জমির ওপর উঁচু কাঠামোয় সৌর প্যানেল বসিয়ে নিচে চাষ চালিয়ে যাওয়ার প্রযুক্তি, যার নাম এগ্রিভোল্টাইক, বাংলাদেশে খাদ্য ও জ্বালানির জন্য জমির টানাটানি কমাতে পারে বলে মনে করেন কৃষি উন্নয়নকর্মী ও গবেষক শহীদুল ইসলাম এবং বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. চয়ন কুমার সাহা। সমকালে প্রকাশিত এক যৌথ কলামে তাঁরা শেরপুরের নকলায় চালু থাকা একটি ব্যবস্থার মাঠের ফল তুলে ধরেছেন।
সমস্যাটি পরিচিত: দেশে সৌরবিদ্যুতের সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি, কিন্তু খাদ্য উৎপাদনের জন্যই কৃষিজমি কম পড়ছে, তাই প্যানেলের জন্য আলাদা জমি ছাড়া বড় নীতিগত চ্যালেঞ্জ। এগ্রিভোল্টাইক ব্যবস্থায় প্যানেল এমনভাবে বসানো হয় যাতে নিচে বা পাশে চাষ চলে। উৎপাদিত বিদ্যুৎ দিয়ে সেচপাম্প, ফসল শুকানো ও প্রক্রিয়াজাতকরণ, ছোট খাদ্যকল ও গ্রামের অন্যান্য কাজ চালানো যায়, আর দিনের বাড়তি বিদ্যুৎ নেট-মিটারিংয়ে গ্রিডে দিয়ে আয়ও হতে পারে।
লেখকদের তথ্য অনুযায়ী, মাটি বাংলাদেশ ২০২৫ সালের গোড়ায় নকলা উপজেলার মাটি ইকো-ভিলেজে মোট ৩৫.৩ কিলোওয়াট ক্ষমতার দুটি এগ্রিভোল্টাইক ব্যবস্থা বসায়। এর ৮.৮ কিলোওয়াট সেচে এবং ২৬.৫ কিলোওয়াট নিরাপদ খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্রে ব্যবহৃত হচ্ছে; রাতের জন্য ৫.১ কিলোওয়াট-ঘণ্টার ব্যাটারিও আছে। ব্রহ্মপুত্রের চরাঞ্চলের এই গ্রামে বিদ্যালয়, দিবাযত্ন কেন্দ্র ও প্রশিক্ষণকেন্দ্রের বিদ্যুৎও এখান থেকে আসছে।
অধ্যাপক চয়ন কুমার সাহার তত্ত্বাবধানে তিনজন মাস্টার্স শিক্ষার্থী ব্যবস্থাটির কারিগরি কার্যকারিতা মেপেছেন। ২০২৫ সালে এটি ৩৯,২৩৩.১৪ কিলোওয়াট-ঘণ্টা এবং ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুনে ২১,১৪৬.৮০ কিলোওয়াট-ঘণ্টা বিদ্যুৎ দিয়েছে। প্যানেলের নিচে হলুদের ফলন হয়েছে প্রতি বর্গমিটারে ২ কেজি, খোলা মাঠে যা ১.২৫ কেজি। ২০২৫ সালের গ্রীষ্ম ও শীতে বেগুনের ফলনও খোলা মাঠের চেয়ে বেশি ছিল; ২০২৬ সালের গ্রীষ্মে গিমা কলমি ও টমেটো খোলা মাঠের সমান আর শসা প্রায় ৯০.৯১ শতাংশ ফলন দিয়েছে।
২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে নেট-মিটারিং সংযোগ পাওয়ার পর মার্চ থেকে ব্যবস্থাটি গ্রিডে যুক্ত। মাটি বাংলাদেশের হিসাবে এরপর প্রায় ৭.৮৮ টন কার্বন ডাই-অক্সাইড নিঃসরণ এড়ানো গেছে। তবে লেখকেরা সতর্ক করেছেন, এই ফল দেশের সব ফসল, মাটি ও জলবায়ুতে সরাসরি খাটবে না; প্যানেলের বিন্যাস, উচ্চতা ও ছায়ার মাত্রা ঠিক করতে বিভিন্ন অঞ্চলে দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা দরকার।
বাধাও কম নয়। প্যানেল, ইনভার্টার, ব্যাটারি ও কাঠামোর প্রাথমিক খরচ সাধারণ কৃষকের জন্য বড় বোঝা, তাই সমবায় বা উৎপাদক সংগঠনের মাধ্যমে যৌথভাবে বসানোকে বেশি কার্যকর মনে করেন লেখকেরা। নকলার ব্যবস্থাটির নেট-মিটারিং সংযোগ পেতে প্রায় ১০ মাস লেগেছে, সংযোগের পরও বিলিং নিয়ে জটিলতা হয়েছে। তাঁদের সুপারিশ: বিভিন্ন কৃষি-জলবায়ু অঞ্চলে গবেষণা, বিশ্ববিদ্যালয়, বিদ্যুৎ সংস্থা, বেসরকারি খাত ও কৃষক সমবায়কে নিয়ে পরীক্ষামূলক প্রকল্প বাড়ানো। মতামত লেখকদের নিজস্ব।
ছবি: UC Davis College of Engineering / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY 2.0)
সূত্র: সমকাল





মন্তব্য
(০)