বৈশাখের মাঝামাঝি সময়ে দেশের নানা প্রান্তে একই ব্যস্ততা। হাওরে কম্বাইন হারভেস্টারের শব্দ, উঠানে উঠানে ধান মাড়াই আর শুকানোর তোড়জোড়, হাটে নতুন ধানের দর নিয়ে দরদাম। ঢাকায় খাদ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারাও তখন তাকিয়ে থাকেন মাঠের দিকে, কারণ এই কয়েক সপ্তাহে যে ধান ঘরে ওঠে, তার ওপরই নির্ভর করে সারা বছর চালের দাম কেমন থাকবে, গুদামে কতটা মজুত হবে, আমদানি লাগবে কি না। এই ধানের নাম বোরো।
বোরো ধানের চাষ বাংলাদেশের কৃষি ও অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এটি খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি কৃষকের আয় বাড়ায়, গ্রামে কাজের সুযোগ তৈরি করে এবং দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে সহায়তা করে। কেন এই একটি মৌসুম এত গুরুত্বপূর্ণ, তার কারণগুলো একে একে দেখা যাক।
খাদ্য নিরাপত্তার প্রধান ভরসা
বোরো ধান দেশের মোট চাল উৎপাদনের সবচেয়ে বড় অংশ জোগায়। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর প্রাথমিক হিসাব নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে দেশে মোট চাল উৎপাদন প্রথমবারের মতো ৪ কোটি টন ছাড়ায়, আর তার মধ্যে বোরো মৌসুম থেকে এসেছিল প্রায় ২ কোটি ১০ লাখ টন। অর্থাৎ দেশের অর্ধেকের বেশি চাল আসে এই এক মৌসুম থেকে। অন্য একটি হিসাবে এই অংশ প্রায় ৫৫ শতাংশ।
সে বছর বোরো আবাদ হয়েছিল প্রায় ৪৮ লাখ ৭৮ হাজার হেক্টর জমিতে। এত বিপুল এলাকা জুড়ে একটি ফসল, যার ওপর নির্ভর করে প্রায় সতেরো কোটি মানুষের প্রধান খাদ্য, এর চেয়ে বড় খাদ্য নিরাপত্তার প্রশ্ন দেশে আর নেই। বোরো ভালো হলে বাজার শান্ত থাকে; বোরো মার খেলে দাম বাড়ে, আর তার চাপ সবচেয়ে বেশি পড়ে নিম্ন আয়ের মানুষের ওপর, যাঁদের আয়ের বড় অংশই যায় চাল কিনতে।
চালের দাম সাধারণ মানুষের জীবনে কতটা প্রভাব ফেলে, তার একটি মাপ খাদ্য মূল্যস্ফীতি। দ্য ডেইলি স্টারের একই প্রতিবেদনে দেখা যায়, রেকর্ড উৎপাদনের বছর ২০২৩-২৪ অর্থবছরেও খাদ্য মূল্যস্ফীতি আগের বছরের ৮.৭১ শতাংশ থেকে বেড়ে ১০.৬৫ শতাংশে পৌঁছেছিল। অর্থাৎ উৎপাদন বাড়লেই দাম কমবে, এমন নিশ্চয়তা নেই; তবে উৎপাদন কমলে দামের চাপ যে আরও বাড়ত, তাতে সন্দেহ নেই।
বোরো ভালো হলে আমদানি কমে
বোরোর গুরুত্ব সবচেয়ে পরিষ্কার বোঝা যায় আমদানির হিসাবে। দ্য ডেইলি স্টারের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে চাল উৎপাদন আগের বছরের চেয়ে ৪.১ শতাংশ বেড়েছিল, যা ছয় বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ প্রবৃদ্ধি এবং টানা পঞ্চম বছরের বৃদ্ধি। সে বছর দেশে কোনো চাল আমদানি করতে হয়নি, অথচ আগের অর্থবছরে আমদানি হয়েছিল প্রায় ১০ লাখ ৫৬ হাজার টন।
একই প্রতিবেদনে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের সাবেক নির্বাহী চেয়ারম্যান ওয়াইস কবির এই প্রবৃদ্ধির কারণ হিসেবে কৃষকদের আধুনিক, উচ্চফলনশীল ও হাইব্রিড জাতের দিকে ঝুঁকে পড়ার কথা বলেছেন। তবে বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের গবেষক এম আসাদুজ্জামান সতর্ক করেছেন, উৎপাদন হিসাবে যতটা দেখানো হয়েছে, বাস্তবে ততটা বাড়েনি; চালের উঁচু দামই সরবরাহ ঘাটতির ইঙ্গিত দেয়। উৎপাদনের পরিসংখ্যান নিয়ে এমন প্রশ্ন বিশেষজ্ঞদের মধ্যে বারবার উঠেছে।
পরের বছরের ছবি ছিল ভিন্ন। ২০২৪ সালের আগস্ট-সেপ্টেম্বরে দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে আকস্মিক বন্যায় আমনের বড় ক্ষতি হয়, চট্টগ্রাম, সিলেট ও ময়মনসিংহ বিভাগে প্রায় ১০ লাখ টন ধান নষ্ট হয়। ফলে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে চাল আমদানি দাঁড়ায় ১৪ লাখ ৩৬ হাজার টনে, যা সাত বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। সে বছর বোরো উৎপাদনের হিসাব নিয়ে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ও যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগের প্রাক্কলনে পার্থক্য ছিল, প্রথমটি ২ কোটি ২৬ লাখ টন আর দ্বিতীয়টি ২ কোটি ৫ লাখ টন। দেশের বার্ষিক চালের চাহিদা ধরা হয় প্রায় ৩ কোটি ৮০ লাখ টন।
এই দুই বছরের তুলনা একটি কথাই বলে: আমন বা আউশ যখন বন্যায় মার খায়, তখন ঘাটতি সামাল দেওয়ার প্রধান ভরসা হয়ে দাঁড়ায় বোরো। বোরো ভালো হলে আমদানির চাপ কমে, বৈদেশিক মুদ্রা বাঁচে; বোরোও খারাপ হলে দেশকে বিদেশি বাজারের ওপর নির্ভর করতে হয়, যেখানে দাম আর সরবরাহ কোনোটাই নিজের নিয়ন্ত্রণে থাকে না।
বছরজুড়ে ধানের ধারাবাহিকতা
বাংলাদেশে বছরে তিনবার ধান ওঠে। বর্ষার আগে আউশ, বর্ষার শেষে হেমন্তে আমন, আর শীত পেরিয়ে গ্রীষ্মের শুরুতে বোরো। বোরো চাষ হয় শীতকালীন মৌসুমে এবং কাটা হয় গ্রীষ্মের শুরুতে। আমন কাটার কয়েক মাস পর যখন গুদামের ধান কমে আসে, ঠিক তখনই বোরোর নতুন ধান বাজারে আসে।
এতে সারা বছর ধান উৎপাদনের একটি ধারাবাহিকতা বজায় থাকে। এক মৌসুমের ফসল ফুরানোর আগেই আরেক মৌসুমের ফসল আসে, ফলে বাজারে সরবরাহে বড় ফাঁক তৈরি হয় না। বোরো না থাকলে বছরের একটা বড় সময় দেশকে পুরোপুরি মজুত আর আমদানির ওপর চলতে হতো। আমন, আউশ আর বোরো মিলে যে চক্র, তার প্রতিটি অংশ একে অপরের ঘাটতি পূরণ করে; তবে এই চক্রের সবচেয়ে ভারী অংশটি এখন বোরো।
সেচের কারণে খরার ঝুঁকি কম
বোরো ধান সেচনির্ভর, আর এটিই এর বড় শক্তি। আমন চাষ অনেকটা বৃষ্টির ওপর নির্ভর করে; বৃষ্টি দেরিতে এলে বা মাঝপথে থেমে গেলে ফলন মার খায়। বোরো চাষের পানি আসে নলকূপ, নদী বা খাল থেকে পাম্পে তুলে, তাই বৃষ্টির খামখেয়ালির প্রভাব এতে কম পড়ে।
স্বাধীনতার পর কয়েক দশকে দেশজুড়ে অগভীর ও গভীর নলকূপ আর পাম্প ছড়িয়ে পড়ায় বোরো এখন দেশের প্রায় সব অঞ্চলে চাষ হয়। কুমিল্লায় গোমতী নদী থেকে পাম্পে পানি তুলে খেতে দেওয়ার যে দৃশ্য, তা এই সেচ-বিপ্লবেরই একটি ছবি। সেচ ব্যবস্থার উন্নতি যত হয়েছে, বোরো তত ছড়িয়েছে, আর দেশের চাল উৎপাদনও বেড়েছে সেই অনুপাতে।
তবে এই শক্তির একটি সীমাও আছে। ভূগর্ভস্থ পানি ব্যাপকভাবে তোলার কারণে কিছু অঞ্চলে পানির স্তর নেমে যাচ্ছে। সে কারণে বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট বা ব্রি পর্যায়ক্রমে ভেজানো ও শুকানো নামের একটি পদ্ধতি প্রচলন করেছে, যাতে খেতে সব সময় পানি জমিয়ে না রেখে মাটি কিছুটা শুকালে তবেই আবার সেচ দেওয়া হয়। ব্রির রাইস নলেজ ব্যাংকের তথ্যমতে, এতে ফলন না কমিয়েই সেচের পানি প্রায় ১৫ থেকে ৩০ শতাংশ সাশ্রয় হয়। বোরোর গুরুত্ব টিকিয়ে রাখতে হলে পানির হিসাবি ব্যবহার এখন জরুরি।
খরচের দিক থেকেও এই পদ্ধতি লাভজনক। দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের একটি প্রতিবেদনে এটিকে এমন পদ্ধতি হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে, যা ধানের সেচ খরচ ২০ থেকে ২৫ শতাংশ কমায়। গবেষণায় উঠে এসেছে, বোরোর জন্য ব্যাপক হারে ভূগর্ভস্থ পানি তোলাই পানির স্তর নেমে যাওয়ার প্রধান কারণ, বিশেষ করে রংপুর বিভাগে, যা এখন জাতীয় পর্যায়ের উদ্বেগ। প্রায় ৪৮ লাখ হেক্টর সেচনির্ভর বোরো জমির সবটাতেই এই পদ্ধতি প্রয়োগের সুযোগ আছে বলে গবেষকেরা বলেন।
উচ্চ ফলন
বোরো মৌসুমে মূলত উচ্চফলনশীল জাতের ধান চাষ হয়, তাই এর চাষ থেকে বেশি পরিমাণ চাল পাওয়া যায়। প্রতি হেক্টরে ৫ থেকে ৮ টন ধান উৎপাদনের সক্ষমতা রয়েছে। শীতের শুকনো মৌসুমে রোদ বেশি, মেঘ কম, আর পানি কৃষকের নিয়ন্ত্রণে থাকে, তাই ধানগাছ তার সম্ভাব্য ফলনের কাছাকাছি পৌঁছাতে পারে।
দীর্ঘদিন বোরোর প্রধান দুই জাত ছিল ব্রি ধান২৮ ও ব্রি ধান২৯। বয়সের ভারে এদের ফলন সক্ষমতা কমে আসায় ব্রি নতুন জাত এনেছে। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী মাঠ পর্যায়ে ব্রি ধান৮৯-এর গড় ফলন হেক্টরে প্রায় ৮ টনের কাছাকাছি, যা ব্রি ধান২৯-এর চেয়ে আধা টন থেকে এক টন বেশি। নতুন জাত যত দ্রুত কৃষকের হাতে পৌঁছাবে, একই জমি থেকে তত বেশি চাল আসবে।
নতুন জাতের মধ্যে ২০১৮ সালে অবমুক্ত ব্রি ধান৮৮ প্রায় ১৪০ থেকে ১৪৩ দিনে পাকে এবং হেক্টরে প্রায় ৭ টন ফলন দিতে পারে। কম সময়ে পাকা এমন জাত বিশেষ কাজে আসে সেসব এলাকায়, যেখানে আগাম বন্যার আগে ধান তুলতে হয় বা বোরোর পর আরেকটি ফসল লাগানোর তাড়া থাকে। বেশি ফলন আর কম জীবনকাল, এই দুইয়ের ভারসাম্যই এখন বোরো জাত উন্নয়নের মূল লক্ষ্য।
কৃষকের আয় ও সরকারি সংগ্রহ
বোরো ধানের উৎপাদন সরাসরি কৃষকের আয় বাড়ায়। অনেক কৃষক পরিবারের কাছে বোরোই বছরের সবচেয়ে বড় নগদ আয়ের উৎস। এই ধান বিক্রির টাকায় শোধ হয় সার-বীজ-সেচের দেনা, চলে সন্তানের পড়াশোনা, ঘর মেরামত বা পরের মৌসুমের প্রস্তুতি। একই সঙ্গে পরিবারের সারা বছরের খোরাকের বড় অংশও রেখে দেওয়া হয় এই ফসল থেকে।
কৃষক যাতে ন্যায্য দাম পান এবং সরকারি মজুত গড়ে ওঠে, সে জন্য সরকার প্রতি বোরো মৌসুমে সরাসরি ধান ও চাল কেনে। ২০২৫ সালের বোরো সংগ্রহ অভিযানে সরকার প্রতি কেজি ধান ৩৬ টাকা এবং চাল ৪৯ টাকা দরে কেনার ঘোষণা দেয়। লক্ষ্য ছিল সাড়ে ৩ লাখ টন ধান, ১৪ লাখ টন সেদ্ধ চাল এবং ৫০ হাজার টন আতপ চাল।
এখানে দুই ধরনের চালের কথা আসে। সেদ্ধ চাল তৈরি হয় ধান পানিতে ভিজিয়ে ভাপ দিয়ে শুকিয়ে তারপর ভাঙিয়ে; দেশের বেশির ভাগ মানুষ এই চালই খান। আতপ চাল তৈরি হয় ধান সেদ্ধ না করে সরাসরি শুকিয়ে ভাঙিয়ে। সরকার কৃষকের কাছ থেকে সরাসরি ধান কেনে, আর চালকল মালিকদের কাছ থেকে কেনে চাল।
সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত খাদ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, সেই অভিযানে ৩ লাখ ৭৬ হাজার ৯৪২ টন ধান, ১৪ লাখ ৬ হাজার ৫৩৩ টন সেদ্ধ চাল এবং ৫১ হাজার ৩০৭ টন আতপ চাল সংগ্রহ করা হয়, যাকে মন্ত্রণালয় দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ সংগ্রহ বলে দাবি করেছে। এই মজুত পরে খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি, খোলাবাজারে বিক্রি ও নানা সহায়তা কর্মসূচিতে কাজে লাগে। সরকারি ক্রয়ের আরেকটি উদ্দেশ্য হলো মৌসুমের শুরুতে বাজারে যখন একসঙ্গে প্রচুর ধান আসে এবং দাম পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে, তখন একটি নির্ধারিত দর ঘোষণা করে কৃষককে কিছুটা সুরক্ষা দেওয়া। যদিও সংগ্রহের পরিমাণ মোট উৎপাদনের তুলনায় ছোট, তবু ঘোষিত দর বাজারের জন্য একটি সংকেত হিসেবে কাজ করে।
চাল রপ্তানি ও বৈদেশিক মুদ্রার সম্ভাবনা
বোরো উৎপাদন বাড়লে চাল রপ্তানি করে বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের সুযোগও তৈরি হয়। উচ্চমানের ধান থেকে পাওয়া চাল আন্তর্জাতিক বাজারে বিক্রি করা সম্ভব, আর তাতে দেশের অর্থনীতিতে বৈদেশিক মুদ্রার অবদান বাড়ে।
তবে বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশ এখনো প্রধানত নিজের চাহিদা মেটাতেই চাল উৎপাদন করে, আর ঘাটতির বছরে চাল আমদানিও করতে হয়। রপ্তানি এখন সীমিত মূলত সুগন্ধি চালে, আর সেটিও সরকারের অনুমোদিত কোটার মধ্যে। ২০২২-২৩ অর্থবছরে সুগন্ধি চাল রপ্তানি পুরোপুরি বন্ধ রাখা হয়েছিল; ২০২৫ সালে ধাপে ধাপে অনুমোদন দিয়ে তা আবার চালু হয়। অর্থাৎ রপ্তানির সম্ভাবনা বাস্তবে রূপ নিতে হলে আগে দেশের চাহিদা মিটিয়ে নিয়মিত উদ্বৃত্ত তৈরি করতে হবে, আর সেখানে বোরোর ফলন বাড়ানোই মূল চাবিকাঠি।
গ্রামের শ্রমজীবী মানুষের কাজ
বোরো ধানের চাষ, পরিচর্যা, সেচ আর ফসল কাটার সময় বিপুল সংখ্যক শ্রমিকের প্রয়োজন হয়। বীজতলা তৈরি, চারা তোলা ও রোপণ, আগাছা পরিষ্কার, সার দেওয়া, পাম্প চালানো, ধান কাটা, আঁটি বাঁধা, মাড়াই, শুকানো, প্রতিটি ধাপে হাতের কাজ লাগে। এর ফলে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর, বিশেষ করে ভূমিহীন কৃষিশ্রমিকদের, মৌসুমি কর্মসংস্থান নিশ্চিত হয়।
কাজ শুধু মাঠেই নয়। সেচ পাম্পের মালিক ও চালক, সার ও বীজের দোকানদার, ধান পরিবহনের নৌকা আর ট্রাক, চালকল ও চাতালের শ্রমিক, সবার আয় জড়িয়ে আছে বোরোর সঙ্গে। ধান কাটার মৌসুমে অনেক এলাকার শ্রমিক দল বেঁধে হাওরসহ দূরের জেলায় কাজ করতে যান। কয়েক সপ্তাহের এই কাজ থেকে যে মজুরি আসে, অনেক ভূমিহীন পরিবারের কাছে তা বছরের একটি গুরুত্বপূর্ণ আয়।
অবশ্য সময় বদলাচ্ছে। শ্রমিকেরা শহরে ও অন্য পেশায় চলে যাওয়ায় অনেক এলাকায় ধান কাটার মৌসুমে শ্রমিকসংকট দেখা দেয়, বিশেষ করে টানা বৃষ্টির সময় যখন দ্রুত ধান কাটা জরুরি। এ কারণে কম্বাইন হারভেস্টারের ব্যবহার বাড়ছে, যা একসঙ্গে ধান কাটে, মাড়াই করে ও ঝাড়ে। সরকার হাওর এলাকায় এমন যন্ত্র কিনতে ৭০ শতাংশ এবং সমতলে ৫০ শতাংশ ভর্তুকি দিয়েছে।
কম্বাইন হারভেস্টারের সুবিধা শুধু শ্রমিকের ঘাটতি পূরণ নয়। হাওরে যেখানে আগাম ঢলের আগে কয়েক দিনের মধ্যে ধান তুলে ফেলতে হয়, সেখানে এই যন্ত্র সময় বাঁচিয়ে ফসল রক্ষা করে। তবে যন্ত্রের দাম বেশি, আর কাদা বা নিচু জমিতে চালানো কঠিন, তাই ভর্তুকি সত্ত্বেও এর বিস্তার নিয়ে নানা জটিলতা রয়ে গেছে বলে সংবাদমাধ্যমে উঠে এসেছে।
জলবায়ু পরিবর্তন সহনশীল জাত
বোরো ধানের উন্নত জাতগুলো খরা, লবণাক্ততা ও রোগবালাই মোকাবিলায় সক্ষম, যা জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় সহায়ক। উপকূলীয় অঞ্চলে শুকনো মৌসুমে মাটি ও পানিতে লবণ বাড়ে, যা সাধারণ ধানের জন্য ক্ষতিকর। এসব এলাকার জন্য ব্রি লবণসহিষ্ণু বোরো জাত উদ্ভাবন করেছে।
যেমন ব্রি ধান৬৭। ব্রির তথ্য অনুযায়ী এই জাত চারা অবস্থায় ১২ ডেসিসিমেন্স প্রতি মিটার এবং পুরো জীবনকালে ৮ ডেসিসিমেন্স প্রতি মিটার মাত্রার লবণাক্ততা সইতে পারে এবং লবণের মাত্রাভেদে হেক্টরে ৩.৮ থেকে ৭.৪ টন ফলন দেয়। এর আগে ব্রি ধান৪৭ বোরো মৌসুমের লবণসহিষ্ণু জাত হিসেবে কৃষকের মাঠে যাচাইয়ের মাধ্যমে বাছাই করা হয়েছিল। এসব জাতের কল্যাণে উপকূলের যে জমি শীতে পতিত পড়ে থাকত, তার একাংশে এখন ধান হয়।
রোগ প্রতিরোধও সমান জরুরি। ২০১৭ সালের বোরো মৌসুমে ব্লাস্ট রোগে ব্রি ধান২৮ ও ব্রি ধান২৯ ব্যাপকভাবে আক্রান্ত হয়েছিল বলে গবেষণায় উঠে এসেছে। নতুন, রোগসহিষ্ণু জাত ছড়িয়ে দেওয়া তাই শুধু ফলন বাড়ানোর প্রশ্ন নয়, ঝুঁকি কমানোরও প্রশ্ন। নতুন জাতের বীজ কৃষকের হাতে পৌঁছে দিতে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ও বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের বীজ বিতরণ ও মাঠ প্রদর্শনী বড় ভূমিকা রাখে, কারণ কৃষক সাধারণত নিজের চোখে ফল দেখে তবেই নতুন জাতে আস্থা রাখেন।
প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনের মাঠ
বোরো ধান চাষে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার সবচেয়ে বেশি: সেচযন্ত্র, উচ্চফলনশীল বীজ, সুষম সার, বালাইনাশক আর এখন ধান কাটার যন্ত্র। বলা যায়, বাংলাদেশের কৃষির আধুনিকায়নের সবচেয়ে বড় পরীক্ষাক্ষেত্র বোরোর মাঠ।
নতুন কোনো পদ্ধতি সাধারণত প্রথমে বোরোতেই পরীক্ষা হয়, কারণ এখানে পানি ও সময় দুটোই কৃষকের নিয়ন্ত্রণে থাকে। পানি সাশ্রয়ী সেচ পদ্ধতি বাংলাদেশে প্রথম মাঠ পরীক্ষা হয়েছিল ২০০৫ সালে ব্রিতে, বোরো মৌসুমেই। এভাবে বোরো চাষ কৃষির আধুনিকীকরণে বড় ভূমিকা রাখছে।
সামাজিক স্থিতিশীলতা ও দুর্যোগের প্রস্তুতি
বোরো ধানের উৎপাদন বাজারে চালের প্রাপ্যতা বাড়ায়, আর তাতে সামাজিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত হয়। চালের দাম হঠাৎ বেড়ে গেলে দরিদ্র পরিবারের খাবারের থালায় টান পড়ে, অসন্তোষ বাড়ে; পর্যাপ্ত উৎপাদন সেই ঝুঁকি কমায়।
দেশে খাদ্য মজুত থাকলে বন্যা, ঘূর্ণিঝড় বা অন্য দুর্যোগের সময় খাদ্যসংকট কম হয়। সরকারি গুদামে বোরো মৌসুমে সংগ্রহ করা ধান-চালই দুর্যোগকালে ত্রাণ ও খোলাবাজারে বিক্রির প্রধান উৎস হয়ে ওঠে।
উল্টো দিকটিও দেখা গেছে। ২০১৭ সালে সুনামগঞ্জসহ হাওর অঞ্চলে আগাম ঢলে পাকার আগেই বিস্তীর্ণ বোরো খেত তলিয়ে যায়। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের হিসাবে প্রায় ২ লাখ হেক্টরের বোরো পানির নিচে চলে যায় এবং প্রায় ৬ লাখ টন ফসলের ক্ষতি হয়। সংবাদমাধ্যমের হিসাবে দেশের বোরো উৎপাদনের প্রায় ২০ শতাংশ আসে হাওর থেকে, তাই সেখানকার ক্ষতি সারা দেশের খাদ্য পরিস্থিতিতে প্রভাব ফেলে।
হাওরের একমাত্র ভরসা
সিলেট, সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার, নেত্রকোনা ও কিশোরগঞ্জের হাওরাঞ্চলে বোরোর গুরুত্ব আরও গভীর। বর্ষায় এই বিস্তীর্ণ নিচু জমি মাসের পর মাস পানির নিচে থাকে, তখন সেখানে কোনো ফসল হয় না। শীতে পানি নামলে সেই জমিতে বোরো লাগানো হয়, আর অনেক কৃষক পরিবারের সারা বছরের একমাত্র ফসল এটিই।
তাই হাওরে বোরো মানে শুধু আয় নয়, সারা বছরের খোরাক, ঋণ শোধ, বিয়েশাদি, সন্তানের পড়াশোনা, সবকিছুর হিসাব। চৈত্রের শেষে বা বৈশাখের শুরুতে উজানের ভারী বৃষ্টিতে আগাম ঢল নামলে কয়েক দিনের মধ্যে পাকা বা আধাপাকা ধান তলিয়ে যেতে পারে। সে কারণে প্রতি বছর হাওরের ফসল রক্ষা বাঁধ সময়মতো মেরামত হলো কি না, তা নিয়ে এলাকাবাসীর উদ্বেগ থাকে, আর ধান কাটার সময় প্রতিটি দিন গোনা হয়।
হাওরের এই ঝুঁকি কমাতে তিনটি বিষয়ের ওপর জোর দেওয়া হয়: কম জীবনকালের জাত, যাতে ঢলের আগেই ধান পাকে; সময়মতো বাঁধ মেরামত; আর কম্বাইন হারভেস্টারের মতো যন্ত্র, যাতে পাকা ধান দ্রুত কাটা যায়। বোরোর জাতীয় গুরুত্ব ধরে রাখতে হলে হাওরের কৃষককে এই সুরক্ষা দেওয়া জরুরি।
যে ফসলের দিকে তাকিয়ে থাকে পুরো দেশ
সব মিলিয়ে বোরো ধান বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক উন্নয়ন আর কৃষি উৎপাদনে একটি অনন্য স্থান দখল করে আছে। এটি দেশের অর্ধেকের বেশি চাল জোগায়, বছরজুড়ে সরবরাহ ধরে রাখে, খরার ঝুঁকি কমায়, কৃষকের আয় আর গ্রামের কাজ তৈরি করে, এবং দুর্যোগের দিনে খাদ্যের মজুত গড়ে দেয়।
এই গুরুত্ব ধরে রাখতে হলে কয়েকটি কাজ জরুরি: ভূগর্ভস্থ পানির হিসাবি ব্যবহার, পুরোনো জাতের জায়গায় বেশি ফলনের ও সহনশীল নতুন জাত, হাওরে সময়মতো বাঁধ মেরামত ও দ্রুত ধান কাটার ব্যবস্থা, আর কৃষকের ন্যায্য দাম নিশ্চিত করা। সঠিক ব্যবস্থাপনা ও উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করে বোরো ধানের উৎপাদন আরও বাড়ানো সম্ভব, যা দেশের সার্বিক উন্নয়নে সহায়ক হবে।
ছবি: কুমিল্লায় গোমতী নদী থেকে পাম্পে সেচ, Mohammed Tawsif Salam / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 3.0)





মন্তব্য
(০)