দিনাজপুরের পার্বতীপুর উপজেলায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) একটি সেচখালের বাঁধ সংস্কারে প্রকল্প এলাকার বাইরে থেকে মাটি আনার কথা ছিল। কিন্তু খননযন্ত্র দিয়ে খালের দুই পাড়ের আবাদি জমিই কোথাও ১০ থেকে ১২ ফুট গভীর করে কেটে সেই মাটি বাঁধে দেওয়া হচ্ছে। পাউবো নিজেই সরেজমিনে অনিয়মের সত্যতা পেয়ে মৌখিকভাবে কাজ বন্ধ রাখতে বলেছে এবং ঠিকাদারকে দুই দফায় চিঠি দিয়েছে।
‘তিস্তা সেচ প্রকল্পের কমান্ড এলাকার পুনর্বাসন ও সম্প্রসারণ’ শীর্ষক প্রকল্পের আওতায় ‘টিওয়ানএসএইটডি’ নামের সেচখালটির ১২ দশমিক ২০০ কিলোমিটার দীর্ঘ দুই পাড় পুনর্বাসন ও শক্তিশালী করা হচ্ছে। পাউবোর পার্বতীপুর পানি উন্নয়ন উপবিভাগ সূত্রে জানা যায়, এর মধ্যে ৪৪০ মিটারে আরসিসি ঢালাই, ১০ কিলোমিটারে সিসি লাইনিং এবং অবশিষ্ট অংশ শুধু মাটি দিয়ে শক্তিশালী করা হবে। কাজের ব্যয় ধরা হয়েছে ১৩ কোটি ৯৫ লাখ টাকা।
কার্যাদেশের শর্ত অনুযায়ী ঠিকাদারকে প্রকল্প এলাকার বাইরে থেকে প্রায় ৫৯ হাজার ৭০৮ ঘনমিটার মাটি এনে বাঁধ পুনর্নির্মাণ করতে হবে, আর সে জন্যই বরাদ্দ রাখা হয়েছে প্রায় ২ কোটি ৩৮ লাখ ৮৩ হাজার টাকা। কাজটি পেয়েছেন মো. মিজানুর আলম নামের একজন ঠিকাদার। কার্যাদেশ অনুযায়ী ২০২২ সালের ১ ডিসেম্বর শুরু করে ২০২৪ সালের ৩০ ডিসেম্বরের মধ্যে কাজ শেষ করার কথা ছিল; দুই দফা বাড়িয়ে সময় এখন চলতি বছরের ৩০ ডিসেম্বর। এ পর্যন্ত ৫৫ দশমিক ৫০ শতাংশ কাজ শেষ দেখিয়ে ঠিকাদার ৭ কোটি ৭২ লাখ টাকা বিল নিয়েছেন।
খালটি চিরিরবন্দর উপজেলার দেবীগঞ্জ এলাকায় তিস্তা ব্যারাজ থেকে বের হয়ে ‘এসএইটডি’ নামে পার্বতীপুরের আদমকাটা পর্যন্ত গেছে; মালিপাড়া এলাকা থেকে বের হওয়া টিওয়ানএসএইটডি শাখাটির সংস্কারই চলছে। খাল ঘুরে দেখা গেছে, দুই পাড়ে খননযন্ত্র দিয়ে মাটি কাটা হচ্ছে, বাইরে থেকে মাটি আনার কোনো দৃশ্য নেই। কয়েকটি স্থানে খালপাড়ের ঘরবাড়ি সরিয়ে দেওয়া হয়েছে, কেটে ফেলা হয়েছে বাঁশ ও কলাসহ অন্যান্য গাছপালা। কোথাও পাড়ের মাটি খালে পড়ে পানির প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
মালিপাড়ার বাসিন্দা জহুরুল ইসলাম বলেন, ‘কাজ শুরুর কয়েক দিন পর জানতে পারি, বাইরে থেকে মাটি আনার কথা। পরে দেখি, কোনো মাটি আনা হয়নি, বরং খালের পাশ থেকেই মাটি কাটা হচ্ছে।’ একই এলাকার রায়হান আলীর কথা, ‘৩০ বছরের বেশি বয়স হবে খালটার। এত দিন পর সংস্কারকাজ হচ্ছে। কিন্তু আমাদের জমির মাটি কেটে পাড়ে দেওয়া হয়েছে। অনেকেরই ধানগাছ নষ্ট হয়েছে।’
মাটির অভিযোগের পাশাপাশি সাইটে নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী পাওয়ার কথাও জানিয়েছে পাউবো। গত ৩১ আগস্ট উপবিভাগীয় প্রকৌশলী জি এম রাইসুল ইসলামের দেওয়া চিঠিতে সিসি লাইনিংয়ের নিম্নমানের সামগ্রী সাইট থেকে সরিয়ে কার্যাদেশ অনুযায়ী সামগ্রী ব্যবহার করতে বলা হয়। চিঠিতে বলা হয়, পরিদর্শনকালে খালসংলগ্ন অধিগ্রহণ করা জমি থেকে মাটি তুলে বাঁধে দেওয়া হয়েছে এবং সিসি লাইনিং ও আরসিসি ড্রেন অংশে দরপত্র অনুযায়ী মাটি দেওয়া হয়নি।
পাউবোর এক কর্মকর্তা জানান, মূল ঠিকাদারের কাছ থেকে স্থানীয় খাদেমুল ইসলামসহ কয়েকজন সাবলিজ নিয়ে কাজটি করছেন; সরকার পতনের পর দীর্ঘদিন কাজ বন্ধ ছিল, প্রায় দুই মাস পর আবার শুরু হলেও এখন বন্ধ। মূল ঠিকাদার মো. মিজানুর আলম বলেন, ‘কাজটি আমার নামে বের হয়েছে। তবে স্থানীয় কয়েকজন সাবলিজ নিয়ে বাস্তবায়ন করছে। কাজের অনিয়ম বা কোনো সমস্যার কথা আমি জানি না। কোনো চিঠিও আমার হাতে আসেনি।’
সৈয়দপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী আখিনুজ্জামান বলেন, ‘একটি অনিয়মের অভিযোগ ছিল যে পাশের জমি থেকে মাটি নিয়ে বাঁধে দেওয়া হচ্ছিল। সরেজমিনে আমরা বিষয়টির সত্যতা পেয়েছি এবং তাৎক্ষণিক মৌখিকভাবে কাজটি বন্ধ রাখতে বলা হয়েছে। পরে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে চিঠিও দেওয়া হয়েছে। পরে যদি আবার কোনো অভিযোগ পাই, খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ সেচখালের পাড় শক্ত হলে বোরো মৌসুমে তিস্তা সেচ প্রকল্পের কমান্ড এলাকায় পানি পৌঁছানো সহজ হয়; কিন্তু পাড়ের আবাদি জমি কেটে নেওয়া হলে সেই সুবিধার দাম দিতে হয় খালপাড়ের কৃষককেই।
প্রতিবেদনটি প্রথম আলোর দিনাজপুর প্রতিনিধি রাজিউল ইসলামের।
সূত্র: প্রথম আলো





মন্তব্য
(০)