ভোরে মাঠে নামলে দেখা যায় ধানের কচি চারার ডগায় জমে আছে শিশিরের ফোঁটা, দূরে সরিষার হলুদ খেত কুয়াশায় ঝাপসা। কৃষক চাদর মুড়ি দিয়ে বীজতলার আল ধরে হাঁটছেন, চারাগুলো ঠান্ডায় হলদে হয়ে গেল কি না দেখছেন। জানুয়ারি বাংলাদেশের কৃষিতে শীতকালীন রবি মৌসুমের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়। বাংলা পঞ্জিকায় এ সময় পৌষের শেষ আর মাঘের শুরু। একদিকে মাঠে দাঁড়িয়ে আছে গম, আলু, সরিষা, ডাল আর শীতের সবজি, অন্যদিকে শুরু হচ্ছে বছরের সবচেয়ে বড় ধানের মৌসুম, বোরো। এ সময়ের যত্ন, রোপণ আর সঠিক ব্যবস্থাপনার ওপরই নির্ভর করে সামনের কয়েক মাসের ফলন।
শীতের মাস, ব্যস্ত মাঠ
জানুয়ারি সাধারণত দেশের শীতলতম মাস। এ মাসেই একাধিকবার শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যায়, উত্তরাঞ্চলে ঘন কুয়াশা কয়েক দিন ধরে সূর্য ঢেকে রাখে। ২০১৮ সালের ৮ জানুয়ারি পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়ায় তাপমাত্রা নেমেছিল ২.৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসে, যা দেশের ইতিহাসে রেকর্ড করা সর্বনিম্ন তাপমাত্রা। এমন ঠান্ডা মানুষের মতো ফসল, গবাদিপশু আর পুকুরের মাছের জন্যও কষ্টের।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীন কৃষি তথ্য সার্ভিস প্রতি মাসে কৃষিকথা পত্রিকায় সে মাসের করণীয় নিয়ে পরামর্শ ছাপে, যা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মাঠকর্মীরাও কৃষকের কাছে পৌঁছে দেন। পৌষ ও মাঘ মাসের সেই পরামর্শ আর ফসলের স্বাভাবিক চক্র মিলিয়ে নিচে জানুয়ারির কাজগুলো ফসল ধরে ধরে সাজানো হলো।
বোরো ধান: বীজতলার যত্ন
বাংলাদেশের মোট চাল উৎপাদনের অর্ধেকের মতো আসে বোরো মৌসুম থেকে, তাই দেশের খাদ্য নিরাপত্তার হিসাব অনেকটাই শুরু হয় জানুয়ারির বীজতলায়। এ সময় বীজতলার প্রধান কাজগুলো হলো:
- বীজতলায় নিয়মিত পানি সরবরাহ নিশ্চিত করা।
- বীজতলায় রোগ বা পোকার আক্রমণ দেখা দিলে দ্রুত প্রতিকারের ব্যবস্থা নেওয়া।
- চারার বয়স ৩০ থেকে ৩৫ দিন হলে মূল জমিতে রোপণের প্রস্তুতি নেওয়া।
শীতের সবচেয়ে বড় ঝুঁকি ঠান্ডাজনিত ক্ষতি। তীব্র শীতে কচি চারা হলদে হয়ে যায়, বাড়বাড়তি থেমে যায়, কখনো চারা মরেও যায়। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ও বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের পরামর্শ হলো, শৈত্যপ্রবাহের সময় বীজতলা স্বচ্ছ পলিথিন দিয়ে ঢেকে রাখা, যাতে ভেতরে তাপ ধরে থাকে। বীজতলার ঠান্ডা পানি সকালে বের করে দিয়ে আবার নতুন পানি দিতে হয়, আর প্রতিদিন সকালে চারার ওপর জমে থাকা শিশির ঝরিয়ে দিতে হয়। দুজন মিলে দড়ি টেনে চারার মাথা ছুঁয়ে দিলেই শিশির ঝরে যায়।
অনেক এলাকায় এখন বাঁশের কাঠামোর ওপর পলিথিন বিছিয়ে ছাউনির মতো বীজতলা তৈরি হচ্ছে, যাকে কৃষকেরা পলিথিন শেড বীজতলা বলেন। দিনের রোদে ছাউনির ভেতরটা উষ্ণ থাকে, রাতের কুয়াশা সরাসরি চারায় পড়ে না, ফলে ঠান্ডার মধ্যেও চারা সবুজ ও সতেজ থাকে। তবে দীর্ঘ শৈত্যপ্রবাহে পলিথিন সারাক্ষণ ঢেকে রাখলে দুই পাশে কিছুটা খোলা রাখতে হয়, যাতে ভেতরে বাতাস চলাচল করে।
কৃষি তথ্য সার্ভিসের পৌষ মাসের পরামর্শে বলা হয়েছে, বীজতলায় স্বল্প পরিমাণ ইউরিয়া ও জিপসাম সার দিলে সুফল পাওয়া যায়। ঠান্ডায় যেসব চারা হলদে হয়ে পড়ে, তারা এতে আবার সবুজ হয়ে ওঠে। তবে মাত্রা বেশি হলে চারা নরম ও লিকলিকে হয়ে যায়, তাই অল্প করে দেওয়াই নিয়ম।
বোরো ধান: জমি তৈরি ও রোপণ
বীজতলার পাশাপাশি জানুয়ারিতে শুরু হয় মূল জমি তৈরির কাজ। জমি ভালোভাবে চাষ দিয়ে মই টেনে সমান করতে হয়, যাতে সেচের পানি সবখানে সমানভাবে দাঁড়ায়। উঁচু-নিচু জমিতে কোথাও পানি জমে, কোথাও শুকিয়ে যায়, ফলে চারা সমানভাবে বাড়ে না। শেষ চাষের আগে সঠিক পরিমাণ সার প্রয়োগ করে জমি প্রস্তুত করতে হয়। কোন জমিতে কতটা সার লাগবে, তা মাটি পরীক্ষা বা উপজেলা কৃষি অফিসের সুপারিশ দেখে ঠিক করা ভালো।
কৃষি তথ্য সার্ভিসের পরামর্শ অনুযায়ী শীতের বোরোতে ৪০ থেকে ৪৫ দিন বয়সের চারা রোপণ করলে ভালো ফল মেলে। লাইন থেকে লাইনের দূরত্ব ২৫ সেন্টিমিটার আর গোছা থেকে গোছার দূরত্ব ১৫ সেন্টিমিটার রেখে প্রতি গোছায় ২ থেকে ৩টি সুস্থ চারা রোপণ করলে ফলন ভালো হয়। লাইনে রোপণ করলে পরে আগাছা পরিষ্কার, সার দেওয়া আর পোকা দেখা সবই হাতের কাছে থাকে।
রোপণের পর ইউরিয়া সার তিন কিস্তিতে দেওয়ার পরামর্শ: রোপণের ১৫ থেকে ২০ দিন পর প্রথম কিস্তি, ৩০ থেকে ৪০ দিন পর দ্বিতীয় কিস্তি আর ৫০ থেকে ৫৫ দিন পর তৃতীয় কিস্তি। অনেক এলাকায় দানাদার ইউরিয়ার বদলে গুটি ইউরিয়া ব্যবহার হয়, যা রোপণের ৭ থেকে ১০ দিনের মধ্যে গোছার মাঝে মাটিতে পুঁতে দিতে হয়। গুটি ইউরিয়া ধীরে গলে বলে সার অপচয় কম হয়। পোকা দমনে প্রথমে পরিষ্কার চাষাবাদ, হাতে ধরে বা জাল দিয়ে দমন আর উপকারী পোকা রক্ষার মতো সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনার পথে যেতে বলা হয়; কীটনাশক আসে একেবারে শেষে।
বোরো চাষের সবচেয়ে বড় খরচ সেচ। বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের উদ্ভাবিত পর্যায়ক্রমে ভেজানো ও শুকানো পদ্ধতিতে জমিতে সারাক্ষণ পানি দাঁড় করিয়ে না রেখে একটি ছিদ্রযুক্ত পাইপ পুঁতে পানির স্তর দেখা হয়; পানি মাটির নিচে নির্দিষ্ট গভীরতায় নেমে গেলে তবেই আবার সেচ দেওয়া হয়। এতে সেচের পানি ও জ্বালানি খরচ কমে, অথচ ফলনে ক্ষতি হয় না। জানুয়ারিতে রোপণের আগেই এ বিষয়ে উপজেলা কৃষি অফিস থেকে জেনে নেওয়া যায়।
জাত বাছাইও এ মাসের সিদ্ধান্ত। বোরো মৌসুমে ব্রি ধান২৮, ব্রি ধান২৯সহ বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের নানা জাত চাষ হয়, আর প্রতি বছরই নতুন জাত আসছে। কোন এলাকায় কোন জাত ভালো ফলন দেবে, আগাম না নাবি জাত বেছে নেওয়া উচিত, তা নির্ভর করে জমির উচ্চতা, সেচের সুবিধা আর পরের ফসলের পরিকল্পনার ওপর। এ বিষয়ে স্থানীয় কৃষি কর্মকর্তার পরামর্শ কাজে আসে।
শীতের সবজি: শেষ মুহূর্তের যত্ন
জানুয়ারির বাজারে সবজির ভরা মৌসুম। মাঠে তখন ফুলকপি, বাঁধাকপি, মুলা, গাজর, শিম, বেগুন, টমেটো। এসব ফসলের পরিচর্যা চালিয়ে যেতে হয়। অতিরিক্ত শীত বা কুয়াশা থেকে চারা ও কচি গাছ রক্ষায় খড় বা পাতার আবরণ ব্যবহার করা যায়।
শীতকালে মাটিতে রস কমে যায়, তাই কৃষি তথ্য সার্ভিস সবজি খেতে চাহিদামাফিক সেচ দিতে বলেছে। মাটি হাতে নিয়ে মুঠো করলে যদি ঝুরঝুরে হয়ে ভেঙে পড়ে, বুঝতে হবে সেচ দরকার। জমিতে আগাছা জন্মালে দ্রুত পরিষ্কার করতে হয়, কারণ আগাছা সবজির ভাগের পানি ও সার কেড়ে নেয়।
টমেটোর ফল ছিদ্রকারী পোকা এ মাসের একটি বড় সমস্যা। এর দমনে প্রতি বিঘা জমিতে ১৫টি ফেরোমন ফাঁদ বসানোর পরামর্শ দিয়েছে কৃষি তথ্য সার্ভিস। ফেরোমন ফাঁদে স্ত্রী পোকার গন্ধের মতো একটি রাসায়নিক সংকেত থাকে, তাতে পুরুষ পোকা আকৃষ্ট হয়ে ফাঁদে পড়ে, ফলে বংশবৃদ্ধি কমে যায়। নিমজাত বালাইনাশকও ব্যবহার করা যায়। আর মৌসুমের শেষে আধা পাকা টমেটোসহ গাছ তুলে ঘরের ঠান্ডা জায়গায় উপুড় করে ঝুলিয়ে রাখলে টমেটো ধীরে পাকে এবং অনেক দিন ঘরে রাখা যায়।
পেঁয়াজ ও রসুনের খেতে এ সময় গাছের গোড়ায় মাটি তুলে দেওয়া, সেচ আর উপরি সার দেওয়ার কাজ থাকে। মধ্যম ও নাবি জাতের রবি সবজিতে সেচ, সার, গোড়া বাঁধা আর মাচা দেওয়ার কাজও চলে।
গম: সেচের তিন গুরুত্বপূর্ণ সময়
নভেম্বর-ডিসেম্বরে বোনা গম জানুয়ারিতে দ্রুত বাড়ে। গমের জমিতে প্রয়োজনীয় সেচ দেওয়াই এ মাসের প্রধান কাজ। তবে গমে সেচের সময়টা খুব গুরুত্বপূর্ণ, যখন-তখন দিলে চলে না।
কৃষি তথ্য সার্ভিসের পরামর্শ অনুযায়ী চারার বয়স ১৭ থেকে ২১ দিন হলে গমখেতের আগাছা পরিষ্কার করে হেক্টরপ্রতি ৩০ থেকে ৩৫ কেজি ইউরিয়া সার দিয়ে প্রথম সেচ দিতে হয়। এ সময় গাছের গোড়া থেকে নতুন শিকড় বের হয়; তখন মাটিতে রস না থাকলে গাছ দুর্বল হয়ে পড়ে। দ্বিতীয় সেচ দিতে হয় গাছের বয়স ৫৫ থেকে ৬০ দিন হলে বা শিষ বের হওয়ার সময়। দানা গঠনের সময় আরেকটি সেচ দিলে দানা পুষ্ট হয় এবং ফলন বাড়ে।
গমের একটি নতুন আতঙ্কের নাম ব্লাস্ট রোগ। ২০১৬ সালে বাংলাদেশে প্রথম এই রোগ ধরা পড়ে, যা ছিল এশিয়ায় গমের ব্লাস্টের প্রথম ঘটনা। শিষ বের হওয়ার সময় গরম ও আর্দ্র আবহাওয়া থাকলে এর ঝুঁকি বাড়ে; আক্রান্ত শিষ সাদা হয়ে শুকিয়ে যায়, দানা পুষ্ট হয় না। তাই জানুয়ারির শেষ থেকে শিষের দিকে নিয়মিত নজর রাখা আর সন্দেহ হলেই কৃষি অফিসে জানানো দরকার।
ঘন হয়ে গজানো চারা পাতলা করে দেওয়া দরকার, যাতে প্রতিটি গাছ যথেষ্ট জায়গা পায়। রোগবালাই দেখা দিলে উপযুক্ত বালাইনাশক ব্যবহার করতে হয়, তবে আগে উপজেলা কৃষি অফিসে রোগ চিনিয়ে নেওয়াই ভালো। গমের খেতে ইঁদুরের উপদ্রবও এ সময় বাড়ে। একজন কৃষক একা ইঁদুর মারলে পাশের খেত থেকে আবার চলে আসে, তাই পাশের জমির কৃষকদের সঙ্গে মিলে একযোগে ইঁদুর দমনের পরামর্শ দেওয়া হয়।
ভুট্টা: গোড়ায় মাটি, মাটিতে সার
রবি মৌসুমের ভুট্টা জানুয়ারিতে হাঁটু থেকে কোমর সমান উঁচু হয়। এ সময় সঠিক পরিমাণ সার প্রয়োগ করা আর পোকামাকড় থেকে রক্ষার জন্য প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা নেওয়া প্রধান কাজ।
কৃষি তথ্য সার্ভিসের পরামর্শ হলো, ভুট্টাখেতে গাছের গোড়ার মাটি তুলে দিতে হবে এবং গোড়ার মাটির সঙ্গে ইউরিয়া সার ভালো করে মিশিয়ে দিতে হবে। এতে সার বাতাসে উড়ে বা রোদে নষ্ট হয় না, আর গোড়া মজবুত হওয়ায় বাতাসে গাছ হেলে পড়ে না। প্রয়োজনমতো সেচ দিতে হয় এবং গাছের নিচের দিকের শুকনো পাতা ভেঙে সরিয়ে ফেলতে হয়। ভুট্টার সঙ্গে সাথী ফসল হিসেবে আলু, শাক বা ডাল লাগানো থাকলে সেগুলোরও যত্ন নিতে হয়।
ডাল ফসল: আগাছা, রস আর সংগ্রহ
মসুর, খেসারি, মুগসহ ডালের জমিতে নিয়মিত আগাছা পরিষ্কার করতে হয়। ডালের গাছ ছোট বলে আগাছা খুব দ্রুত তাকে ঢেকে ফেলে। জমি শুকিয়ে গেলে হালকা সেচ দিয়ে আর্দ্রতা বজায় রাখা দরকার, তবে পানি জমে থাকলে ডালের গোড়া পচে যায়।
আগাম বোনা ডাল জানুয়ারির শেষ দিকে পাকতে শুরু করে। কৃষি তথ্য সার্ভিসের পরামর্শ, ডাল ফসল ৮০ ভাগ পাকলেই সংগ্রহ করা উচিত। গাছ গোড়া থেকে না উপড়ে মাটির কয়েক ইঞ্চি ওপর থেকে কাটলে শিকড় মাটিতে থেকে যায়। ডালের শিকড়ে থাকা গুটিতে বাতাসের নাইট্রোজেন জমা থাকে, শিকড় মাটিতে পচলে সেই নাইট্রোজেন পরের ফসলের কাজে লাগে।
সরিষা ও তেলফসল: ফুল থেকে দানা
জানুয়ারির মাঠে সবচেয়ে চোখ জুড়ানো দৃশ্য সরিষার হলুদ ফুল। সরিষার ফুল ধরার সময় জমি শুকনো থাকলে সেচ দিতে হয়। এ সময় সরিষার জাবপোকার আক্রমণ বাড়ে, আর পোকামাকড়ের আক্রমণ হলে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হয়। ফুলের সময় মৌমাছি পরাগায়নে সাহায্য করে ফলন বাড়ায়, তাই বালাইনাশক ব্যবহারের প্রয়োজন হলে কৃষি কর্মকর্তার পরামর্শ নিয়ে মৌমাছির ক্ষতি এড়ানোর ব্যবস্থা রাখা ভালো।
আগাম জাতের সরিষা জানুয়ারিতেই পেকে যায়। সরিষা ও তিসি বেশি পাকলে রোদের তাপে ফল ফেটে বীজ মাটিতে পড়ে যায়। তাই কৃষি তথ্য সার্ভিস ৮০ ভাগ পাকলেই সংগ্রহের পরামর্শ দিয়েছে। সরিষা কেটে জমি ফাঁকা হলে অনেক এলাকায় সেই জমিতেই বোরো রোপণ করা হয়।
আলু: মড়ক রোগের সময়
আলুচাষির কাছে জানুয়ারি মানে উদ্বেগের মাস। কুয়াশা আর মেঘলা, স্যাঁতসেঁতে আবহাওয়ায় আলুর নাবি ধসা বা মড়ক রোগ কয়েক দিনের মধ্যে পুরো খেত নষ্ট করে দিতে পারে। আলুর জমিতে সঠিক সেচ আর রোগবালাইয়ের বিরুদ্ধে প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা নেওয়াই তাই এ মাসের প্রধান কাজ।
মড়ক রোগ কেন কুয়াশায় বাড়ে, তা বুঝলে সতর্কতার গুরুত্বও বোঝা যায়। এই রোগের জীবাণু একধরনের ছত্রাকসদৃশ অণুজীব, যা ঠান্ডা, ভেজা পাতায় দ্রুত বংশবৃদ্ধি করে। কয়েক দিন ঘন কুয়াশা, মেঘলা আকাশ আর ঝিরঝিরে শিশির থাকলে পাতায় প্রথমে পানিভেজা দাগ পড়ে, পরে তা কালো হয়ে পুরো গাছ ঝলসে যায়। তাই আবহাওয়ার পূর্বাভাসে কুয়াশা বা মেঘলা দিনের খবর পেলে আক্রমণের আগেই প্রতিরোধমূলক স্প্রে দেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।
কৃষি তথ্য সার্ভিসের পরামর্শ: মড়ক রোগ দমনে দেরি না করে ডায়থেন এম-৪৫, সিকিউর বা ইন্ডোফিলের মতো ছত্রাকনাশক প্রতি লিটার পানিতে ২ গ্রাম হারে মিশিয়ে ৭ দিন পরপর স্প্রে করতে হবে। রোগ দেখা দেওয়া জমিতে সেচ বন্ধ রাখতে হবে, কারণ ভেজা পরিবেশে রোগ দ্রুত ছড়ায়। চারার উচ্চতা ১০ থেকে ১৫ সেন্টিমিটার হলে ইউরিয়া সারের উপরি প্রয়োগ, গোড়ায় মাটি তুলে দেওয়া, মালচিং আর আগাছা পরিষ্কারও চলতে থাকে।
আগাম লাগানো আলু জানুয়ারির শেষ দিকে তোলার সময় হয়। আলু সংগ্রহের আগে জমি ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করতে হয়। পরামর্শ হলো, গাছের বয়স ৯০ দিন হলে গাছগুলো মাটির সমান করে কেটে দিয়ে ১০ দিন পর আলু তোলা। এতে আলুর খোসা শক্ত হয়, তোলার সময় ছিলে যায় না, আর সংরক্ষণে পচন কম হয়। তোলার পর আলু ছায়ায় শুকিয়ে কাটা-পচা আলু বাছাই করে তবেই ঘরে বা হিমাগারে রাখতে হয়।
ফলগাছ: আমের মুকুলের প্রস্তুতি
জানুয়ারির শেষ থেকে আমগাছে মুকুল আসতে শুরু করে। এ সময় আমের অ্যানথ্রাকনোজ রোগ মুকুল ও কচি আম ঝরিয়ে দিতে পারে। কৃষি তথ্য সার্ভিস মুকুল আসার আগে একবার এবং আম মটরদানার মতো হলে আরেকবার ছত্রাকনাশক স্প্রে করার পরামর্শ দেয়। আমের শোষক পোকা বা হপার দমনেও এ সময় ব্যবস্থা নিতে হয়।
গত বর্ষায় লাগানো ফল, ঔষধি বা কাঠের চারাগাছের যত্নও এ মাসের কাজ। গাছের গোড়ার মাটি আলগা করে দিতে হয়, আগাছা পরিষ্কার করতে হয় আর শুকনো মৌসুমে নিয়মিত পানি দিতে হয়।
পুকুরের মাছ: শীতে কম খাবার, বেশি নজর
শীতে পুকুরের পানি ঠান্ডা হলে মাছের চলাফেরা আর খাওয়া কমে যায়, বৃদ্ধিও ধীর হয়। তবু পুকুরের পানি পরিষ্কার রাখা আর নিয়মিত মাছের খাদ্য সরবরাহ করা জরুরি। মাছ কতটা খাচ্ছে দেখে খাবারের পরিমাণ ঠিক করতে হয়, কারণ না খাওয়া খাবার তলায় পচে পানি নষ্ট করে।
শীতে কার্পজাতীয় মাছের ড্রপসি বা পেট ফোলা রোগ দেখা দিতে পারে। কৃষি তথ্য সার্ভিসের পরামর্শ অনুযায়ী এ রোগে প্রতি কেজি খাবারের সঙ্গে ১০০ মিলিগ্রাম টেরামাইসিন বা স্ট্রেপটোমাইসিন মিশিয়ে পরপর ৭ দিন খাওয়াতে হয়, তবে ওষুধ দেওয়ার আগে উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তার পরামর্শ নেওয়া ভালো। শীতের আরেক পরিচিত সমস্যা ক্ষত রোগ। এর প্রতিরোধে মৎস্য বিভাগ শীত আসার আগে, আশ্বিনের শেষে বা কার্তিকের শুরুতে, প্রতি শতাংশে ১ কেজি চুন ও ১ কেজি লবণ দেওয়ার পরামর্শ দেয়। যাঁরা সেটি দিতে পারেননি, তাঁদের নিয়মিত মাছের গায়ে লাল দাগ বা ঘা আছে কি না খেয়াল রাখা দরকার।
রোদ ঝলমলে দুপুরে পুকুরের পানি কিছুটা উষ্ণ হয়, তখন মাছ বেশি সক্রিয় থাকে। তাই শীতের দিনে সকালের বদলে দুপুরের দিকে খাবার দিলে মাছ তা ভালোভাবে খায়। পুকুরপাড়ের গাছের ডালপালা ছেঁটে দিলে পানিতে বেশি রোদ পড়ে, আর ঝরা পাতা পচে পানি নষ্ট হওয়ার ঝুঁকিও কমে।
গবাদিপশু ও হাঁস-মুরগি: ঠান্ডা থেকে সুরক্ষা
ঠান্ডা থেকে রক্ষা করতে গোয়ালঘর উষ্ণ রাখা জরুরি। রাতে গোয়ালের খোলা দিক চট বা পলিথিন দিয়ে ঘিরে দিলে ঠান্ডা বাতাস ঢোকে না। কৃষি তথ্য সার্ভিস বলছে, শীতকালে গাভীর গায়ে মোটা চট জড়িয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করা খুব জরুরি। মেঝে শুকনো রাখতে খড় বিছিয়ে দেওয়া যায়।
গবাদিপশুকে পর্যাপ্ত খাদ্য ও পরিষ্কার পানি দিতে হয়। শীতে সবুজ ঘাস কম মেলে, তাই খড়ের পাশাপাশি দানাদার খাবার ও যতটা সম্ভব কাঁচা ঘাস দেওয়া দরকার। গোয়াল নিয়মিত পরিষ্কার রাখা আর খাবারের মান ঠিক রাখা রোগ প্রতিরোধের প্রথম শর্ত। শীতে ছাগলের নিউমোনিয়া বেশি হয়; নাক দিয়ে পানি পড়া, কাশি বা শ্বাসকষ্ট দেখলে দেরি না করে ভেটেরিনারি চিকিৎসকের পরামর্শে চিকিৎসা করাতে হয়।
হাঁস-মুরগির ঘরেও শীতের প্রস্তুতি লাগে। রাতে ঘরের জানালা চট দিয়ে ঢেকে দেওয়া, মেঝেতে শুকনো তুষ বা কাঠের গুঁড়া বিছানো দরকার। কৃষি তথ্য সার্ভিসের পরামর্শে শীতে রোগ প্রতিরোধের জন্য ভেটেরিনারি চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে হাঁস-মুরগিকে ভিটামিন এ, সি, ডি, ই, কে ও ফলিক অ্যাসিড দেওয়া যায়। নির্ধারিত সময়সূচি মেনে হাঁসের প্লেগ ও কলেরার টিকাও দিতে হয়।
এক মাসের কাজ, সারা বছরের ফলন
জানুয়ারির কাজের তালিকা দীর্ঘ, আর আবহাওয়া প্রায়ই প্রতিকূল। কিন্তু এ মাসের প্রতিটি কাজের ফল দেখা যায় পরের কয়েক মাসে: বীজতলার সুস্থ চারা থেকে এপ্রিল-মে মাসের বোরো, সময়মতো সেচ পাওয়া গম থেকে মার্চের সোনালি শিষ, মড়ক থেকে বাঁচানো আলু থেকে সারা বছরের সংরক্ষণ। জানুয়ারি মাসের সঠিক কৃষিকাজ তাই ফসল উৎপাদন বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
এক নজরে জানুয়ারির প্রধান কাজ:
- বোরো: শৈত্যপ্রবাহে বীজতলা পলিথিনে ঢাকা, সকালে পানি বদল ও শিশির ঝরানো, জমি তৈরি, লাইনে রোপণ।
- গম: ১৭ থেকে ২১ দিনে প্রথম সেচ ও ইউরিয়া, শিষ বের হওয়ার সময় ও দানা গঠনে আবার সেচ।
- আলু: মড়ক ঠেকাতে ৭ দিন পরপর ছত্রাকনাশক, আক্রান্ত জমিতে সেচ বন্ধ, ৯০ দিনে গাছ কেটে ১০ দিন পর আলু তোলা।
- সরিষা ও ডাল: ৮০ ভাগ পাকলেই সংগ্রহ।
- সবজি: চাহিদামাফিক সেচ, আগাছা দমন, টমেটোতে ফেরোমন ফাঁদ।
- পুকুর ও গোয়াল: পরিষ্কার পানি, মেপে খাবার, গোয়াল ও হাঁস-মুরগির ঘর উষ্ণ রাখা, সময়মতো টিকা।
কোনো ফসলে অচেনা রোগ বা পোকা দেখা দিলে নিজে থেকে ওষুধ না কিনে ইউনিয়নের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা বা উপজেলা কৃষি অফিসে যোগাযোগ করাই নিরাপদ। কৃষি তথ্য সার্ভিসের কৃষি কল সেন্টারে ফোন করেও বিনামূল্যে পরামর্শ পাওয়া যায়। কুয়াশায় ঢাকা এই মাসে সময়মতো সঠিক তথ্যই কৃষকের সবচেয়ে বড় সহায়।
ছবি: শীতে সরিষার খেত, Kamruzzaman Raihan / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)





মন্তব্য
(০)