সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার নারায়ণতলা গ্রামের মো. লস্কর আলী (৭১) ৪৫ বছর ধরে ঘোড়ায় টানা কাঠের ঘানিতে খাঁটি শর্ষের তেল ভাঙাচ্ছেন। শুরুতে যে প্রতিজ্ঞা করেছিলেন—তেলে ভেজাল দেবেন না—তা থেকে এক দিনের জন্যও সরেননি। জেলা সদর থেকে ১৯ কিলোমিটার দূরের এই সীমান্তঘেঁষা গ্রামের তেল এখন শহরের ক্রেতারাও নিয়মিত কেনেন। এই ব্যবসাতেই তাঁর সংসারে সচ্ছলতা এসেছে, আর গত ৩১ ডিসেম্বর সুনামগঞ্জ সদর উপজেলা প্রশাসন তাঁকে সম্মাননা দিয়েছে।
লস্কর আলীর পরিবার মূলত কৃষিজীবী। স্বাধীনতার পরপর নরসিংদী থেকে তাঁরা সুনামগঞ্জের সীমান্ত এলাকায় এসে বসতি গড়েন; তখন তাঁর বয়স ছিল ১৪। ১৯৮০ সালে একই গ্রামের ফুলজান বিবিকে বিয়ে করেন। ফুলজানদের বাড়িতে গরুতে টানা ঘানিতে শর্ষের তেল ভাঙানোর কাজ হতো। বিয়ের বছরই সংসারে অভাব দেখা দিলে ফুলজান বিবিই স্বামীকে ঘানির কাজ শুরু করার পরামর্শ দেন। কাজটি লস্কর আলী জানতেন না, ফুলজান জানতেন। গ্রামের অন্য কয়েকটি ঘানির তেলে ভেজালের অভিযোগ থাকায় ফুলজান বিবির শর্ত ছিল একটাই—তাঁরা ভেজাল দেবেন না।
সেই থেকে শর্ষের আবাদ, কাটা-মাড়াই, শুকানো ও প্রক্রিয়াজাত—সবই স্বামী-স্ত্রী মিলে করতেন, আর লস্কর আলী বাজারে বাজারে তেল বিক্রি করতেন। এখন আর বাজারে যেতে হয় না; ক্রেতারা বাড়ি থেকেই তেল নিয়ে যান, জেলা সদরের নিয়মিত ক্রেতাদের তেল তিনি নিজে পৌঁছে দেন। ফুলজান বিবি ২০১৯ সালে মারা যান। এখন একমাত্র ছেলে হেলাল মিয়া (৩২) বাবার সঙ্গে ঘানি ঘরে সময় দেন।
ঘানি চলে দুই বেলা—সকাল ৭টা থেকে ১০টা এবং বেলা ৩টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা। দুই বেলায় ১০ কেজি শর্ষে থেকে ছয় কেজি তেল হয়, যা ছেঁকে পরিষ্কার করে প্রতি কেজি ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকায় বিক্রি করেন। নিজের জমির শর্ষের পাশাপাশি সুনামগঞ্জের ছাতক ও সিলেটের কোম্পানীগঞ্জ থেকে বছরে তিন থেকে সাড়ে তিন লাখ টাকার শর্ষে কিনে রাখেন; এখন প্রতি কেজি শর্ষের দাম পড়ছে ৭৫ থেকে ৮০ টাকা। লস্কর আলী বলেন, ‘এইটাতে পুঁজি, পরিশ্রম আর ধৈর্য লাগে। কঠিন কাম। ঘানিতে ঘোড়ার সঙ্গে একটা মানুষকে তিন ঘণ্টা সময় দিতে হয়।’
সব খরচ বাদে মাসে এখনো ৩০ থেকে ৪০ হাজার টাকা আয় হয় বলে জানান তিনি। এই আয়ে ঘর তুলেছেন, জমি কিনেছেন, চার মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন, ছেলেকে পড়িয়েছেন। ঘানির পাশাপাশি কৃষিকাজও করেন—জমির ধান বিক্রি করে শর্ষে কেনেন, আবাদ করেন বাদাম ও আলু। ২৯ বছর ইউনিয়ন পরিষদের দফাদার হিসেবে কাজ করে গত বছর অবসর নিয়েছেন। ৭৫ শতকের বাড়িতে আম, জাম, কাঁঠাল, লিচু, পেয়ারা, জাম্বুরা, কামরাঙার গাছ; পশ্চিম কোণে ১৫ ফুট বাই ১৫ ফুটের টিনের চালার ঘানি ঘর।
গ্রামের বাসিন্দা আবদুস সালাম জানান, শর্ষের সঙ্গে তিল মিশিয়ে দিলে কেউ বুঝতে পারত না, কিন্তু লস্কর আলী কখনোই তা করেননি। মুদিদোকানি মোহাম্মদ মুসা মিয়া (৫০) ও প্রতিবেশী আবদুল কুদ্দুস (৪৫) একই কথা বলেন। সুনামগঞ্জ শিল্প বণিক সমিতির জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি মোহাম্মদ জুয়েল মিয়া কয়েক বছর ধরে তাঁর কাছ থেকেই তেল নেন; শহরে তাঁর নিয়মিত গ্রাহক আছে।
গত বছরের ৩১ ডিসেম্বর সুনামগঞ্জ সদর উপজেলা প্রশাসন সমাজ উন্নয়নে বিশেষ ভূমিকার জন্য ছয় উদ্যোক্তাকে সম্মাননা দেয়; বিশুদ্ধ ও নিরাপদ পদ্ধতিতে খাঁটি শর্ষের তেল উৎপাদন ও বাজারজাতকরণে অবদানের জন্য লস্কর আলী ক্রেস্ট ও সম্মাননার অর্থ পান। অনুষ্ঠানে তৎকালীন ইউএনও সুলতানা জেরিন বলেন, দীর্ঘদিনের সততা, নিষ্ঠা ও পরিশ্রমেই সফলতা আসে, এবং লস্কর আলীর দায়িত্বশীলতা নতুন প্রজন্মের জন্য অনুকরণীয়। ভোজ্যতেলে ভেজালের অভিযোগ যখন নিয়মিত, তখন গ্রামীণ এই ঘানি দেখিয়ে দিচ্ছে, খাঁটি পণ্যের বাজার ও দাম দুটোই আছে।
সূত্র: প্রথম আলো





মন্তব্য
(০)