সরাসরিবাজারদর
আটা (প্যাকেটজাত)৫৮—আদা - আমদানিকৃত১৬৭—আদা - দেশী১৫৪—আমন চাল - মাঝারি৫৬—আমন চাল - মোটা৪৮—আমন চাল - সরু৭২—আয়োডিনযুক্ত লবণ (প্যাকেটজাত)৩২—কাঁচা মরিচ২১৮—খামারের মুরগী১৬২—খাসী৯০০—চিনি (দেশী)১৩২—ছোলা - গোটা৮৫—ডিম ফার্ম - লাল৪৭—পেঁয়াজ - দেশী৬০—বোরো চাল - মাঝারি৫৫—বোরো চাল - মোটা৪৭—বোরো চাল - সরু৬৬—মাংসঃ– গরু৭২৯—মুগ ডাল১২২—রসুন - আমদানিকৃত১৯২—রসুন - দেশী১৭৩—সয়াবিন তেল১৬৩—
হালনাগাদ ২ অক্টোবর ২০২৬
ঢাকা৩৩°মূলত পরিষ্কারআর্দ্রতা ৫০%বাতাস ৮ কিমি/ঘ

চন্দ্রমল্লিকা চাষের সঠিক কৌশল ও রোগ দমনের উপায়: বাগানে আনুন রঙের জাদু

জনপ্রিয়তায় গোলাপের পরই চন্দ্রমল্লিকা, আন্তর্জাতিক ফুলের বাজারেও প্রথম সারিতে। শীতের রোদ ও দোআঁশ মাটি, সাকার ও শাখা কলমে চারা, রোপণের সময়, টবের মাটির মিশ্রণ, বড় ফুলের জন্য কুঁড়ি অপসারণ আর জাবপোকা ও ছত্রাক দমনের নিয়ম।

চন্দ্রমল্লিকা চাষের সঠিক কৌশল ও রোগ দমনের উপায়: বাগানে আনুন রঙের জাদু
ফুল

নভেম্বরের এক কুয়াশাভেজা সকালে কোনো বাড়ির ছাদবাগানে ঢুকলে প্রথমেই চোখ আটকে যায় টবভর্তি সোনালি, তামাটে আর বেগুনি ফুলে। থোকা থোকা পাপড়ি যেন গোল বলের মতো ফুটে আছে। এই ফুলের নাম চন্দ্রমল্লিকা। শীত এলেই শহরের ছাদ, স্কুলের বাগান আর ফুলের মেলায় তার রাজত্ব শুরু হয়। বিয়ের মঞ্চ থেকে একুশের শহীদ মিনার পর্যন্ত নানা আয়োজনে ফুলের চাহিদা মেটাতে চন্দ্রমল্লিকার চাষ এখন আর শুধু শখের বিষয় নয়, অনেক কৃষকের কাছে এটি লাভজনক ব্যবসাও।

চন্দ্রমল্লিকা অত্যন্ত জনপ্রিয় ফুল, যার বাণিজ্যিক চাষ হয় পৃথিবীর নানা দেশে। নানা রঙের এই ফুল আন্তর্জাতিক ফুলের বাজারে বাণিজ্যমূল্যের দিক থেকে প্রথম সারিতে। জনপ্রিয়তায় গোলাপের পরই এর স্থান। এ দেশে অক্টোবরে গাছে কুঁড়ি আসে এবং নভেম্বরে ফুল ফোটে। গাছে ফুল তাজা থাকে ২০ থেকে ২৫ দিন, যা অন্য অনেক ফুলের তুলনায় বেশি। বাজারে চাহিদা থাকায় দেশে বাণিজ্যিকভাবে চন্দ্রমল্লিকা উৎপাদনের ভালো সম্ভাবনা রয়েছে।

রঙের বাহার, নামের ইতিহাস


চন্দ্রমল্লিকা নানা বর্ণ ও রঙের হয়। তামাটে, সোনালি, হলুদ, বেগুনি, লাল ও খয়েরি রঙের চন্দ্রমল্লিকা বেশ জনপ্রিয়। আর আছে ‘গ্রিন গডেস’ নামের সবুজ চন্দ্রমল্লিকা, যা দেখে অনেকেই প্রথমে বিশ্বাস করতে চান না যে ফুল সবুজও হতে পারে। আকারেও বৈচিত্র্য আছে: কোনো জাতের ফুল হাতের তালুর চেয়েও বড়, আবার কোনোটি ছোট বোতামের মতো, এক ডালে থোকা থোকা ফোটে।

ফুলের গড়ন দেখে উদ্যানবিদেরা চন্দ্রমল্লিকাকে কয়েকটি দলে ভাগ করেন। কোনোটির পাপড়ি ভেতরের দিকে বাঁকানো, ফলে ফুল দেখতে একটি নিটোল বলের মতো; কোনোটির পাপড়ি বাইরের দিকে ঝুলে পড়ে। পমপম ধরনের ফুল ছোট ও গোল, ঠিক উলের বলের মতো। স্পাইডার বা মাকড়সা ধরনের ফুলে লম্বা, সরু, নলের মতো পাপড়ি চারদিকে ছড়িয়ে থাকে। আবার কিছু জাতের ফুল দেখতে অনেকটা ডেইজির মতো, মাঝখানে চাকতি আর চারপাশে এক সারি পাপড়ি। কোন জাত বাছবেন, তা নির্ভর করে উদ্দেশ্যের ওপর: প্রদর্শনীর জন্য বড় ফুলের জাত, টবে সাজানোর জন্য থোকা ধরা ছোট ফুলের জাত, আর বাজারে ডাঁটাসহ বিক্রির জন্য লম্বা ও শক্ত ডালের জাত।

উদ্ভিদবিজ্ঞানে এর নাম ক্রিসানথিমাম। গ্রিক ভাষায় শব্দটির অর্থ সোনালি ফুল, কারণ আদিতে এর বেশির ভাগ জাত ছিল হলুদ। চীনে এই ফুলের চাষ হাজার বছরেরও বেশি পুরোনো, আর জাপানে চন্দ্রমল্লিকা রাজপরিবারের প্রতীক; সেখানকার সম্রাটের সিংহাসনকে বলা হয় চন্দ্রমল্লিকা সিংহাসন। পূর্ব এশিয়া থেকে ফুলটি ধীরে ধীরে ইউরোপ হয়ে সারা বিশ্বে ছড়িয়েছে। বাংলা নাম চন্দ্রমল্লিকাও বেশ কাব্যিক; চাঁদের মতো গোল, পূর্ণ ফুলের সঙ্গে নামটি মানিয়েও যায়।

বাংলাদেশে ফুল চাষের কথা উঠলেই যশোরের ঝিকরগাছা উপজেলার গদখালীর নাম আসে, যা দেশের ফুলের রাজধানী হিসেবে পরিচিত। সেখানকার কৃষকেরা গোলাপ, জারবেরা, গ্লাডিওলাস, রজনীগন্ধা ও গাঁদার পাশাপাশি চন্দ্রমল্লিকাও চাষ করেন। পাশের ঝিনাইদহের মহেশপুরের শ্যামপুর গ্রামেও বহু কৃষক চন্দ্রমল্লিকা চাষে ঝুঁকেছেন বলে সংবাদমাধ্যমে খবর এসেছে।

দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী গদখালী ও পানিসারা এলাকায় ছয় হাজারেরও বেশি কৃষক প্রায় দুই হাজার হেক্টর জমিতে ফুল চাষ করেন। সেখানকার ফুল ঢাকাসহ দেশের প্রায় সব জেলায় যায়। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ডিসেম্বর থেকে এপ্রিল এখানকার ফুল ব্যবসার ভরা মৌসুম, যখন বিজয় দিবস, একুশে ফেব্রুয়ারি, স্বাধীনতা দিবস, বসন্ত উৎসব আর পহেলা বৈশাখকে ঘিরে চাহিদা চূড়ায় ওঠে। শীতের ফুল হিসেবে চন্দ্রমল্লিকা এই মৌসুমেরই অংশ।

আবহাওয়া ও মাটি: শীতের রোদ চাই


চন্দ্রমল্লিকা তুলনামূলক ঠান্ডা আবহাওয়া আর রোদেলা জায়গা পছন্দ করে। বাংলাদেশে তাই শীতকালই এই ফুল চাষের সবচেয়ে ভালো সময়। দিনের বেশির ভাগ সময় রোদ পায়, এমন জায়গায় টব বা বেড রাখতে হবে; ছায়ায় গাছ লম্বা ও দুর্বল হয়, ফুলও কম আসে।

এই ফুলের আরেকটি মজার বৈশিষ্ট্য আছে। উদ্ভিদবিজ্ঞানীরা একে বলেন ছোট দিনের উদ্ভিদ। অর্থাৎ দিন ছোট হয়ে রাত লম্বা হতে শুরু করলে গাছ ফুল ফোটানোর সংকেত পায়। এ কারণেই হেমন্ত আর শীতে, যখন দিন ছোট হয়ে আসে, চন্দ্রমল্লিকা ফোটে। বাণিজ্যিক চাষিরা আলো ব্যবহার করে এই সময়কে নিয়ন্ত্রণ করেন। দ্য ডেইলি স্টারের ২০২০ সালের ডিসেম্বরের এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, মহেশপুরের শ্যামপুরের চাষিরা খেতে এলইডি বাতি জ্বালিয়ে চন্দ্রমল্লিকা চাষ করছেন। তাঁদের অভিজ্ঞতায়, বাতি জ্বালালে গাছ দ্রুত বাড়ে, ফুলের আকার ও রং আরও সুন্দর হয়। ওই প্রতিবেদন অনুযায়ী মৌসুমে একটি গাছ থেকে প্রায় ১০০টি ফুল পাওয়া যায়, আর প্রতিটি ফুল বিক্রি হয় আড়াই থেকে পাঁচ টাকায়।

লাভের একটি বাস্তব হিসাবও ওই প্রতিবেদনে ছিল। সবজি চাষ ছেড়ে চন্দ্রমল্লিকায় আসা এক কৃষক ২০ শতাংশ জমিতে ২০২০ সালের মৌসুমে খরচ করেছিলেন দেড় লাখ টাকা, আর ফুল বিক্রি করে পেয়েছিলেন ১ লাখ ৮৫ হাজার টাকা; অর্থাৎ করোনা মহামারির সেই কঠিন বছরেও তাঁর মুনাফা হয়েছিল ৩৫ হাজার টাকা। চাষিরা আরও জানিয়েছিলেন, বাতি ব্যবহারে সারও কম লাগে। হিসাবটি একজন কৃষকের এক মৌসুমের, সবার ক্ষেত্রে এক রকম হবে না; তবে এতে বোঝা যায়, পরিকল্পনা করে চাষ করলে ছোট জমিতেও চন্দ্রমল্লিকা আয় এনে দিতে পারে।

মাটির ক্ষেত্রে জৈব পদার্থসমৃদ্ধ, পানি নিষ্কাশনের ভালো ব্যবস্থা আছে এমন দোআঁশ ও বেলে মাটি চন্দ্রমল্লিকার জন্য উপযোগী। গোড়ায় পানি জমলে শিকড় পচে যায়, তাই বেড কিছুটা উঁচু করে তৈরি করা ভালো। মাটির পিএইচ ৬.০ থেকে ৭.০ হওয়া বাঞ্ছনীয়। পিএইচ হলো মাটির অম্লত্ব বা ক্ষারত্বের মাপ; ৭ মানে নিরপেক্ষ, তার কম অম্লীয়। অর্থাৎ হালকা অম্লীয় থেকে নিরপেক্ষ মাটিতে এই ফুল সবচেয়ে ভালো হয়।

চারা তৈরি: বীজ নয়, কলম ও সাকার


বীজ, সাকার ও শাখা কলম, এই তিনভাবে চন্দ্রমল্লিকার চারা তৈরি করা যায়। তবে বীজ থেকে চারা করলে ভালো ফুল পাওয়া যায় না, আর ফুল পেতেও অনেক দিন লেগে যায়। বীজের চারায় মাতৃগাছের রং ও আকার ঠিক থাকে না। অন্যদিকে ডাল কেটে শাখা কলম করলে বা সাকার থেকে চারা করলে এই সমস্যা থাকে না; নতুন গাছ হুবহু মাতৃগাছের মতো ফুল দেয়।

এ দেশে সাধারণত শাখা কলম করেই চারা তৈরি করা হয়। জুলাই মাসের মাঝামাঝি থেকে শাখা কলম করা শুরু হয়। এক বছর বয়সী সতেজ ও সবল ডাল থেকে ৮ থেকে ১০ সেন্টিমিটার লম্বা অংশ তেরছা করে কেটে বেডে বা বালতিতে বসিয়ে দিলে তাতে শিকড় গজায়। তেরছা করে কাটলে কাটা অংশের আয়তন বাড়ে, ফলে শিকড় বের হওয়ার জায়গাও বেশি পাওয়া যায়। কলম বসানোর মাধ্যম হিসেবে বালু বা বালুমেশানো মাটি ভালো, কারণ তাতে পানি জমে না।

সাকার থেকে চারা করার পদ্ধতিও প্রচলিত। সাকার হলো গাছের গোড়া থেকে বের হওয়া নতুন কচি ডগা। ফেব্রুয়ারির দিকে যখন ফুল দেওয়া শেষ হয়ে যায়, তখন গাছগুলোকে মাটির ওপর ১৫ থেকে ২০ সেন্টিমিটার রেখে কেটে দেওয়া হয়। কিছুদিন পর কাটা গাছের গোড়া থেকে কয়েকটি সাকার বের হয়। এগুলো ৫ থেকে ৭ সেন্টিমিটার লম্বা হলে মাতৃগাছ থেকে আলাদা করে ছায়াযুক্ত বীজতলায় বা টবে লাগানো হয়।

তাই ফুল শেষ হলেই গাছ ফেলে দেওয়া ঠিক নয়। পরের বছরের চারার উৎস এই মাতৃগাছগুলোই। ছেঁটে দেওয়া গাছগুলো গ্রীষ্মে আধা ছায়ায় রেখে পরিমিত পানি দিলে গোড়া থেকে সতেজ সাকার বের হয়, আর সেগুলোর ডাল থেকেই জুলাইয়ে কলম করা যায়। যে গাছে সবচেয়ে সুন্দর ও বড় ফুল এসেছিল, সেটিকে চিহ্ন দিয়ে আলাদা করে রাখলে পরের মৌসুমে ভালো জাতটি হারায় না।

মে থেকে জুলাই মাস চারার জন্য কঠিন সময়। এ সময় ভারী বৃষ্টি আর কড়া রোদ, দুটোই চারার ক্ষতি করে। তাই চারাকে বৃষ্টি ও কড়া রোদ থেকে বাঁচানোর ব্যবস্থা করতে হবে। বাঁশের কাঠামোর ওপর পলিথিন বা চাটাই দিয়ে হালকা ছাউনি দিলে চারা নিরাপদ থাকে। অনেক শৌখিন বাগানি এ সময় টবগুলো বারান্দা বা ছাউনির নিচে সরিয়ে রাখেন। টবের নিচে ইট বা কাঠ দিয়ে একটু উঁচু করে রাখলে বৃষ্টির পানিও দ্রুত বেরিয়ে যায়।

চারা রোপণ: একবার বদলে শক্ত করা


চূড়ান্তভাবে নির্দিষ্ট জায়গায় বা টবে লাগানোর আগে চারাগুলোকে একবার আলাদা জমিতে বা টবে সরিয়ে লাগানো যেতে পারে। একে বলে চারা স্থানান্তর। এতে চারার শিকড় বেশি ছড়ায়, চারা শক্ত হয় এবং ফুল দেওয়ার ক্ষমতা বাড়ে। মূল জমি বা টবে চারা লাগানোর উপযুক্ত সময় অক্টোবর থেকে নভেম্বর। জাতভেদে সারি ও গাছের মধ্যে প্রায় ৩০ ও ২৫ সেন্টিমিটার দূরত্ব রেখে চন্দ্রমল্লিকা লাগাতে হবে। বড় ফুলের জাতে দূরত্ব কিছুটা বেশি রাখা ভালো, যাতে আলো-বাতাস চলাচল করে।

চারা লাগানোর কাজ বিকেলে করলে ভালো, কারণ রাতের ঠান্ডায় চারা ধকল সামলে নিতে পারে। লাগানোর পর গোড়ায় হালকা পানি দিতে হয় এবং প্রথম কয়েক দিন কড়া রোদ থেকে আড়াল রাখতে হয়। লম্বা জাতের গাছে পরে কাঠি দিয়ে ঠেকনা দেওয়ার দরকার হয়, নইলে ফুলের ভারে ডাল নুয়ে পড়ে বা ভেঙে যায়।

ডগা ভাঙা: ঝোপালো গাছের কৌশল


চারা লেগে যাওয়ার পর একটি প্রচলিত কাজ হলো ডগা ভাঙা বা পিঞ্চিং। চারায় কয়েক জোড়া পাতা হলে আঙুল দিয়ে মূল ডগার একেবারে আগার কচি অংশটুকু ভেঙে দিতে হয়। এতে গাছ ওপরের দিকে লম্বা না হয়ে পাশ থেকে কয়েকটি ডাল ছাড়ে, ফলে গাছ ঝোপালো হয় এবং বেশি ডালে ফুল আসে। যাঁরা এক টবে অনেক ফুল চান, তাঁরা পাশের ডালগুলোতেও একবার ডগা ভাঙেন। তবে কুঁড়ি আসার সময় ঘনিয়ে এলে আর ডগা ভাঙা উচিত নয়, নইলে ফুল দেরিতে আসে।

প্রদর্শনীর জন্য যাঁরা একটি বিশাল ফুল চান, তাঁরা উল্টো পথে হাঁটেন: গাছে একটি মাত্র মূল কাণ্ড রেখে পাশের সব ডাল ছেঁটে দেন, যাতে গাছের পুরো শক্তি একটি ফুলে যায়। কোন পথ বেছে নেবেন, তা নির্ভর করে আপনি কী ধরনের ফুল চান তার ওপর। দুই ক্ষেত্রেই গাছের গোড়া থেকে বের হওয়া অপ্রয়োজনীয় কুশি নিয়মিত সরিয়ে ফেলা ভালো।

টবের মাটি ও সার: মাপমতো মিশ্রণ


ছাদবাগান আর বারান্দায় চন্দ্রমল্লিকা সাধারণত টবেই চাষ হয়। টবে ভালো ফুল পেতে মাটির মিশ্রণটি ঠিক হওয়া জরুরি। এর জন্য উত্তম মিশ্রণ হলো:

  • ২ ভাগ মাটি
  • ২ ভাগ গোবর সার
  • ১ ভাগ পাতা পচা সার
  • ১ ভাগ হাড়ের গুঁড়া
  • এর সঙ্গে প্রতি টবে ৩ গ্রাম টিএসপি ও ৩ গ্রাম মিউরেট অব পটাশ

গোবর আর পাতা পচা সার মাটিকে ঝুরঝুরে রাখে এবং ধীরে ধীরে খাবার জোগায়। হাড়ের গুঁড়া ফসফরাস ও ক্যালসিয়ামের ভালো উৎস, যা শিকড় ও ফুলের গঠনে সাহায্য করে। টিএসপি থেকে আসে ফসফরাস, আর মিউরেট অব পটাশ থেকে পটাশিয়াম, যা গাছকে শক্ত করে ও ফুলের রং উজ্জ্বল রাখে।

নাইট্রোজেনের জন্য প্রতি টবে মোট ৮ গ্রাম ইউরিয়া দুই ভাগে দিতে হয়। অর্ধেক দিতে হবে সাকার বা কাটিং লাগানোর ২৫ থেকে ৩০ দিন পর, যখন গাছ দৈহিকভাবে বাড়ছে। বাকি অর্ধেক দিতে হবে গাছে ফুলের কুঁড়ি আসার সময়। এভাবে গাছের মাথার ওপর দিয়ে ছিটিয়ে দেওয়া সারকে বলে উপরি প্রয়োগ। সার দেওয়ার সময় যেন পাতায় না লাগে এবং সার দেওয়ার পর হালকা পানি দিতে হবে। বেশি ইউরিয়া দিলে গাছে পাতা বাড়ে কিন্তু ফুল কমে, আর জাবপোকার আক্রমণও বাড়ে; তাই মাপ মেনে চলাই ভালো।

সেচের ক্ষেত্রে মনে রাখতে হবে, চন্দ্রমল্লিকা ভেজা মাটি পছন্দ করে না, আবার একেবারে শুকনো মাটিও সহ্য করে না। টবের ওপরের মাটি শুকিয়ে এলে তবেই পানি দিতে হয়। পানি দিতে হবে গাছের গোড়ায়, পাতায় বা ফুলে নয়; ভেজা পাতায় ছত্রাকের আক্রমণ বাড়ে।

কুঁড়ি অপসারণ: বড় ফুলের কৌশল


চন্দ্রমল্লিকা চাষের সবচেয়ে কৌশলী কাজ হলো কুঁড়ি অপসারণ, ইংরেজিতে যাকে বলে ডিসবাডিং। অনাকাঙ্ক্ষিত ও অপরিপক্ব ফুলের কুঁড়ি তুলে ফেলাকেই কুঁড়ি অপসারণ বলে। চারা গাছে খুব তাড়াতাড়ি ফুল এলে তা সঙ্গে সঙ্গে তুলে ফেলতে হয়, কারণ ছোট গাছ ফুল ফোটাতে গেলে দুর্বল হয়ে পড়ে এবং মূল মৌসুমে ভালো ফুল দিতে পারে না।

বড় আকারের ফুল পেতে চাইলে ডালের মাথায় যে তিনটি কুঁড়ি একসঙ্গে আসে, তার মাঝেরটি রেখে পাশের দুটি কেটে ফেলতে হয়। তখন গাছের সব শক্তি একটি কুঁড়িতে যায় এবং ফুল অনেক বড় হয়। প্রদর্শনী বা ফুলের মেলায় যে বিশাল চন্দ্রমল্লিকা দেখা যায়, সেগুলো এই পদ্ধতিরই ফল। আর যদি মাঝারি আকারের অনেক ফুল চাই, তাহলে মাঝের কুঁড়িটি তুলে ফেলতে হয়; তখন পাশের কুঁড়িগুলো একসঙ্গে ফুটে ডাল ভরিয়ে দেয়। কুঁড়ি ছোট থাকতেই, মটরদানার মতো আকারে, এই কাজ সেরে ফেলা ভালো; দেরি করলে গাছের শক্তির অপচয় হয়।

জাবপোকা: শীতের ছোট শত্রু


চন্দ্রমল্লিকার সবচেয়ে পরিচিত শত্রু হলো জাবপোকা। এই পোকা খুব ছোট, নরম দেহের এবং কালচে সবুজ রঙের। শীতকালে এর প্রকোপ অনেক বেড়ে যায়, ঠিক যখন চন্দ্রমল্লিকার ভরা মৌসুম। জাবপোকা দল বেঁধে গাছের পাতা, কচি ডগা এবং ফুল থেকে রস চুষে খায়। আক্রান্ত নতুন কুঁড়ি ও পাতা কুঁকড়ে যায়, গাছের বৃদ্ধি থেমে যায় এবং ফুল ছোট ও বিকৃত হয়। জাবপোকা এক ধরনের মিষ্টি রস নিঃসরণ করে, যার ওপর কালো ছত্রাক জন্মায় এবং পাতা কালচে দেখায়।

দমনের প্রথম ধাপ হলো শুরুতেই নজর রাখা। প্রতিদিন কচি ডগা ও পাতার নিচের দিক দেখে নিলে আক্রমণ শুরুতেই ধরা পড়ে। আক্রমণের শুরুতে আক্রান্ত ডগা ও পাতা হাত দিয়ে তুলে নষ্ট করে ফেলতে হবে। এরপর প্রতি লিটার পানিতে ৫ গ্রাম সাবান গুলে ৭ থেকে ১০ দিন পর পর দুই থেকে তিনবার গাছে স্প্রে করলে জাবপোকা দমন হয়। সাবানের দ্রবণ পোকার নরম দেহ ঢেকে দেয়, ফলে পোকা মারা যায়। স্প্রে করতে হবে বিকেলে, রোদ কমে এলে, আর পাতার নিচের দিকেও দ্রবণ পৌঁছাতে হবে।

বাগানে লেডিবার্ড বিটল বা সোনাপোকার মতো উপকারী পোকা থাকলে তারাও জাবপোকা খেয়ে সংখ্যা কমিয়ে রাখে। তাই অকারণে কড়া কীটনাশক ছিটিয়ে এই বন্ধু পোকাদের মেরে ফেলা ঠিক নয়। আক্রমণ খুব বেশি হলে তবেই কৃষি কর্মকর্তার পরামর্শে অনুমোদিত কীটনাশক ব্যবহার করা যেতে পারে।

ছত্রাকের দাগ ও পাউডারি মিলডিউ


জাবপোকার পাশাপাশি চন্দ্রমল্লিকায় ছত্রাকজনিত রোগও দেখা দেয়। পাতায় বাদামি বা কালো দাগ পড়ে, দাগ বড় হয়ে পাতা শুকিয়ে ঝরে যায়। আবার কখনো পাতার ওপর সাদা পাউডারের মতো আস্তরণ পড়ে, যাকে বলে পাউডারি মিলডিউ। কুয়াশা আর আর্দ্রতার দিনে এসব রোগ বেশি হয়।

প্রতিরোধের উপায়গুলো তেমন খরচের নয়। গাছ ঘন করে না লাগিয়ে পর্যাপ্ত দূরত্ব রাখতে হবে, যাতে বাতাস চলাচল করে এবং পাতা দ্রুত শুকায়। পানি দিতে হবে গোড়ায়, পাতার ওপর দিয়ে নয়। আক্রান্ত পাতা তুলে বাগান থেকে দূরে ফেলে দিতে হবে বা পুড়িয়ে ফেলতে হবে। আক্রমণ বেশি হলে অনুমোদিত ছত্রাকনাশক ব্যবহার করতে হবে, সে ক্ষেত্রেও মাত্রা ও নিয়ম মেনে।

জাবপোকা ছাড়াও মাঝে মাঝে থ্রিপস নামের অতি ক্ষুদ্র পোকা পাপড়ি ও কচি পাতায় আঁচড় কেটে রস খায়, ফলে পাপড়িতে রুপালি বা বাদামি দাগ পড়ে। শুষ্ক আবহাওয়ায় লাল মাকড় পাতার নিচে সূক্ষ্ম জাল বোনে, পাতা হলদেটে ও ফ্যাকাশে হয়ে যায়। এগুলোর ক্ষেত্রেও নিয়মিত পর্যবেক্ষণ, আক্রান্ত অংশ সরিয়ে ফেলা আর প্রয়োজনে কৃষি কর্মকর্তার পরামর্শে অনুমোদিত বালাইনাশক ব্যবহারই নিয়ম।

ফুল তোলা ও বাজারের সম্ভাবনা


বিক্রির জন্য ফুল কাটতে হয় সকালে, যখন ফুল পুরোপুরি ফুটেছে এবং গাছ রাতের ঠান্ডায় সতেজ আছে। দুপুরের রোদে কাটলে ফুল দ্রুত নেতিয়ে পড়ে। ধারালো ছুরি বা কাঁচি দিয়ে লম্বা ডাঁটাসহ কেটে সঙ্গে সঙ্গে পানিভর্তি বালতিতে রাখলে ফুল অনেক দিন তাজা থাকে। প্রথম দফা ফুল কাটার পর গাছ আবার নতুন করে ফুল দেয়, ফলে এক মৌসুমে একাধিকবার ফুল তোলা যায়।

ঘরে ফুলদানিতে চন্দ্রমল্লিকা সাধারণত অনেক দিন ভালো থাকে। কয়েকটি ছোট অভ্যাস এই সময় আরও বাড়ায়: ফুলদানিতে রাখার আগে ডাঁটার নিচের অংশ পানির নিচে ধরে তেরছা করে আবার কেটে নেওয়া, পানির নিচে ডুবে থাকা পাতাগুলো ছাড়িয়ে ফেলা, আর দুই এক দিন পর পর পানি বদলে দেওয়া। পানিতে পাতা পচলে জীবাণু জন্মায় এবং ডাঁটা দিয়ে পানি ওঠা বন্ধ হয়ে যায়।

দেশে ফুলের বাজার ক্রমেই বড় হচ্ছে। বিজয় দিবস, বসন্ত উৎসব, ভালোবাসা দিবস, একুশে ফেব্রুয়ারি আর বিয়ের মৌসুমে ফুলের চাহিদা হঠাৎ বেড়ে যায়, আর এর বড় অংশই পড়ে শীতকালে, চন্দ্রমল্লিকার মৌসুমে। গাছে দীর্ঘদিন তাজা থাকা, রঙের বৈচিত্র্য আর টবে বিক্রির সুযোগ, এই তিন কারণে চন্দ্রমল্লিকা ফুলচাষিদের কাছে আকর্ষণীয়। অনেক নার্সারি শীতের আগে ফুলসহ টব বিক্রি করে ভালো আয় করে।

ছাদবাগানের শৌখিন মালী হোন বা বাণিজ্যিক ফুলচাষি, চন্দ্রমল্লিকার সাফল্যের সূত্র একই: জুলাইয়ে সঠিক সময়ে কলম, বর্ষায় চারার যত্ন, অক্টোবর থেকে নভেম্বরে রোপণ, মাপমতো সার, সময়মতো কুঁড়ি অপসারণ আর জাবপোকার ওপর কড়া নজর। এই কয়েকটি নিয়ম মানলে শীতের রোদে বাগান ভরে উঠবে সোনালি, বেগুনি আর সবুজ রঙের ফুলে।

ছবি: শিশিরে ভেজা লাল চন্দ্রমল্লিকা / Ermell / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)

তানিয়া চৌধুরীদা এগ্রো নিউজ

ফুল

সম্পর্কিত খবর

ফুল

ফুলচাষের গ্রাম সাবদি: শীতে নারায়ণগঞ্জের মাঠজুড়ে গাঁদা, গোলাপ, সূর্যমুখী

নারায়ণগঞ্জ শহরের কাছের গ্রাম সাবদি ফুলচাষের জন্য পরিচিত; শীত শুরু হলে সূর্যমুখী, গাঁদা ও গোলাপে ভরে ওঠে মাঠ, ঢাকা থেকে এক দিনে ঘুরে আসা যায়।

বাংলা ট্রিবিউন২ অক্টোবর ২০২৬১ মিনিটের পড়া
গ্যালারি

শরতের শেষে সিলেটে ছাতিমের সুবাস, হেমন্তের আগমনী বার্তা

হেমন্ত আসতে এখনো প্রায় ১৫ দিন বাকি, তবু সিলেটে গাছে গাছে ফুটেছে ছাতিম; সন্ধ্যা নামলেই এর মিষ্টি গন্ধ ছড়িয়ে পড়ছে শহরের অলিগলিতে।

প্রথম আলো২ অক্টোবর ২০২৬১ মিনিটের পড়া
ফুল

রাতে ফোটে, ভোরে ঝরে: শরতের দূত শিউলি

সাদা পাপড়ি আর কমলা বোঁটার শিউলি রাতে ফুটে ভোরের আগেই ঝরে পড়ে; সেপ্টেম্বর থেকে নভেম্বর পর্যন্ত গাছতলায় ছড়িয়ে থাকা এই ফুল আর তার মৃদু সুবাস শরতের চেনা ছবি, তবে শহরে বড় গাছ ও খোলা জায়গা কমায় শিউলিও কমছে।

বার্তা২৪১ অক্টোবর ২০২৬১ মিনিটের পড়া

মন্তব্য

(০)