২০২৬ সালের জুলাইয়ে দেশের বাজারে ভোজ্যতেলের দাম বাড়াতে উদ্যোগী হয় আমদানিকারক ও বাজারজাতকারী প্রতিষ্ঠানগুলো। প্রতি লিটারে ১০ টাকা বাড়ানোর প্রস্তাব তারা দেয় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে, আর যুক্তি দেখায়, এই দামে টানা লোকসান দিয়ে আমদানি চালিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। প্রস্তাবটি প্রথম দেয় রিফাইনারদের সংগঠন বাংলাদেশ ভেজিটেবল অয়েল রিফাইনার্স অ্যান্ড বনস্পতি ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন, ২০২৬ সালের ১১ জুলাই। জুলাইয়ের শেষ পর্যন্ত বিষয়টির কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি; মন্ত্রণালয় প্রশ্ন তোলে, কোম্পানিগুলোর চাওয়া বৃদ্ধির সঙ্গে বিশ্ববাজারের দরবৃদ্ধির মিল আছে কি না, আর ভোক্তা অধিকার সংগঠন অভিযোগ তোলে, লোকসানকে অজুহাত বানিয়ে দাম বাড়ানোর চেষ্টা হচ্ছে। চলতি সপ্তাহে আবার একটি বৈঠক হওয়ার কথা ছিল।
কোম্পানিগুলো যে প্রস্তাব দিয়েছে
ব্যবসায়ীরা প্রস্তাব দেন, খুচরা বাজারে প্রতি লিটার বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম ১০ টাকা বাড়িয়ে ২০৯ টাকা করা হোক। একইভাবে লিটারে ১০ টাকা বাড়িয়ে ৫ লিটারের বোতলের দাম এক হাজার ১৫ টাকা এবং খোলা সয়াবিন তেলের দাম লিটারে ১৮৮ টাকা নির্ধারণের কথা বলা হয়। একই প্রস্তাবে খোলা পাম তেলের দামও বাড়িয়ে প্রতি লিটার ১৮৩ টাকা করার কথা বলা হয়।
দাম বাড়ানোর এই প্রস্তাব প্রথম বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে পৌঁছায় ২০২৬ সালের ১১ জুলাই, রিফাইনারদের সংগঠনের পক্ষ থেকে। এর পরের সপ্তাহে মন্ত্রণালয়ে একদফা বৈঠক হয়, কিন্তু তা কোনো মীমাংসা ছাড়াই শেষ হয়। মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, চলতি সপ্তাহে আবারও একটি বৈঠক হবে, যেখানে দামের বিষয়ে সিদ্ধান্ত আসতে পারে। জুলাইয়ের শেষে যখন প্রস্তাবের খবরটি প্রকাশ পায়, তখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
কোম্পানির যুক্তি: আমদানি খরচ বেড়েছে
আমদানিকারক ও বাজারজাতকারী প্রতিষ্ঠানগুলো বলছে, আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধি, পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়াসহ নানা কারণে স্থানীয় বাজারে দাম সমন্বয় করা দরকার; বর্তমান দামে তারা লোকসান করছে। তাদের দাবি, আন্তর্জাতিক বাজারে দরবৃদ্ধি ও পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়ায় প্রতি লিটার বোতলজাত সয়াবিন তেলে ১৮ থেকে ২০ টাকা পর্যন্ত খরচ বেড়েছে।
বড় রিফাইনারদের একটি, টি কে গ্রুপের পরিচালক (ফাইন্যান্স অ্যান্ড অপারেশন) মো. শফিউল আতহার তসলিম জাগো নিউজকে বলেন, আমদানি পর্যায়ে তাদের সব খরচ বেড়েছে। তিনি বলেন, ‘আমাদের আমদানি পর্যায়ে সব খরচ বেড়েছে। জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধিতে বেড়েছে পরিবহন খরচও। এসব কারণে বর্তমান বাজারদরের তুলনায় লিটারে ১৮ থেকে ২০ টাকা পর্যন্ত বাড়তি গুনতে হচ্ছে।’ তিনি জানান, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে একটি বৈঠক হয়েছে, আরও একটি হওয়ার কথা রয়েছে; টানা লোকসান হলে এভাবে আমদানি করা সম্ভব হবে না।

মন্ত্রণালয়ের অবস্থান
বাণিজ্য মন্ত্রণালয় কোম্পানিগুলোর হিসাব হুবহু মেনে নেয়নি। কর্মকর্তারা বলেন, বিশ্ববাজারে দাম বাড়লেও সেই বৃদ্ধি এবং কোম্পানিগুলোর চাওয়া বৃদ্ধির মধ্যে ফারাক রয়েছে। মন্ত্রণালয় আরও মনে করিয়ে দেয়, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে নিত্যপণ্যে একগুচ্ছ করছাড় দেওয়া হয়েছে; দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্তের আগে সেসব ছাড় হিসাবে নেওয়া প্রয়োজন।
মন্ত্রণালয় উল্লেখ করে, প্রায় তিন মাস আগেই একবার দাম বাড়ানোর অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। ২০২৬ সালের ২৯ এপ্রিল সয়াবিন তেলের দাম লিটারে ৪ টাকা বাড়ানোর অনুমতি দেয় মন্ত্রণালয়; বোতলজাত সয়াবিন তেল লিটারে ১৯৫ থেকে বেড়ে ১৯৯ টাকা এবং খোলা সয়াবিন ১৭৬ থেকে ১৮০ টাকা হয়, পাম তেলের দাম তখন অপরিবর্তিত থাকে। সে সময় বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশন রিফাইনারদের প্রস্তাব পর্যালোচনা করে পরিমিত বৃদ্ধির কিছুটা যৌক্তিকতা খুঁজে পেয়েছিল।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জাগো নিউজকে বলেন, অ্যাসোসিয়েশনের প্রস্তাবের পর তারা ওইসব ব্যবসায়ীর সঙ্গে বসেছিলেন; তবে সেদিন বড় বড় কোম্পানির অল্প কিছু প্রতিনিধি উপস্থিত থাকায় বিষয়টির মীমাংসা করা সম্ভব হয়নি। তখন সিদ্ধান্ত হয়, পরে আরও একটি সভা করে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে দাম কত হওয়া উচিত, তা বিশ্লেষণের জন্য মন্ত্রণালয় বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের (বিটিটিসি) দ্বারস্থ হয়।
বিশ্ববাজার যা দেখাল
জুলাইয়ের শেষে উদ্ধৃত বিটিটিসির তথ্যে দেখা যায়, বিশ্ববাজারেও ভোজ্যতেলের দাম বেড়েছে। তখন বিশ্ববাজারে প্রতি টন অপরিশোধিত সয়াবিন তেল বিক্রি হচ্ছিল প্রায় এক হাজার ১৯১ মার্কিন ডলারে; মাসখানেক আগে যা ছিল প্রায় এক হাজার ১৬৯ ডলার, আর এক বছর আগে প্রায় এক হাজার ৭৮ ডলার। একইভাবে অপরিশোধিত পাম তেল বিক্রি হচ্ছিল প্রতি টন প্রায় এক হাজার ১৬২ ডলারে; মাসখানেক আগে যা ছিল প্রায় এক হাজার ১৪৫ ডলার এবং এক বছর আগে প্রায় এক হাজার ২৫ ডলার।
এই দরবৃদ্ধিই বিতর্কের কেন্দ্রে। কোম্পানিগুলো একে স্থানীয় দাম বাড়ানোর ভিত্তি হিসেবে দেখছিল, আর মন্ত্রণালয়ের বক্তব্য ছিল, প্রস্তাবিত ১০ টাকা বৃদ্ধি বিশ্ববাজারের হিসাবের চেয়ে বেশি। পাম ও সয়াবিন, দুটিই দেশের রান্নাঘর ও আমদানি ব্যয়ের বড় অংশজুড়ে আছে, আর দুটিরই দাম নির্ধারিত হয় ওঠানামায় ভরা আন্তর্জাতিক বাজারে; পাম তেল আসে মূলত ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়া থেকে, যেখানকার উৎপাদন ও রপ্তানিনীতি বিশ্ববাজারের দরে প্রভাব ফেলে। বিশ্ববাজারে উদ্ভিজ্জ তেলের দামে প্রভাব ফেলে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম ও জৈবজ্বালানির চাহিদাও, যা পাম ও সয়াবিন তেলকে জ্বালানির কাজে টেনে নেয়; প্রভাব ফেলে দক্ষিণ আমেরিকা ও যুক্তরাষ্ট্রে সয়াবিনের ফলনও। ফলে ঢাকায় নেওয়া সিদ্ধান্ত অনেকটাই নির্ভর করে বহু দূরের বাজারের ঘটনার ওপর। দেশের প্রায় পুরো তেলই যেহেতু এসব বাজার থেকে কেনা, টনপ্রতি দামের প্রতিটি ওঠানামা কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই খুচরা বাজারে টের পাওয়া যায়; ২০২৬ সালের জুলাইয়ে কোম্পানি ও মন্ত্রণালয় এই সঞ্চালন নিয়েই তর্ক করছিল।

দাম নিয়ে ভোক্তাদের উদ্বেগ
ভোজ্যতেল বাংলাদেশের রান্নাঘরে সবচেয়ে নজরে রাখা পণ্যগুলোর একটি, আর ২০২৬ সালের শুরুতেই বারবার দাম বাড়ায় প্রতিবাদ হয়েছিল। ভোক্তা অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) ২০২৬ সালের ৮ এপ্রিল ভোজ্যতেলের বাজারে কারসাজি ও বারবার দাম বৃদ্ধির অভিযোগে মানববন্ধন করে। ভোক্তা প্রতিনিধিদের যুক্তি ছিল, বিশ্ববাজারে দাম বাড়লে কোম্পানিগুলো দ্রুত দাম বাড়াতে চায়, কিন্তু দাম কমলে সেই সুফল দিতে দেরি করে; ফলে বছরের মাঝামাঝির লোকসানের দাবিকে তারা সতর্কতার সঙ্গে দেখছিল।
কারসাজির এই অভিযোগ শিল্পমালিকেরা অস্বীকার করেন; তাদের বক্তব্য, প্রস্তাবিত দাম কেবল আমদানি খরচেরই প্রতিফলন। মন্ত্রণালয় বলে, বিটিটিসির বিশ্লেষণের পরই নতুন দাম ঠিক হবে, যেখানে কোম্পানির খরচের দাবি, করছাড় এবং বিশ্ববাজারের প্রকৃত দরবৃদ্ধি একসঙ্গে বিবেচনা করা হবে। কারসাজির অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি; এটি ভোক্তা সংগঠনের বক্তব্য হিসেবেই ছিল, যা কোম্পানিগুলো নাকচ করে দেয়।
আগের দরবৃদ্ধির ধাক্কা
২০২৬ সালের জুলাইয়ের এই বিতর্ক ভোজ্যতেলের দাম নিয়ে দীর্ঘ টানাপোড়েনেরই সর্বশেষ পর্ব। সবচেয়ে তীব্র ধাক্কা আসে ২০২২ সালে, যখন ইউক্রেন যুদ্ধের পর বিশ্ববাজারে দাম লাফিয়ে বাড়ে ও সরবরাহ টান পড়ে; বাংলাদেশে উৎসবের আগে অনেক দোকান থেকে বোতলজাত সয়াবিন তেল কিছু সময়ের জন্য উধাও হয়ে যায়, আতঙ্কিত কেনাকাটা শুরু হয় এবং খুচরা দাম লিটারে প্রায় ২০০ টাকায় ওঠে, যা তখন ছিল রেকর্ড। ওই সময় বাংলাদেশ কম্পিটিশন কমিশন মজুতের অভিযোগে আট আমদানিকারকের বিরুদ্ধে মামলা করে, আর সরকার বারবার শুল্ক সমন্বয় ও দাম নির্ধারণ করে বাজার স্থির রাখার চেষ্টা করে। এরপর থেকে ছবিটা চেনা: রিফাইনাররা বিশ্ববাজারের দরবৃদ্ধি ও খরচের কথা বলে দাম বাড়াতে চায়, ভোক্তা সংগঠন ও কিছু কর্মকর্তা সন্দেহ করেন যে সুফল-অসুফলের সঞ্চালন একতরফা, আর সরকার মন্ত্রণালয় ও বিটিটিসির মাধ্যমে মধ্যস্থতা করে। বছরের পর বছর মাথাপিছু ব্যবহারও বেড়েছে, দিনে প্রায় ২২ গ্রামে; ফলে তেলের দামের যেকোনো পরিবর্তন প্রায় প্রতিটি পরিবারেই টের পাওয়া যায়।
আমদানিনির্ভর বাজার
ভোজ্যতেলের চাহিদার প্রায় পুরোটাই বাংলাদেশ মেটায় বিদেশ থেকে। দেশে তেলবীজের উৎপাদন খুবই কম, তাই আমদানি করা তেলেই চাহিদার বড় অংশ পূরণ হয়। বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের হিসাবে, বার্ষিক চাহিদার প্রায় ৯০ শতাংশ আসে আমদানি থেকে। মোট আবাদি জমির অল্প অংশেই, প্রায় ৩ শতাংশে, তেলবীজের চাষ হয়; বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্যে ২০১৯-২০ অর্থবছরে কৃষকেরা প্রায় ১১ দশমিক ৮ লাখ একর জমিতে তেলবীজ আবাদ করে প্রায় ৯ দশমিক ৭২ লাখ টন ফলিয়েছিলেন। এই আবাদ ২০১০-১১ অর্থবছরের চেয়ে প্রায় ২৮ শতাংশ বেশি এবং উৎপাদন ওই বছরের ৭ দশমিক ৩ লাখ টনের চেয়ে প্রায় ৩১ শতাংশ বেশি; অর্থাৎ দেশীয় ফলন বেড়েছে, তবে চাহিদার সঙ্গে ফারাক ঘোচানোর মতো নয়, যে বার্ষিক চাহিদা কমিশনের হিসাবে ২৩ থেকে ২৪ লাখ টনের মতো।
আমদানির ঝুড়িতে সবচেয়ে বড় অংশ সয়াবিন তেলের, ৬০ শতাংশের বেশি; এর সয়াবিনের বড় অংশ আসে যুক্তরাষ্ট্র থেকে। বাকিটা মূলত পাম তেল, যা আসে প্রধানত ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়া থেকে। ২০২২ সালের পর বাংলাদেশের সরবরাহে যুক্তরাষ্ট্রের সয়াবিনের হিস্যা বেড়েছে, ওই বছরের ফেব্রুয়ারির আগে বার্ষিক চাহিদার প্রায় ১৫ শতাংশ থেকে পরে প্রায় ৪০ শতাংশে। এই বাণিজ্যের পরিমাণ বিশাল: বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যে ২০২০-২১ অর্থবছরে তেলবীজ ও ভোজ্যতেল আমদানিতে দেশ ব্যয় করেছিল প্রায় ২৫ হাজার ৯১০ কোটি টাকা, যা ২০০৯-১০ অর্থবছরে ছিল প্রায় ৮ হাজার ১৬০ কোটি টাকা। এসব চালান সমুদ্রপথে আসে মূলত দেশের প্রধান বন্দর চট্টগ্রামে, যেখানে বাজারের প্রধান রিফাইনারিগুলোও গড়ে উঠেছে। তেলের বড় অংশ অপরিশোধিত অবস্থায় এনে দেশেই পরিশোধন করা হয়, তাই খালাস খরচ ডলারের বিপরীতে টাকার বিনিময় হারের সঙ্গেও ওঠানামা করে, কারণ আমদানির দাম ডলারে নির্ধারিত; টাকার মান কমলে বিশ্ববাজারের দাম স্থির থাকলেও প্রতি টনের খরচ বেড়ে যায়, আর ২০২৬ সালে রিফাইনাররা জাহাজভাড়া ও জ্বালানির পাশাপাশি এই চাপের কথাও বলেছিল।

দাম যেভাবে নির্ধারিত হয়
বাংলাদেশে বোতলজাত ও খোলা সয়াবিন এবং পাম তেলের খুচরা দাম পুরোপুরি বাজারের ওপর ছেড়ে দেওয়া নেই। একটি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে দাম ঠিক হয়, যেখানে একসঙ্গে থাকে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, রিফাইনারদের সংগঠন এবং বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশন। সাধারণত সংগঠন আমদানি খরচ ও বিশ্ববাজারের দর দেখিয়ে একটি দাম প্রস্তাব করে; বিটিটিসি জাহাজ থেকে খালাস পর্যন্ত খরচ ও আন্তর্জাতিক বাজার বিশ্লেষণ করে; আর মন্ত্রণালয় সেই দাম অনুমোদন, নাকচ বা সংশোধন করে। ২০২৬ সালের জুলাইয়ের প্রস্তাব, এপ্রিলের সংশোধন এবং মন্ত্রণালয়ের বিটিটিসির কাছে বিষয়টি পাঠানো, সবই এই ধারা মেনেই হয়েছিল। পরিশোধন ও বাজারজাত মূলত হাতে গোনা কয়েকটি বড় শিল্পগোষ্ঠীর হাতে কেন্দ্রীভূত, যাদের মধ্যে টি কে গ্রুপ ও মেঘনা গ্রুপ আছে; এদের ক্রাশিং প্ল্যান্ট ও রিফাইনারি গড়ে উঠেছে চট্টগ্রামকে ঘিরে। অল্প কয়েকটি প্রতিষ্ঠানই বাজারে সরবরাহ করে বলে সংগঠনের একটি যৌথ প্রস্তাব বড় প্রভাব ফেলে, আর প্রতিটি দাম নিয়ে মন্ত্রণালয়ের দরকষাকষি সবাই নিবিড়ভাবে লক্ষ করে।
কর এই হিসাবের অংশ। আগের দরবৃদ্ধির ধাক্কা থেকে ভোক্তাদের কিছুটা স্বস্তি দিতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড আগেই ভোজ্যতেলের ওপর করের বোঝা কমিয়েছিল: ২০২৪ সালের অক্টোবরে সয়াবিন ও পাম তেল আমদানিতে ভ্যাট ১৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১০ শতাংশ করা হয় এবং স্থানীয় উৎপাদন ও ব্যবসায়ে ভ্যাট অব্যাহতি দেওয়া হয়, পরে আমদানি পর্যায়ে ভ্যাট আরও কমানো হয়। শুল্ক, রেগুলেটরি ডিউটি ও ভ্যাট, সবই ভোজ্যতেলের খালাস খরচে যোগ হয়, যা দাম নির্ধারণের সময় বিটিটিসি বিবেচনায় নেয়; এ কারণেই ২০২৬ সালের জুলাইয়ে মন্ত্রণালয় জোর দিয়ে বলে, দাম বাড়ানোর আগে বাজেটের করছাড় হিসাবে ধরতে হবে।
টিসিবি ও স্বল্প আয়ের ভোক্তা
নির্ধারিত খুচরা দামের পাশাপাশি রাষ্ট্রায়ত্ত ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি) সয়াবিন তেলসহ নিত্যপণ্য ভর্তুকি মূল্যে বিক্রি করে প্রায় এক কোটি স্বল্প আয়ের ফ্যামিলি কার্ডধারীর কাছে। একজন কার্ডধারী সাধারণত ডাল, চিনিসহ অন্যান্য পণ্যের সঙ্গে সর্বোচ্চ দুই লিটার সয়াবিন তেল কিনতে পারেন, খোলাবাজারের চেয়ে অনেক কম দামে; কারসাজি ঠেকাতে নিযুক্ত ডিলার ও নির্দিষ্ট দোকানের মাধ্যমে এই বিক্রি চালানো হয়। টিসিবি তার তেলের একটি অংশ নিজস্ব দরপত্রে ও একটি অংশ দেশীয় রিফাইনারদের কাছ থেকে কেনে; প্রায় এক কোটি পরিবার নিয়ে গঠিত এই ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচিই নির্ধারিত খুচরা দামের বদলে সরাসরি স্বল্প আয়ের ভোক্তার কাছে পৌঁছানোর সরকারের প্রধান হাতিয়ার। সবচেয়ে দরিদ্র পরিবারগুলোকে ঠিক এই ধরনের দরবৃদ্ধির ধাক্কা থেকে আড়াল করতেই এই কর্মসূচি, যদিও সরবরাহ দাম নিয়ে রিফাইনার ও টিসিবির মতৈক্য না হলে কখনো কখনো টিসিবির বিক্রি আটকেও গেছে।
দেশেই বেশি তেল ফলানোর চেষ্টা
আমদানিনির্ভরতা কমাতে দেশে তেলবীজের আবাদ বাড়ানোর চেষ্টা চলেছে। কৃষি মন্ত্রণালয় তেলবীজের আবাদ ও ফলন ২০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়িয়ে আমদানি কমানোর লক্ষ্যে ২০২০ থেকে ২০২৫ মেয়াদে প্রায় ২৭৮ কোটি টাকার একটি প্রকল্প নিয়েছিল। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বারি) এ পর্যন্ত ৫০টির মতো তেলবীজের জাত উদ্ভাবন করেছে, যার মধ্যে সরিষা, সয়াবিন, বাদাম ও সূর্যমুখী রয়েছে; কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর আমন ও বোরো ধানের মাঝের পতিত জমিতে সরিষা চাষে উৎসাহ দিয়েছে, যেখানে ধানের আবাদ না কমিয়েও স্বল্পমেয়াদি একটি তেলবীজ ফলানো যায়। সরিষা দেশের প্রধান স্থানীয় তেলবীজ এবং দেশের অনেক জায়গার চিরচেনা রান্নার তেল; সরিষা থেকে তেল নিষ্কাশনের হার ৩৩ শতাংশের বেশি, যেখানে সয়াবিনে তা ১৫ থেকে ১৮ শতাংশ (বারি)। এ কারণেই স্বয়ংসম্পূর্ণতার চেষ্টা অনেকটা সরিষার ওপর ভর করে। তবু দেশীয় উৎপাদন চাহিদার তুলনায় এতই কম যে, সয়াবিন ও পাম তেলের দাম এখনো প্রধানত আমদানি ও বিশ্ববাজারের ওপরই নির্ভরশীল, আর কোনো এক বছরের বিশ্ববাজারের ধাক্কা দেশীয় ফসল দিয়ে সামলানো যায় না বললেই চলে।
বোতলের পেছনের ফসল
বিতর্কের কেন্দ্রে থাকা দুটি তেল আসে একেবারে ভিন্ন দুটি ফসল থেকে। সয়াবিন (Glycine max) একটি ডালজাতীয় ফসল, যার বীজে ওজনের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল থাকে; বীজ ভাঙিয়ে তেল এবং প্রোটিনসমৃদ্ধ খইল পাওয়া যায়, যা পশুখাদ্যে ব্যবহৃত হয়। বাংলাদেশে সয়াবিনের আবাদ কম, মূলত নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর ও বৃহত্তর বরিশালের নদীর চর ও উপকূলীয় জমিতে; সেখানে এটি মূলত বর্ষা-পরবর্তী রবি মৌসুমের ফসল, কিন্তু এই ফলন চাহিদার তুলনায় সামান্য, তাই বেশির ভাগ সয়াবিন তেল হয় আমদানি করা বীজ থেকে পরিশোধিত হয়, নয়তো অপরিশোধিত তেল হিসেবে আমদানি হয়। বীজ ভাঙানোর পর যে খইল থাকে, তা-ও গুরুত্বপূর্ণ: এটি পোলট্রি ও মাছের খাবারে প্রোটিনের প্রধান উপাদান। ফলে সয়াবিনের বাণিজ্য ভোজ্যতেলের বাজারকে দেশের পোলট্রি ও মৎস্যচাষের সঙ্গেও বেঁধে রাখে, আর বীজের দামের ওঠানামায় রান্নার তেলের পাশাপাশি ডিম, মুরগি ও চাষের মাছের খরচও নড়ে।
অন্যদিকে পাম (Elaeis guineensis) হলো পশ্চিম আফ্রিকার আদি একটি গ্রীষ্মমণ্ডলীয় গাছ এবং বিশ্বের সর্বোচ্চ ফলনশীল তেলফসল, যা প্রতি হেক্টরে সয়াবিন বা অন্য যেকোনো তেলবীজের চেয়ে অনেক বেশি তেল দেয়। এর লালচে তাজা ফলের কাঁদি থেকে অপরিশোধিত পাম তেল বের করা হয়, যা পরিশোধন, ব্লিচিং ও গন্ধমুক্ত করার পর রান্নাঘরে পৌঁছায়। বিশ্বের পামের বড় অংশ বাগানের পাশাপাশি ক্ষুদ্র চাষিদের কাছ থেকেও আসে, আর ফল কাটার এক-দুই দিনের মধ্যেই মাড়াই করতে হয় বলে উৎপাদন গড়ে ওঠে বাগানের কাছাকাছিই। বিশ্বের বেশির ভাগ পাম তেল ফলে ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়ায়; এটি বিশ্বে সবচেয়ে বেশি উৎপাদিত ও বাণিজ্য হওয়া উদ্ভিজ্জ তেল। পাম তেল সয়াবিন তেলের চেয়ে সস্তা এবং বেশি দিন টেকে, তাই বাংলাদেশে খোলা তেলের বিক্রি ও খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণে এর আধিপত্য। দূরের এই দুটি ফসল এবং সেগুলো বহনকারী জাহাজের ওপর বাংলাদেশ নির্ভরশীল বলেই ঢাকার মুদি দোকানের তাকে দাম ওঠানামা করে বহু দূরের ফসল, রপ্তানিনীতি আর জাহাজভাড়ার সঙ্গে, যা ভোজ্যতেলের দাম বাড়ানো বা ধরে রাখার প্রতিটি প্রস্তাবেরই পটভূমি।
ছবি: গভেরেত তেরেদ / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY 2.5)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪; বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশন (বিটিটিসি); বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো; বাংলাদেশ ব্যাংক; জাতীয় রাজস্ব বোর্ড; প্রথম আলো; দ্য ডেইলি স্টার





মন্তব্য
(০)