সাগরের উষ্ণতা, চাপে থাকা বদ্বীপ আর সীমান্তে ভাগ হওয়া বিচরণক্ষেত্রের কারণে ইলিশের মৎস্যসম্পদ ক্রমেই চাপে পড়ছে; তাই ভারত, বাংলাদেশ ও মিয়ানমারকে একসঙ্গে এই মাছ ব্যবস্থাপনা করতে হবে, ডাউন টু আর্থে ৩১ অক্টোবর প্রকাশিত এক কলামে এমন যুক্তি দিয়েছেন Sarvesh JP (সর্বেশ জেপি) ও Deepanjana Saha (দীপাঞ্জনা সাহা)। সর্বেশ জেপি চেন্নাইয়ে বে অব বেঙ্গল প্রোগ্রাম ইন্টার-গভর্নমেন্টাল অর্গানাইজেশনের (বিওবিপি-আইজিও) প্রকল্প সহযোগী, দীপাঞ্জনা সাহা অশোকা ট্রাস্ট ফর রিসার্চ ইন ইকোলজি অ্যান্ড দ্য এনভায়রনমেন্টের (এট্রি) ডক্টরাল গবেষক। মতামত লেখকদের নিজস্ব।
তাঁরা এক আঞ্চলিক পর্যালোচনার তথ্য দিয়েছেন: ১৯৫৬-১৯৬২ সালে বাংলাদেশের ইলিশের ৯৪ শতাংশ আসত নদী থেকে, সাগর থেকে মাত্র ৬ শতাংশ। এখন বাংলাদেশের মৎস্য অধিদপ্তরের হিসাবে প্রায় ৭২ শতাংশ আসে সাগর থেকে, নদী ও মোহনা থেকে ২৮ শতাংশ। ভারতের তথ্যে পশ্চিমবঙ্গের উপকূলে ইলিশ আহরণ কমছে, অথচ গুজরাট ২০২৫-২৬ সালে ১৪,৫৮৭.৭২ টন ইলিশ পেয়েছে, যা চার বছরে সর্বোচ্চ; নর্মদা নদী থেকে আসা সেখানকার অভ্যন্তরীণ আহরণ ১২৩.৬২ টন থেকে বেড়ে হয়েছে ৪,৬৪৫.৯৯ টন।
ইলিশ সাগরে থাকে, ডিম ছাড়তে নদীতে উঠে আসে। লেখকদের মতে, এই যাত্রার জন্য দরকার নির্দিষ্ট পরিবেশ: প্রজননের জন্য প্রায় ২৯.৩-৩০.২ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা, প্রতি হাজারে ০.১ ভাগের কম লবণাক্ততার প্রায় মিঠা পানি, আর স্রোতওয়ালা ১৮-২০ মিটার গভীর নদীখাত। উত্তর বঙ্গোপসাগরের উষ্ণ পানি আর দুর্বল, অনিয়মিত বর্ষার কারণে নদীর তলদেশ দিয়ে লোনা পানি ভেতরে ঢুকছে; মেঘনা মোহনায় শুষ্ক মৌসুমের লবণাক্ততা এখন প্রতি হাজারে প্রায় ১০ ভাগে ওঠে, যা ঐতিহাসিক মাত্রার প্রায় দ্বিগুণ। ফলে বড়, পরিণত ইলিশ ক্রমেই গভীর সাগরে থেকে যাচ্ছে। নর্মদার সর্দার সরোবর বাঁধ থেকে পশ্চিমবঙ্গের ফারাক্কা ব্যারাজ পর্যন্ত বাঁধ, পলি জমা ও দূষণও চাপ বাড়াচ্ছে।
এর দাম দিচ্ছেন ছোট জেলেরা; খারাপ মৌসুমের পর অনেকে ঋণে জড়িয়ে পড়েন, কেউ কেউ নিষিদ্ধ সূক্ষ্ম ফাঁসের মনোফিলামেন্ট জালে জাটকা ধরেন। গণমাধ্যমে আসা মাঠ গবেষণার তথ্য বলছে, পদ্মায় এখন ১৭-১৮ সেন্টিমিটারের ইলিশ ধরা পড়ছে, প্রথমবার ডিম ছাড়ার আগেই, অথচ আগে ইলিশ ২২-৩০ সেন্টিমিটারে প্রজননক্ষম হতো।
লেখকদের মূল কথা সমন্বয়। বাংলাদেশ জাটকা ও মা ইলিশ রক্ষায় ২২ দিনের প্রজনন নিষেধাজ্ঞা ও ৬৫ দিনের সামুদ্রিক নিষেধাজ্ঞা দেয়, কিন্তু পশ্চিমবঙ্গ ও ওড়িশার সময়সূচি আলাদা। ফলে বাংলাদেশ যখন মাছ ধরা বন্ধ রাখে, তখন ইলিশের ঝাঁক ভারতের একান্ত অর্থনৈতিক অঞ্চলে ঢুকলে সেখানে বৈধভাবেই ধরা যায়। তাঁদের ভাষায়, মাছ ধরার চাপ কমে না, শুধু জায়গা বদলায়; সংরক্ষণের ভর্তুকির খরচ বাংলাদেশ বহন করে, আর ফসল তোলে প্রতিবেশীরা।
তাঁরা মৎস্য ব্যবস্থাপনায় বাস্তুতন্ত্রভিত্তিক পদ্ধতির প্রস্তাব দিয়েছেন: বিশ্বের ৯৫ শতাংশের বেশি ইলিশ আহরণকারী ভারত, বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের নিষেধাজ্ঞার সময় এক করা; যৌথ মজুত মূল্যায়ন, অভিন্ন নজরদারি ও মাছে ট্যাগ লাগানোর তথ্য ভাগাভাগি; সাগরের তাপমাত্রা ও লবণাক্ততার তাৎক্ষণিক তথ্য দিয়ে যৌথ পরামর্শ; সীমান্তজুড়ে সূক্ষ্ম ফাঁসের জাল বন্ধে একই কড়াকড়ি; এবং প্রজনন ও চলাচলের পথ ঘিরে সংযুক্ত সংরক্ষিত এলাকা।
ছবি: Rezowan / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: ডাউন টু আর্থ




মন্তব্য
(০)