় কাটিয়ে ঘুরে দাঁড়ানোর ক্ষেত্রেও নদী অনেক মানুষের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
এভাবেই নদীকে ঘিরে গড়ে ওঠে মানুষের বসতি, জীবিকা, সংস্কৃতি এবং ভালোবাসার এক বিস্তৃত জগৎ। নদীর সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক কেবল প্রয়োজনের নয়, এ সম্পর্ক গভীর আবেগ ও আত্মিক বন্ধনেরও। নদী তাই শুধু একটি জলধারা নয়; নদী একটি জনপদের জীবন, ঐতিহ্য, স্মৃতি ও অস্তিত্বের অংশ।
তবে নদীর সঙ্গে মানুষের এই ভালোবাসার সম্পর্ক সব সময় সুখের নয়। যে নদী একদিন মানুষের ঘরে মাছ পৌঁছে দেয়, সেই নদীই কখনো কেড়ে নেয় তার বসতভিটা। যে নদীর বাতাসে মানুষ প্রশান্তি খুঁজে পায়, সেই নদীর বুকেই কখনো জন্ম নেয় ভয়ংকর ঢেউ। বর্ষায় নদীর পানি বাড়লে কারও ঘরে আনন্দ আসে, আবার কারও মনে জাগে ভাঙনের আতঙ্ক। কারও ফসলি জমি পলিতে উর্বর হয়, আবার কারও কয়েক বিঘা জমি চোখের সামনে নদীগর্ভে হারিয়ে যায়। নদীপাড়ের মানুষের জীবন তাই প্রাপ্তি ও হারানোর এক অদ্ভুত সমীকরণ। নদী তাদের বাঁচায়, আবার কখনো সেই নদীর কারণেই নতুন করে বাঁচার সংগ্রামে নামতে হয়।
নদীপাড়ের মানুষের সবচেয়ে বড় আতঙ্ক নদীভাঙন। এক রাতের ভাঙনেই কারও ঘরবাড়ি, ফসলি জমি, গাছপালা ও দীর্ঘদিনের বসতি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়। অনেক পরিবারকে বারবার ঠিকানা বদলাতে হয়। এভাবে মানুষ শুধু বসতভিটাই হারায় না, হারায় দীর্ঘদিনের স্মৃতি, সম্পদ ও পরিচিত পরিবেশ।
নদীপাড়ের মানুষের জন্য বন্যা, ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসও বড় বিপদের কারণ। বিশেষ করে উপকূলীয় এলাকায় ঘূর্ণিঝড়ের সময় নদীর পানি অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে লোকালয়ে প্রবেশ করে প্রাণহানি, ঘরবাড়ি ধ্বংস ও সম্পদের ব্যাপক ক্ষতি করে। বর্ষায় নদীর পানি বেড়ে বাড়িঘর, রাস্তাঘাট, ফসলি জমি ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্লাবিত হয়। দীর্ঘদিন পানি জমে থাকলে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হয়। এ সময় ঘরের আসবাব, খাদ্যশস্য, গবাদিপশু ও প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে হয়। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে সব সম্পদ রক্ষা করা সম্ভব হয় না।
ঝালকাঠির কাঠালিয়া উপজেলার বিষখালী নদীর তীরবর্তী আমুয়া গ্রামের বাসিন্দা ফরহাদ মিয়া জানান, নদীপাড়ের অনেক এলাকায় সড়ক যোগাযোগ সীমিত। কোথাও নৌকা বা ট্রলারই যাতায়াতের একমাত্র ভরসা। নদী উত্তাল হলে, ঘন কুয়াশা পড়লে কিংবা নৌযান চলাচল বন্ধ থাকলে মানুষের যাতায়াত কঠিন হয়ে পড়ে। দুর্গম চর ও নদীবেষ্টিত এলাকায় বিদ্যালয়, হাসপাতাল ও চিকিৎসকের পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধাও থাকে না। জরুরি রোগীকে হাসপাতালে নিতে দীর্ঘসময় লাগে। অনেক সময় প্রয়োজনের মুহূর্তে নৌযান না পাওয়ায় চিকিৎসাসেবা পেতেও দেরি হয়।
নদীপাড়ের মানুষের আরেকটি বড় সমস্যা বিশুদ্ধ পানির সংকট। বন্যা বা জলোচ্ছ্বাসের সময় পুকুর ও নলকূপের পানি দূষিত হয়ে ওঠে। বিশেষ করে উপকূলীয় এলাকায় লবণাক্ততার কারণে সুপেয় পানির অভাব দেখা দেয়। নদীর পানি সরাসরি পান করাও স্বাস্থ্যঝুঁকিপূর্ণ। দূষিত পানি ব্যবহার, বন্যার পানি ও দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতার কারণে ডায়রিয়া, আমাশয় ও চর্মরোগসহ বিভিন্ন পানিবাহিত রোগের ঝুঁকি বাড়ে।
পিরোজপুর জেলার ভাণ্ডারিয়া এলাকার বাসিন্দা লিয়াকত হাওলাদার বলেন, 'নদীর পানির অস্বাভাবিক বৃদ্ধি, বন্যা, নদীভাঙন, লবণাক্ততা ও অনিয়মিত বৃষ্টিপাতের কারণে কৃষকের ফসল নষ্ট হতে পারে। অনেক সময় ফসলের পাশাপাশি কৃষিজমিও নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়। এতে কৃষকের আয়ের স্থায়ী উৎস হারিয়ে যায়। অন্যদিকে, নদীতে মাছের প্রাপ্যতা, পানির প্রবাহ ও আবহাওয়ার ওপর জেলেদের জীবিকা অনেকাংশে নির্ভরশীল। ঝড়, বন্যা, মাছ ধরার নিষেধাজ্ঞা কিংবা নদীতে মাছ কমে গেলে জেলে ও সংশ্লিষ্ট শ্রমজীবী মানুষের আয় কমে যায়, কখনো কাজও বন্ধ হয়ে যায়।'
নদীপথে চলাচলের ক্ষেত্রেও রয়েছে নানা ঝুঁকি। অতিরিক্ত যাত্রী বহন, অনিরাপদ নৌযান, ঝড়ো আবহাওয়া ও অসতর্কতার কারণে নৌদুর্ঘটনা ঘটতে পারে। অনেক মানুষকে জীবিকা, শিক্ষা কিংবা চিকিৎসার প্রয়োজনে প্রতিদিন নদী পার হতে হয়। ফলে নদীপথের দুর্ঘটনার আশঙ্কা তাদের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গী হয়ে থাকে।
উপকূলীয় কৃষক হাসানুর রহমান জানান, নদীতে লবণাক্ত পানি প্রবেশ করলে কৃষি, মৎস্যসম্পদ, গাছপালা ও সুপেয় পানির ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। এতে ফসল উৎপাদন ব্যাহত হয়, গাছপালার স্বাভাবিক বৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হয় এবং মানুষের জীবনযাত্রা ও জীবিকায় পরিবর্তন আসে। পাশাপাশি নদীতীরবর্তী জনপদে বেড়িবাঁধ দুর্বল বা ক্ষতিগ্রস্ত হলে নদীর পানি লোকালয়ে প্রবেশ করতে পারে। বাঁধ ভেঙে গেলে বসতবাড়ি, ফসলি জমি ও বিভিন্ন অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষতি হয়।
নদীপাড়ের মানুষের নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও রয়েছে কিছু ঐতিহাসিক ও বাস্তব সমস্যা। অতীতে নদীপাড়ের বনেদি বাড়িঘর ও সম্পদশালী পরিবারগুলো অনেক সময় ডাকাতদের লক্ষ্যবস্তু হতো। নদীপথে নৌকায় সহজে যাতায়াত এবং লুট করা মালামাল দ্রুত সরিয়ে নেওয়ার সুযোগ থাকায় নদীকেন্দ্রিক জনপদে ডাকাতির ঘটনা ঘটত। উপকূলীয় এলাকায় এমন অসংখ্য ঘটনা ও জনশ্রুতি রয়েছে, যেখানে ডাকাতদের কবলে পড়ে অনেক পরিবার সর্বস্ব হারিয়ে পথে বসেছে।
নদীভাঙন ও বন্যার কারণে মানুষ বারবার স্থানান্তরিত হলে শুধু বসতভিটা বা সম্পদের ক্ষতি হয় না, ব্যাহত হয় পারিবারিক ও সামাজিক জীবনও। শিশুদের পড়াশোনা, পারিবারিক সম্পর্ক, সামাজিক যোগাযোগ এবং স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় বিঘ্ন ঘটে। অনেক পরিবার স্থায়ীভাবে কোথাও বসতি গড়ার নিশ্চয়তা হারায়। এক জায়গায় ঘর তৈরি করার পর আবার অন্য জায়গায় আশ্রয় খুঁজতে হয়। এভাবে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বসবাস করা জনপদের সামাজিক বন্ধনও দুর্বল হয়ে পড়ে।
এসব সংকটের পাশাপাশি নদীপাড়ের মানুষের জীবনে কাজ করে এক ধরনের স্থায়ী মানসিক চাপ ও অনিশ্চয়তা। কখন নদীভাঙন হবে, কখন ঘর ছাড়তে হবে, কখন ফসল নষ্ট হবে কিংবা কখন আবার নতুন করে ঘর বাঁধতে হবে, এমন দুশ্চিন্তা অনেক পরিবারের নিত্যসঙ্গী। বারবার বাস্তুচ্যুত হওয়ার অভিজ্ঞতা মানুষের মনে দীর্ঘস্থায়ী উদ্বেগ, নিরাপত্তাহীনতা ও অসহায়ত্ব তৈরি করতে পারে। ফলে নদীপাড়ের মানুষের জীবন শুধু প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই নয়, প্রতিনিয়ত অনিশ্চয়তার মধ্যেও টিকে থাকার এক কঠিন সংগ্রাম।
বরিশাল সরকারি ব্রজমোহন কলেজের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের প্রধান ও সহযোগী অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইব্রাহীম খলিল বলেন, 'নদীপাড়ের মানুষের জীবন প্রাপ্তি ও হারানোর এক বৈপরীত্যময় গল্প। যে নদী জমিতে পলি জমিয়ে উর্বরতা বাড়ায়, সেই নদীই আবার ভাঙনের মাধ্যমে কেড়ে নেয় ফসলি জমি ও বসতভিটা। যে নদী মাছ দিয়ে মানুষের খাদ্য ও জীবিকার জোগান দেয়, সেই নদীতে মাছ ধরতে গিয়েই কখনো জীবন বিপন্ন হয়। নদী একদিকে যাতায়াত ও পণ্য পরিবহনের সহজ পথ তৈরি করে, অন্যদিকে উত্তাল স্রোত, ঝড় কিংবা নৌদুর্ঘটনার ঝুঁকিতে সেই পথই হয়ে ওঠে বিপজ্জনক। নদীর বাতাস মানুষের ক্লান্তি দূর করে, নদীর জলরাশি প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্যকে সমৃদ্ধ করে; অথচ বন্যা, ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসে সেই নদীই ডেকে আনে সর্বনাশ। নদী যেমন কৃষি, ব্যবসা-বাণিজ্য, কর্মসংস্থান ও সংস্কৃতির বিকাশ ঘটায়; তেমনই নদীভাঙন, লবণাক্ততা, বিশুদ্ধ পানির সংকট ও যোগাযোগের দুর্ভোগ মানুষের জীবনকে অনিশ্চিত করে তোলে।'
তিনি বলেন, 'নদীর পাশে বসবাস মানে শুধু প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ কিংবা নদীর কাছ থেকে নানা সুবিধা পাওয়া নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে প্রতিনিয়ত ঝুঁকি ও অনিশ্চয়তার মধ্যে টিকে থাকার সংগ্রাম। নদী মানুষের জীবনে কখনো আশীর্বাদ, কখনো অভিশাপের মতো আবির্ভূত হয়। তবে নদীকে দায়ী করার চেয়ে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ, পরিবেশ ও প্রতিবেশের ভারসাম্য রক্ষা এবং নদীপাড়ের মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই বেশি জরুরি। কারণ, নদী বাঁচলে নদীকেন্দ্রিক জনপদ বাঁচবে, আর নদীপাড়ের মানুষের জীবন ও জীবিকাও পাবে টিকে থাকার নিশ্চয়তা।'
প্রতিবেদন: খায়রুল বাশার আশিক, জাগো নিউজ ২৪।
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪




মন্তব্য
(০)