সরাসরিবাজারদর
আটা (প্যাকেটজাত)৫৮—আদা - আমদানিকৃত১৬৭—আদা - দেশী১৫৪—আমন চাল - মাঝারি৫৬—আমন চাল - মোটা৪৮—আমন চাল - সরু৭২—আয়োডিনযুক্ত লবণ (প্যাকেটজাত)৩২—কাঁচা মরিচ২১৮—খামারের মুরগী১৬২—খাসী৯০০—চিনি (দেশী)১৩২—ছোলা - গোটা৮৫—ডিম ফার্ম - লাল৪৭—পেঁয়াজ - দেশী৬০—বোরো চাল - মাঝারি৫৫—বোরো চাল - মোটা৪৭—বোরো চাল - সরু৬৬—মাংসঃ– গরু৭২৯—মুগ ডাল১২২—রসুন - আমদানিকৃত১৯২—রসুন - দেশী১৭৩—সয়াবিন তেল১৬৩—
হালনাগাদ ২ অক্টোবর ২০২৬
ঢাকা৩৩°মূলত পরিষ্কারআর্দ্রতা ৫০%বাতাস ৮ কিমি/ঘ

কোয়েল পাখি পালনে দ্বিগুণ লাভের পথ

ছয় থেকে সাত সপ্তাহ বয়সে ডিম পাড়া শুরু, বছরে আড়াইশোর বেশি ডিম, আর একটি মুরগির জায়গায় আট থেকে দশটি পাখি। অল্প পুঁজি, অল্প জায়গা আর সামান্য খাবারে কোয়েল কীভাবে খামারির ঘরে লাভ তোলে, জাত বাছাই থেকে বাচ্চার যত্ন, খাঁচা, খাবার ও মেঝের ব্যবস্থাপনা পর্যন্ত তার পুরো হিসাব।

কোয়েল পাখি পালনে দ্বিগুণ লাভের পথ
লাইভস্টক

বাড়ির বারান্দার এক কোণে তারের জালের একটি খাঁচা, দৈর্ঘ্যে মাত্র চার হাতের মতো। ভেতরে ষাটটি ছোট বাদামি ছিটছিটে পাখি, মুরগির বাচ্চার চেয়েও ছোট। অথচ এই খাঁচা থেকেই প্রতিদিন সকালে উঠে আসে কয়েক ডজন ছোট ছোট ছোপওয়ালা ডিম, যা পাড়ার দোকান থেকে শহরের সুপারশপ পর্যন্ত বিক্রি হয়। কোয়েল পালনের আকর্ষণ ঠিক এখানেই: বড় জমি লাগে না, বড় পুঁজি লাগে না, আর ফল আসে কয়েক সপ্তাহের মধ্যে। প্রায় সব ধরনের আবহাওয়ায় এই পাখি টিকে থাকে, খায় সামান্য, আর এর মাংস সুস্বাদু বলে বাজারে চাহিদা থাকে সারা বছর। হাঁস, মুরগি, কবুতর, টার্কির মতো গৃহপালিত পাখির যে প্রায় এগারো রকম প্রজাতি পোল্ট্রি হিসেবে পালন করা হয়, তার মধ্যে কোয়েলই সবচেয়ে ছোট, আর অল্প পরিশ্রমে পালন করা যায় বলে কৃষক পরিবারের কাছে এটি এক লাভজনক ব্যবসা হয়ে উঠেছে।

কেন কোয়েল: ছয়টি সুবিধা


কোয়েলকে অন্য পোল্ট্রি থেকে আলাদা করে তুলেছে কয়েকটি বৈশিষ্ট্য। খামারিরা যখন এই পাখি নিয়ে কথা বলেন, তখন ঘুরেফিরে এই ছয়টি কথাই আসে।

  • কোয়েল খুব দ্রুত বড় হয়। মাত্র ছয় থেকে সাত সপ্তাহ বয়সে ডিম পাড়া শুরু করে এবং বছরে ২৫০ থেকে ২৬০টি ডিম দেয়।
  • কোয়েলের ডিমে কোলেস্টেরল কম এবং আমিষ বা প্রোটিনের ভাগ বেশি বলে খামারিরা জানান।
  • পাখির নিজের শরীরের ওজনের তুলনায় ডিমের ওজন শতকরা হিসাবে বেশি। অর্থাৎ ছোট শরীর থেকে তুলনামূলক বড় ডিম আসে।
  • একটি মুরগি যতটুকু জায়গা নেয়, সেখানে আট থেকে দশটি কোয়েল রাখা যায়। ডিম দেওয়ার মাত্র ১৭ থেকে ১৮ দিনের মাথায় বাচ্চা ফুটে বের হয়।
  • কোয়েলের রোগবালাই খুব কম এবং খাবারও লাগে অল্প।
  • অল্প পুঁজি খাটিয়ে অল্প দিনের মধ্যে বেশি লাভ তোলা যায়।

এই হিসাবগুলো পাশাপাশি রাখলেই বোঝা যায় কেন ছোট খামারির কাছে কোয়েল এত প্রিয়। মুরগির একটি লেয়ার জাত ডিম দেওয়া শুরু করতে সাধারণত চার থেকে পাঁচ মাস সময় নেয়, সেখানে কোয়েল দেড় মাসের মাথায় আয় দিতে শুরু করে। ফলে যে টাকা খামারে ঢোকে, তা ফিরে আসে দ্রুত, আর ঝুঁকির সময়টাও থাকে ছোট। বাড়ির ছাদ, বারান্দা, উঠানের এক কোণ বা পুরনো গোয়ালঘর, যেখানেই খানিকটা ছায়া আর বাতাস আছে, সেখানেই খাঁচা বসানো যায়।

জাত: জাপানি কোয়েলই ভরসা


পৃথিবীতে বর্তমানে ১৭ থেকে ১৮ জাতের কোয়েল আছে। অন্য পোল্ট্রির মতোই কোয়েলেরও মাংসের জন্য আলাদা জাত আর ডিমের জন্য আলাদা জাত রয়েছে। তবে বাংলাদেশের খামারে যে কোয়েলটি সবচেয়ে বেশি দেখা যায়, সেটি হলো জাপানি কোয়েল, যার বৈজ্ঞানিক নাম কোটারনিক্স জাপোনিকা। এই জাতটি ডিম ও মাংস দুটোর জন্যই পালন করা হয়, আর দেশের আবহাওয়ার সঙ্গে ভালোভাবে মানিয়ে নিয়েছে।

জাপানি কোয়েলের গায়ের রং মূলত বাদামি, তাতে কালো আর সাদাটে ছিট। একটু বড় হলে স্ত্রী ও পুরুষ পাখি আলাদা করে চেনা যায়: পুরুষ পাখির বুকের পালক সাধারণত লালচে বাদামি ও এক রঙা, আর স্ত্রী পাখির বুকে থাকে হালকা রঙের ওপর কালো ছোপ। পাখি কেনার সময় এবং প্রজননের জন্য দল সাজানোর সময় এই পার্থক্য চোখে রাখা কাজে দেয়। নতুন খামারি হলে সরকারি প্রাণিসম্পদ দপ্তর বা পরিচিত ও নির্ভরযোগ্য হ্যাচারি থেকে সুস্থ বাচ্চা বা পাখি কেনাই নিরাপদ, কারণ শুরুতে দুর্বল বা অসুস্থ পাখি এলে পুরো দলেই তার প্রভাব পড়ে।

প্রজনন: কখন পুরুষ পাখি রাখবেন


শুধু খাওয়ার ডিম বিক্রি করাই যদি উদ্দেশ্য হয়, তাহলে খাঁচায় পুরুষ পাখির দরকার নেই। স্ত্রী কোয়েল একাই ডিম পাড়ে, আর কেবল স্ত্রী পাখি পালন করাই বেশি লাভজনক। পুরুষ পাখি লাগে তখনই, যখন ডিম ফুটিয়ে বাচ্চা তোলার পরিকল্পনা থাকে।

বাচ্চা ফোটানোর ডিমে ভালো উর্বরতা পেতে হলে প্রতি তিনটি স্ত্রী কোয়েলের সঙ্গে একটি পুরুষ কোয়েল রাখতে হয়। পুরুষ ও স্ত্রী পাখি একসঙ্গে রাখার চার দিন পর থেকে বাচ্চা ফোটানোর জন্য ডিম সংগ্রহ শুরু করা উচিত, তার আগের ডিমে উর্বরতা কম থাকতে পারে। আবার স্ত্রী পাখি থেকে পুরুষ পাখি আলাদা করে ফেলার পরও তিন দিন পর্যন্ত যে ডিম পাওয়া যায়, তা ফোটানোর কাজে লাগানো যায়।

উপযুক্ত পরিবেশ পেলে একটি স্ত্রী কোয়েল প্রথম বছরে গড়ে ২৫০ থেকে ৩০০টি ডিম পাড়ে। কোয়েলের ডিমের গড় ওজন ১০ থেকে ১২ গ্রাম। ডিম ফোটার সময় লাগে ১৭ থেকে ১৮ দিন, যা মুরগির ডিমের একুশ দিনের চেয়ে কম। ফলে একটি ইনকিউবেটর বা ডিম ফোটানোর যন্ত্র থাকলে অল্প সময়ের মধ্যেই খামারি নিজের বাচ্চা নিজে তুলতে পারেন, বাইরে থেকে বাচ্চা কেনার খরচ বাঁচে।

বাচ্চার প্রথম তিন সপ্তাহ


কোয়েল পালনের সবচেয়ে নাজুক সময় হলো বাচ্চা ফোটার পরের দিনগুলো। সদ্য ফোটা কোয়েলের বাচ্চা খুবই ছোট, ওজন মাত্র ৫ থেকে ৭ গ্রাম, একটি বড় আঙুরের চেয়েও হালকা। এ সময় ব্যবস্থাপনায় যেকোনো ত্রুটি হলে তার ছাপ পড়ে পরে পাখির স্বাভাবিক বৃদ্ধিতে, ডিম উৎপাদনে এবং বেঁচে থাকার হারে। তাই খাবারে প্রয়োজনীয় পুষ্টি আর ঘরে ঠিক তাপমাত্রা বজায় রাখতে হয় খুব সতর্কতার সঙ্গে।

বাচ্চা ফোটার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তাদের ব্রুডিং ঘরে আনতে হয়। ব্রুডিং মানে কৃত্রিম উপায়ে তাপ দিয়ে বাচ্চাকে মায়ের ডানার উষ্ণতার মতো পরিবেশ দেওয়া; সাধারণত বাল্ব বা হিটার দিয়ে এটা করা হয়। ঘরে আনার পর প্রথমে পানির সঙ্গে গ্লুকোজ এবং এমবাভিট ডব্লিউ এস নামের ভিটামিন মিশিয়ে পরপর তিন দিন খেতে দিতে হয়, এরপর খাবার দেওয়া শুরু হয়। এতে দীর্ঘ যাত্রা বা ফোটার ধকল কাটিয়ে বাচ্চা দ্রুত চাঙা হয়।

তাপের হিসাবটা বোঝা জরুরি। কোয়েল পালন বিষয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রসারণ নির্দেশিকাগুলো বলছে, প্রথম সপ্তাহে বাচ্চার কাছাকাছি তাপমাত্রা প্রায় ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস রাখা দরকার, এরপর প্রতি সপ্তাহে সাড়ে তিন ডিগ্রির মতো কমিয়ে আনতে হয়, যতদিন না তিন থেকে চার সপ্তাহ বয়সে বাচ্চার শরীর পুরো পালকে ঢেকে যায়। থার্মোমিটার না থাকলেও বাচ্চার আচরণ দেখে বোঝা যায় তাপ ঠিক আছে কি না। বাচ্চারা যদি তাপের উৎসের চারপাশে ছড়িয়ে থেকে শান্তভাবে কিচিরমিচির করে, তাহলে তাপ ঠিক আছে। আর যদি তীক্ষ্ণ স্বরে ডাকতে থাকে এবং বাল্বের নিচে গাদাগাদি করে জড়ো হয়, তাহলে ঠান্ডা লাগছে। উল্টো দিকে, বাচ্চারা তাপ থেকে দূরে সরে গিয়ে ঠোঁট খুলে হাঁপাতে থাকলে বুঝতে হবে গরম বেশি হয়ে গেছে।

প্রথম সপ্তাহে মেঝেতে খবরের কাগজ বিছিয়ে তার ওপর খাবার ছিটিয়ে দিতে হয়, যাতে ছোট বাচ্চা খুঁটে খুঁটে খেতে শেখে। কাগজটি প্রতিদিন বদলাতে হবে, কারণ ভেজা ও নোংরা কাগজ থেকেই রোগ ছড়ায়। এক সপ্তাহ পর থেকে ছোট খাবার পাত্র বা চ্যাপ্টা ট্রে ব্যবহার করা যায়। পানির পাত্রও এমন হতে হবে যাতে ছোট বাচ্চা তাতে পড়ে ডুবে না যায়; অগভীর পাত্রে ছোট নুড়ি বা মার্বেল রেখে দিলে এই ঝুঁকি কমে।

খাঁচায় কোয়েল: মাপজোখের হিসাব


কোয়েল মেঝেতে লিটারের ওপরেও পালন করা যায়, তবে জায়গা কম থাকলে খাঁচাই সবচেয়ে সুবিধাজনক। খাঁচায় পরিষ্কার রাখা, ডিম তোলা আর পাখি গোনা অল্প পরিশ্রমে হয়, আর একটির ওপর আরেকটি খাঁচা বসিয়ে কয়েক তলা করে ফেলা যায়।

ষাটটি বয়স্ক কোয়েলের জন্য একটি খাঁচার মাপ হবে ১২০ সেন্টিমিটার লম্বা, ৬০ সেন্টিমিটার চওড়া এবং ৩০ সেন্টিমিটার উঁচু। খাঁচার মেঝের জাল হবে ১৬ থেকে ১৮ গেজের তারের। গেজ হলো তারের পুরুত্বের মাপ; সংখ্যা যত কম, তার তত মোটা। তিন সপ্তাহ বয়স পর্যন্ত বাচ্চার খাঁচার মেঝের জালের ফাঁক হবে ৩ মিলিমিটার, যাতে ছোট পা আটকে না যায়। বয়স্ক কোয়েলের খাঁচায় এই ফাঁক হবে ৫ মিলিমিটার।

খাঁচার দুই পাশে বাইরে থেকে পাত্র লাগিয়ে দিতে হয়: এক পাশে খাবারের পাত্র, অন্য পাশে পানির পাত্র। এতে পাখি মাথা বের করে খায় ও পানি পান করে, কিন্তু পাত্রে পা দিয়ে খাবার নষ্ট করতে পারে না, আবার খামারিকেও বারবার খাঁচা খুলতে হয় না। তিন সপ্তাহ বয়স পর্যন্ত ষাটটি বাচ্চার জন্য প্রায় ৩ বর্গফুট জায়গা লাগে, আর খাঁচার উচ্চতা হবে ২৫ সেন্টিমিটার বা ১০ ইঞ্চি।

কোয়েল চমকে গেলে সোজা ওপরের দিকে লাফ দেয়। এ কারণেই খাঁচার উচ্চতা বেশি রাখা হয় না; নিচু খাঁচায় লাফ দিয়ে মাথায় বড় আঘাত পাওয়ার সুযোগ কম থাকে। খাঁচার নিচে একটি ট্রে রাখলে বিষ্ঠা জালের ফাঁক দিয়ে তাতে পড়ে, পাখির পায়ে লাগে না। এই ট্রে প্রতিদিন বা অন্তত একদিন পরপর বের করে পরিষ্কার করলে খামারে দুর্গন্ধ থাকে না, মাছির উপদ্রবও কমে। কয়েক তলা খাঁচা হলে প্রতিটি তলার নিচেই আলাদা ট্রে দিতে হয়, নইলে ওপরের তলার বিষ্ঠা নিচের পাখির গায়ে পড়ে। খাঁচার মেঝে সামান্য ঢালু করে বানালে পাড়া ডিম গড়িয়ে খাঁচার বাইরের দিকে একটি খাঁজে এসে জমা হয়; তখন খাঁচা না খুলেই ডিম তোলা যায় এবং পাখির পায়ের চাপে ডিম ভাঙার বা নোংরা হওয়ার ঝুঁকিও কমে। ডিম দিনে অন্তত একবার, পারলে দুবার তুলে ঠান্ডা ও ছায়াযুক্ত জায়গায় রাখা ভালো।

খাঁচা রাখার জায়গায় যেন সরাসরি বৃষ্টি বা কড়া রোদ না পড়ে, অথচ বাতাস চলাচল করে, সেটা নিশ্চিত করতে হবে। বিড়াল, ইঁদুর, বেজি ও সাপ কোয়েলের বড় শত্রু, তাই রাতে খাঁচা ঘরের ভেতরে বা সুরক্ষিত জায়গায় রাখাই ভালো।

খাবার ও পানি: ক্যালসিয়ামের হিসাবটাই আসল


কোয়েলের খরচের সবচেয়ে বড় অংশ যায় খাবারে, তাই এখানে হিসাব ঠিক রাখলেই লাভ বাড়ে। ডিম পাড়া কোয়েলের প্রতি কেজি খাবারে ২.৫ থেকে ৩ শতাংশ ক্যালসিয়াম থাকতে হবে। ক্যালসিয়াম দিয়েই ডিমের খোসা তৈরি হয়; এর ঘাটতি হলে খোসা পাতলা হয়, ডিম ভাঙে, আর পাখির নিজের হাড় থেকে ক্যালসিয়াম টেনে নেওয়ায় পাখি দুর্বল হয়ে পড়ে। গরমের সময় পাখি খাবার কম খায়, তাই তখন ডিম উৎপাদন ধরে রাখতে খাবারে ক্যালসিয়ামের মাত্রা ৩.৫ শতাংশে তুলতে হয়।

একটি বয়স্ক কোয়েলকে দিনে ২০ থেকে ২৫ গ্রাম খাবার দিতে হয়, সকালে ও বিকালে দুই ভাগে, প্রতিবার খাবারের পাত্র ভালো করে পরিষ্কার করে। বাচ্চা অবস্থা থেকে এই পরিমাণে পৌঁছাতে হয় ধাপে ধাপে: প্রথম সপ্তাহে মাথাপিছু দিনে ৫ গ্রাম দিয়ে শুরু, এরপর প্রতি সপ্তাহে ৫ গ্রাম করে বাড়িয়ে ২০ থেকে ২৫ গ্রামে গিয়ে থামতে হবে এবং সেখানেই নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। বেশি খাবার দিলে তা ছড়িয়ে নষ্ট হয় আর পাখি অতিরিক্ত মোটা হয়ে ডিম কমিয়ে দিতে পারে।

খাবার পাত্রে জায়গাও মাপা দরকার। প্রতিটি বয়স্ক কোয়েলের জন্য পাত্রের ধারে ১.২৫ থেকে ২.৫ সেন্টিমিটার, অর্থাৎ আধা ইঞ্চি থেকে এক ইঞ্চি জায়গা থাকতে হবে, যাতে সব পাখি একসঙ্গে খেতে পারে এবং দুর্বল পাখিগুলো পিছিয়ে না পড়ে। খাবার পানি সবসময় পরিষ্কার হতে হবে, আর যে পাত্রে পানি দেওয়া হয়, সেটি প্রতিদিন ধুয়ে নিতে হবে। নোংরা পানিই পোল্ট্রিতে পেটের অসুখের সবচেয়ে সাধারণ উৎস।

বাজারে কোয়েলের জন্য আলাদা তৈরি খাবার পাওয়া যায়, অনেকে ব্রয়লার বা লেয়ার মুরগির খাবারও ব্যবহার করেন। কোন খাবার দেওয়া হচ্ছে, তার প্যাকেটে আমিষ ও ক্যালসিয়ামের মাত্রা লেখা থাকে কি না, সেটা দেখে নেওয়া ভালো। সন্দেহ থাকলে উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তার কাছে পরামর্শ নেওয়া যায়।

লিটার ব্যবস্থাপনা: শুকনো মেঝেই সুস্থ খামার


যারা খাঁচার বদলে ঘরের মেঝেতে কোয়েল পালন করেন, তাদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় লিটার। লিটার হলো মেঝেতে বিছিয়ে দেওয়া শুকনো উপকরণ, যা পাখির বিষ্ঠা আর আর্দ্রতা শুষে নেয়। ধানের তুষ, বালি, ছাই, কাঠের গুঁড়া প্রভৃতি কোয়েলের লিটার হিসেবে ব্যবহার করা যায়।

মেঝেতে ডিপ লিটার পদ্ধতি অনুসরণ করাই ভালো। এই পদ্ধতিতে প্রথমেই ৫ থেকে ৬ ইঞ্চি পুরু করে তুষ বিছিয়ে দেওয়া হয় এবং প্রতিদিন বদলানোর বদলে ওপরের স্তর নেড়েচেড়ে শুকনো রাখা হয়। খেয়াল রাখতে হবে লিটার যেন কখনো ভিজে না যায়; পানির পাত্র উল্টে গেলে বা ছাদ চুইয়ে পানি পড়লে সেই অংশ সঙ্গে সঙ্গে তুলে ফেলে নতুন তুষ দিতে হবে। ভেজা লিটার থেকে দুর্গন্ধ আর অ্যামোনিয়া গ্যাস তৈরি হয়, যা পাখির চোখ ও শ্বাসনালির ক্ষতি করে।

অবস্থা বুঝে লিটার বদলানো আবশ্যক, যাতে কোনোরকম অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ তৈরি না হয়। সাধারণভাবে শীতকালে লিটার বদলানো ও নতুন লিটার বিছানো হয়। অন্য ঋতুতে লিটার বদলাতে হলে নতুন লিটারের সঙ্গে শতকরা ১ থেকে ২ ভাগ কলিচুন মিশিয়ে দিতে হয়, যাতে লিটার শুকনো ও জীবাণুমুক্ত থাকে। পুরনো লিটার ফেলে না দিয়ে জৈব সার হিসেবে সবজি খেতে ব্যবহার করা যায়।

রোগ কম, তবু সাবধানতা দরকার


কোয়েলের রোগবালাই তুলনামূলক কম, এটিই এই পাখির বড় সুবিধা। কিন্তু রোগ কম মানে রোগ নেই, এমন নয়। বেশির ভাগ সমস্যা শুরু হয় অপরিষ্কার খাঁচা, ভেজা লিটার, নোংরা পানি আর গাদাগাদি করে পাখি রাখা থেকে। তাই খাঁচার নিচের বিষ্ঠা নিয়মিত সরাতে হবে, খাঁচায় পাখির সংখ্যা মাপমতো রাখতে হবে, আর বাইরে থেকে নতুন পাখি আনলে কয়েক দিন আলাদা রেখে দেখে নিতে হবে সেগুলো সুস্থ কি না।

কোনো পাখি ঝিমাতে থাকলে, খাওয়া বন্ধ করলে বা পাতলা পায়খানা করলে তাকে দ্রুত দল থেকে আলাদা করা উচিত। পাখি মারা গেলে বা একসঙ্গে কয়েকটি অসুস্থ হলে নিজে নিজে ওষুধ না দিয়ে উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তরের পশু চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া নিরাপদ। খামারে ঢোকার আগে হাত ধোয়া আর বাইরের লোকজনকে খাঁচার কাছে কম যেতে দেওয়ার মতো ছোট অভ্যাসও রোগ ঠেকাতে অনেক কাজ করে।

কোয়েল পালনের গুরুত্ব বাংলাদেশে


কোয়েল পালন এখন বাংলাদেশের প্রাণিসম্পদ খাতের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ হয়ে উঠেছে। অল্প জায়গা, কম খরচ আর দ্রুত উৎপাদন, এই তিন কারণে এর জনপ্রিয়তা বাড়ছে। কেন এটি ছোট খামারির উপযোগী, তা কয়েকটি দিক থেকে দেখা যায়।

  • অল্প জায়গায় পালন: কোয়েল পালনে বেশি জায়গা লাগে না। ছোট খামার বা বাড়ির আঙিনাতেও অল্প পরিশ্রমে পালন করা যায়।
  • খরচ কম: অন্যান্য পোল্ট্রির তুলনায় কোয়েল পালনের খরচ অনেক কম। খাবার ও ব্যবস্থাপনা দুটোই সাশ্রয়ী।
  • দ্রুত উৎপাদন: মাত্র ছয় থেকে সাত সপ্তাহে ডিম পাড়া শুরু হয়, বাচ্চাও বড় হয় দ্রুত।
  • উচ্চ উৎপাদন হার: একটি কোয়েল বছরে প্রায় ২৫০ থেকে ৩০০টি ডিম পাড়ে।
  • আয়ের সুযোগ: কোয়েলের মাংস ও ডিমের চাহিদা ক্রমশ বাড়ছে, যা কৃষকের জন্য লাভজনক ব্যবসার সুযোগ তৈরি করছে।
  • প্রতিকূল আবহাওয়ায় টিকে থাকা: কোয়েল নানা প্রাকৃতিক প্রতিকূলতার সঙ্গে ভালোভাবে মানিয়ে নিতে পারে।

গ্রামের নারীদের জন্য এই পাখি পালন বাড়তি আয়ের একটি বাস্তব উপায়, কারণ ঘরের কাজের ফাঁকে দিনে দুবার খাবার ও পানি দেওয়া আর ডিম তোলাই মূল কাজ। বেকার তরুণেরাও অল্প পুঁজিতে শুরু করে ধীরে ধীরে খাঁচার সংখ্যা বাড়াতে পারেন। তবে যেকোনো ব্যবসার মতোই এখানে বাজার আগে চিনে নেওয়া জরুরি: আশপাশের দোকান, হোটেল, রেস্তোরাঁ বা পাইকার কারা ডিম ও মাংস কিনবেন, তা খোঁজ নিয়ে তারপর উৎপাদনের পরিমাণ ঠিক করা বুদ্ধিমানের কাজ।

পাতে কোয়েল: ডিম ও মাংসের পুষ্টিগুণ


কোয়েল পালন শুধু লাভজনক উদ্যোগই নয়, এর ডিম ও মাংস মানুষের পুষ্টি ও স্বাস্থ্যের জন্যও উপকারী। কোয়েলের মাংস উচ্চমানের প্রোটিনের একটি উৎস, যা শরীরের পেশি গঠনে সহায়তা করে। এর মাংসে চর্বি ও ক্যালরির পরিমাণ কম, তাই যারা চর্বি কম খেতে চান, তাদের খাদ্যতালিকায় এটি জায়গা পেতে পারে। কোয়েলের মাংসে ভিটামিন বি৬, বি১২, জিংক, সেলেনিয়াম ও আয়রন রয়েছে।

এসব ভিটামিন ও খনিজ শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ধরে রাখতে ভূমিকা রাখে। মাংসে থাকা ক্যালসিয়াম ও ফসফরাস হাড়ের জন্য দরকারি, আর প্রোটিন ও ভিটামিনে সমৃদ্ধ হওয়ায় এটি শরীরে শক্তি জোগায় ও ক্লান্তি কমাতে সাহায্য করে। চর্বি কম থাকায় হৃদ্‌যন্ত্রের ওপর চাপও কম পড়ে বলে পুষ্টিবিদেরা চর্বিহীন মাংসকে পছন্দ করেন। তবে ডায়াবেটিস, হৃদ্‌রোগ বা অন্য কোনো দীর্ঘমেয়াদি অসুখ থাকলে খাদ্যতালিকা বদলানোর আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই সঠিক পথ।

কোয়েলের ডিম আকারে ছোট হলেও একটি পূর্ণাঙ্গ খাবার। ছোট বলে শিশুদের টিফিনে দুটি বা তিনটি সেদ্ধ ডিম দেওয়া যায়, আর দামও তুলনামূলক কম। ডিমের খোসায় বাদামি ও কালো ছোপ থাকে, যা দেখে অনেকেই প্রথমবার অবাক হন, কিন্তু এটিই এই ডিমের স্বাভাবিক চেহারা।

শুরু করার আগে যে হিসাবগুলো মাথায় রাখা দরকার


যিনি প্রথমবার কোয়েল পালন শুরু করতে চান, তার জন্য ছোট পরিসরে শুরু করাই ভালো। একটি বা দুটি খাঁচা, ষাট থেকে একশো কুড়িটি পাখি দিয়ে শুরু করলে কয়েক মাসের মধ্যেই খাবারের খরচ, ডিমের সংখ্যা আর বাজারদরের একটা নিজস্ব হিসাব দাঁড়িয়ে যায়। সেই অভিজ্ঞতার ওপর ভর করে তারপর খামার বড় করা নিরাপদ।

প্রতিদিনের একটি খাতা রাখা খুব কাজের অভ্যাস: কত খাবার গেল, কতটি ডিম এল, কতটি পাখি অসুস্থ হলো বা মারা গেল, আর কত টাকার ডিম ও পাখি বিক্রি হলো। এই খাতাই বলে দেবে খামার আসলে লাভে চলছে কি না, আর কোথায় খরচ কমানো যায়। ডিমের উৎপাদন হঠাৎ কমে গেলে খাতা দেখে বোঝা যায় সমস্যাটা খাবারে, তাপমাত্রায়, নাকি অসুখে।

প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের উপজেলা অফিসগুলো পোল্ট্রি পালন নিয়ে প্রশিক্ষণ ও পরামর্শ দেয়। নতুন খামারি সেখান থেকে টিকা, খাবার ও রোগ ব্যবস্থাপনার প্রাথমিক ধারণা নিতে পারেন। অল্প জায়গা, অল্প পুঁজি আর নিয়মিত যত্ন, এই তিনটি মিলিয়ে কোয়েল ছোট খামারির জন্য দ্রুত আয়ের একটি বাস্তব পথ, আর এর ডিম ও মাংস পরিবারের পুষ্টিতেও যোগ করে বাড়তি মূল্য। বাংলাদেশের কৃষি অর্থনীতিতে এই ছোট পাখির ভূমিকা তাই মোটেই ছোট নয়।

ছবি: জাপানিজ কোয়েল (Coturnix japonica), Kirill Tsukanov / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC0)

তানিয়া চৌধুরীদা এগ্রো নিউজ

লাইভস্টক

সম্পর্কিত খবর

এগ্রোটেক

নিজে চলে খামারঘর ধোয়া-জীবাণুমুক্ত করবে রোবট, কানাডার শূকর খামারে আসছে

নেদারল্যান্ডসের এমএস শিপারসের স্মার্ট ক্লিনিং রোবট একবারে ফোম দেওয়া, উচ্চচাপে ধোয়া ও জীবাণুনাশ করে। থ্রিডি লিডার সেন্সরে পথ চিনে নেয় বলে আগে থেকে প্রোগ্রাম করতে হয় না।

Farms.com২ অক্টোবর ২০২৬২ মিনিটের পড়া
লাইভস্টক

ব্লুটাংয়ের মাছি বাতাসে ১৫০ কিলোমিটার উড়ে যেতে পারে, টিকা দিতে বললেন আয়ারল্যান্ডের কৃষিমন্ত্রী

ডাবলিন, মিথ, রসকমন, লংফোর্ড ও ওয়াটারফোর্ডে নতুন ব্লুটাং শনাক্তের পর গরু ও ভেড়ার খামারিদের টিকা দিতে আহ্বান জানিয়েছেন মার্টিন হেইডন; টিকার পর জন্মানো বাছুরকেও টিকা ও পরের বছর বুস্টারের পরামর্শ দিয়েছেন।

Agriland২ অক্টোবর ২০২৬২ মিনিটের পড়া
লাইভস্টক

সাইলেজনির্ভর গরুর খাদ্যে ভাজা সয়াবিন দিলে খাবারের দক্ষতা বাড়ে: নেব্রাস্কার গবেষণা

ইউনিভার্সিটি অব নেব্রাস্কা-লিংকনের ৮৪ দিনের পরীক্ষায় ডিস্টিলার্স গ্রেইন খাওয়া বকনা সবচেয়ে বেশি ওজন বাড়িয়েছে, আর ভাজা সয়াবিন খাওয়া বকনা খাবার সবচেয়ে দক্ষভাবে কাজে লাগিয়েছে।

Farms.com২ অক্টোবর ২০২৬২ মিনিটের পড়া

মন্তব্য

(০)