মন মাতানো সুগন্ধের জুঁই ফুল বাঙালির কাছে বহুদিনের প্রিয়। শুধু বাগানের শোভা নয়, মালা গাঁথা, ফুলসজ্জা ও উপাসনার ডালা সাজানোয় সারা বছর এর চাহিদা থাকায় দেশে বাণিজ্যিকভাবেও জুঁইয়ের চাষ হচ্ছে। ২০২৫ সালের মার্চে দ্য এগ্রো নিউজ সহজ উপায়ে জুঁই চাষের পদ্ধতি নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। তামিলনাড়ু কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (টিএনএইউ) চাষ নির্দেশিকা ও উদ্ভিদবিদ্যার তথ্যসূত্রের সঙ্গে মিলিয়ে সেই পদ্ধতি এখানে বিস্তারিত তুলে ধরা হলো।
জুঁই কোন গাছ
জুঁই অলিভ পরিবারের (Oleaceae) Jasminum গণের সদস্য। এই গণে প্রায় ২০০টি প্রজাতি রয়েছে, যাদের আদি নিবাস এশিয়া, আফ্রিকা ও ওশেনিয়ার উষ্ণমণ্ডলীয় ও উষ্ণ নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চল; সবচেয়ে বেশি বৈচিত্র্য দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায়। দক্ষিণ এশিয়ায় জুঁই বা যূথী নামে পরিচিত প্রজাতিটির বৈজ্ঞানিক নাম Jasminum auriculatum। এটি ভারত, নেপাল, শ্রীলঙ্কা, ভুটান ও আন্দামান দ্বীপপুঞ্জের স্থানীয় উদ্ভিদ, আর ইফ্লোরা অব ইন্ডিয়ার তালিকায় বাংলাদেশেও এর বিস্তার দেখানো হয়েছে।
গাছটি লতানো, কাষ্ঠল কাণ্ডের গুল্ম। পাতা সাধারণত সরল ও ডিম্বাকার, প্রায় ৩ সেন্টিমিটার লম্বা; অনেক সময় গোড়ায় দুটি ছোট পার্শ্বপত্রক থাকে, সেখান থেকেই "কানওয়ালা" অর্থে auriculatum নাম। ধবধবে সাদা, তীব্র সুগন্ধি ফুল থোকায় ফোটে; প্রতিটি ফুল প্রায় ১৬ মিলিমিটার চওড়া, পাপড়ি সাধারণত পাঁচটি। ফুলে সুগন্ধি তেল থাকায় ভারত ও থাইল্যান্ডে এর বাণিজ্যিক চাষ হয়। দ্য এগ্রো নিউজের প্রতিবেদন অনুযায়ী জুঁইয়ের সুবাস আতর এবং সাবান, ক্রিম, তেল ও শ্যাম্পুর মতো পণ্যে সুগন্ধ যোগ করতে ব্যবহৃত হয়।

মাটি, জমি তৈরি ও চারা রোপণ
প্রায় সব ধরনের মাটিতে জুঁই জন্মায়, তবে কাঁকরযুক্ত মাটি এড়িয়ে চলাই ভালো। জৈব পদার্থসমৃদ্ধ, পানি সহজে সরে যায় এমন বেলে দোআঁশ মাটিতে গাছ সবচেয়ে ভালো হয়। টিএনএইউ-এর নির্দেশিকাও উষ্ণমণ্ডলীয় আবহাওয়ায় সুনিষ্কাশিত লাল ও বেলে দোআঁশ মাটিকে উপযোগী বলেছে। চারা তৈরি হয় দাবা কলম (লেয়ারিং) বা ১৫ থেকে ২০ সেন্টিমিটার লম্বা আধা-পরিপক্ব ডালের শিকড় গজানো কাটিং থেকে। রোপণের ধাপগুলো হলো:
- এক বা দুটি প্রাথমিক চাষ দিয়ে জমি আগাছামুক্ত করুন।
- রোপণের এক মাস আগে ৩০ সেন্টিমিটার লম্বা, ৩০ সেন্টিমিটার চওড়া ও ৩০ সেন্টিমিটার গভীর গর্ত খুঁড়ে রোদে খোলা রাখুন।
- প্রতিটি গর্তের মাটির সঙ্গে প্রায় ১০ কেজি পচা গোবর সার মিশিয়ে গর্ত ভরাট করুন।
- জুন থেকে নভেম্বরের মধ্যে চারা রোপণ করুন।
- দ্য এগ্রো নিউজের প্রতিবেদনে গাছ থেকে গাছের দূরত্ব গড়ে ১.৮ × ১.৮ মিটার রাখার কথা বলা হয়েছে; টিএনএইউ ১.৫ × ১.৫ মিটার দূরত্বে হেক্টরে প্রায় ৪,৪০০টি গাছ লাগানোর সুপারিশ করে।
সার, ছাঁটাই ও পরিচর্যা
টিএনএইউ-এর নির্দেশিকা অনুযায়ী প্রতিটি গাছে বছরে ১২০ গ্রাম নাইট্রোজেন, ২৪০ গ্রাম ফসফরাস ও ১২০ গ্রাম পটাশ ছয় কিস্তিতে, দুই মাস পরপর দিতে হয়। হেক্টরপ্রতি ২ কেজি করে অ্যাজোস্পিরিলাম ও ফসফোব্যাকটেরিয়া জীবাণুসার ১০০ কেজি গোবর সারের সঙ্গে মিশিয়ে প্রয়োগের পরামর্শও সেখানে রয়েছে। অণুপুষ্টির ঘাটতি মেটাতে পাতায় ০.২৫ শতাংশ জিঙ্ক সালফেট এবং ০.৫ শতাংশ করে ম্যাগনেসিয়াম সালফেট ও ফেরাস সালফেট স্প্রে করা যায়।
জুঁইয়ের ফলন ধরে রাখতে ছাঁটাই জরুরি। জানুয়ারির শেষ সপ্তাহে ঝোপগুলো মাটি থেকে প্রায় ৪৫ সেন্টিমিটার উচ্চতায় ছেঁটে দিলে নতুন ডালে বেশি ফুল আসে। প্রধান শত্রু হলো কুঁড়ির পোকা (বাড ওয়ার্ম), লাল মাকড় এবং পাতাখেকো শুঁয়োপোকা; আক্রমণ দেখা দিলে স্থানীয় কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তার পরামর্শে দমনব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
ফুল তোলা, ফলন ও বাজার
টিএনএইউ-এর তথ্যে জুঁই গাছে এপ্রিল থেকে নভেম্বর পর্যন্ত ফুল আসে। মালা ও বাজারের জন্য না-ফোটা পরিপুষ্ট কুঁড়ি ভোরবেলা তুলতে হয়। বিশ্ববিদ্যালয়টির উদ্ভাবিত জাতগুলোর মধ্যে রয়েছে সিও ১, সিও ২ ও পরিমুল্লাই; ভালো ব্যবস্থাপনায় হেক্টরে প্রায় ১০ টন ফুল পাওয়া যায়। সুগন্ধি শিল্পে ফুল থেকে যে ঘন নির্যাস (কংক্রিট) তোলা হয়, তার পরিমাণ ফুলের ওজনের ০.২৫ থেকে ০.২৮ শতাংশ।

দক্ষিণ এশিয়ার ফুলের বাজারে জুঁইয়ের গাঁথা মালা ও গুচ্ছ খুব পরিচিত পণ্য। দ্য এগ্রো নিউজের প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, সারা বছর চাহিদা থাকায় জুঁই বিক্রি করে কৃষকেরা ভালো আয় করছেন, আর তুলনামূলক কম পরিশ্রমে এর চাষ সম্ভব।

ছবি: Sumita Roy Dutta / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: দ্য এগ্রো নিউজ (নিজস্ব প্রতিনিধি), তামিলনাড়ু কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (টিএনএইউ অ্যাগ্রিটেক পোর্টাল: মুল্লাই চাষ), ইফ্লোরা অব ইন্ডিয়া, উইকিপিডিয়া (Jasmine ও Jasminum auriculatum)





মন্তব্য
(০)