মানিকগঞ্জের হরিরামপুরে পদ্মার চরের এক বাড়িতে রান্নাঘরের পাশের ছোট কুঠুরিতে তাকে তাকে সাজানো বীজ: কাচের বয়ামে, কাপড়ের পুঁটলিতে, মাটির হাঁড়িতে, প্রতিটির গায়ে হাতে লেখা নাম। এই বীজ রাখেন বাড়ির নারীরা। আমেনা বেগম (৩৫) বললেন, ‘আশপাশে যত গাছ দেখতাছেন, যত সবজি দেখতাছেন, সব প্ল্যান আমাদের।’
বেড়ায় করলা ও বরবটি, ক্ষেতে টমেটো, বেগুন, ডাঁটা আর মরিচ; বিলের পাড়ে তাল ও সুপারির সারি, যাতে শিকড় মাটি ধরে রাখে। কোন ফসলের পাশে কোন ফসল বসবে, কোন মৌসুমে কী বোনা হবে, পরের বছরের জন্য কোন বীজ রাখা হবে, সে পরিকল্পনা করেন এই নারীরা। চরে এর যুক্তি সহজ: বন্যায় এক ফসল গেলে আরেকটি টিকে যায়। বন্যার পর বীজ কেনার টাকা বা সময় না থাকলে ঘরের এই বীজ দিয়েই ক্ষেত আবার সবুজ হয়।
তবু জমির দলিল, কৃষকের তালিকা বা ভাঙনের ক্ষতিপূরণের কাগজে তাঁদের নাম নেই। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য উদ্ধৃত করে ভূমি অধিকার সংগঠন এএলআরডি জানিয়েছে, দেশের কর্মজীবী নারীর ৭৪ শতাংশ কৃষিতে যুক্ত, অথচ জমির কার্যকর মালিকানায় তাঁদের ভাগ মাত্র চার থেকে পাঁচ শতাংশ। ফসল উৎপাদনের ২১ ধরনের কাজের ১৭টিতে নারী জড়িত, যার মধ্যে বীজ বাছাই, ফসল তোলা, মাড়াই, শুকানো ও সংরক্ষণ আছে।
কৃষি অফিসের প্রশিক্ষণ, ভর্তুকির সার, প্রণোদনার বীজ, সহজ ঋণ ও দুর্যোগের পরের সহায়তা যায় কৃষকের তালিকা ধরে। প্রবীণ নারীরা বলেন, কেনা বীজ, রাসায়নিক সার ও কীটনাশক আসার পর দোকানের খাতা আর ঋণের কাগজে নাম ওঠে পুরুষের; জ্ঞান থেকে যায় নারীর কাছে, সিদ্ধান্ত চলে যায় অন্য হাতে।
চরের জমিও স্থির নয়। স্থানীয়দের হিসাবে গত দুই দশকে হরিরামপুরের অন্তত ১৩টি মৌজা পদ্মায় গেছে, গত এক বছরে নদী নিয়েছে প্রায় এক হাজার বিঘা ফসলি জমি ও শতাধিক বসতবাড়ি। সিইজিআইএসের হিসাবে ১৯৭৩ সাল থেকে যমুনা ও পদ্মার ভাঙনে প্রায় এক লাখ ৫৮ হাজার হেক্টর জমি হারিয়েছে। ভাঙনের পর পুরুষেরা কাজের খোঁজে শহরে গেলে নারীরা নিজের রাখা বীজে আবার চাষ শুরু করেন।
এ বছর পহেলা বৈশাখে চালু হওয়া ‘কৃষক কার্ড’ কর্মসূচির প্রাক-পাইলট পর্যায়ে ১০ জেলার ২০ হাজার ৬৭১ জন ভূমিহীন, প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র কৃষক কার্ড পাচ্ছেন, বছরে আড়াই হাজার টাকা নগদসহ ন্যায্যমূল্যে উপকরণ ও সহজ ঋণের সুবিধা। মানিকগঞ্জ এই দশ জেলায় নেই। আবেদনে জমির দলিল, খতিয়ান বা চাষের প্রমাণ চাওয়া হচ্ছে, যার কোনোটিই আমেনার নামে নেই; আর কৃষকের শ্রেণি ঠিক হচ্ছে পরিবারের জমির মাপে।
চরে কাজ করা উন্নয়নকর্মীরা বলছেন, কৃষক তালিকায় মালিকানার বদলে প্রকৃত চাষকে মানদণ্ড ধরা, একই পরিবারের নারী ও পুরুষকে আলাদা কৃষক হিসেবে গোনা, খাসজমিতে স্বামী-স্ত্রীর যৌথ নামে বন্দোবস্তের বিধান চরে কড়াভাবে মানা এবং ভাঙনের ক্ষতিপূরণের তালিকায় নারীপ্রধান পরিবারকে আলাদা করে চিহ্নিত করা দরকার।
প্রতিবেদনটি সমকালের জন্য লাবণী মণ্ডলের লেখা থেকে তৈরি।
ছবি: Hridoye Mati O Manush / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY 2.0)
সূত্র: সমকাল





মন্তব্য
(০)