২০২৪ সালের ডিসেম্বরে শীতের ফুলের মৌসুম যখন জমে উঠেছিল, তখন দ্য এগ্রো নিউজ বাগানপ্রেমী ও ফুলচাষিদের জন্য চন্দ্রমল্লিকা চাষের একটি পূর্ণাঙ্গ নির্দেশিকা প্রকাশ করেছিল। এতে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বারি) উদ্ভাবিত জাত, চারা তৈরি, সার, পরিচর্যা ও পোকা দমনের সরকারি সুপারিশ তুলে ধরা হয়েছিল, যার বড় অংশ কৃষি তথ্য সার্ভিসের ই-কৃষি নির্দেশিকার সঙ্গে মিলে যায়।
চন্দ্রমল্লিকা অ্যাস্টারেসি গোত্রের ফুল। উইকিপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী এর বেশির ভাগ প্রজাতির আদি নিবাস পূর্ব এশিয়া, আর চীনে খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চদশ শতক থেকেই এর চাষ হয়ে আসছে। এটি মৌসুমের শেষ দিকের ফুল, তাই বাংলাদেশে শীতকালই এর প্রধান সময়।
বারির জাত, আবহাওয়া ও মাটি
বারি চন্দ্রমল্লিকার দুটি জাত উদ্ভাবন করেছে: বারি চন্দ্রমল্লিকা-১ ও বারি চন্দ্রমল্লিকা-২। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিজিটাল হার্বেরিয়ামের তালিকা অনুযায়ী দুটি জাতই ২০০৯ সালে অবমুক্ত হয়; পরে বারি চন্দ্রমল্লিকা-৩ (২০০৯) ও বারি চন্দ্রমল্লিকা-৪ (২০১৬) জাতও আসে।
চন্দ্রমল্লিকা তুলনামূলক ঠান্ডা আবহাওয়া ও রোদেলা জায়গা পছন্দ করে। জৈব পদার্থসমৃদ্ধ, পানি সহজে নেমে যায় এমন দোআঁশ ও বেলে দোআঁশ মাটি এর জন্য উপযোগী, আর মাটির পিএইচ ৬.০ থেকে ৭.০ হলে ভালো। যুক্তরাষ্ট্রের ইউটা স্টেট ইউনিভার্সিটি এক্সটেনশনও উর্বর, সুনিষ্কাশিত মাটি এবং সারা দিনের পূর্ণ রোদের কথা বলে।

চারা তৈরি ও রোপণের সময়
বীজ, সাকার ও শাখা কলম থেকে চারা তৈরি করা যায়। বীজের চারায় ভালো ফুল আসে না এবং ফুল আসতে দেরি হয়, তাই দেশে সাধারণত শাখা কলম বা সাকার থেকেই চারা করা হয়। নির্দেশিকার মূল ধাপগুলো ছিল এমন:
- জুলাইয়ের মাঝামাঝি থেকে শাখা কলম শুরু হয়; এক বছর বয়সী সতেজ ডাল থেকে ৮ থেকে ১০ সেন্টিমিটার লম্বা অংশ তেরছা করে কেটে বেডে বা পাত্রে বসালে শিকড় গজায়।
- ফেব্রুয়ারিতে ফুল শেষ হলে গাছ মাটি থেকে ১৫ থেকে ২০ সেন্টিমিটার রেখে কেটে দেওয়া হয়; কাটা গোড়া থেকে সাকার বের হয়।
- সাকার ৫ থেকে ৭ সেন্টিমিটার লম্বা হলে মা গাছ থেকে আলাদা করে ছায়াযুক্ত বীজতলা বা টবে লাগানো হয়।
- মে থেকে জুলাই পর্যন্ত চারাকে বৃষ্টি ও কড়া রোদ থেকে রক্ষা করতে হয়।
- জমি বা টবে চূড়ান্ত রোপণের উপযুক্ত সময় অক্টোবর থেকে নভেম্বর।
সার প্রয়োগের সুপারিশ
চন্দ্রমল্লিকা মাটি থেকে প্রচুর খাদ্য টেনে নেয়, তাই সুষম সার জরুরি। নির্দেশিকায় হেক্টরপ্রতি ১০ টন পচা গোবর বা কম্পোস্ট, ৪০০ কেজি ইউরিয়া, ২৭৫ কেজি টিএসপি, ৩০০ কেজি মিউরেট অব পটাশ, ১৬৫ কেজি জিপসাম এবং ১২ কেজি করে বোরিক এসিড ও জিংক অক্সাইড দেওয়ার কথা বলা হয়েছিল। রোপণের ১০ থেকে ১৫ দিন আগে গোবর বা কম্পোস্ট এবং ৭ থেকে ১০ দিন আগে ইউরিয়া বাদে বাকি সার মাটিতে মেশাতে হয়। ইউরিয়ার অর্ধেক রোপণের ২৫ থেকে ৩০ দিন পর এবং বাকি অর্ধেক ৪৫ থেকে ৫০ দিন পর গোড়া থেকে একটু দূরে দিয়ে মাটিতে মিশিয়ে সেচ দিতে হয়।
পরিচর্যা, সেচ ও খুঁটি
বেড ও টব আগাছামুক্ত রাখতে হয়। রোপণের মাসখানেক পর ডগা কেটে দিলে গাছ ঝোপালো হয়, আর অল্প বয়সে ফুল এলে তা ভেঙে দিতে হয়। বড় ফুলের জন্য মাঝের কুঁড়ি রেখে পাশের দুটি কুঁড়ি ফেলে দেওয়া হয়, যাকে ডিসবাডিং বলে; মাঝারি আকারের ফুল চাইলে মাঝের কুঁড়িটি সরানো হয়।
চারা বিকেলে লাগিয়ে গোড়ার মাটি চেপে দিয়ে হালকা সেচ দিতে হয়। গাছ বেশি পানি সহ্য করে না, তাই গোড়ায় পানি জমতে দেওয়া যাবে না। ফুল ডালের তুলনায় ভারী হয় বলে রোপণের সময়ই গোড়া থেকে একটু দূরে জাতের উচ্চতা অনুযায়ী বাঁশের কাঠি পুঁতে দেওয়া ভালো; পরে পুঁতলে শিকড় জখম হয়ে রোগজীবাণু ঢুকতে পারে। কৃষি তথ্য সার্ভিসের হিসাবে জাতভেদে গাছপ্রতি বছরে গড়ে ৩০ থেকে ৪০টি ফুল পাওয়া যায়।

থ্রিপস ও জাব পোকা দমন
থ্রিপস বা শোষক পোকা খুব ছোট, ছাই রঙের, খালি চোখে প্রায় দেখা যায় না। এরা পাতা ও ফুলের রস শুষে নেয়, ফলে দাগ পড়ে, পাতা ও ফুল শুকিয়ে যায়, বেশি আক্রমণে গোটা গাছ মরে যেতে পারে। নির্দেশিকায় প্রতি লিটার পানিতে ২ মিলিলিটার ম্যালাথিয়ন মিশিয়ে ৭ থেকে ১০ দিন পরপর স্প্রে করার পরামর্শ ছিল; ইউটা স্টেট এক্সটেনশনও জাব পোকা ও থ্রিপস দমনে লেবেলের নির্দেশ মেনে ম্যালাথিয়ন ব্যবহারের কথা বলে।

জাব পোকা চন্দ্রমল্লিকার প্রধান ক্ষতিকর পোকা। গাঢ় সবুজ, বেগুনি বা কালো রঙের এই পোকার বাচ্চা ও পূর্ণবয়স্ক দুই অবস্থাতেই নতুন ডগা ও ফুলের রস চুষে খায়, ফলে বৃদ্ধি ও ফলন কমে যায়। নির্দেশিকা অনুযায়ী নোভাক্রন (০.১%) বা রগর (১%) প্রয়োগে এ পোকা দমন করা যায়।
ছবি: BRPever / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: দ্য এগ্রো নিউজ (নিজস্ব প্রতিনিধি), কৃষি তথ্য সার্ভিস (ই-কৃষি), বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ডিজিটাল হার্বেরিয়াম, ইউটা স্টেট ইউনিভার্সিটি এক্সটেনশন, উইকিপিডিয়া





মন্তব্য
(০)