বাড়তে থাকা জনসংখ্যাকে খাওয়ানো আর গ্রহের মাটি ফিরিয়ে আনা—দুটোর মধ্যে একটি বেছে নেওয়ার দরকার নেই, বলছে একটি নতুন বই; আর যে কৃষকেরা দুটোই পারেন, তাঁরা চাষ করেন বিশ্বের আবাদি জমির মাত্র ১২ শতাংশে। ‘হোল আর্থ ফার্মিং: স্মলহোল্ডার্স অ্যান্ড দ্য গ্রেট রিজেনারেটিভ ট্রান্সফরমেশন’ বইয়ে উন্নয়ন বিশেষজ্ঞ হিউ লকের (Hugh Locke) যুক্তি—বিশ্বের অর্ধেক ক্ষুদ্র কৃষক, অর্থাৎ প্রায় ২৪ কোটি কৃষক পরিবারকে পুনরুৎপাদনশীল কৃষি ও কৃষিবনায়নে যেতে সাহায্য করলে ২০৫০ সাল পর্যন্ত জনসংখ্যা বৃদ্ধির সব বাড়তি খাদ্য উৎপাদন সম্ভব, আর তাতে জমি নিঃশেষ না হয়ে বরং উন্নত হবে।
গ্লোবাল সাউথে ক্ষুদ্র খামার প্রায় ৪৭ কোটি ৫০ লাখ, বেশির ভাগই দুই হেক্টরের কম জমিতে; সব মিলিয়ে তারা এখনই বিশ্বের খাদ্যের প্রায় ৩০ শতাংশ ফলায়। অথচ ঋণ, বাজার আর কারিগরি প্রশিক্ষণ বেশির ভাগ পরিবারের নাগালে নেই; গবেষণার অর্থ, অবকাঠামো, সম্প্রসারণ সেবা ও অর্থায়ন দশকের পর দশক গেছে বড় খামারের দিকে। লক এই ফারাককে দেখছেন সুযোগ হিসেবে: যে খামারগুলো প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা ছাড়াই মানুষের এক-তৃতীয়াংশ খাদ্য জোগায়, তাদের সহায়তার ঘাটতি আংশিক পূরণ করলেও উৎপাদন, মাটির স্বাস্থ্য, পানির মান ও জীববৈচিত্র্যে বড় লাভ মিলবে।
২০১০ সালে হাইতিতে স্মলহোল্ডার ফার্মার্স অ্যালায়েন্স (Smallholder Farmers Alliance) সহপ্রতিষ্ঠা করা লক বলেন, বিশ্বের ক্ষুদ্র কৃষকদের প্রায়ই উন্নয়ন সহায়তার ‘সুবিধাভোগী’ হিসেবে দেখা হয়, অথচ তাঁদের স্বীকৃতি পাওয়া উচিত পরবর্তী কৃষি রূপান্তরের ‘স্থপতি’ হিসেবে। সেই কর্মসূচিতে মৌলিক কৃষি সহায়তা পাওয়া কৃষকদের ফলন গড়ে প্রায় ৪০ শতাংশ আর পরিবারের আয় ৫০ থেকে ১০০ শতাংশ বেড়েছে।
তাঁর হিসাবে বাড়তি খাদ্য আসবে প্রচলিত নিবিড়করণ—বেশি রাসায়নিক, বেশি সেচ, বেশি জমি—থেকে নয়, বরং স্থানীয় অবস্থার সঙ্গে মানানো পুনরুৎপাদনশীল কৌশল থেকে: কভার ক্রপ, কম্পোস্ট, শস্য আবর্তন, কৃষিবনায়ন, কম চাষ ও সমন্বিত পশুপালন। তবে পুনরুৎপাদনশীল কৃষিকে নির্দিষ্ট কিছু পদ্ধতির তালিকায় নামিয়ে আনতে নারাজ লক; তাঁর মতে মাপকাঠি ফলাফল—মাটি সুস্থ হচ্ছে কি না, জীববৈচিত্র্য ফিরছে কি না, পানি বাঁচছে কি না, খাদ্য বাড়ছে কি না আর কৃষক পরিবার আর্থিকভাবে ভালো থাকছে কি না। কলম্বিয়া, থাইল্যান্ড, কানাডা, নেদারল্যান্ডস থেকে আফ্রিকা, এশিয়া ও লাতিন আমেরিকা—১৮টি দেশের ২১টি গল্প বইটিতে আছে।
পিয়ার-রিভিউড গবেষণার ভিত্তিতে বইয়ের হিসাব, প্রায় ২৪ কোটি ক্ষুদ্র খামার মোটামুটি ৪৮ কোটি হেক্টরে পুনরুৎপাদনশীল কৃষিতে গেলে মাটিতে কার্বন জমার সময়কালে তাদের মাটি ও গাছপালা বছরে ০.৭২ গিগাটন পর্যন্ত কার্বন ডাই-অক্সাইড বায়ুমণ্ডল থেকে সরাতে পারে; কৃত্রিম সার কমলে পূর্ণ গ্রহণের পর্যায়ে সম্মিলিত জলবায়ু-সুফল দাঁড়াতে পারে বছরে ০.৬–০.৮৫ গিগাটন কার্বন ডাই-অক্সাইড সমতুল্যে।
দাবির সীমাও টেনেছেন লক: মাটি অনন্তকাল কার্বন শোষে না, নতুন ভারসাম্যে পৌঁছালে এক থেকে তিন দশক পর শোষণ ধীর হয়ে আসে, আর ফল বদলায় জলবায়ু, মাটির ধরন, চাষপদ্ধতি ও শুরুর অবস্থার সঙ্গে। তাঁর জোর—পুনরুৎপাদনশীল কৃষিকে অন্যত্র চলতে থাকা নির্গমনের ‘অফসেট’ হিসেবে দেখা চলবে না। ডাউন টু আর্থের জন্য প্রতিবেদনটি করেছেন শগুন (Shagun)।
সূত্র: ডাউন টু আর্থ

মন্তব্য
(০)