ভোরের আলো ফোটার আগেই দেশের লাখো গ্রামে একই দৃশ্য। কেউ কাঁধে লাঙল বা হাতে নিড়ানি নিয়ে জমির আলে হাঁটছেন, কেউ সেচের পাম্প চালু করছেন, কেউ পুকুরে জাল ফেলছেন, কেউ গোয়াল থেকে গরু বের করছেন। শহরের মানুষ যখন ঘুম থেকে ওঠেন, তখন তাদের নাশতার চাল, ডাল, সবজি, ডিম আর দুধের যাত্রা শুরু হয়ে গেছে এই মাঠ থেকেই। কৃষি পৃথিবীর প্রাচীনতম পেশাগুলোর একটি, আর মানুষের মৌলিক চাহিদা খাদ্য, বস্ত্র ও আশ্রয় পূরণে এর ভূমিকা আজও সবচেয়ে বড়। বাংলাদেশের মতো কৃষিনির্ভর দেশে কৃষি কেবল খাবারের জোগান দেয় না; এটি অর্থনৈতিক উন্নয়ন, কর্মসংস্থান আর পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষারও ভিত্তি।
কৃষি কেন এত গুরুত্বপূর্ণ
একটি দেশের অর্থনীতি, সমাজ ও পরিবেশ, তিনটিরই অন্যতম প্রধান ভিত্তি কৃষি। খাদ্য উৎপাদন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি আর জাতীয় উন্নয়নে এর ভূমিকা বাংলাদেশে অপরিসীম। কারখানা আর সেবা খাত যত বড়ই হোক, দেশের মানুষের পেট ভরানোর দায়িত্ব শেষ পর্যন্ত মাঠের ওপরই থাকে। কৃষির এই গুরুত্ব অন্তত আটটি দিক থেকে দেখা যায়।
এক: খাদ্য নিরাপত্তা
কৃষি মানুষের সবচেয়ে মৌলিক চাহিদা, খাদ্য, সরবরাহ করে। ধান, গম, ভুট্টা, শাকসবজি আর ফলমূলের উৎপাদনই খাদ্য সংকট মোকাবিলার প্রথম ঢাল। বাংলাদেশ এখন বিশ্বের শীর্ষ ধান উৎপাদনকারী দেশগুলোর একটি; আন্তর্জাতিক হিসাবে দেশটি ধান উৎপাদনে তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে। স্বাধীনতার পর যে দেশকে নিয়মিত খাদ্য আমদানির ওপর নির্ভর করতে হতো, সেই দেশ আজ জনসংখ্যা কয়েক গুণ বাড়ার পরও প্রধান খাদ্যশস্যে অনেকটাই নিজের পায়ে দাঁড়িয়েছে। এর পেছনে আছে বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের (ব্রি) উদ্ভাবিত উচ্চফলনশীল জাত, সেচের বিস্তার আর কৃষকের পরিশ্রম।
তবে খাদ্য নিরাপত্তা শুধু পেট ভরানোর প্রশ্ন নয়, পুষ্টিরও প্রশ্ন। কেবল ভাত খেয়ে শরীরের সব চাহিদা মেটে না; দরকার ডাল, শাকসবজি, ফল, মাছ, ডিম ও দুধ। চালে দেশ যতটা এগিয়েছে, ডাল ও ভোজ্যতেলে ততটা নয়; এসবের বড় অংশ এখনো আমদানি করতে হয়। তাই কৃষির পরের ধাপের লক্ষ্য হলো ফসলে বৈচিত্র্য আনা, যাতে একই জমি থেকে ধানের পাশাপাশি ডাল, তেলবীজ ও সবজিও আসে, আর প্রতিটি পরিবারের থালায় পুষ্টির ভারসাম্য ফেরে। বসতবাড়ির আঙিনায় সবজি বাগান, পুকুরে মাছ আর উঠানে কয়েকটি হাঁস-মুরগি, এই ছোট আয়োজনগুলো গ্রামের পরিবারের পুষ্টিতে বড় ভূমিকা রাখে।
দুই: অর্থনীতিতে অবদান
দেশের মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপির একটি বড় অংশ আসে কৃষি খাত থেকে। জিডিপি হলো এক বছরে দেশে উৎপাদিত সব পণ্য ও সেবার মোট মূল্য। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সাময়িক হিসাব অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে শস্য, প্রাণিসম্পদ, বন ও মৎস্য মিলিয়ে বৃহত্তর কৃষি খাতের অবদান ছিল জিডিপির ১১.০২ শতাংশ। শতাংশের হিসাবে ভাগটি আগের চেয়ে ছোট মনে হতে পারে, কারণ শিল্প ও সেবা খাত দ্রুত বড় হচ্ছে। কিন্তু টাকার অঙ্কে কৃষির উৎপাদন বাড়ছেই, আর পোশাক কারখানা থেকে খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ পর্যন্ত বহু শিল্প দাঁড়িয়ে আছে কৃষির ওপর। কৃষিপণ্য রপ্তানি দেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনেও ভূমিকা রাখে।
তিন: কর্মসংস্থান
দেশের সবচেয়ে বেশি মানুষ কাজ করেন কৃষিতে। বিবিএসের শ্রমশক্তি জরিপ ২০২২ অনুযায়ী, দেশের মোট কর্মসংস্থানের ৪৫.৩৩ শতাংশই কৃষি খাতে, যা ২০১৬-১৭ সালের ৪০.৬ শতাংশ থেকে বেড়েছে। অর্থাৎ প্রায় প্রতি দুজন কর্মজীবী মানুষের একজন সরাসরি মাঠ, খামার, পুকুর বা বাগানের সঙ্গে যুক্ত। এর বাইরে কৃষি থেকে পাওয়া কাঁচামাল ব্যবহার করে শিল্প খাতেও বিপুল কর্মসংস্থান তৈরি হয়: চালকল, পাটকল, চা কারখানা, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, পরিবহন আর হাটবাজারের ব্যবসা।
মাঠের এই শ্রমশক্তির বড় একটি অংশ নারী, যদিও তাদের কাজ প্রায়ই চোখের আড়ালে থাকে। একই জরিপ অনুযায়ী, ২০২২ সালে দেশে প্রায় ১ কোটি ৮৪ লাখ নারী কৃষি খাতে কাজ করছিলেন, যা এই খাতের মোট শ্রমশক্তির ৫৮ শতাংশ। কর্মজীবী নারীদের ৭৪ শতাংশই যুক্ত ছিলেন কৃষিতে। বীজ বাছাই ও সংরক্ষণ, চারা তৈরি, ধান মাড়াই ও শুকানো, বসতবাড়ির আঙিনায় সবজি চাষ, হাঁস-মুরগি ও গরু-ছাগল পালন, এসব কাজের বড় ভার গ্রামের নারীরাই বহন করেন। পুরুষেরা কাজের খোঁজে শহরে বা বিদেশে গেলে সংসারের জমি দেখাশোনার দায়িত্বও অনেক সময় তাদের কাঁধে এসে পড়ে। তাই কৃষি প্রশিক্ষণ, ঋণ আর বাজারে প্রবেশের সুযোগ যখন নারী কৃষকের কাছে পৌঁছায়, তখন তার সুফল পড়ে পুরো পরিবারে।
চার: দারিদ্র্য বিমোচন
দেশের দরিদ্র মানুষের বড় অংশ থাকেন গ্রামে, আর তাদের আয়ের প্রধান উৎস কৃষি। তাই কৃষির উন্নয়ন মানেই গ্রামীণ পরিবারের আয় বাড়া। একজন কৃষক যখন ভালো বীজ, সময়মতো সার ও সেচ পেয়ে ফলন বাড়াতে পারেন, আর ফসলের ন্যায্য দাম পান, তখন তার সংসারে শিক্ষা, চিকিৎসা ও পুষ্টির জন্য বাড়তি টাকা আসে। দারিদ্র্য কমানোর সবচেয়ে কার্যকর পথগুলোর একটি তাই কৃষির উন্নয়ন।
পাঁচ: শিল্পের কাঁচামাল
পাট, তুলা, আখ আর তেলবীজের মতো কৃষিপণ্য শিল্প খাতের কাঁচামাল জোগায়। এসব পণ্যকে ঘিরেই নতুন শিল্প গড়ে ওঠে। পাট থেকে বস্তা, সুতা ও পরিবেশবান্ধব ব্যাগ, আখ থেকে চিনি ও গুড়, তেলবীজ থেকে ভোজ্যতেল, চা পাতা থেকে প্যাকেটজাত চা, সবই কৃষির হাত ধরে। বিশ্বে পাট উৎপাদনে বাংলাদেশ দ্বিতীয়, যা এই শিল্পের শক্ত ভিত্তি।
ছয়: পরিবেশের ভারসাম্য
সঠিক কৃষিচর্চা মাটির উর্বরতা রক্ষা করে এবং জীববৈচিত্র্য টিকিয়ে রাখতে সাহায্য করে। শস্য পর্যায় বা ফসল ঘুরিয়ে চাষ, জৈব সারের ব্যবহার আর গাছপালা লাগানো মাটিকে সুস্থ রাখে। জৈব কৃষি আর সেচব্যবস্থার উন্নতি পরিবেশবান্ধব উন্নয়নের পথ তৈরি করে। উল্টো দিকে, ভুল কৃষিচর্চা, যেমন মাত্রাতিরিক্ত রাসায়নিক আর ভূগর্ভস্থ পানির অপচয়, পরিবেশের ক্ষতিও করে। তাই কৃষি পরিবেশের বন্ধু হবে না শত্রু, তা নির্ভর করে চাষের ধরনের ওপর।
সাত: রপ্তানি ও বৈদেশিক মুদ্রা
পাট ও পাটজাত পণ্য, চা, সবজি, ফল, হিমায়িত মাছ আর চিংড়িসহ নানা কৃষিপণ্য রপ্তানি করে বাংলাদেশ বৈদেশিক মুদ্রা আয় করে। চা খাতের কথাই ধরা যাক: বাংলাদেশ চা বোর্ডের হিসাবে ২০২৩ সালে দেশে রেকর্ড ১০ কোটি ২৯ লাখ কেজি চা উৎপাদিত হয়েছে, যা দেশের চা শিল্পের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। মাছের ক্ষেত্রেও সাফল্য চোখে পড়ার মতো; জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) প্রতিবেদনে নদী, খাল, বিল ও হাওরের মতো উন্মুক্ত জলাশয় থেকে মাছ আহরণে বাংলাদেশ বিশ্বে দ্বিতীয় অবস্থানে উঠে এসেছে।
আট: সংস্কৃতি ও জীবনযাত্রা
কৃষি আমাদের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ। বাংলা সনের মাসগুলো চলে ফসলের ঋতু ধরে, নবান্ন উৎসব আসে আমন ধান ঘরে তোলার আনন্দে, পহেলা বৈশাখের হালখাতার শিকড়ও কৃষিজীবী সমাজে। গ্রামের গান, প্রবাদ, মেলা, খাবারের রীতি, সবখানেই মাঠের ছাপ। দেশের গ্রামীণ সমাজ আজও কৃষির ওপর নির্ভরশীল, আর শহরে থাকা মানুষের শিকড়ও অনেক ক্ষেত্রে কোনো না কোনো কৃষক পরিবারে।
কৃষির নানা ধরন
কৃষি মূলত মানুষের খাদ্য, পোশাক ও জীবিকার উৎস। উৎপাদনের পদ্ধতি, পরিবেশ আর অঞ্চলভেদে এটি নানা ধরনের হয়ে থাকে। বাংলাদেশের মাঠে এর প্রায় সবগুলোরই দেখা মেলে।
ফসলি কৃষি হলো কৃষির সবচেয়ে প্রচলিত ধরন, যেখানে প্রধানত নানা ধরনের শস্য উৎপাদন করা হয়। ধান, গম ও ভুট্টা প্রধান খাদ্যশস্য; ডাল ও তেলবীজ আমিষ ও চর্বির উৎস; শাকসবজি ও ফলমূল পুষ্টির জন্য।
বাণিজ্যিক কৃষিতে পণ্য উৎপাদন করা হয় ব্যবসার উদ্দেশ্যে, নিজের খাওয়ার জন্য নয়। চা, পাট ও তুলা শিল্পের কাঁচামাল; আখ ও তামাক অর্থকরী ফসল। সিলেট ও চট্টগ্রামের চা বাগান কিংবা ফরিদপুর ও জামালপুর অঞ্চলের পাটখেত এর পরিচিত উদাহরণ।
জৈব কৃষিতে রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের বদলে প্রাকৃতিক উপাদান, যেমন কম্পোস্ট, কেঁচো সার ও উদ্ভিজ্জ বালাইনাশক ব্যবহার করা হয়। এটি পরিবেশবান্ধব এবং স্বাস্থ্যসম্মত খাদ্য উৎপাদনের পথ। শহরের ক্রেতাদের মধ্যে বিষমুক্ত সবজির চাহিদা বাড়ায় এই ধরনের চাষও বাড়ছে।
সেচনির্ভর কৃষি চলে যেখানে প্রাকৃতিক বৃষ্টি কম, সেখানে সেচের মাধ্যমে। ধান, গম ও অন্যান্য সেচনির্ভর ফসল এর আওতায় পড়ে। বাংলাদেশে শুকনো মৌসুমের বোরো ধান এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ; গভীর ও অগভীর নলকূপ আর খালের পানি ছাড়া এই ফসল হয় না।
শুষ্ক কৃষি প্রচলিত সেসব অঞ্চলে, যেখানে বৃষ্টিপাত কম এবং পানির অভাব। বাজরা ও জোয়ারের মতো অল্প পানিতে টিকে থাকা ফসল এখানে চাষ হয়। দেশের উত্তর-পশ্চিমের বরেন্দ্র অঞ্চলে পানির সংকট বাড়ায় কম পানির ফসলের দিকে ঝোঁকার আলোচনাও জোরালো হচ্ছে।
মিশ্র কৃষিতে একই খামারে একসঙ্গে ফসল উৎপাদন, পশুপালন আর মাছ চাষ করা হয়। এতে এক খাতের বর্জ্য আরেক খাতের সম্পদ হয়ে ওঠে: গরুর গোবর জমির সার হয়, ফসলের খড় গরুর খাবার হয়। এটি বেশি লাভজনক এবং বহুমুখী পণ্য উৎপাদনের সুবিধা দেয়।
পশুপালন ও হাঁস-মুরগি পালনের মাধ্যমে গরু, ছাগল, মহিষ ও হাঁস-মুরগি থেকে দুধ, ডিম ও মাংস উৎপাদন হয়। পুষ্টি ও আয় দুটোই বাড়াতে এর গুরুত্ব অনেক।
মৎস্য চাষ মানে পুকুর, নদী বা অন্য জলাশয়ে মাছ উৎপাদন। মাছ দেশের মানুষের প্রধান আমিষের উৎস, আর এর অর্থনৈতিক গুরুত্বও বিশাল; "মাছে-ভাতে বাঙালি" কথাটি এমনি আসেনি।
বনায়ন ও কৃষি বনায়নের মাধ্যমে কাঠ, ফলমূল পাওয়া যায় এবং পরিবেশ রক্ষা হয়। গাছ বাতাস থেকে কার্বন ডাই-অক্সাইড শুষে নিয়ে কার্বন নিঃসরণের প্রভাব কমায়। জমির আইলে বা বসতবাড়ির চারপাশে ফলের গাছ লাগানো কৃষি বনায়নেরই একটি রূপ।
টেকসই কৃষি পরিবেশ ও অর্থনীতির ভারসাম্য রক্ষা করে দীর্ঘমেয়াদে উৎপাদনশীলতা ধরে রাখার চেষ্টা। আজকের ফলন বাড়াতে গিয়ে যেন আগামীকালের মাটি, পানি আর জীববৈচিত্র্য ফুরিয়ে না যায়, এটাই এর মূল কথা।
বাংলাদেশের কৃষিতে এই সব ধরনের চাষাবাদের মিশেল রয়েছে। অঞ্চলভেদে ধরন বদলায়: হাওরে একটি বোরো ফসলই ভরসা, উপকূলে লবণসহিষ্ণু ধান আর ঘের, পাহাড়ে ফলের বাগান, চরে বাদাম আর মিষ্টি কুমড়া। কিন্তু প্রতিটি ধরনেরই গুরুত্ব আছে কৃষির টেকসই উন্নয়ন আর অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিতে।
এই বৈচিত্র্যের পেছনে কাজ করে দেশের ভূপ্রকৃতি। বাংলাদেশের বেশির ভাগ ভূমি গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনার বয়ে আনা পলিতে গড়া, যা পৃথিবীর অন্যতম উর্বর মাটি। সারা বছর কোনো না কোনো ফসল মাঠে থাকে: বর্ষায় আমন, শীতে সবজি, ডাল, সরিষা ও গম, আর শুকনো মৌসুমে বোরো। একই জমিতে বছরে দুই বা তিনটি ফসল ফলানো এখানে সাধারণ ঘটনা। তবে এই তীব্র ব্যবহারই মাটির ওপর চাপ বাড়ায়, আর তখনই প্রশ্ন আসে জৈব সার, শস্য পর্যায় আর টেকসই চাষের।
আধুনিক কৃষির পথে
কৃষির আধুনিকীকরণ মানে উন্নত প্রযুক্তি, যন্ত্রপাতি ও নতুন উদ্ভাবন দিয়ে উৎপাদনকে কম পরিশ্রমের ও বেশি কার্যকর করা। এতে ফলন বাড়ে, সময় ও শ্রম বাঁচে, আর কৃষি আরও লাভজনক হয়। গ্রাম থেকে শ্রমিক শহরে ও বিদেশে চলে যাওয়ায় ধান কাটার মৌসুমে যে মজুরসংকট দেখা দেয়, তা সামাল দিতেও যন্ত্রের বিকল্প কমে আসছে। বাংলাদেশের মতো কৃষিনির্ভর দেশে তাই আধুনিকীকরণ টেকসই উন্নয়নের মূল চাবিকাঠি। এর উপাদানগুলো আটটি ভাগে দেখা যায়।
- উন্নত যন্ত্রপাতি: ট্রাক্টর, কম্বাইন হারভেস্টার ও রোটাভেটর চাষ ও ফসল তোলার কাজ দ্রুত করে। ড্রোন দিয়ে জমির অবস্থা দেখা ও বালাইনাশক ছিটানো যায়। ড্রিপ ও স্প্রিংকলার পদ্ধতিতে সেচে পানি বাঁচে।
- উন্নত বীজ: উচ্চফলনশীল ও রোগ প্রতিরোধী জাতের বীজ ফলন বাড়ায়; জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে খরা, বন্যা ও লবণসহিষ্ণু জাত উদ্ভাবন চলছে।
- জৈব কৃষি ও জৈব সার: রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের বদলে জৈব সার ও প্রাকৃতিক বালাইনাশক মাটির স্বাস্থ্য রক্ষা করে।
- ডিজিটাল প্রযুক্তি: স্মার্টফোন অ্যাপে আবহাওয়ার পূর্বাভাস, বাজারদর আর চাষের পরামর্শ হাতের কাছে আসে; জিপিএস ও সেন্সর দিয়ে জমি পর্যবেক্ষণ ও সঠিক চাষ পদ্ধতি ঠিক করা যায়। কৃষি তথ্য সার্ভিসের ১৬১২৩ নম্বরের কল সেন্টারে ফোন করেও কৃষক পরামর্শ নিতে পারেন।
- গবেষণা ও উদ্ভাবন: ফসলের নতুন জাত আর আধুনিক চাষ পদ্ধতি চালু করা, কীটপতঙ্গ ও রোগ দমনে নতুন প্রযুক্তি বের করা। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বারি), ব্রি ও অন্যান্য গবেষণা প্রতিষ্ঠান এই কাজ করে।
- কৃষিশিক্ষার প্রসার: কৃষকদের প্রশিক্ষণ, আধুনিক প্রযুক্তি সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানো আর মাঠপর্যায়ে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তাদের পরামর্শসেবা।
- সেচব্যবস্থার উন্নয়ন: পানির সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে আধুনিক সেচ পদ্ধতি, আর ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার কমিয়ে বৃষ্টির পানি ধরে রাখা।
- যান্ত্রিকীকরণ: চাষ, বপন, সেচ ও ফসল কাটায় যন্ত্রের ব্যবহার, যাতে সময় ও শ্রম দুটোই বাঁচে।
এসবের সুফল কয়েক দিক থেকে আসে। উৎপাদন বাড়ে এবং খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়। যন্ত্র শ্রমের প্রয়োজন কমায়, আধুনিক পদ্ধতি দ্রুত ফল দেয়। জৈব চাষ আর সঠিক প্রযুক্তি পরিবেশদূষণ কমায়। আর উৎপাদন ও বাজারদর দুটোর উন্নতিতে কৃষকের আয় বাড়ে।
তবে বাংলাদেশে আধুনিকীকরণের পথে বাধাও কম নয়। অনেক কৃষকের আর্থিক সামর্থ্য নেই দামি যন্ত্র কেনার। প্রযুক্তি সম্পর্কে সচেতনতার ঘাটতি আছে। প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি সব এলাকায় হাতের কাছে পাওয়া যায় না। জমি ছোট ছোট খণ্ডে ভাগ হওয়ায় বড় যন্ত্র চালানোও কঠিন। আর জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব প্রতিটি পরিকল্পনাকেই অনিশ্চিত করে তোলে। সরকার ভর্তুকি দিয়ে কৃষকদের কাছে কম্বাইন হারভেস্টার ও অন্যান্য যন্ত্র পৌঁছে দেওয়ার প্রকল্প নিয়েছে, আর অনেক এলাকায় একজন উদ্যোক্তা যন্ত্র কিনে আশপাশের কৃষকদের ভাড়ায় সেবা দিচ্ছেন। সঠিক পরিকল্পনা, আধুনিক প্রযুক্তি সুলভ করা আর কৃষকের জন্য প্রশিক্ষণ ও আর্থিক সহায়তা নিশ্চিত করা গেলে কৃষি খাত আরও এগোবে এবং জাতীয় অর্থনীতিতে আরও বড় ভূমিকা রাখবে।
মাঠের সামনে দশটি চ্যালেঞ্জ
কৃষি বাংলাদেশের অর্থনীতি, খাদ্য নিরাপত্তা আর জীবনযাত্রার প্রধান ভিত্তি হলেও এটি নানা চ্যালেঞ্জের মুখে। এই সমস্যাগুলো টেকসই উন্নয়ন ও উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
প্রথমটি জলবায়ু পরিবর্তন। বন্যা, খরা আর ঘূর্ণিঝড়ের মতো দুর্যোগে ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়। অনিয়মিত বৃষ্টি আর অস্বাভাবিক তাপমাত্রা উৎপাদনে সরাসরি আঘাত করে: আগাম বন্যায় হাওরের পাকা বোরো ডুবে যায়, তাপপ্রবাহে ধানের ফুলে চিটা হয়।
দ্বিতীয়ত জমির অবক্ষয়। শিল্পায়ন, নগরায়ণ আর আবাসন প্রকল্পের কারণে কৃষিজমি প্রতিনিয়ত কমছে। অপরিকল্পিত চাষাবাদে মাটির উর্বরতাও কমে যাচ্ছে।
তৃতীয়ত পানির সংকট। সেচের জন্য প্রয়োজনীয় পানির অভাব দেখা দিচ্ছে; ভূগর্ভস্থ পানির অতিরিক্ত ব্যবহারে পানির স্তর নেমে যাচ্ছে, আর শুকনো মৌসুমে নদী ও খালের পানিও কমে যায়।
চতুর্থত আর্থিক সংকট। ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকেরা পুঁজি ও ঋণ পেতে সমস্যায় পড়েন, আর কৃষিযন্ত্র ও প্রযুক্তির দাম তাদের নাগালের বাইরে।
পঞ্চমত আধুনিক প্রযুক্তির অভাব। অনেক কৃষক এখনো প্রথাগত পদ্ধতির ওপর নির্ভরশীল, আধুনিক যন্ত্র ও প্রযুক্তি সম্পর্কে সচেতনতার অভাব রয়েছে।
ষষ্ঠত কীটপতঙ্গ ও রোগের আক্রমণ। খেতে পোকামাকড় আর নানা রোগের প্রকোপ ফলন কমায়, আর কীটনাশক ও বালাইনাশকের সঠিক ব্যবহার নিয়ে জ্ঞানের ঘাটতি সমস্যাকে আরও বাড়ায়।
সপ্তমত বাজারব্যবস্থার সমস্যা। কৃষক প্রায়ই ফসলের ন্যায্য দাম পান না; উৎপাদকের কাছ থেকে ভোক্তার কাছে পৌঁছাতে পণ্যটি কয়েক হাত ঘোরে, আর মধ্যস্বত্বভোগীরা লাভের বড় অংশ নিয়ে যান।
অষ্টমত কৃষিশিক্ষা ও প্রশিক্ষণের অভাব। আধুনিক চাষাবাদ নিয়ে কৃষকদের পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ নেই, প্রযুক্তি ব্যবহার আর ফসল ব্যবস্থাপনায় দক্ষতার ঘাটতি রয়েছে।
নবমত প্রাকৃতিক সম্পদের অবক্ষয়। বনজ সম্পদ আর জীববৈচিত্র্য কমায় কৃষিজমির ওপর চাপ বাড়ছে, আর মাটির লবণাক্ততা ও ভূমিক্ষয়ের সমস্যা বাড়ছে। মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের (এসআরডিআই) হিসাবে, উপকূলের প্রায় ১৬ লাখ ৮৯ হাজার হেক্টর জমির মধ্যে ২০০৯ সালে ১০ লাখ ৫৬ হাজার হেক্টর কমবেশি লবণাক্ততায় আক্রান্ত ছিল, যা ১৯৭৩ সালের তুলনায় প্রায় ২৬ শতাংশ বেশি।
দশমত সরকারি সহায়তার জটিলতা। কৃষিঋণ ও ভর্তুকি পেতে কৃষকদের নানা জটিলতায় পড়তে হয়, আর কৃষি খাতে প্রয়োজনের তুলনায় বিনিয়োগ কম।
এই চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলায় দরকার সঠিক পরিকল্পনা, প্রযুক্তির ব্যবহার আর কৃষকের জন্য আর্থিক সহায়তা ও প্রশিক্ষণ। সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো মিলে কাজ করলে কৃষি খাতের সমস্যাগুলোর সমাধান সম্ভব, আর তখন দেশের অর্থনীতি ও খাদ্য নিরাপত্তায় কৃষি আরও বড় ভূমিকা রাখতে পারবে।
এই দশটি সমস্যা আলাদা আলাদা দেখা গেলেও বাস্তবে এগুলো একে অন্যের সঙ্গে জড়ানো। লবণাক্ততা বাড়লে ফলন কমে, ফলন কমলে আয় কমে, আয় কমলে কৃষক ভালো বীজ বা যন্ত্র কিনতে পারেন না, আর তখন ঋণের দিকে ঝুঁকতে হয়। তাই সমাধানও হতে হবে একসঙ্গে: গবেষণায় নতুন সহনশীল জাত, সম্প্রসারণ কর্মীর মাধ্যমে সেই জাত মাঠে পৌঁছানো, কম সুদে ও ঝামেলাহীন শর্তে ঋণ, আর উৎপাদিত ফসলের জন্য নিশ্চিত বাজার। কোনো একটি ধাপ বাদ পড়লে বাকিগুলোর সুফলও পুরোপুরি মেলে না।
মাঠের ভবিষ্যৎ মাঠের মানুষের হাতে
সব হিসাব শেষে ফিরে আসতে হয় সেই ভোরের দৃশ্যে। প্রযুক্তি, গবেষণা, ভর্তুকি আর বাজার, সবকিছুর কেন্দ্রে আছেন একজন কৃষক, যিনি প্রতিটি মৌসুমে আবহাওয়ার সঙ্গে বাজি ধরে জমিতে বীজ ফেলেন। তার হাতে ভালো বীজ, সময়মতো সার ও পানি, ফসলের ন্যায্য দাম আর বিপদের সময় সহায়তা পৌঁছালে কৃষি যে কতটা ফল দিতে পারে, বাংলাদেশ গত কয়েক দশকে তা দেখিয়েছে।
কৃষি শুধু জীবিকা নয়; এটি আমাদের সংস্কৃতি, অর্থনীতি আর টেকসই উন্নয়নের ভিত্তি। সঠিক পরিকল্পনা, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার আর সরকারি সহায়তা নিশ্চিত করা গেলে কৃষি খাত আরও সমৃদ্ধ হবে এবং দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নকে আরও গতি দেবে। দেশ যেদিকেই এগোক, তার ভিত গাঁথা থাকবে এই মাঠেই।
ছবি: ধানের চারা রোপণ করছেন বাংলাদেশের কৃষক, Balaram Mahalder / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 3.0)





মন্তব্য
(০)