সরাসরিবাজারদর
আটা (প্যাকেটজাত)৫৮+০.০%আদা - আমদানিকৃত১৬৭+০.০%আদা - দেশী১৫৪+০.০%আমন চাল - মাঝারি৫৬+০.০%আমন চাল - মোটা৪৮+০.০%আমন চাল - সরু৭২+০.০%আয়োডিনযুক্ত লবণ (প্যাকেটজাত)৩২+০.০%কাঁচা মরিচ২১৮+০.০%খামারের মুরগী১৬২+০.০%খাসী৯০০+০.০%চিনি (দেশী)১৩২+০.০%ছোলা - গোটা৮৫+০.০%ডিম ফার্ম - লাল৪৭+০.০%পেঁয়াজ - দেশী৬০+০.০%বোরো চাল - মাঝারি৫৫+০.০%বোরো চাল - মোটা৪৭+০.০%বোরো চাল - সরু৬৬+০.০%মাংসঃ– গরু৭২৯+০.০%মুগ ডাল১২২+০.০%রসুন - আমদানিকৃত১৯২+০.০%রসুন - দেশী১৭৩+০.০%সয়াবিন তেল১৬৩+০.০%
হালনাগাদ ১ নভেম্বর ২০২৬
ঢাকা৩২°মূলত পরিষ্কারআর্দ্রতা ৫৫%বাতাস ৫ কিমি/ঘ

২২ দেশ ঘোরা সুমন বাবুগঞ্জে গড়েছেন পেঁপে ও চারার কোটি টাকার ব্যবসা

জীবিকার খোঁজে ২২টি দেশে কাজ করা আবু বকর সিদ্দিকী সুমন ২০২১ সালে বরিশালের বাবুগঞ্জে পেঁপে চাষ শুরু করেন। জাগো নিউজের উদ্ধৃত কৃষি বিভাগের তথ্যে, পাঁচ বছরে তিনি প্রায় ৬০ লাখ টাকার পেঁপে ও ১ কোটি ৬০ লাখ টাকার চারা বিক্রি করেছেন; তার দাবি, দুই হাজারের বেশি মানুষকে প্রশিক্ষণ দিয়েছেন।

২২ দেশ ঘোরা সুমন বাবুগঞ্জে গড়েছেন পেঁপে ও চারার কোটি টাকার ব্যবসা
ফল

বরিশালের বাবুগঞ্জ উপজেলার চাঁদপাশা ইউনিয়নের বায়লাখালী গ্রামের সাবেক প্রবাসী শ্রমিক আবু বকর সিদ্দিকী সুমন পেঁপে ও পেঁপের চারা বিক্রি করে এমন এক ব্যবসা গড়ে তুলেছেন, যাকে ২০২৬ সালের জুলাইয়ে জাগো নিউজ কোটি টাকার ব্যবসা বলে বর্ণনা করেছে। জীবিকার খোঁজে তিনি রেলওয়ের চাকরি, রংমিস্ত্রির কাজ, দিনমজুরি আর বিদেশে ব্যবসা করতে করতে ২২টি দেশ ঘুরেছেন; ২০২১ সালে নিজের পতিত জমিতে পেঁপে চাষ শুরু করেন। বাগানের পাশাপাশি তিনি গড়ে তুলেছেন 'দেলোয়ারা এগ্রো ট্রেনিং সেন্টার'। প্রতিবেদন অনুযায়ী, সেখানে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আসা তরুণ, শিক্ষার্থী, বেকার ও অবসরপ্রাপ্ত মানুষকে হাতেকলমে প্রশিক্ষণ দিয়ে তিনি দুই হাজারের বেশি মানুষকে কৃষি উদ্যোক্তা হিসেবে যাত্রা শুরু করতে সাহায্য করেছেন।

জাগো নিউজ প্রতিবেদনটি প্রকাশ করে ২০২৬ সালের ২২ জুলাই। তার আগের দিন, ২১ জুলাই সন্ধ্যায় ঢাকা পোস্টও একই চাষিকে নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করে, যাতে অনেক তথ্যই একই রকম। দুটি প্রতিবেদনই তৈরি হয়েছিল বাগান সরেজমিনে দেখে এবং সুমন, তার প্রতিবেশী ও উপজেলা কৃষি কার্যালয়ের সঙ্গে কথা বলে। এই প্রতিবেদনে দুই পত্রিকার তথ্য তুলে ধরা হলো, সঙ্গে যোগ করা হলো বাবুগঞ্জ, ফসল হিসেবে পেঁপে এবং বাংলাদেশের পেঁপেচাষিদের সতর্ক থাকতে হয় এমন রোগবালাইয়ের পটভূমি।

২২ দেশে কেটেছে কর্মজীবন


অভাবের কারণে ১৯৭৭ সালে নবম শ্রেণিতে পড়ার সময়ই সুমনকে পড়াশোনা ছেড়ে রেলওয়েতে চাকরি নিতে হয়। চার বছর পর সেই চাকরি শেষ হলে ১৯৮১ সালে ভাগ্যবদলের আশায় তিনি লেবাননের রাজধানী বৈরুতে যান। কিন্তু সেখানকার যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে সিরিয়া ও ফিলিস্তিন ঘুরে ১৭ মাস পর তাকে দেশে ফিরতে হয়। ঢাকায় ফিরে ফকিরাপুলে কখনো রংমিস্ত্রি, কখনো দিনমজুর হিসেবে কাজ করে তিনি জীবন চালিয়েছেন।

১৯৮৬ সালে একটি পত্রিকার বিজ্ঞাপন দেখে কুয়েতে রংমিস্ত্রির চাকরি পান সুমন। এরপর দীর্ঘ প্রবাসজীবনে ২২টি দেশ ভ্রমণের সুযোগ হয় তার। ১৯৯৩ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার একটি হুন্দাই প্রতিষ্ঠানে পেইন্টার হিসেবে কাজ শুরু করেন। সেখানে চাকরির সময় জিম্বাবুয়ে ও মালাউইতে বাণিজ্যিক পেঁপে চাষ দেখে এই ফসলের প্রতি তার আগ্রহ জন্মায়। পরে তিনি দক্ষিণ আফ্রিকায় নিজের ব্যবসা শুরু করেন এবং সেখানে পেঁপে চাষের ওপর প্রশিক্ষণ নেন। ঢাকা পোস্ট জানায়, বিদেশে ব্যবসা গড়ার পাশাপাশি তিনি দেশে জমিও কিনেছিলেন।

এরপরের বছরগুলোতে আসে বড় ধাক্কা। ২০১৪ সালে বিদেশে তার ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে ডাকাতির ঘটনায় তিনি বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েন। দেশে ফিরে ঢাকায় ব্যবসা শুরু করলেও জাগো নিউজের তথ্যমতে, সেখানেও ডাকাতির কবলে পড়ে সব হারান। এর মধ্যে তার স্ত্রী কিডনি রোগে আক্রান্ত হলে তিনি বাবুগঞ্জের গ্রামের বাড়িতে ফিরে আসেন; ঢাকা পোস্টের তথ্যে, স্ত্রীর চিকিৎসার জন্য তিনি ২০২০ সালে দেশে ফেরেন। ২০২১ সালে স্ত্রী মারা যান। একদিকে আর্থিক সংকট, অন্যদিকে নিঃসঙ্গতা, সব মিলিয়ে কঠিন সময় পার করতে হয় তাকে।

মাছ চাষের ঋণ থেকে পেঁপে বাগান


মোড় ঘোরে ২০২১ সালে। মাছ চাষের জন্য ঋণ নিতে গেলে বাবুগঞ্জের তৎকালীন সিনিয়র উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা সাইদুজ্জামান তাকে মাছের পাশাপাশি পেঁপে চাষের পরামর্শ দেন। সরকারি একটি প্রকল্প থেকে তিনি ৫০ হাজার টাকা সহায়তা পান। প্রথম চেষ্টায় ব্যর্থ হন। এরপর গাজীপুর থেকে উন্নতমানের বীজ এনে নিজেই চারা উৎপাদন শুরু করেন এবং দক্ষিণ আফ্রিকায় শেখা কৌশল কাজে লাগিয়ে নিজের পতিত জমিকে বাণিজ্যিক পেঁপে বাগানে রূপ দেন। ঢাকা পোস্ট লিখেছে, সেই বীজ থেকে তৈরি চারাতেই আসে কাঙ্ক্ষিত সফলতা।

গাজীপুরে রয়েছে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বারি)। ধান, পাট, আখ ও চায়ের জন্য আলাদা প্রতিষ্ঠান থাকায় এগুলো বাদে অন্য সব ফসলের গবেষণা করে বারি। বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটির যাত্রা শুরু ১৯০৮ সালে ঢাকায় 'অ্যাগ্রিকালচারাল রিসার্চ ল্যাবরেটরি, বেঙ্গল' নামে; ১৯৭৬ সালে এটি বারিতে রূপ নেয় এবং ১৯৮০ সালে গাজীপুরের জয়দেবপুরে স্থানান্তর সম্পন্ন হয়। বারির ছয়টি ফসলভিত্তিক গবেষণা কেন্দ্রের একটি উদ্যানতত্ত্ব গবেষণা কেন্দ্র। তবে সুমনের বীজ কোথা থেকে এসেছে, কোনো প্রতিবেদনেই সেই সরবরাহকারীর নাম বলা হয়নি।

বাগান ও পেঁপের জাত


প্রতিবেদন প্রকাশের সময় সুমনের ১ একর ৪৮ শতক জমি এবং তিনটি মাছের ঘেরের পাড়জুড়ে প্রায় ১ হাজার ২৫০টি পূর্ণবয়স্ক পেঁপে গাছ ছিল। জাগো নিউজ জাত হিসেবে শাহী, কাশ্মীরি ও টপ লেডির কথা লিখেছে; বাগান ঘুরে আসা ঢাকা পোস্ট উল্লেখ করেছে শাহী ও কাশ্মীরি জাতের কথা। দুই প্রতিবেদনেই বলা হয়েছে, প্রতিটি গাছ থেকে গড়ে চার থেকে পাঁচ মণ ফল পাওয়া যায় এবং বাগানে সর্বোচ্চ পাঁচ কেজি ওজনের পেঁপেও হয়েছে। ঢাকা পোস্ট জানায়, স্থানীয়দের কাছে তিনি 'পেঁপে বিপ্লবী' নামে পরিচিতি পেয়েছেন এবং তার নার্সারি থেকে চারা নিতে অনেককে আগাম সিরিয়াল দিতে হয়।

পেঁপে (Carica papaya) ক্যারিকেসি গোত্রের নরম কাণ্ডের, সাধারণত শাখাহীন গাছ; গাছের আগায় লম্বা বোঁটায় থাকে করতলের মতো খণ্ডিত বড় বড় পাতার গুচ্ছ। বাংলাদেশের জাতীয় জ্ঞানকোষ বাংলাপিডিয়া বলছে, মধ্য আমেরিকার এই গাছ ষোড়শ শতকের শেষার্ধে দক্ষিণ এশিয়ায় পৌঁছায়। কাঁচা পেঁপে সবজি হিসেবে রান্না হয়, পাকা পেঁপে ফল হিসেবে খাওয়া হয়। বাংলাপিডিয়ার তথ্যে, দেশে উৎপাদিত পেঁপের ৬০ শতাংশের বেশি সবজি হিসেবে খাওয়া হয়, আর পেঁপের কষে থাকে প্যাপাইন নামের এক উৎসেচক, যা পেপসিনের মতো।

পেঁপে সাধারণত একলিঙ্গী গাছ: পুরুষ ও স্ত্রী ফুল আলাদা গাছে ধরে। তবে লিঙ্গ কয়েক জোড়া জিন দিয়ে নিয়ন্ত্রিত হওয়ায় একই গাছে দুই ধরনের ফুল থাকা মাঝামাঝি ধরনের গাছও দেখা যায়। বাংলাপিডিয়া ব্যাখ্যা করেছে, অল্পবয়সী পুরুষ ও স্ত্রী গাছ আলাদা করে চেনার কোনো উপায় না থাকায় যথেষ্ট স্ত্রী গাছ নিশ্চিত করতে চাষিরা প্রতিটি গর্তে দুই থেকে তিনটি চারা লাগান। ২০২৫ সালে জার্নাল অব ফাঙ্গাই সাময়িকীতে প্রকাশিত এক গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে, বিশ্বে উৎপাদনের দিক থেকে কলা, কমলা ও আমের পরেই পেঁপে চতুর্থ প্রধান গ্রীষ্মমণ্ডলীয় ফল।

পেঁপের কচি চারা, পটভূমি হিসেবে দেওয়া; ছবিটি সুমনের নার্সারির নয়। ছবি: Ksd5 / উইকিমিডিয়া কমন্স (সিসি০)
পেঁপের কচি চারা, পটভূমি হিসেবে দেওয়া; ছবিটি সুমনের নার্সারির নয়। ছবি: Ksd5 / উইকিমিডিয়া কমন্স (সিসি০)

বিক্রি ও চারার হিসাব, প্রতিবেদন অনুযায়ী


দুই পত্রিকার উদ্ধৃত বরিশাল কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) তথ্য অনুযায়ী, গত পাঁচ বছরে সুমন কাঁচা ও পাকা মিলিয়ে প্রায় ৬০ লাখ টাকার পেঁপে এবং ১ কোটি ৬০ লাখ টাকার পেঁপের চারা বিক্রি করেছেন; এতে তার লাভ হয়েছে প্রায় ৬০ লাখ টাকা। জাগো নিউজ জানায়, শুধু আগের মৌসুমেই তিনি প্রায় ১৫ লাখ টাকার পেঁপে বিক্রি করেছেন এবং চলতি মৌসুমে কাঁচা ও পাকা মিলিয়ে ২০ থেকে ২৫ লাখ টাকার পেঁপে বিক্রির আশা করছেন; ঢাকা পোস্টে চলতি মৌসুমের এই প্রত্যাশা প্রায় ২৫ লাখ টাকা বলে উল্লেখ আছে। জাগো নিউজের তথ্যে, ২০২৬ সালের শুরু থেকে শুধু চারা বিক্রি করেই তিনি প্রায় ৭ লাখ টাকা লাভ করেছেন।

ব্যবসার বড় অংশ এখন চারা। দুই প্রতিবেদনে সুমনের দেওয়া হিসাব ছিল এ রকম:

  • ২০২৩: চারা বিক্রির প্রথম বছর, প্রায় ছয় হাজার চারা বিক্রি।
  • ২০২৪: প্রায় ৩৫ হাজার চারা বিক্রি।
  • ২০২৫: প্রায় ১৪ লাখ চারা বিক্রি।
  • ২০২৬: নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও জুলাইয়ে প্রতিবেদন প্রকাশের সময় পর্যন্ত ছয় লাখ চারা উৎপাদন ও বিক্রি।
  • ২০২৭: সারা দেশে ২০ লাখ চারা বিক্রির লক্ষ্য, যার জন্য এরই মধ্যে একটি আধুনিক পলি হাউস নির্মাণ করেছেন।

সুমন পত্রিকা দুটিকে জানান, খরচ বাদ দিয়ে প্রতিটি চারায় তার প্রায় পাঁচ টাকা লাভ থাকে। ঢাকা পোস্ট আরও জানায়, তার সাফল্য দেখে বাবুগঞ্জসহ বরিশালের বিভিন্ন এলাকার কৃষক বাণিজ্যিকভাবে পেঁপে চাষে আগ্রহী হয়েছেন। বিক্রি ও লাভের এসব অঙ্ক সুমন ও কৃষি কার্যালয় প্রতিবেদকদের যেভাবে জানিয়েছেন, সেভাবেই দেওয়া হলো; এগুলো নিরীক্ষিত হিসাব নয়।

মাছের ঘেরের পাড়ে সবজি


সুমনের খামারে পেঁপেই একমাত্র ফসল নয়। মাছের ঘেরের পাড়ে তিনি সাথী ফসল হিসেবে মিষ্টি কুমড়া, লাউ, চিচিঙা, ধুন্দুল, করলা ও বরবটিসহ নানা সবজি চাষ করেন। পুকুরপাড়ে মাচা পদ্ধতিতেও সবজি ফলান; দুই প্রতিবেদন অনুযায়ী, এ থেকে বছরে তার অতিরিক্ত কয়েক লাখ টাকা আয় হয়।

মাছ ও ফসলের এমন সমন্বিত চাষ বাংলাদেশের পরিবারগুলোর জন্য কী ফল দেয়, তা নিয়ে গবেষণা হয়েছে। উপকূলীয় বদ্বীপ অঞ্চলের ১ হাজার ১৮৮টি পরিবার নিয়ে করা এবং ২০২২ সালে ফুড সিকিউরিটি সাময়িকীতে প্রকাশিত এক নিবন্ধে আগের দুটি গবেষণার সারসংক্ষেপ দেওয়া হয়েছে: দে ও সহকর্মীদের (২০১৩) এবং মুরশেদ-ই-জাহান ও পেমসলের (২০১১) গবেষণায় দেখা গেছে, সমন্বিত মাছ ও ফসল চাষে কৃষকদের প্রশিক্ষণ দিলে তাদের কারিগরি দক্ষতা, উৎপাদনশীলতা ও নিট আয়ে উল্লেখযোগ্য ইতিবাচক প্রভাব পড়ে, যার ফলে পরিবারের খাদ্যগ্রহণ বাড়ে এবং পুষ্টি ভালো হয়। একই নিবন্ধে আহমেদ ও ওয়াইবেলের ২০১৯ সালের এক গবেষণার কথাও বলা হয়েছে, যাতে দেখা যায় বসতবাড়ির মাছ চাষে পরিবারে বেশি মাছ খাওয়া এবং বাড়তি নগদ আয়, দুই পথেই খাদ্যগ্রহণ ও খাদ্যের বৈচিত্র্য বেড়েছে।

প্রশিক্ষণ কেন্দ্র ও আশপাশের মানুষ


ঢাকা পোস্ট জানায়, সুমন ৪৮ শতাংশ জমির ওপর 'দেলোয়ারা এগ্রো ট্রেনিং সেন্টার' গড়ে তুলেছেন। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে তরুণ উদ্যোক্তা, বেকার যুবক, বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজের শিক্ষার্থী, এমনকি অবসরপ্রাপ্ত ব্যক্তিরাও সেখানে প্রশিক্ষণ নিতে আসেন। সুমন ঢাকা পোস্টকে বলেন, গত তিন বছরে তার প্রশিক্ষণ কেন্দ্র থেকে দুই হাজারের বেশি উদ্যোক্তা তৈরি হয়েছেন এবং তাদের অনেকে এখন সফলভাবে পেঁপে চাষ করছেন।

আবু বকর সিদ্দিকী সুমন জাগো নিউজকে বলেন, 'দেশে কৃষিই হতে পারে বেকারত্ব দূর করার অন্যতম কার্যকর মাধ্যম। মাত্র কয়েকটি গাছই বদলে দিতে পারে একজন বেকার চাকরিপ্রত্যাশী শিক্ষার্থীর জীবন।'

তিনি বলেন, 'আমি চাই বেকার যুবক ও শিক্ষার্থীরা কৃষিকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করুক। একজন শিক্ষার্থী যদি পড়াশোনার পাশাপাশি মাত্র ২৫টি উন্নত জাতের পেঁপে গাছ লাগিয়ে সঠিক পরিচর্যা করেন, তাহলে একটি মৌসুমেই প্রায় এক লাখ টাকা আয় করা সম্ভব। অন্যের চাকরির অপেক্ষায় না থেকে বাড়ির পতিত জমিকে কাজে লাগাতে হবে।' আয়ের এই হিসাব তার নিজের।

তিনি আরও বলেন, 'আমি আমার ট্রেনিং সেন্টারে বিনা মূল্যে পেঁপে চাষের প্রশিক্ষণ দিই। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে মানুষ এসে প্রশিক্ষণ নিয়ে সফল উদ্যোক্তা হচ্ছেন।' ঢাকা পোস্টকে তিনি বলেন, সরকারি আর্থিক সহায়তা বাড়ানো হলে আরও অনেক শিক্ষিত তরুণ কৃষিভিত্তিক উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে উঠতে পারবেন।

বায়লাখালী গ্রামের তরুণ সিহাব উদ্দিন জাগো নিউজকে বলেন, 'সুমন ভাই নিজে সফল হওয়ার পর এখন দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষ তার কাছে প্রশিক্ষণ নিতে আসছেন। অনেকে তার কাছ থেকে চারা নিয়ে সফলভাবে পেঁপে চাষ করছেন।' বাবুগঞ্জ ডিগ্রি কলেজের শিক্ষক মোস্তফা কামাল পত্রিকাটিকে জানান, সুমনের কাছ থেকে উন্নত জাতের চারা নিয়ে চাষ করে তিনি সফল হয়েছেন এবং শিক্ষকতার পাশাপাশি এটি তার নতুন আয়ের উৎস হয়েছে।

বাবুগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আব্দুর রউফ জাগো নিউজকে জানান, তাদের কার্যালয় একাধিকবার বাগানটি পরিদর্শন করেছে। তিনি বলেন, 'তিনি একজন পরিশ্রমী ও উদ্যমী কৃষি উদ্যোক্তা। উন্নতমানের পেঁপের চারা উৎপাদনের মাধ্যমে তিনি কৃষকদের সহায়তা করছেন। তার এই উদ্যোগ অন্যদের জন্যও অনুকরণীয়। তাকে অনুসরণ করে অনেক কৃষক বাণিজ্যিকভাবে পেঁপে চাষে এগিয়ে এলে কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে সব ধরনের সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে।'

বাবুগঞ্জ ও বরিশাল


বাবুগঞ্জ বরিশাল জেলার একটি উপজেলা, আয়তন ১৬৪.৮৭ বর্গকিলোমিটার। বাংলাপিডিয়ার বর্ণনায়, এর উত্তরে গৌরনদী উপজেলা, দক্ষিণে বরিশাল সদর ও ঝালকাঠি সদর, পূর্বে মুলাদী ও বরিশাল সদর এবং পশ্চিমে উজিরপুর। আড়িয়াল খাঁ, কালিজিরা ও সন্ধ্যাসহ কয়েকটি নদী এবং দেহেরগতি বিল ও রাজারবাড় খাল রয়েছে এ উপজেলায়। বাবুগঞ্জ থানা গঠিত হয় ১৯০৬ সালে, উপজেলা হয় ১৯৮৩ সালে। ২০১১ সালের আদমশুমারিতে এখানকার জনসংখ্যা ছিল ১ লাখ ৪০ হাজার ৩৬১।

কৃষিই এখানকার প্রধান জীবিকা। আদমশুমারিভিত্তিক বাংলাপিডিয়ার তথ্যে, বাবুগঞ্জের ৫০.৫৮ শতাংশ পরিবারের আয়ের প্রধান উৎস কৃষি; প্রধান ফসল ধান, আখ, ডাল, পান ও সবজি। প্রধান ফলের তালিকায় আম, কাঁঠাল, কলা, নারকেল, সুপারি ও জামের সঙ্গে পেঁপেও আছে, আর এখান থেকে বাইরে যায় সবজি, নারকেল ও সুপারিসহ নানা পণ্য। এ উপজেলাতেই রয়েছে দুর্গাসাগর, যাকে বাংলাপিডিয়া দক্ষিণ বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় দিঘি বলে বর্ণনা করেছে। বরিশাল শহর থেকে প্রায় ১১ কিলোমিটার দূরে মাধবপাশায় ১৭৮০ সালে খনন করা এই দিঘিতে শীতে অতিথি পাখি আসে।

পুরো বরিশাল জেলার আয়তন ২ হাজার ৭৮৪.৫২ বর্গকিলোমিটার; ২০১১ সালের আদমশুমারিতে জনসংখ্যা ছিল ২৩ লাখ ২৪ হাজার ৩১০। ১৭৯৭ সালে বাকেরগঞ্জ জেলা হিসেবে এর প্রতিষ্ঠা, পরে নাম হয় বরিশাল; ১৯৯৩ সালের ১ জানুয়ারি বরিশাল বিভাগ ঘোষিত হয়। বাংলাপিডিয়ার তথ্যে, জেলার ৪৮.২৫ শতাংশ পরিবারের আয়ের প্রধান উৎস কৃষি।

বরিশালের বাবুগঞ্জে সন্ধ্যা নদী; সুমন যে উপজেলায় চাষ করেন, এটি সেখানকার একটি নদী। ছবি: শাজিন শরীফ / উইকিমিডিয়া কমন্স (সিসি বাই-এসএ ৪.০)
বরিশালের বাবুগঞ্জে সন্ধ্যা নদী; সুমন যে উপজেলায় চাষ করেন, এটি সেখানকার একটি নদী। ছবি: শাজিন শরীফ / উইকিমিডিয়া কমন্স (সিসি বাই-এসএ ৪.০)

পেঁপেচাষিদের রোগবালাই ও ক্ষতি


রোগে খুব অল্প সময়ে একটি পেঁপে বাগান নষ্ট হয়ে যেতে পারে। ভারতের তামিলনাড়ু কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের ২০২৫ সালে থ্রি বায়োটেক সাময়িকীতে প্রকাশিত এক পর্যালোচনায় দেখা যায়, বিভিন্ন গোত্রের ২২টি ভাইরাস পেঁপেকে আক্রমণ করে বলে শনাক্ত হয়েছে। বিশ্বজুড়ে সবচেয়ে বেশি ছড়ানো ভাইরাসজনিত রোগ হলো পেঁপের রিংস্পট ও পাতা কোঁকড়ানো রোগ, যাতে প্রায়ই ফলন শতভাগ পর্যন্ত নষ্ট হয়। এসব ভাইরাস ছড়ায় মূলত জাবপোকা, সাদা মাছি ও লিফহপারের মতো পোকার মাধ্যমে; আর পেঁপের লেথাল ইয়েলোয়িং ও স্টিকি রোগের ভাইরাসসহ কয়েকটি বীজের মাধ্যমেও ছড়াতে পারে।

বাংলাদেশে ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির গবেষকেরা ২০২৪ সালে ডেটা ইন ব্রিফ সাময়িকীতে পেঁপে পাতার ছবির একটি তথ্যভান্ডার প্রকাশ করেন। ২০২৩ সালের ১২ জুলাই থেকে ২ আগস্ট ঢাকার আশুলিয়ার চানগাঁও এলাকায় তোলা ছবিতে পাতার চারটি রোগ চিহ্নিত হয়: অ্যানথ্রাকনোজ, ব্যাকটেরিয়াজনিত দাগ, পাতা কোঁকড়ানো ও রিংস্পট। গবেষকেরা লিখেছেন, রোগ পেঁপের উৎপাদনশীলতার একটি সাধারণ বাধা; এতে ফলের মান ও ফলন কমে এবং কৃষকের বড় আর্থিক ক্ষতি হয়।

ছত্রাকও ক্ষতি করে, অনেক সময় ফল তোলার পরে। ২০২৫ সালের জার্নাল অব ফাঙ্গাইয়ের গবেষণায় বলা হয়েছে, মূলত কোলেটোট্রিকাম গ্লিওস্পোরিওয়েডস ছত্রাকের কারণে হওয়া অ্যানথ্রাকনোজ মাঠে সাধারণত লুকিয়ে থাকে এবং পরিবহনের সময় ফল পাকতে শুরু করলে তবেই লক্ষণ দেখা দেয়; অযত্নে নাড়াচাড়ায় ফলে যে ক্ষত হয়, তা দিয়ে ফিউজেরিয়াম পচন ঢুকতে পারে। বাগানে রোগের লক্ষণ দেখলে দমন ব্যবস্থা জানতে চাষিদের উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার পরামর্শ নেওয়া উচিত।

পেঁপের রিংস্পট ভাইরাসে আক্রান্ত পাতায় মোজাইক দাগ, পটভূমি হিসেবে দেওয়া; ছবিটি বাংলাদেশে তোলা নয়। ছবি: Plant pests and diseases / উইকিমিডিয়া কমন্স (সিসি০)
পেঁপের রিংস্পট ভাইরাসে আক্রান্ত পাতায় মোজাইক দাগ, পটভূমি হিসেবে দেওয়া; ছবিটি বাংলাদেশে তোলা নয়। ছবি: Plant pests and diseases / উইকিমিডিয়া কমন্স (সিসি০)

তোলার পরে পেঁপে টাটকা রাখা


পেঁপে ক্লাইমেকটেরিক ফল, অর্থাৎ গাছ থেকে তোলার পরও পাকতে থাকে, তাই সংগ্রহের পর এর আয়ু কম। গাজীপুরের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে হেলিয়ন সাময়িকীতে লিখেছেন, বাংলাদেশে সংগ্রহোত্তর পর্যায়ে পেঁপের ক্ষতি ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ। গাজীপুরের শ্রীপুরের একটি বাগান থেকে তোলা স্থানীয় জাত 'বাদশা রাবি' নিয়ে করা পরীক্ষায় তারা কাইটোসান, অ্যালোভেরা জেল, সামুদ্রিক শৈবালের নির্যাস ও 'ক্লাইবায়ো' নামের একটি অণুজীবভিত্তিক মিশ্রণের প্রলেপ তুলনা করেন।

তারা দেখেছেন, পাকা বিলম্বিত করা ও সংরক্ষণকাল বাড়ানোর জন্য কাইটোসান ও ক্লাইবায়ো সবচেয়ে উপযোগী। সংরক্ষণ শুরুর পর নয় দিন পর্যন্ত কাইটোসানের প্রলেপ দেওয়া ফলে আর্দ্রতা, শর্করা, বিটা-ক্যারোটিন ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট সক্রিয়তা সবচেয়ে ভালো বজায় ছিল; আর ১২ দিন পর্যন্ত ভিটামিন সি ও রোগের প্রকোপসহ কয়েকটি মাপকাঠিতে ক্লাইবায়ো ভালো ফল দিয়েছে। পদ্ধতিটি সুপারিশের আগে বিভিন্ন মৌসুম ও জাতে আরও পরীক্ষার কথা বলেছেন গবেষকেরা।

বিনা মূল্যে চারা ও সম্মাননা


দুই প্রতিবেদনেই ব্যবসার বাইরে সুমনের কাজের কথা এসেছে। তিনি স্থানীয় মসজিদ, মাদরাসা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বিনা মূল্যে পেঁপের চারা বিতরণ করেন, দরিদ্র পরিবার ও প্রতিবেশীদের উন্নত জাতের চারা দিয়ে চাষে উৎসাহিত করেন এবং নিজের বাগানের পেঁপে নিয়মিত বিনা মূল্যে স্থানীয় এতিমখানায় সরবরাহ করেন।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, অল্প জমিতে বেশি ফলনের স্বীকৃতি হিসেবে দেশ-বিদেশ থেকে তিনি সাতটি সম্মাননা ও পুরস্কার পেয়েছেন। এর মধ্যে রয়েছে নেপাল থেকে কৃষি সম্মাননা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বীকৃতি এবং ভারতের মহাত্মা গান্ধী ও মাদার তেরেসা সম্মাননা। ঢাকা পোস্ট জানায়, নেপালের পার্লামেন্টে এবং ভারতে গিয়ে তিনি নিজ হাতে এসব সম্মাননা গ্রহণ করেছেন।

ছবি: সেলিম খন্দকার / উইকিমিডিয়া কমন্স (সিসি বাই-এসএ ৩.০)

সূত্র: জাগো নিউজ, ঢাকা পোস্ট, বাংলাপিডিয়া, ডেটা ইন ব্রিফ (২০২৪), হেলিয়ন (২০২৪), জার্নাল অব ফাঙ্গাই (২০২৫), থ্রি বায়োটেক (২০২৫), ফুড সিকিউরিটি (২০২২)

অনলাইন ডেস্কদা এগ্রো নিউজ

ফল

সম্পর্কিত খবর

ইসলাম

স্পেনের জলপাই খামারে আন্দালুসের ইসলামি ঐতিহ্য তুলে ধরছেন এক মুসলিম দম্পতি

মালাগার কাছে ৩৫ একরের খামারবাড়ি কিনে ‘হাউস অব আন্দালুস’ গড়ছেন হেনরিয়েটা সোভাতি ও ইমাম আজমল মাসরুর; সেখানে ৪০০ জলপাইগাছ, পরিকল্পনা কোরআনিক বাগান ও গ্রন্থাগারের।

বার্তা২৪১ নভেম্বর ২০২৬২ মিনিটের পড়া
এগ্রোটেক

বিনায় চালু হলো গামা ইরেডিয়েশন প্রযুক্তি, কৃষিপণ্য রপ্তানিতে নতুন সুযোগ

গাজীপুরে বিনার আঞ্চলিক কেন্দ্রে ৮৯ কোটি টাকার গামা ইরেডিয়েশন সেন্টার চালু হয়েছে; এতে আম-কাঁঠালের মতো কৃষিপণ্য জীবাণুমুক্ত করে বেশি দিন রাখা যাবে।

এগ্রিকেয়ার২৪১ নভেম্বর ২০২৬১ মিনিটের পড়া
ফল

ফুলবাড়িয়ার ছয় গ্রামে লেবুর বাগান, এক মৌসুমে ৯৫ কোটি টাকা বিক্রির আশা

ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়ায় এবার ৭৫৪ হেক্টরের বেশি জমিতে লেবুর আবাদ; কৃষি বিভাগের হিসাবে এ মৌসুমে প্রায় ৯৫ কোটি টাকার লেবু বিক্রি হতে পারে।

এগ্রিকেয়ার২৪১ নভেম্বর ২০২৬১ মিনিটের পড়া

মন্তব্য

(০)