নিয়ম না মেনে যত্রতত্র অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োগের কারণে গবাদিপশু ও হাঁস-মুরগির দেহে জীবাণু এতটাই শক্তিশালী হয়ে উঠেছে যে অনেক চিকিৎসায় আর সুফল মিলছে না। খামার থেকে এই অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স (এএমআর) খাবারের মাধ্যমে মানুষের শরীরেও পৌঁছাচ্ছে বলে সতর্ক করেছেন বিশেষজ্ঞরা, প্রতিদিনের বাংলাদেশের এক বিশেষ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
মাঠের উদাহরণ দিয়েছে পত্রিকাটি। শরীয়তপুরের ডামুড্যার পূর্ব ডামুড্যা গ্রামের মনির হোসেনের ছয় মাস বয়সী একটি বাছুর সম্প্রতি লাম্পি স্কিন ডিজিজ (এলএসডি) ও পাতলা পায়খানায় ভুগে মারা যায়। ১৮ বছর ধরে পশুর চিকিৎসা করা গ্রাম্য চিকিৎসক লুৎফর রহমান জানান, বাছুরটিকে পাতলা পায়খানার জন্য অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়া হলেও কাজ করেনি। কৃষকেরা বলছেন, মাঠে চরানো গরু-ছাগল এলএসডি, তড়কা বা নিউমোনিয়ায় বেশি আক্রান্ত হচ্ছে, আর চিকিৎসায় ওষুধের কার্যকারিতা কমছে।
ডামুড্যা উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. মানসুরুল হক বলেন, সাধারণ ওষুধে কাজ না হলে বাধ্য হয়ে উচ্চমাত্রার বা দীর্ঘমেয়াদি অ্যান্টিবায়োটিক দিতে হয়, যার অবশিষ্টাংশ প্রাণিদেহে ও পরিবেশে থেকে যায়। তাঁর মতে, ওষুধের এই অকার্যকারিতা খাদ্যনিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি জড়িত।
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের এপিডেমিওলজি সেলের উপপরিচালক ডা. মো. আনোয়ারুল ইসলাম জানান, ২০২৪-২৫ সালে চার জেলার ৭২টি ব্রয়লার, লেয়ার ও সোনালি মুরগির খামারে অধিদপ্তরের গবেষণায় ই-কোলাই, সালমোনেলা, এন্টারোকক্কাস ও ক্যাম্পাইলোব্যাকটর ওষুধ প্রতিরোধী পাওয়া গেছে; ই-কোলাই ১৯টি অ্যান্টিবায়োটিকের বিরুদ্ধে ৯৮ শতাংশ পর্যন্ত প্রতিরোধক্ষমতা অর্জন করেছে। চলতি বছর মাঠ থেকে সংগ্রহ করা ব্রয়লারের মাংস ও ডিমের ১৩৯টি নমুনার পরীক্ষায় মাংসে অক্সিটেট্রাসাইক্লিন ও এনরোফ্লক্সাসিন নির্ধারিত মাত্রার বেশি পাওয়া গেছে, তবে ডিমে কোনো অবশিষ্টাংশ মেলেনি। বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিএলআরআই) গবেষণায় ব্রয়লার, লেয়ার, গরু, ছাগল ও ভেড়া থেকে পাওয়া জীবাণুর ৭১ শতাংশই একাধিক অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী।
রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) গবেষক অধ্যাপক ডা. জাকির হোসেন বলেন, সংক্রমিত মাংস অস্বাস্থ্যকরভাবে কাটাকাটি করলে বা সঠিক তাপে রান্না না করলে প্রতিরোধী জীবাণু মানুষের দেহে প্রবেশ করে। পত্রিকাটি জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) ৩ জুনের এক প্রতিবেদনের বরাতে লিখেছে, বিশ্বে ব্যবহৃত অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল ওষুধের প্রায় ৭৫ শতাংশ যায় গবাদিপশু পালনে; ২০৪০ সালের মধ্যে সংকট মোকাবিলা না হলে এ খাতে ক্ষতি দাঁড়াবে ৩১ হাজার ৮০০ কোটি ডলার, অথচ যথেচ্ছ ব্যবহার বন্ধে খরচ হবে ৫ হাজার ৩০০ কোটি ডলার।
‘ফ্লেমিং ফান্ড কান্ট্রি গ্রান্ট টু বাংলাদেশ’ প্রকল্পের সাবেক টেকনিক্যাল লিড ড. মো. নূরে আলম সিদ্দিকী জানান, যুক্তরাজ্য সরকারের সহায়তায় স্বাস্থ্য, প্রাণিসম্পদ ও মৎস্য অধিদপ্তরের ২০টি ল্যাবরেটরির এএমআর নজরদারির সক্ষমতা বাড়ানো হয়েছে। ড্রাগ অ্যান্ড কসমেটিকস আইনে ব্যবস্থাপত্র ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক বিক্রিতে ৫০ হাজার টাকা জরিমানার বিধান কঠোরভাবে প্রয়োগের ওপর জোর দেন তিনি। খামারিদের জন্য বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ: নিবন্ধিত ভেটেরিনারি সার্জনের পরামর্শে সঠিক রোগ নির্ণয় করে ওষুধ দেওয়া, ল্যাবভিত্তিক নজরদারি বাড়ানো এবং মানুষ, প্রাণী ও পরিবেশকে একসঙ্গে বিবেচনা করে ‘ওয়ান হেলথ’ পদ্ধতিতে কাজ করা।
প্রতিবেদক: ফারুক আহমাদ আরিফ, প্রতিদিনের বাংলাদেশ।
ছবি: Ibrahim Husain Meraj / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 3.0)
সূত্র: প্রতিদিনের বাংলাদেশ





মন্তব্য
(০)