সরাসরিবাজারদর
আটা (প্যাকেটজাত)৫৮+০.০%আদা - আমদানিকৃত১৬৭+০.০%আদা - দেশী১৫৪+০.০%আমন চাল - মাঝারি৫৬+০.০%আমন চাল - মোটা৪৮+০.০%আমন চাল - সরু৭২+০.০%আয়োডিনযুক্ত লবণ (প্যাকেটজাত)৩২+০.০%কাঁচা মরিচ২১৮+০.০%খামারের মুরগী১৬২+০.০%খাসী৯০০+০.০%চিনি (দেশী)১৩২+০.০%ছোলা - গোটা৮৫+০.০%ডিম ফার্ম - লাল৪৭+০.০%পেঁয়াজ - দেশী৬০+০.০%বোরো চাল - মাঝারি৫৫+০.০%বোরো চাল - মোটা৪৭+০.০%বোরো চাল - সরু৬৬+০.০%মাংসঃ– গরু৭২৯+০.০%মুগ ডাল১২২+০.০%রসুন - আমদানিকৃত১৯২+০.০%রসুন - দেশী১৭৩+০.০%সয়াবিন তেল১৬৩+০.০%
হালনাগাদ ১ নভেম্বর ২০২৬
ঢাকা৩২°মূলত পরিষ্কারআর্দ্রতা ৫৫%বাতাস ৫ কিমি/ঘ

চাঁপাইনবাবগঞ্জে মাছি পোকায় ফজলি আমের ক্ষতি, চাষিদের হিসাবে ১০০ কোটি টাকা

২০২৬ সালের জুলাইয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জের বাগানে ফ্রুট ফ্লাই বা মাছি পোকার আক্রমণে জিআই স্বীকৃত ফজলি আম পচে ঝরে পড়ছিল। চাষি ও সংশ্লিষ্টদের হিসাবে নষ্ট আমের দাম প্রায় ১০০ কোটি টাকা; কৃষি বিভাগের কাছে ক্ষতিগ্রস্ত বাগানের নির্দিষ্ট তথ্য ছিল না।

চাঁপাইনবাবগঞ্জে মাছি পোকায় ফজলি আমের ক্ষতি, চাষিদের হিসাবে ১০০ কোটি টাকা
ফল

২০২৬ সালের জুলাইয়ের মাঝামাঝি, নাবি জাতের ফজলি আম যখন বাজারে ওঠার সময়, তখন আমের রাজধানীখ্যাত চাঁপাইনবাবগঞ্জের বিভিন্ন বাগানে ফ্রুট ফ্লাই বা আমের মাছি পোকার আক্রমণে ফজলি আম নষ্ট হচ্ছিল। জাগো নিউজ ২৪ জেলা থেকে ১৪ জুলাই ২০২৬ তারিখে জানায়, পোকায় আক্রান্ত আম গাছেই পচে ঝরে পড়ছে; ফলে চাষিদের ফলন কমছে, অথচ উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে। চাষি ও সংশ্লিষ্টদের হিসাবে, এ মৌসুমে মাছি পোকার আক্রমণে প্রায় ১০০ কোটি টাকার ফজলি আম নষ্ট হয়েছে। এ অঙ্কটি তাঁদের নিজস্ব অনুমান, প্রতিবেদনে শিবগঞ্জ উপজেলার একটি আমচাষি সমবায় সমিতির সাধারণ সম্পাদক এটি জানান; কৃষি বিভাগ পত্রিকাটিকে বলেছে, ঠিক কতগুলো বাগান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, সে বিষয়ে তাদের কাছে নির্দিষ্ট কোনো তথ্য নেই।

খিরসাপাত, ল্যাংড়া ও আশ্বিনার সঙ্গে ফজলিও চাঁপাইনবাবগঞ্জের সেই চার জাতের আমের একটি, যেগুলো ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্যের স্বীকৃতি পেয়েছে। তবে চাষিরা পত্রিকাটিকে বলেন, এই স্বীকৃতির সুফল মাঠপর্যায়ে তাঁরা তেমন পাচ্ছেন না। সমবায় সমিতির ওই নেতার ভাষ্য, অনেক বাগানে ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ আম মাছি পোকার কারণে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে; পত্রিকাটির নিজস্ব সারসংক্ষেপে ক্ষতির হার বলা হয়েছে ৪০ থেকে ৬০ শতাংশ। চাষিরা এই উপদ্রবের জন্য কয়েক দিনের অতিবৃষ্টিকে দায়ী করেন, আর সরকারি এক উদ্যানতত্ত্ব বিজ্ঞানী বলেন, চলতি মৌসুমে জলবায়ু পরিবর্তন ও অতিবৃষ্টির কারণে মাছি পোকার উপদ্রব বেড়েছে এবং সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন ফজলি চাষিরা।

শিবগঞ্জ ও কানসাটে চাষিদের ক্ষতির হিসাব


চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায় সবচেয়ে বেশি আম উৎপাদন হয় শিবগঞ্জ উপজেলায়, এবং এখানে ফজলি আমের চাষও হয় ব্যাপক পরিমাণে। শিবগঞ্জ উপজেলার শ্যামপুর ইউনিয়নের আমচাষি উজ্জল হোসেন এ মৌসুমে ৫ বিঘা জমিতে ফজলি আমের চাষ করেছিলেন, আর প্রতিবেদন লেখার সময় সেই আম বিক্রির উপযুক্ত সময় চলছিল। কয়েক দিনের অতিবৃষ্টির পর তাঁর বাগানে মাছি পোকার আক্রমণ দেখা দেয়, এবং তিনি জানান, বাগানের প্রায় ৫০ শতাংশ আম নষ্ট হয়ে গেছে। ফেরোমন ফাঁদসহ নানা ব্যবস্থা নিয়েও কাঙ্ক্ষিত ফল মেলেনি, ফলে উৎপাদন খরচ উঠবে কি না, তা নিয়ে তিনি দুশ্চিন্তায় ছিলেন।

কানসাট ইউনিয়নের আমচাষি রফিকুল ইসলাম বলেন, ফজলি আম চাষ করেই তাঁরা বছরের পর বছর জীবিকা নির্বাহ করছেন, আর এই আম এলাকার ঐতিহ্য বহন করে। কিন্তু এখন ফজলি চাষ করতে গিয়ে নানা সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। গাছগুলো অনেক পুরোনো ও আকারে বড় হওয়ায় পরিচর্যায় বাড়তি খরচ হয়: গাছে উঠে কীটনাশক স্প্রে করতে হয়, সারও দিতে হয় বেশি, ফলে অন্য জাতের তুলনায় উৎপাদন খরচ অনেক বেড়ে যায়। তিনি বলেন, ‘এ বছর আমের ফলন ভালো হওয়ার আশা ছিল। কিন্তু কয়েক দফা বৃষ্টি ও আবহাওয়ার পরিবর্তনের পর মাছি পোকার আক্রমণ বেড়ে গেছে। পোকা দমনে ফেরোমন ফাঁদ, কীটনাশকসহ বিভিন্ন পদ্ধতি ব্যবহার করেও আম রক্ষা করা যাচ্ছে না। বাগানের অনেক আম নষ্ট হয়ে গেছে। এভাবে চলতে থাকলে ফজলি আম চাষ করে লাভ করা কঠিন হয়ে পড়বে।’

শ্যামপুর ইউনিয়নের আরেক আমচাষি শহিদুল ইসলাম বলেন, ছোটবেলা থেকেই তিনি ফজলি আমের চাষ দেখে আসছেন এবং নিজেও দীর্ঘদিন ধরে এই জাতের আম চাষ করছেন। একসময় ফজলির ব্যাপক কদর ছিল; ভালো মানের ফজলি আম ৫ হাজার টাকা মণ দরে বিক্রি হয়েছে। কিন্তু এখন সেই আম ৯০০ থেকে ১ হাজার টাকা মণ দরে বিক্রি করতে হচ্ছে। উৎপাদন খরচের তুলনায় দাম না পাওয়ায় বাধ্য হয়ে আগের বছর তিনি বাগানের ৫টি বড় ফজলি আমগাছ কেটে ফেলেছেন, আর এ বছরও আরও ৬টি গাছ বিক্রির সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তাঁর আশঙ্কা, এভাবে চলতে থাকলে ভবিষ্যতে ফজলি গাছ ধরে রাখা কঠিন হবে।

কানসাট বাজারে ১০ বছর ধরে আম কিনে চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে পাঠান মজিবুর রহমান। তিনি বলেন, অতিবৃষ্টির কারণে ফজলি আমের অবস্থা খুবই খারাপ হয়েছে। তখন ভালো মানের আম ১ হাজার ৫০০ থেকে ১ হাজার ৬০০ টাকা মণ দরে বিক্রি হচ্ছিল। মাছি পোকার আক্রমণে আমে ছিদ্র হয়ে যায় এবং ভেতরের অংশ নষ্ট হয়ে যায়, ফলে এসব আম বাজারে বিক্রি করতে সমস্যা হয়; এ কারণে ফজলি আমের চাহিদা ও কদর দিন দিন কমছে বলে তিনি জানান।

চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ ম্যাংগো প্রডিউসার কো-অপারেটিভ সোসাইটির সাধারণ সম্পাদক ইসমাইল খান শামীম বলেন, একসময় জেলায় সবচেয়ে বেশি উৎপাদিত আমের জাত ছিল ফজলি, কিন্তু নানা সমস্যার কারণে অনেক চাষি ধীরে ধীরে এ আমের চাষ থেকে সরে যাচ্ছেন। তাঁর কথায়, ‘ফজলি আমে রোগবালাইয়ের আক্রমণ বেশি হয়। বিশেষ করে চলতি সময়ে মাছি পোকার আক্রমণে ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে। অনেক বাগানে ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ আম মাছি পোকার কারণে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।’ তিনি আরও বলেন, পোকা দমনে চাষিরা বিভিন্ন পদ্ধতি ব্যবহার করলেও কাঙ্ক্ষিত ফল পাচ্ছেন না, তাই অনেক কৃষক ফজলি চাষে আগ্রহ হারাচ্ছেন। নষ্ট হওয়া এসব আমের আনুমানিক মূল্য প্রায় ১০০ কোটি টাকা বলে তিনি উল্লেখ করেন।

পুরোনো গাছ, বাড়তি খরচ, পড়তি দাম


চাষিদের নিজেদের হিসাবে, মাছি পোকা এমন এক ফসলে আঘাত হেনেছে, যা থেকে লাভ তোলা এমনিতেই কঠিন হয়ে পড়েছিল। জেলার ফজলি আমের গাছগুলোর বেশির ভাগই পুরোনো; গত এক দশকে নতুন করে তেমন কোনো ফজলি বাগান তৈরি হয়নি, বংশপরম্পরায় পাওয়া গাছের পরিচর্যা করেই চাষিরা এখনও আম উৎপাদন করছেন। ফজলি গাছ আকারে অনেক বড় হওয়ায় বাড়তি শ্রম ও খরচ লাগে। গাছে উঠে স্প্রে করতে হয়, সারও দিতে হয় বেশি পরিমাণে। অন্য জাতের তুলনায় ফজলিতে রোগবালাই দমনের খরচ বেশি, আর বড় গাছে উঠে স্প্রে করায় কীটনাশকের অপচয়ও হয় বেশি, বাড়ে শ্রমিক খরচ।

চাষিরা বলেন, জিআই স্বীকৃত ফজলির ঐতিহ্য থাকলেও মাঠপর্যায়ে এর সুফল তাঁরা পাচ্ছেন না। উৎপাদন খরচ বেশি হলেও বাজারে দাম তুলনামূলক কম থাকায় লাভের বদলে লোকসানের হিসাব কষতে হচ্ছে, কারণ আম ধরার পরই শুরু হয় পোকার আক্রমণ, আর এ মৌসুমে মাছি পোকা ফসলের বড় অংশ নষ্ট করে দিচ্ছিল।

মৌসুমের শুরুর দিকেই প্রথম আলো একই চাপের কথা তুলে ধরেছিল। ১৪ জুন ২০২৬ তারিখে জেলা থেকে প্রকাশিত প্রতিবেদনে পত্রিকাটি জানায়, দেশের সবচেয়ে বড় আমের বাজার হিসেবে পরিচিত শিবগঞ্জের কানসাট আমবাজার চালু হয়েছে ১ জুন, এবং ফজলি আমের অবস্থাও ভালো নয়। শিবগঞ্জের একজন অগ্রণী আমচাষি পত্রিকাটিকে বলেন, একসময় উপজেলার বাগানের প্রায় ৮০ শতাংশজুড়ে ছিল ফজলি গাছ, এখন তা কমে প্রায় অর্ধেকে দাঁড়িয়েছে; কয়েক বছর ধরে আশানুরূপ দাম না পেয়ে চাষিরা ফজলি গাছ কেটে ফেলছেন বা সেখানে হাইব্রিড জাত লাগাচ্ছেন। চাষিরা আরও বলেন, আম্রপালি, ব্যানানা ম্যাংগো ও কাটিমনের মতো বিদেশি জাত আগেভাগে বাজারে এসে প্রচলিত জাতগুলোকে কোণঠাসা করছে।

আম ওজনের পদ্ধতি নিয়েও চাষিদের অভিযোগ ছিল। প্রথম আলোর প্রতিবেদনে বলা হয়, কানসাটে ৫৪ থেকে ৫৬ কেজিতে এক মণ ধরে আম বিক্রি হচ্ছে, আর কুলি, ওজনদার ও আড়তের শ্রমিকদের টাকা দেওয়ার পর কার্যত ওজন দাঁড়ায় প্রায় ৬০ কেজিতে। ২০২৬ সালের মে মাসে শিবগঞ্জের এক চাষি রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা বাসসকে বলেন, ৪০ কেজিতে মণ হওয়ার কথা থাকলেও কোনো কোনো এলাকায় ক্রেতারা ৫০ থেকে ৫৫ কেজি নিচ্ছেন, এবং চাষিরা কেজিপ্রতি প্রায় ৪০ টাকা পাচ্ছেন, অথচ সেই আম ঢাকায় ৮০ থেকে ১০০ টাকা কেজিতে বিক্রি হয়। জেলা প্রশাসক বাসসকে বলেন, ওজন নিয়ে দীর্ঘদিনের এই বিরোধের বিষয়টি তিনি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানাবেন।

ফ্রুট ব্যাগ ও ফেরোমন ফাঁদ: চাষি ও কর্মকর্তারা যা বললেন


পোকা দমনে চাষিরা বিভিন্ন পদ্ধতি ব্যবহার করছিলেন, যার মধ্যে প্রধান ফেরোমন ফাঁদ। মাছি পোকার বিস্তার রোধে বাগানে এসব ফাঁদ বসানো হচ্ছিল। প্রতিটি ফাঁদের দাম প্রায় ২৫০ টাকা, আর অনেক চাষি একাধিক ফাঁদ ব্যবহার করে বাড়তি খরচ করছিলেন। প্রতিবেদনের বর্ণনা অনুযায়ী, ছোট একটি প্লাস্টিকের বালতি বা পাত্রের মধ্যে বিশেষ ধরনের ফেরোমন লিউর (কৃত্রিম গন্ধযুক্ত রাসায়নিক) রাখা হয়; পাত্রের দুই পাশে ছিদ্র করে দড়ি দিয়ে সেটি আমগাছের ডালে ঝুলিয়ে দেওয়া হয়। গন্ধে আকৃষ্ট হয়ে পুরুষ পোকা পাত্রে ঢুকে আটকা পড়ে বা মারা যায়; এতে পুরুষ পোকার সংখ্যা কমে, প্রজনন ব্যাহত হয় এবং পরবর্তী আক্রমণ অনেকটা নিয়ন্ত্রণে থাকে। তবে চাষিদের অভিযোগ, এত টাকা খরচ করে ফাঁদ বসিয়েও মাছি পোকা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না; ফলে একদিকে উৎপাদন খরচ বাড়ছে, অন্যদিকে ফলন কমছে।

ইসমাইল খান শামীম বলেন, ফ্রুট ব্যাগ ব্যবহার করে মাছি পোকার আক্রমণ অনেকাংশে ঠেকানো সম্ভব, কিন্তু কয়েক বছর ধরে আমদানি করা অধিকাংশ ফ্রুট ব্যাগ নিম্নমানের। যে যার মতো করে এসব ব্যাগ এনে বাজারজাত করছে, আর পণ্যের মান নিয়ন্ত্রণে কৃষিবিদদের কার্যকর তদারকি নেই। ফলে ব্যাগ পরিয়েও চাষিরা কাঙ্ক্ষিত ফল পাচ্ছেন না, আর সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন তাঁরাই।

শিবগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা নয়ন মিয়া বলেন, ফজলি আমের বাগানে প্রায়ই মাছি পোকার আক্রমণ দেখা যায়, তবে যেসব চাষি নিয়মিতভাবে এই পোকা দমনে স্প্রে করেন, তাঁদের বাগানে সমস্যা তুলনামূলক কম হয়। তিনি জানান, ফজলির পরিবর্তে চাষিদের নাবি জাতের আম চাষের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। সে সময় ক্ষতিগ্রস্ত আমচাষিদের জন্য কোনো ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা ছিল না, আর ঠিক কতগুলো বাগান মাছি পোকায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, সে বিষয়ে কৃষি বিভাগের কাছে নির্দিষ্ট কোনো তথ্য ছিল না।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (ডিএই), চাঁপাইনবাবগঞ্জের অতিরিক্ত উপপরিচালক (শস্য) মো. আব্দুল হালিম বলেন, মাছি পোকার আক্রমণ নতুন কোনো বিষয় নয়; দীর্ঘদিন ধরেই এ পোকা আমের ক্ষতি করে আসছে। এটি মূলত ফলের পোকা হলেও ফজলি আমে এর আক্রমণে ক্ষতি বেশি হয়। চাষিদের ফেরোমন ফাঁদ ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে, পাশাপাশি ফ্রুট ব্যাগের ব্যবহার বাড়াতেও উৎসাহিত করা হচ্ছে। ব্যাগ ব্যবহারের পরও কেন পোকা দমন হচ্ছে না, এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, চলতি মৌসুমে ফ্রুট ব্যাগের সংকট ছিল, তাই অনেক চাষি নিম্নমানের ব্যাগ ব্যবহার করেছেন, আর এ কারণেই সমস্যা তৈরি হয়েছে। তাঁর ভাষ্য, কৃষি বিভাগ সব সময় চাষিদের এসব বিষয়ে প্রশিক্ষণ দিচ্ছে।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ আঞ্চলিক উদ্যানতত্ত্ব গবেষণা কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. শরফ উদ্দিন জাগো নিউজকে বলেন, শুধু ফজলি নয়, সব ধরনের আমের গুণগত মান ভালো রাখতে ফ্রুট ব্যাগের বিকল্প নেই। ব্যাগ ব্যবহার করলে পোকামাকড়ের আক্রমণ কমে, আমের স্বাভাবিক রং ও স্বাদ বজায় থাকে এবং বাজারমূল্যও ভালো পাওয়া যায়; চাঁপাইনবাবগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে চাষিরা ব্যাপকভাবে ব্যাগ ব্যবহার করছেন, বিশেষ করে উন্নতমানের ও রপ্তানিযোগ্য আম উৎপাদনে। তবে গত কয়েক বছরে বাজারে নিম্নমানের ব্যাগের সরবরাহ বেড়েছে, আর এসব ব্যাগ ব্যবহার করে অনেক চাষি প্রত্যাশিত সুফল পাচ্ছেন না, বরং আর্থিক ক্ষতিতে পড়ছেন। ভালো মানের ব্যাগ আমকে রোগবালাই ও ক্ষতিকর পোকা থেকে রক্ষা করে, কিন্তু নিম্নমানের ব্যাগে অনেক সময় সেই সুরক্ষা মেলে না, ফলে আমের গায়ে দাগ, পচনসহ নানা সমস্যা দেখা দিতে পারে; তাই ব্যাগ কেনার সময় চাষিদের সতর্ক থাকতে হবে বলে তিনি জানান।

তিনি বলেন, আমের অন্যতম ক্ষতিকর পোকা ফ্রুট ফ্লাই বা ফলমাছি; এই পোকা আমের গায়ে ছিদ্র করে ডিম পাড়ে, ফলে আম নষ্ট হয়ে যায়। ফেরোমন ফাঁদের মাধ্যমে পুরুষ পোকাকে আকৃষ্ট করে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব, এতে রাসায়নিক কীটনাশকের ব্যবহারও কমানো যায়। ক্ষতি কমাতে চাষিদের নাবি জাতের আম চাষে আগ্রহী হওয়ার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে, একই সঙ্গে আধুনিক প্রযুক্তি ও সঠিক ব্যবস্থাপনায় বাগান পরিচর্যার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। প্রতিবেদনে কর্মকর্তা বা বিজ্ঞানী কেউই কোনো কীটনাশকের নাম বা মাত্রা উল্লেখ করেননি; স্প্রে করার কথা ভাবলে চাষিদের উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার পরামর্শ নেওয়া উচিত।

এই প্রতিবেদনের তিন দিন আগে, ১১ জুলাই ২০২৬ তারিখে, জাগো নিউজ ২৪ জেলা থেকে আলাদা একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল, যেখানে আম রক্ষার জন্য ব্যবহৃত ফ্রুট ব্যাগ নিয়েই চাষিদের দুর্ভোগের কথা উঠে আসে।

বাংলাদেশের একটি গাছে ফ্রুট ব্যাগে মোড়ানো আশ্বিনা আম, ছবিটি ২০১৬ সালের জুলাইয়ে তোলা। ছবি: Fozli.com / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
বাংলাদেশের একটি গাছে ফ্রুট ব্যাগে মোড়ানো আশ্বিনা আম, ছবিটি ২০১৬ সালের জুলাইয়ে তোলা। ছবি: Fozli.com / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)

ওরিয়েন্টাল ফ্রুট ফ্লাই: যেভাবে আমের ক্ষতি করে


বাংলাদেশের জাতীয় জ্ঞানকোষ বাংলাপিডিয়া দেশের আমের প্রধান ক্ষতিকর পোকাগুলোর মধ্যে আমের মাছি পোকাকে তালিকাভুক্ত করেছে, এর পুরোনো বৈজ্ঞানিক নাম Dacus dorsalis (গোত্র Tephritidae, বর্গ Diptera) দিয়ে; একই তালিকায় আছে আমের শোষক পোকা (হপার), ফলের উইভিল, কাণ্ড ছিদ্রকারী ও ডগা ছিদ্রকারী পোকা। প্রজাতিটি এখন Bactrocera dorsalis নামে পরিচিত, সাধারণ নাম ওরিয়েন্টাল ফ্রুট ফ্লাই। এর আদি নিবাস দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, এবং ২০০টিরও বেশি ধরনের ফল ও বাদামজাতীয় উদ্ভিদে এর আক্রমণ নথিভুক্ত হয়েছে; স্ত্রী পোকা যেসব ফলে সবচেয়ে বেশি ডিম পাড়ে, আম তার অন্যতম।

স্ত্রী পোকা ডিম পাড়ার অঙ্গ (ওভিপজিটর) দিয়ে পাকতে থাকা ফল ছিদ্র করে খোসার নিচে একবারে ৩ থেকে ৩০টি করে ডিম পাড়ে; মাঠে একটি স্ত্রী পোকা সাধারণত ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৫০০টি ডিম পাড়ে। ডিম সাধারণত এক দিনের মধ্যেই ফোটে, আর কীড়া মোটামুটি ৬ থেকে ৩৫ দিন ফলের শাঁস খেয়ে বড় হয়, তারপর ফল ছেড়ে গাছের নিচের মাটিতে, সাধারণত ওপরের ৪ সেন্টিমিটারের মধ্যে ঢুকে পুত্তলিতে পরিণত হয়। পুত্তলি দশা সাধারণত ১০ থেকে ১২ দিনের। গ্রীষ্মের আবহাওয়ায় ডিম থেকে পূর্ণাঙ্গ পোকা হতে লাগে প্রায় ১৬ দিন, আর পূর্ণাঙ্গ পোকা সাধারণত এক থেকে তিন মাস বাঁচে; তাই উষ্ণ ও বৃষ্টিভেজা আম মৌসুমে এ পোকা দ্রুত বেড়ে যেতে পারে।

ঢাকার শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা ২০২২ সালের জুনে জার্নাল অব অ্যাগ্রিকালচার, ফুড অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টে প্রকাশিত এক গবেষণায় এই ক্ষতির বর্ণনা দেন: কীড়া ফলের পচতে থাকা শাঁস খায়, আক্রান্ত ফল দ্রুত পচে খাওয়ার অযোগ্য হয়ে যায় বা গাছ থেকে ঝরে পড়ে, ফলে চাষির সরাসরি ক্ষতি হয়। তাঁরা উল্লেখ করেন, এই সরাসরি ক্ষতির বাইরেও ফলমাছির উপস্থিতির সঙ্গে আমদানিকারক দেশগুলোর কোয়ারেন্টাইন বিধিনিষেধ জড়িত। আগের গবেষণার বরাতে তাঁরা লেখেন, দমনব্যবস্থা না থাকলে ফলের পরিপক্বতা, জাত, অঞ্চল ও মৌসুমভেদে সরাসরি ক্ষতি ৩০ থেকে ১০০ শতাংশ পর্যন্ত হয়েছে, এবং বাংলাদেশের এক পূর্ববর্তী গবেষণায় ফলমাছিতে আমের ৩৭.৫০ শতাংশ আক্রান্ত হওয়ার তথ্য পাওয়া গিয়েছিল।

একই গবেষণায় ২০২০ সালের এপ্রিল থেকে জুনের মধ্যে দিনাজপুর ও ঠাকুরগাঁও জেলার কৃষকদের আমবাগানে মিথাইল ইউজিনল ফাঁদ দিয়ে পূর্ণাঙ্গ পোকা সংগ্রহ করে চারটি প্রজাতি শনাক্ত করা হয়। ধরা পড়া পোকার ৮৫.৪১ শতাংশ ছিল ওরিয়েন্টাল ফ্রুট ফ্লাই, ৮.৮১ শতাংশ মেলন ফ্রুট ফ্লাই (কুমড়াজাতীয় ফসলের মাছি), ৩.৩৪ শতাংশ পাম্পকিন ফ্রুট ফ্লাই এবং ২.৪৪ শতাংশ পিচ ফ্রুট ফ্লাই। এতে দেখা যায়, বাংলাদেশের আমবাগানে প্রধান প্রজাতি ওরিয়েন্টাল ফ্রুট ফ্লাই।

আমে আক্রমণকারী প্রজাতি ওরিয়েন্টাল ফ্রুট ফ্লাই (Bactrocera dorsalis), ছবিটি ২০১৪ সালে ভারতের কেরালায় তোলা; প্রসঙ্গচিত্র, চাঁপাইনবাবগঞ্জের নয়। ছবি: Vinayaraj / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
আমে আক্রমণকারী প্রজাতি ওরিয়েন্টাল ফ্রুট ফ্লাই (Bactrocera dorsalis), ছবিটি ২০১৪ সালে ভারতের কেরালায় তোলা; প্রসঙ্গচিত্র, চাঁপাইনবাবগঞ্জের নয়। ছবি: Vinayaraj / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)

ফাঁদ ও ব্যাগিং নিয়ে দেশের গবেষণা যা বলে


২০২২ সালের ওই গবেষণায় ব্যবহৃত ফাঁদটি বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বারি) বিজ্ঞানীদের নকশা করা, যা লেখকদের ভাষায় জনপ্রিয়ভাবে ‘ম্যাজিক ফাঁদ’ নামে পরিচিত। তাঁদের বর্ণনায়, এটি ৩ লিটার ধারণক্ষমতার, ২০ থেকে ২২ সেন্টিমিটার উঁচু একটি নলাকার প্লাস্টিকের পাত্র; এর দুই বিপরীত পাশে প্রায় ১০ থেকে ১২ সেন্টিমিটার উঁচু ও চওড়া ত্রিভুজাকার ছিদ্র কাটা থাকে, আর প্রতিটি ছিদ্রের নিচের প্রান্ত পাত্রের তলা থেকে ৩ সেন্টিমিটার ওপরে। পাত্রে দুই-তিন ফোঁটা ডিটারজেন্ট মেশানো পানি রাখা হয়, আর লিউরে ভেজানো তুলা সরু তার দিয়ে পাত্রের ভেতরে বেঁধে দেওয়া হয়। পোকা ভেতরে ঢুকে পানিতে পড়ে মারা যায়; ফাঁদ যাতে শুকিয়ে না যায়, সে জন্য নিয়মিত পানির স্তর দেখতে হয়। গবেষণায় ফল পুরোপুরি পাকার আগে ১৫ এপ্রিল থেকে শেষ সংগ্রহ পর্যন্ত আমগাছের নিচের ডালে ফাঁদ ঝোলানো হয়েছিল।

এ ধরনের ফাঁদের লিউর মিথাইল ইউজিনল পুরুষ ফলমাছিকে আকৃষ্ট করে বিপুল সংখ্যায় আটকে ফেলে, ফলে মিলন ব্যাহত হয়। ২০২০ সালে ক্রপ প্রটেকশন সাময়িকীতে প্রকাশিত এক গবেষণাপত্রে এগুলোকে মিথাইল ইউজিনল ‘কাইরোমোন’ ফাঁদ বলা হয়েছে, অর্থাৎ লিউরটি স্ত্রী পোকার নিজের নিঃসৃত গন্ধ নয়, বরং পুরুষ পোকাকে টেনে আনে এমন একটি আকর্ষক।

এম. এস. হোসেন ও সহকর্মীদের ওই গবেষণাপত্রে ২০১৭ সালের আম মৌসুমে বাংলাদেশে ওরিয়েন্টাল ফ্রুট ফ্লাই দমনের বিভিন্ন উপায় তুলনা করা হয়, লক্ষ্য ছিল মাছিমুক্ত ও কীটনাশকের অবশেষমুক্ত আম উৎপাদনের জন্য একটি সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা (আইপিএম) কর্মসূচি তৈরি। দুই স্তরের বাদামি কাগজের ব্যাগ, কাপড়ের ব্যাগ ও পলিথিন ব্যাগে ফল মোড়ানো, মিথাইল ইউজিনল ফাঁদ এবং প্রোটিন হাইড্রোলাইসেট বিষটোপ পরীক্ষা করে প্রোফেনোফস ও সাইপারমেথ্রিনযুক্ত একটি কীটনাশক দিয়ে প্রচলিত দমনব্যবস্থার সঙ্গে তুলনা করা হয়। সবচেয়ে ভালো ফল দেয় সংগ্রহের ৪২ দিন আগে দুই স্তরের বাদামি কাগজের ব্যাগে আম মোড়ানো: ফলে আক্রমণ শূন্যে নেমে আসে, বিক্রয়যোগ্য ফলন প্রচলিত কীটনাশক ব্যবস্থাপনার চেয়ে উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি হয়, আর প্রান্তিক আয়-ব্যয় অনুপাত ছিল অন্য যেকোনো পদ্ধতির প্রায় দ্বিগুণ। লেখকেরা এই লাভের কারণ হিসেবে ফলের উচ্চমান এবং ব্যাগ দুই মৌসুম ব্যবহার করতে পারার কথা বলেন, এবং আমের পূর্ণাঙ্গ আইপিএম প্যাকেজে দুই স্তরের বাদামি কাগজের ব্যাগিং অন্তর্ভুক্ত করার সুপারিশ করেন।

আমের জেলাগুলোতে ব্যাগিং দ্রুত ছড়িয়েছে। ২০২২ সালের জুলাইয়ে দ্য ডেইলি স্টার জানায়, ২০১৬ সালে প্রথম যখন এই পদ্ধতি চালু হয়, তখন প্রায় ৬০ হাজার ব্যাগ ব্যবহৃত হয়েছিল, আর ২০২২ সালে ব্যবহৃত হয় প্রায় ১২ কোটি ব্যাগ, যার প্রায় ১০ কোটি চাঁপাইনবাবগঞ্জে। ড. শরফ উদ্দিন পত্রিকাটিকে বলেন, ব্যাগের চাহিদা বছরে প্রায় ১ থেকে দেড় কোটি করে বাড়ছে, আর ব্যাগ আমকে পোকামাকড়, ঝড়, ভারী বৃষ্টি ও শিলাবৃষ্টি থেকে রক্ষা করে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ব্যাগ লাগাতে হয় এপ্রিল ও মে মাসে; প্রতিটি ব্যাগের দাম প্রায় ৪ টাকা, সঙ্গে ১ টাকা মজুরি; এতে মণপ্রতি বাড়তি খরচ প্রায় ১ হাজার টাকা, আর সাধারণ আম যেখানে মণপ্রতি ১ হাজার ৮০০ টাকায় বিক্রি হয়, ব্যাগে মোড়ানো আম পেতে পারে প্রায় ৩ হাজার ২০০ টাকা। পত্রিকাটি জানায়, তখন কেবল মাঝারি ও বড় চাষিরাই ব্যাগ ব্যবহার করছিলেন, আর গবেষকেরা চাইছিলেন ব্যাগের ওপর ৬৩ শতাংশ আমদানি শুল্ক কমানো হোক, যাতে ক্ষুদ্র চাষিরাও তা কিনতে পারেন।

ফজলি ও জেলার চার জিআই আম


ফজলি একটি নাবি জাতের আম, অন্য প্রধান জাতগুলোর পরে বাজারে আসে। একটি ফলের ওজন এক কেজি পর্যন্ত হতে পারে, আর উপমহাদেশের রান্নায় জ্যাম ও আচার তৈরিতে এর ব্যাপক ব্যবহার আছে। বাংলাদেশের রাজশাহী বিভাগে এবং সীমান্তের ওপারে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মালদহ ও মুর্শিদাবাদে এ জাতের চাষ হয়। বাংলাপিডিয়া ফজলিকে দেশের উৎকৃষ্ট আমের জাতগুলোর তালিকায় রেখেছে এবং উল্লেখ করেছে, উৎকৃষ্ট জাতের আম প্রধানত রাজশাহী, নবাবগঞ্জ (বর্তমান চাঁপাইনবাবগঞ্জ) ও দিনাজপুরে চাষ হয়।

বাংলাদেশে ভৌগোলিক নির্দেশক পণ্য নিবন্ধিত হয় ভৌগোলিক নির্দেশক পণ্য (নিবন্ধন ও সুরক্ষা) আইন, ২০১৩ (২০১৩ সনের ৫৪ নং আইন) অনুযায়ী, শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীন পেটেন্ট, ডিজাইন ও ট্রেডমার্কস অধিদপ্তরের (ডিপিডিটি) মাধ্যমে। জিআই কোনো পণ্যের নামকে সেই এলাকার সঙ্গে যুক্ত করে, যার জলবায়ু, মাটি বা ঐতিহ্য পণ্যটির বৈশিষ্ট্য গড়ে দেয়; চাঁপাইনবাবগঞ্জের ক্ষেত্রে চারটি আমের নাম এখন এই স্বীকৃতি বহন করে।

  • খিরসাপাত (হিমসাগর নামেও পরিচিত): চাঁপাইনবাবগঞ্জের চাষিদের পক্ষে বারি ২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে আবেদন করে, আর সনদ হস্তান্তর করা হয় ২০১৯ সালের ২৭ জানুয়ারি; জামদানি ও ইলিশের পর এটি বাংলাদেশের তৃতীয় জিআই পণ্য।
  • ফজলি: ডিপিডিটি প্রথমে রাজশাহীকে ফজলির জিআই দেয়। ২০২১ সালের অক্টোবরের শুরুতে চাঁপাইনবাবগঞ্জ কৃষি সমিতি এর বিরুদ্ধে আবেদন করে, ডিপিডিটির গঠিত একটি ট্রাইব্যুনাল শুনানি করে, এবং ২০২২ সালের ২৪ মে অধিদপ্তর সিদ্ধান্ত দেয় যে দুই জেলাই এ নাম ব্যবহার করতে পারবে। ২০২৩ সালের এপ্রিলে বিডিনিউজ২৪ জানায়, ফজলির স্বীকৃতি দুই জেলার নামে যৌথভাবে দেওয়া হয়েছে।
  • ল্যাংড়া ও আশ্বিনা: চাঁপাইনবাবগঞ্জ আঞ্চলিক উদ্যানতত্ত্ব গবেষণা কেন্দ্রের তৎকালীন মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ২০১৭ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি আবেদন করেন, আর দুটি জাতই ২০২৩ সালের ২৫ জুন জিআই সনদ পায়।

ল্যাংড়া ও আশ্বিনার সনদ দেওয়ার সময় ডিপিডিটির একজন উপনিবন্ধক দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, বিদেশে রপ্তানির সময় জিআই পণ্যের অধিক মূল্য পাওয়া যায়। ২০১৯ সালে দ্য ডেইলি স্টার উল্লেখ করে, ভারত এর বহু আগেই পশ্চিমবঙ্গের মালদহের ফজলি আমকে জিআই হিসেবে নিবন্ধন করেছে। তবে ২০২৬ সালের জুলাইয়ের প্রতিবেদনে যেসব ফজলিচাষির কথা এসেছে, তাঁদের কাছে এই স্বীকৃতি কানসাটের বাজারে দাম বাড়াতে পারেনি।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ, শিবগঞ্জ ও আমের অর্থনীতি


বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী, রাজশাহী বিভাগের চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার আয়তন ১৭০২.৫৫ বর্গকিলোমিটার। এর উত্তর, পশ্চিম ও দক্ষিণে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, পূর্বে রাজশাহী ও নওগাঁ জেলা; জেলাটি বরেন্দ্র, দিয়াড়া ও চরাঞ্চল নিয়ে গঠিত। প্রধান নদী পদ্মা, মহানন্দা ও পাগলা। ১৯৪৭ সালের আগ পর্যন্ত নবাবগঞ্জ ছিল মালদহ জেলার একটি থানা; দেশভাগের সময় এটি রাজশাহী জেলার অন্তর্ভুক্ত হয়, ১৯৪৮ সালে মহকুমা এবং ১৯৮৪ সালে জেলা হয়। জেলার পাঁচটি উপজেলার মধ্যে শিবগঞ্জ সবচেয়ে বড়, আয়তন ৫২৫.৪২ বর্গকিলোমিটার।

শিবগঞ্জের ভেতর দিয়ে বয়ে গেছে পদ্মা, মহানন্দা, পাগলা ও মরা গঙ্গা। উপজেলায় ১৫টি ইউনিয়ন, যার মধ্যে কানসাট ও শ্যামপুরও আছে, প্রতিবেদনে উদ্ধৃত চাষিরা এসব ইউনিয়নেরই। বাংলাপিডিয়া এ উপজেলার প্রধান ফল হিসেবে আম, কাঁঠাল ও লিচুর কথা এবং প্রধান রপ্তানিপণ্যের তালিকায় সবার আগে আমের কথা বলেছে; উল্লেখযোগ্য হাটের মধ্যে আছে কানসাট হাট, আর ৫৯.২৫ শতাংশ পরিবারের আয়ের প্রধান উৎস কৃষি।

২০২৬ মৌসুমের জন্য জেলার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর মে মাসে বাসসকে জানায়, ৩৭ হাজার ৪৮৭ হেক্টর জমিতে আমের চাষ হয়েছে এবং উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ৪ লাখ ৫৮ হাজার ৯১২ মেট্রিক টন। অধিদপ্তরের উপপরিচালক বলেন, জলবায়ু, মাটি ও ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে চাঁপাইনবাবগঞ্জের আম বেশি সুস্বাদু, তবে অন্য জেলার তুলনায় দেরিতে পাকে। সে বছর কোনো আম সংগ্রহের ক্যালেন্ডার ঠিক করা হয়নি: ১১ মে এক সভার পর সিদ্ধান্ত হয়, গাছে আম পাকলেই চাষিরা বিক্রি করতে পারবেন, আর ১৪ মে থেকেই বিভিন্ন স্থানে পাকা গুটি ও গোপালভোগ আমের খবর আসে। জাগো নিউজের প্রতিবেদনেও উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা প্রায় ৪ লাখ ৫৮ হাজার টন বলা হয়, যার বাজারমূল্য প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা। জুনে প্রথম আলোর প্রতিবেদনে জেলার বার্ষিক আম-বাণিজ্য ৬ হাজার থেকে ৮ হাজার কোটি টাকা বলে অনুমান করা হয় এবং বলা হয়, এক লাখের বেশি মানুষের জীবিকা আমের ওপর নির্ভরশীল।

আম দেশেরও অন্যতম প্রধান ফল। ওপরে উল্লিখিত ২০২২ সালের গবেষণায় বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০২০ সালের তথ্য ধরে বলা হয়, দেশে প্রায় ৯৫ হাজার হেক্টর জমি থেকে ১২ লাখ ২২ হাজার ৩৬৮ টন আম উৎপাদিত হয়, আর ফলের মধ্যে জমির পরিমাণে আম প্রথম ও উৎপাদনে তৃতীয়। দ্য ডেইলি স্টার ২০১৯ সালে জানায়, দেশের মোট আম উৎপাদনের ৬৭ শতাংশ আসে উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল, প্রধানত রাজশাহী অঞ্চল থেকে।

বাংলাদেশের চাঁপাইনবাবগঞ্জে একটি আমগাছ। ছবি: Mahmudul Karim Farsad / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 3.0)
বাংলাদেশের চাঁপাইনবাবগঞ্জে একটি আমগাছ। ছবি: Mahmudul Karim Farsad / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 3.0)

নাবি জাত ও গবেষণা কেন্দ্র


উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ও গবেষণা কেন্দ্রের বিজ্ঞানী দুজনেই চাষিদের নাবি জাতের দিকে যাওয়ার পরামর্শ দেন। বারির অধীন চাঁপাইনবাবগঞ্জ আঞ্চলিক উদ্যানতত্ত্ব গবেষণা কেন্দ্র আগে আম গবেষণা কেন্দ্র নামে পরিচিত ছিল। দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে জানায়, ফ্লোরিডার জাত এম-৩৮৯৬ ও স্থানীয় আশ্বিনার সংকরায়ণে উদ্ভাবিত বারি আম-৪ জাতের সংকরায়ণ কাজ নব্বইয়ের দশকের শুরুতে এখানেই শুরু হয়। আশ্বিনা নিজেও একটি নাবি জাত, যা চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও রাজশাহীর মিষ্টি জাতগুলো ফুরিয়ে যাওয়ার পর সাধারণত আগস্টে বাজারে আসে।

চাষিনেতারা দীর্ঘদিন ধরে গবেষণার সক্ষমতা বাড়ানোর দাবি জানিয়ে আসছিলেন। প্রথম আলো ২০২৬ সালের জুনে জানায়, জেলায় একটি পূর্ণাঙ্গ আম গবেষণা ইনস্টিটিউটের দাবি পূরণ হয়নি, আর বিদ্যমান আঞ্চলিক উদ্যানতত্ত্ব গবেষণা কেন্দ্রে জনবলের সংকট রয়েছে, আধুনিক গবেষণাগারও নেই। জুলাইয়ের প্রতিবেদনের সময় উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা জানান, ফজলি হারানো চাষিদের জন্য কোনো ক্ষতিপূরণ নেই, আর ডিএইর অতিরিক্ত উপপরিচালকের ভাষ্য ছিল, কৃষি বিভাগের সমাধান প্রশিক্ষণ, ফেরোমন ফাঁদ ও ভালো মানের ফ্রুট ব্যাগ।

ছবি: Fozli.com / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)

সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, বাসস, প্রথম আলো, দ্য ডেইলি স্টার, দ্য ডেইলি স্টার বাংলা, বিডিনিউজ২৪, দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, বাংলাপিডিয়া, জার্নাল অব অ্যাগ্রিকালচার, ফুড অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট (শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা, ২০২২), ক্রপ প্রটেকশন (হোসেন ও সহকর্মী, ২০২০), ডব্লিউআইপিও লেক্স, উইকিপিডিয়া

অনলাইন ডেস্কদা এগ্রো নিউজ

ফল

সম্পর্কিত খবর

ইসলাম

স্পেনের জলপাই খামারে আন্দালুসের ইসলামি ঐতিহ্য তুলে ধরছেন এক মুসলিম দম্পতি

মালাগার কাছে ৩৫ একরের খামারবাড়ি কিনে ‘হাউস অব আন্দালুস’ গড়ছেন হেনরিয়েটা সোভাতি ও ইমাম আজমল মাসরুর; সেখানে ৪০০ জলপাইগাছ, পরিকল্পনা কোরআনিক বাগান ও গ্রন্থাগারের।

বার্তা২৪১ নভেম্বর ২০২৬২ মিনিটের পড়া
এগ্রোটেক

বিনায় চালু হলো গামা ইরেডিয়েশন প্রযুক্তি, কৃষিপণ্য রপ্তানিতে নতুন সুযোগ

গাজীপুরে বিনার আঞ্চলিক কেন্দ্রে ৮৯ কোটি টাকার গামা ইরেডিয়েশন সেন্টার চালু হয়েছে; এতে আম-কাঁঠালের মতো কৃষিপণ্য জীবাণুমুক্ত করে বেশি দিন রাখা যাবে।

এগ্রিকেয়ার২৪১ নভেম্বর ২০২৬১ মিনিটের পড়া
ফল

ফুলবাড়িয়ার ছয় গ্রামে লেবুর বাগান, এক মৌসুমে ৯৫ কোটি টাকা বিক্রির আশা

ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়ায় এবার ৭৫৪ হেক্টরের বেশি জমিতে লেবুর আবাদ; কৃষি বিভাগের হিসাবে এ মৌসুমে প্রায় ৯৫ কোটি টাকার লেবু বিক্রি হতে পারে।

এগ্রিকেয়ার২৪১ নভেম্বর ২০২৬১ মিনিটের পড়া

মন্তব্য

(০)