অগ্রহায়ণের শেষ বিকেলে উত্তরের কোনো চরে দাঁড়ালে এখনও চোখে পড়ে ছোট ছোট খেত, যেখানে বালুমেশানো মাটিতে সবুজ চারা মাথা তুলছে। কয়েক মাস পর সেই চারার মাথায় ঝুলবে লম্বা, রেশমি শীষ, যাতে ঠাসা থাকবে সরষের দানার চেয়েও ছোট হলদেটে দানা। এই ফসলের নাম কাউন। একসময় গ্রামের মানুষ একে বলতেন গরিবের খাবার; ধান যখন ঘরে থাকত না, তখন কাউনের ভাত, কাউনের জাউ কিংবা খিচুড়ি দিয়েই পেট ভরাতেন অনেকে। সময় বদলেছে। আজ শহরের স্বাস্থ্যসচেতন ক্রেতা সুপারশপে প্যাকেটজাত কাউনের চাল খোঁজেন, পুষ্টিবিদেরা ডায়াবেটিসের রোগীকে এই দানার কথা মনে করিয়ে দেন। যে শস্যকে আমরা প্রায় ভুলতে বসেছিলাম, সেটিই এখন ফিরে আসছে পুষ্টিকর ও লাভজনক ফসল হিসেবে।
কাউন পৃথিবীর প্রাচীনতম চাষ করা শস্যগুলোর একটি। উদ্ভিদবিজ্ঞানীরা একে চেনেন সেটারিয়া ইটালিকা নামে; ইংরেজিতে বলা হয় ফক্সটেইল মিলেট, কারণ এর শীষ দেখতে অনেকটা শিয়ালের লেজের মতো। এটি ঘাসজাতীয় উদ্ভিদ, ধান ও গমের দূর সম্পর্কের আত্মীয়। কম পানিতে, কম সারে, অপেক্ষাকৃত অনুর্বর জমিতে টিকে থাকার ক্ষমতার জন্য বহু শতাব্দী ধরে এশিয়ার কৃষকেরা একে ভরসা করেছেন। বাংলাদেশেও কাউন বহু পুরোনো ফসল, বিশেষ করে উত্তরাঞ্চলে এবং নদীর চর এলাকায় যেখানে বালুমাটিতে অন্য ফসল ভালো হয় না।
বিশ্বজুড়ে এই ধরনের ক্ষুদ্র দানাশস্যের প্রতি নতুন করে আগ্রহ তৈরি হয়েছে। ভারতের প্রস্তাবে এবং সত্তরটিরও বেশি দেশের সমর্থনে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ ২০২১ সালের মার্চে ২০২৩ সালকে আন্তর্জাতিক মিলেট বর্ষ ঘোষণা করে, আর সেই বছরের আয়োজনের নেতৃত্ব দেয় জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা, এফএও। সংস্থাটির বক্তব্য ছিল, প্রতিকূল ও বদলে যাওয়া জলবায়ুতেও এসব শস্য চাষ করা যায় এবং এগুলো পুষ্টিতে সমৃদ্ধ। কাউন সেই মিলেট পরিবারেরই সদস্য। ফলে বাংলাদেশের কৃষকের কাছে কাউনের প্রশ্নটা কেবল পুরোনো অভ্যাস ফিরিয়ে আনা নয়; খরা, অনিয়মিত বৃষ্টি আর বাড়তে থাকা উৎপাদন খরচের যুগে একটি টেকসই বিকল্প খুঁজে নেওয়ার প্রশ্নও বটে।
ছোট দানায় বড় পুষ্টি
কাউনকে গরিবের খাবার বলা হলেও পুষ্টির হিসাবে এটি মোটেই গরিব নয়। ছোট দানা বিশিষ্ট এই শস্যে রয়েছে আমিষ, অর্থাৎ প্রোটিন, যা শরীরের পেশি গঠন ও ক্ষয়পূরণে কাজে লাগে। এতে আছে প্রচুর আঁশ বা ফাইবার, যা হজমে সাহায্য করে এবং পেট দীর্ঘক্ষণ ভরা রাখে। খনিজ উপাদানের মধ্যে কাউনে পাওয়া যায় ম্যাগনেসিয়াম, পটাশিয়াম ও আয়রন বা লৌহ। ম্যাগনেসিয়াম স্নায়ু ও পেশির স্বাভাবিক কাজে দরকার, পটাশিয়াম রক্তচাপের ভারসাম্য রাখতে ভূমিকা রাখে, আর লৌহ রক্তস্বল্পতা ঠেকাতে জরুরি। এর সঙ্গে আছে বি-কমপ্লেক্স ভিটামিন, যা খাবার থেকে শক্তি তৈরির প্রক্রিয়ায় অংশ নেয়।
কাউনের আরেকটি গুণ হলো এর ক্যালরি তুলনামূলক কম। যাঁরা ওজন নিয়ন্ত্রণ করতে চান, তাঁদের খাদ্যতালিকায় তাই এটি জায়গা পাচ্ছে। পুষ্টিবিদেরা যে বিষয়টির ওপর সবচেয়ে বেশি জোর দেন, তা হলো গ্লাইসেমিক ইনডেক্স। এটি একটি মাপকাঠি, যা বলে দেয় কোনো খাবার খাওয়ার পর রক্তে শর্করা কত দ্রুত বাড়ে। যে খাবারের এই সূচক কম, তা খেলে রক্তে চিনির মাত্রা ধীরে ধীরে বাড়ে, হঠাৎ লাফিয়ে ওঠে না। কাউনের গ্লাইসেমিক ইনডেক্স কম হওয়ায় ডায়াবেটিসের রোগীদের জন্য এটি সহায়ক খাবার হিসেবে বিবেচিত হয়।
স্বাস্থ্যের জন্য কী করে কাউন
প্রথমত, কাউন হজমশক্তি উন্নত করে। আঁশসমৃদ্ধ খাবার অন্ত্রের চলাচল স্বাভাবিক রাখে, ফলে কোষ্ঠকাঠিন্য দূর হয়। দ্বিতীয়ত, কম গ্লাইসেমিক ইনডেক্সের কারণে এটি রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। সাদা চালের ভাতের কিছু অংশের বদলে কাউন খাওয়ার পরামর্শ তাই অনেকেই দেন, যদিও ডায়াবেটিসের রোগীর খাদ্যতালিকা বদলানোর আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই ভালো।
তৃতীয়ত, কাউনে চর্বি কম থাকায় এটি হৃদ্যন্ত্রের জন্য ভালো এবং হৃদরোগ প্রতিরোধে সহায়ক বলে ধরা হয়। চতুর্থত, এটি পেট ভরা রাখে ও অতিরিক্ত ক্ষুধা কমায়, ফলে ওজন কমাতে চাইলে কাজে আসে। পঞ্চমত, কম দামে পাওয়া যায় বলে গ্রামীণ পরিবারের পুষ্টির ঘাটতি পূরণে কাউন একটি ভালো উৎস হতে পারে। যে পরিবার প্রতিদিন মাছ-মাংস কিনতে পারে না, তাদের পাতে ভাতের পাশাপাশি কাউনের একটি পদ বাড়তি আমিষ ও খনিজ জোগায়।
রান্নার দিক থেকেও কাউন বহুমুখী। বাংলার গ্রামে কাউনের চালের পায়েস বা ক্ষীর বহু পুরোনো পদ। অনেকে ভাতের মতো রান্না করেন, কেউ খিচুড়িতে মেশান, কেউ আবার গুঁড়া করে পিঠা বানান। শহরে এখন সকালের নাশতায় কাউনের উপমা বা পোলাও রান্নার চলও দেখা যাচ্ছে। এর বাইরে পাখির খাবার হিসেবেও কাউনের বড় বাজার আছে; পোষা পাখির দোকানে যে দানা বিক্রি হয়, তার বড় অংশই এই শস্য।
কোন জমিতে কাউন ভালো হয়
কাউনের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো মাটি নিয়ে এর তেমন বাছবিচার নেই। প্রায় সব ধরনের মাটিতেই এর চাষ করা যায়। তবে যে জমিতে পানি দাঁড়িয়ে থাকে না, এমন বেলে দোআঁশ মাটিতে ফলন সবচেয়ে ভালো হয়। দোআঁশ মাটিও উপযুক্ত। দোআঁশ বলতে বোঝায় বালু, পলি ও কাদার মোটামুটি সুষম মিশ্রণ; আর বেলে দোআঁশে বালুর ভাগ একটু বেশি থাকে, ফলে পানি দ্রুত নেমে যায়। কাউনের শিকড় জলাবদ্ধতা সহ্য করতে পারে না, তাই নিচু জমির চেয়ে উঁচু বা মাঝারি উঁচু জমি বেছে নেওয়াই ভালো।
মাটির অম্লত্ব বা ক্ষারত্ব মাপা হয় পিএইচ দিয়ে। এর মান ৭ হলে মাটি নিরপেক্ষ, ৭-এর কম হলে অম্লীয়, বেশি হলে ক্ষারীয়। কাউনের জন্য মাটির পিএইচ ৫.৫ থেকে ৭.৫-এর মধ্যে থাকা উচিত, অর্থাৎ হালকা অম্লীয় থেকে হালকা ক্ষারীয় মাটিতে এটি স্বচ্ছন্দে বাড়ে। উপজেলা কৃষি অফিস বা মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের ভ্রাম্যমাণ ল্যাবে মাটি পরীক্ষা করিয়ে নিলে জমির অবস্থা বোঝা যায়।
জমি তৈরির কাজও জটিল নয়। দুই থেকে তিনবার চাষ ও মই দিয়ে মাটি ঝুরঝুরে করে নিতে হয়। কাউনের বীজ খুব ছোট, তাই ঢেলা থাকলে বীজ ঠিকমতো মাটির সংস্পর্শ পায় না, গজানোর হার কমে যায়। চাষের সময়ই আগাছা পরিষ্কার করে ফেলা জরুরি, কারণ চারা অবস্থায় কাউন আগাছার সঙ্গে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ে।
তিতাস: দেশের মাঠ থেকে উঠে আসা উন্নত জাত
দেশে এখনও বেশির ভাগ কৃষক স্থানীয় জাতের কাউন চাষ করেন। তবে এর পাশাপাশি বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট, সংক্ষেপে বারি, উদ্ভাবিত ‘তিতাস’ নামের একটি উন্নত জাত রয়েছে। এই জাতের পেছনের ইতিহাসটিও চমকপ্রদ। ১৯৮০ সালে কুমিল্লা জেলা থেকে শিবনগর নামে একটি স্থানীয় কাউন সংগ্রহ করা হয়। এরপর দেশি ও বিদেশি বিভিন্ন জাতের সঙ্গে বছরের পর বছর তুলনামূলক মূল্যায়ন চলে। শেষে ১৯৮৯ সালে ‘তিতাস’ নামে জাতটি অনুমোদন পায়। অর্থাৎ বাংলার মাঠেরই একটি ফসল বাছাই ও পরীক্ষার মধ্য দিয়ে উন্নত জাতে পরিণত হয়েছে।
তিতাস উচ্চ ফলনশীল জাত। এর রোগ ও পোকা প্রতিরোধ ক্ষমতা ভালো, এবং এটি আগাম পাকে। গাছ মাঝারি লম্বা, পাতা সবুজ, কাণ্ড শক্ত। ফলে ঝড়ো বাতাসেও গাছ সাধারণত নুয়ে পড়ে না; কৃষকের ভাষায়, ফসল ‘শুয়ে পড়ে’ না। শীষ বেশ লম্বা, মোটা ও রেশমি। বীজ মাঝারি আকারের, রং ঘিয়ের মতো। এক হাজার বীজের ওজন মাত্র ২.৩ থেকে ২.৫ গ্রাম, যা থেকেই বোঝা যায় দানা কত ছোট।
ফলনের হিসাবে তিতাস স্থানীয় জাতের চেয়ে প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ বেশি ফলন দেয়। রবি মৌসুমে, অর্থাৎ শীতকালে, জাতটি পাকতে ১০৫ থেকে ১১৫ দিন সময় নেয়; খরিফ মৌসুমে, অর্থাৎ গ্রীষ্ম ও বর্ষায়, পাকে ৮৫ থেকে ৯৫ দিনে। রবি মৌসুমে তিতাসের ফলন হেক্টরপ্রতি ২.০ থেকে ২.৫ টন, খরিফে কিছুটা কম। জাতটির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ গুণ হলো এটি গোড়া পচা রোগ প্রতিরোধ করতে পারে। গোড়া পচা হলে গাছের কাণ্ডের নিচের অংশ নরম হয়ে পচে যায় এবং গাছ মরে যায়; ভেজা মাটিতে এই রোগ বেশি দেখা দেয়।
তিতাসের পর বারি আরও কয়েকটি জাত অবমুক্ত করেছে। গবেষণা প্রকাশনা অনুযায়ী বারি কাউন-২, বারি কাউন-৩ ও বারি কাউন-৪ নামে জাতগুলো মাঠে এসেছে। জাত বাছাইয়ের আগে নিকটস্থ উপজেলা কৃষি অফিস বা বারির আঞ্চলিক কেন্দ্র থেকে কোন এলাকায় কোন জাত ভালো করছে, তা জেনে নেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ। মানসম্মত বীজই ভালো ফলনের প্রথম শর্ত; উন্নত জাতের বীজ বেছে নেওয়ার পরামর্শ তাই সব কৃষি বিশেষজ্ঞই দেন।
কখন বুনবেন: দুই মৌসুমের হিসাব
কাউন রবি ও খরিফ, দুই মৌসুমেই চাষ করা যায়, এটাই এর বড় শক্তি। দেশের উত্তরাঞ্চলে অগ্রহায়ণ থেকে মাঘ মাস, অর্থাৎ মধ্য নভেম্বর থেকে মধ্য ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বীজ বোনা যায়। দক্ষিণাঞ্চলে সাধারণত অগ্রহায়ণ মাসেই বীজ বোনা হয়। এটি রবি মৌসুমের চাষ, যখন আমন ধান কাটার পর অনেক জমি খালি পড়ে থাকে, কিংবা চরের বালুমাটি নতুন করে জেগে ওঠে।
অন্যদিকে বর্ষা মৌসুমেও, অর্থাৎ জুন ও জুলাই মাসে, কাউন বোনা হয়। অনেক এলাকায় একে আদর্শ সময় হিসেবে ধরা হয়, কারণ তখন বৃষ্টির পানিতেই ফসলের প্রয়োজন মিটে যায়, আলাদা সেচ লাগে না। তবে খরিফ মৌসুমে জমিতে পানি জমার ঝুঁকি থাকে, তাই এ সময় উঁচু ও পানি নিষ্কাশনের ভালো ব্যবস্থা আছে এমন জমি বেছে নিতে হয়। মনে রাখতে হবে, তিতাসসহ কাউনের ফলন রবি মৌসুমে বেশি হয়।
কতটা বীজ, কীভাবে বুনবেন
কাউনের বীজ ছিটিয়ে এবং সারিতে, দুইভাবেই বোনা যায়। ছিটিয়ে বুনলে হেক্টরপ্রতি ১০ কেজি এবং সারিতে বুনলে ৮ কেজি বীজ লাগে। সাধারণভাবে বলা হয়, প্রতি হেক্টরে ৮ থেকে ১০ কেজি বীজই যথেষ্ট। এক হেক্টর মানে প্রায় আড়াই একর, বা মোটামুটি ২৪৭ শতাংশ জমি। এত বড় জমিতে মাত্র কয়েক কেজি বীজ লাগার কারণ, কাউনের দানা অসম্ভব ছোট, আর একটি গাছ থেকেই কয়েকটি কুশি বা পাশের ডাল বের হয়।
বিশেষজ্ঞেরা সারিতে বোনার পরামর্শ দেন, কারণ তাতে আগাছা পরিষ্কার, সার দেওয়া ও পরিচর্যা অনেক সুবিধাজনক হয়। সারিতে বুনলে সারি থেকে সারির দূরত্ব ২৫ থেকে ৩০ সেন্টিমিটার রাখতে হবে। চারা গজানোর দুই থেকে তিন সপ্তাহের মধ্যে সারিতে চারা থেকে চারার দূরত্ব ৬ থেকে ৮ সেন্টিমিটার রেখে বাকি চারা তুলে ফেলতে হবে। এই কাজকে বলে চারা পাতলা করা। শুনতে অপচয় মনে হলেও এর ফলে প্রতিটি গাছ পর্যাপ্ত আলো, পানি ও খাবার পায় এবং শীষ বড় হয়। কোনো কোনো নির্দেশিকায় আরও বেশি দূরত্বের কথা বলা হয়, যেমন সারির মধ্যে ৩০ সেন্টিমিটার এবং গাছের মধ্যে ২০ থেকে ২৫ সেন্টিমিটার; জমির উর্বরতা ও জাত বুঝে স্থানীয় কৃষি কর্মকর্তার সঙ্গে আলাপ করে দূরত্ব ঠিক করাই ভালো।
বীজ খুব ছোট বলে বোনার সময় একটি কৌশল অনেকে কাজে লাগান: বীজের সঙ্গে শুকনো বালু বা ঝুরঝুরে মাটি মিশিয়ে নেন, যাতে হাতে ছিটালে বীজ সমানভাবে ছড়ায়। বীজ খুব গভীরে পুঁতে দিলে চারা মাটি ফুঁড়ে উঠতে পারে না, তাই হালকা করে ঢেকে দেওয়াই যথেষ্ট।
সার: দরকার বুঝে, মেপে
কাউন চাষে সচরাচর রাসায়নিক সার দেওয়া হয় না। এটাই অনেক কৃষকের কাছে ফসলটির আকর্ষণ; সারের দাম যখন বাড়ে, তখন কম খরচের ফসলের কদরও বাড়ে। তবে অনুর্বর জমিতে পরিমিত সার দিলে ফলন উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ে। কৃষি গবেষণার সুপারিশ অনুযায়ী এমন জমিতে যে পরিমাণ সার দেওয়া যায়, তা নিচে দেওয়া হলো। শতাংশের হিসাবটি ছোট জমির কৃষকের সুবিধার জন্য।
- ইউরিয়া: প্রতি শতাংশে ৩৮৫ থেকে ৪২৫ গ্রাম, অর্থাৎ হেক্টরপ্রতি ৯৫ থেকে ১০৫ কেজি।
- টিএসপি (ট্রিপল সুপার ফসফেট): প্রতি শতাংশে ২৮৩ থেকে ৩০৪ গ্রাম, অর্থাৎ হেক্টরপ্রতি ৭০ থেকে ৭৫ কেজি।
- এমওপি (মিউরেট অব পটাশ): প্রতি শতাংশে ১২১ থেকে ১৬২ গ্রাম, অর্থাৎ হেক্টরপ্রতি ৩০ থেকে ৪০ কেজি।
ইউরিয়া নাইট্রোজেনের উৎস, যা গাছের পাতা ও কাণ্ড বাড়ায়। টিএসপি ফসফরাস জোগায়, যা শিকড় ও দানা গঠনে কাজে লাগে। এমওপি থেকে আসে পটাশিয়াম, যা গাছকে শক্ত করে এবং রোগ ও খরা সহ্য করার ক্ষমতা বাড়ায়। পটাশিয়াম ও ফসফরাস সার দিলে কাউনের ফলন ভালো হয় বলে মাঠের অভিজ্ঞতাও বলে।
সার দেওয়ার পদ্ধতি নির্ভর করে সেচের সুযোগের ওপর। সেচ ছাড়া চাষ করলে সবটুকু সার শেষ চাষের সময় মাটিতে মিশিয়ে দিতে হবে। সেচের ব্যবস্থা থাকলে শেষ চাষের সময় অর্ধেক ইউরিয়া এবং সবটুকু টিএসপি ও এমওপি দিতে হবে। বাকি অর্ধেক ইউরিয়া বীজ বোনার ৩৫ থেকে ৪০ দিন পর উপরি প্রয়োগ করতে হবে, অর্থাৎ দাঁড়িয়ে থাকা ফসলের সারির ফাঁকে ছিটিয়ে দিতে হবে। ইউরিয়া উপরি প্রয়োগের পর হালকা সেচ দিলে সার মাটিতে মিশে যায় এবং অপচয় কমে।
রাসায়নিক সারের পাশাপাশি বোনার আগে জৈব সার, যেমন কম্পোস্ট বা পচা গোবর, দেওয়া ভালো। জৈব সার মাটির গঠন উন্নত করে, বেলে মাটিতে পানি ধরে রাখার ক্ষমতা বাড়ায় এবং দীর্ঘমেয়াদে জমির উর্বরতা রক্ষা করে। বাড়ির আশপাশের খড়, পাতা ও গোবর দিয়েই কম খরচে কম্পোস্ট তৈরি করা যায়।
খরা সইতে পারে, তবু একটু যত্ন চায়
কাউন একটি খরা সহিষ্ণু ফসল। এর শিকড় মাটির গভীর থেকে পানি টেনে নিতে পারে, আর পাতা পানির অপচয় কম করে। তাই বর্ষাকালে এর জন্য আলাদা সেচের দরকার হয় না। তবে রবি মৌসুমে দীর্ঘ খরা দেখা দিলে এক থেকে দুটি হালকা সেচ দিলে ফলন বেশি হয়। শুষ্ক আবহাওয়ায় বিশেষ করে শীষ বের হওয়ার সময় মাটিতে রস থাকা জরুরি, কারণ তখন পানির অভাব হলে দানা পুষ্ট হয় না। সেচ দিতে হবে হালকাভাবে; জমিতে পানি জমিয়ে রাখা চলবে না।
আগাছা কাউনের বড় শত্রু, বিশেষ করে প্রথম এক মাসে। জমিতে আগাছা দেখা দিলে নিড়ানি দিয়ে তুলে ফেলতে হবে। সাধারণত চারা পাতলা করার সময় একবার এবং তার কয়েক সপ্তাহ পর আরেকবার নিড়ানি দিলেই চলে। সারিতে বোনা খেতে নিড়ানি দেওয়া অনেক কম পরিশ্রমের, এটি সারিতে বোনার আরেকটি সুবিধা।
রোগবালাই কম, তবে নজর রাখা চাই
কাউন চাষে সাধারণত রোগবালাই কম দেখা যায়। এটিও কৃষকের খরচ কমানোর একটি কারণ। তবে কিছু ক্ষেত্রে সমস্যা হতে পারে। পাতায় দাগ পড়া বা পাতা ঝলসে যাওয়া এর মধ্যে প্রধান। এগুলো মূলত ছত্রাকজনিত রোগ; আর্দ্র আবহাওয়ায় পাতায় বাদামি বা ধূসর দাগ দেখা দেয়, দাগ বড় হয়ে পাতা শুকিয়ে যায়। আক্রমণ দেখা দিলে কৃষি কর্মকর্তার পরামর্শ অনুযায়ী অনুমোদিত ছত্রাকনাশক প্রয়োগ করতে হবে।
পোকামাকড়ের আক্রমণ হলে অনুমোদিত কীটনাশক ব্যবহার করে তা নিয়ন্ত্রণ করা যায়। তবে কীটনাশক ব্যবহারের আগে দেখে নেওয়া দরকার ক্ষতি সত্যিই অর্থনৈতিকভাবে বড় কি না, কারণ অপ্রয়োজনীয় বালাইনাশক খরচ বাড়ায় এবং উপকারী পোকাও মেরে ফেলে। তিতাসের মতো রোগ ও পোকা প্রতিরোধী জাত বেছে নেওয়া, সুস্থ বীজ ব্যবহার করা এবং জমিতে পানি জমতে না দেওয়াই রোগ ঠেকানোর সবচেয়ে কার্যকর ও কম খরচের উপায়।
দানা পাকার সময় আরেকটি পরিচিত সমস্যা হলো পাখি। মুনিয়া, চড়ুইসহ নানা পাখি কাউনের শীষ থেকে দানা খেয়ে যায়। অনেক কৃষক এ সময় খেতে পাহারা দেন, ঝুনঝুনি বা চকচকে ফিতা টাঙিয়ে পাখি তাড়ান। আশপাশের কৃষকেরা একই সময়ে বুনলে ও কাটলে পাখির ক্ষতি ভাগাভাগি হয়ে যায়, কোনো একজনের খেতে চাপ বেশি পড়ে না।
ফসল তোলা ও ঘরে রাখা
জাত ও মৌসুমভেদে বোনার ৮০ থেকে ১০০ দিনের মধ্যে কাউন পরিপক্ক হয়; তিতাসের ক্ষেত্রে খরিফে ৮৫ থেকে ৯৫ এবং রবিতে ১০৫ থেকে ১১৫ দিন লাগে। শীষের রং সবুজ থেকে বদলে হলদেটে বা সোনালি হলে বুঝতে হবে ফসল কাটার উপযুক্ত সময় এসেছে। বেশি দেরি করলে দানা ঝরে পড়ে এবং পাখির ক্ষতিও বাড়ে। সাধারণত কাস্তে দিয়ে শীষসহ গাছের ওপরের অংশ কেটে নেওয়া হয়।
কাটার পর শীষগুলো রোদে শুকিয়ে মাড়াই করতে হয়। মাড়াইয়ের পর দানা আবার ভালোভাবে রোদে শুকানো জরুরি, কারণ আর্দ্রতা থাকলে সংরক্ষণের সময় ছত্রাক ধরে এবং পোকা লাগে। দাঁতে কাটলে দানা ‘কট’ শব্দে ভাঙলে বোঝা যায় যথেষ্ট শুকিয়েছে। এরপর বায়ুরোধী পাত্র, ড্রাম বা মোটা পলিথিনে মুখ বন্ধ করে শুকনো জায়গায় রাখলে কাউন দীর্ঘদিন ভালো থাকে। পরের মৌসুমের বীজের জন্য সবচেয়ে সুস্থ ও পুষ্ট শীষগুলো আলাদা করে রাখা উচিত।
কম খরচ, বাড়তি চাহিদা: কাউনের অর্থনীতি
কাউনের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা কয়েকটি কারণে উজ্জ্বল। প্রথমত, বাজারে এর চাহিদা বাড়ছে। স্বাস্থ্যসচেতন শহুরে ক্রেতা, ডায়াবেটিসে আক্রান্ত মানুষ এবং পাখির খাবারের ব্যবসা, তিন দিক থেকেই চাহিদা আসছে। আন্তর্জাতিক বাজারেও মিলেটজাতীয় শস্যের কদর বেড়েছে, বিশেষ করে আন্তর্জাতিক মিলেট বর্ষের পর থেকে। স্বাস্থ্যকর শস্য হিসেবে পরিচিতি পাওয়ায় রপ্তানির সম্ভাবনাও তৈরি হচ্ছে।
দ্বিতীয়ত, উৎপাদন খরচ কম। অল্প বীজ লাগে, সার প্রায় লাগেই না বা সামান্য লাগে, সেচ খুব কম, রোগবালাইও কম। ফলে বিনিয়োগের তুলনায় লাভ ভালো হয় এবং দামও মোটামুটি ভালো পাওয়া যায়। তৃতীয়ত, কাউন এমন জমিতে জন্মায় যেখানে অন্য ফসল ভালো হয় না: চরের বালুমাটি, উঁচু অনুর্বর জমি কিংবা সেচের সুবিধাহীন এলাকা। এসব জমি অনেক সময় খালি পড়ে থাকে; সেখানে কাউন বাড়তি আয়ের পথ খুলে দেয়। চতুর্থত, স্বল্প সময়ে ফসল ঘরে ওঠে, তাই শস্যবিন্যাসে অর্থাৎ একই জমিতে বছরে কয়েকটি ফসলের পালাক্রমে কাউন অনায়াসে জায়গা করে নিতে পারে।
তবে সম্ভাবনার পাশাপাশি বাস্তবতাও মনে রাখা দরকার। কাউনের বাজার এখনও ধান বা গমের মতো সংগঠিত নয়। কৃষক অনেক সময় স্থানীয় ফড়িয়ার কাছে কম দামে বিক্রি করতে বাধ্য হন। দানা থেকে খোসা ছাড়িয়ে চাল করার যন্ত্রও সব জায়গায় নেই। এসব কারণে বড় পরিসরে চাষে নামার আগে আশপাশে কোথায় বিক্রি হবে, কারা কিনবে, তা খোঁজ নিয়ে রাখা জরুরি। কয়েকজন কৃষক মিলে দল বেঁধে উৎপাদন ও বিক্রি করলে দরকষাকষির ক্ষমতা বাড়ে।
অবহেলিত শস্যের ফিরে আসা
কাউনের কাহিনি আসলে আমাদের খাদ্য-ইতিহাসেরই একটি অধ্যায়। সবুজ বিপ্লবের পর উচ্চ ফলনশীল ধান ও গমের বিস্তারে অনেক দেশি শস্য মাঠ থেকে সরে গেছে। কাউন, চিনা, ঘাসজাতীয় আরও কিছু দানা হয়ে উঠেছে প্রান্তিক ফসল। অথচ এই শস্যগুলোই কম পানিতে, কম সারে, কঠিন আবহাওয়ায় টিকে থাকার শিক্ষা দেয়। জলবায়ু পরিবর্তনে যখন খরা ও অনিয়মিত বৃষ্টি বাড়ছে, তখন এমন ফসলের গুরুত্ব নতুন করে বোঝা যাচ্ছে।
বাংলাদেশের কৃষকের জন্য কাউন তাই একটি গুরুত্বপূর্ণ ফসল হয়ে উঠতে পারে। পুষ্টিতে ভরপুর, অল্প খরচে ও অল্প পরিশ্রমে চাষযোগ্য, আর অনুর্বর জমিতেও ফলন দেয়, এমন শস্য খুব বেশি নেই। সঠিক জাত, সময়মতো বোনা, পরিমিত সার আর যত্নের সঙ্গে ফসল তোলা, এই কয়েকটি বিষয় মেনে চললে কাউন কৃষকের ঘরে বাড়তি আয় আর পরিবারের পাতে বাড়তি পুষ্টি, দুটোই এনে দিতে পারে। একসময় যাকে গরিবের খাবার বলে অবহেলা করা হয়েছিল, সেই কাউনই হয়তো আগামী দিনের স্বাস্থ্যকর খাদ্যের তালিকায় সামনের সারিতে জায়গা করে নেবে।
ছবি: কাউন (Setaria italica), চট্টগ্রাম / Moheen Reeyad / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)





মন্তব্য
(০)