বিশ্ববিদ্যালয়ের দরজায় তালা, ক্লাস নেই, পরীক্ষা নেই, বন্ধুদের আড্ডাও নেই। করোনার সেই দীর্ঘ বন্ধের দিনগুলোতে দেশের লাখো শিক্ষার্থীর মতো মুন্সীগঞ্জের সাইফুল ইসলাম শাওনও ঘরবন্দী হয়ে পড়েছিলেন। কিন্তু সময়টা তিনি মোবাইলের পর্দায় হারিয়ে যেতে দেননি। উঠে গেছেন বাড়ির ছাদে। টব, ড্রাম আর মাটি নিয়ে শুরু করেছেন এক নতুন কাজ। আজ সেই ছাদে গোলাপ ফোটে, থাই লিলি দোলে, আর গাছে ঝোলে কাটিমন আম। এই ছাদ বাগানই জিতে নিয়েছে দা এগ্রো নিউজের 'শখের বাগান ঈদ কনটেস্ট'।
আমাদের একটুখানি হাতের ছোঁয়ায় ঘরের ছাদ কিংবা বারান্দা হয়ে উঠতে পারে নন্দনকানন। এই ভালোবাসার ছোঁয়াকে আরও একটু স্বীকৃতি দিতেই দা এগ্রো নিউজের পক্ষ থেকে আয়োজন করা হয়েছিল 'শখের বাগান ঈদ কনটেস্ট'। পাঠকেরা পাঠিয়েছিলেন নিজেদের বাগানের ছবি আর অভিজ্ঞতা। সেখান থেকে বিজয়ী হন বিশ্ববিদ্যালয়ের চতুর্থ বর্ষের ছাত্র সাইফুল ইসলাম শাওন। কত ভালোবাসা আর যত্ন দিয়ে তিনি বাগানটি গড়ে তুলেছেন, কী কৌশলে ছাদের ক্ষতি না করে গাছ লাগিয়েছেন, সেসব কথা শুনেছি তাঁর কাছ থেকেই।
লকডাউনের অবসরে এক টুকরো সবুজ
শাওনের বাড়ি মুন্সীগঞ্জ জেলায়। ঢাকার দক্ষিণে পদ্মা, মেঘনা আর ধলেশ্বরী ঘেরা এই জেলা আলু চাষের জন্য দেশজুড়ে পরিচিত। ঐতিহাসিক বিক্রমপুর অঞ্চলের অংশ এই জেলা; কৃষির সঙ্গে এখানকার মানুষের সম্পর্ক বহু পুরোনো, নদীর পলিতে উর্বর মাঠে আলু, ধান আর সবজির চাষ হয় সারা বছর। তবে শাওনের বাগান মাঠে নয়, বাড়ির ছাদে।
২০২০ সালের মার্চে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করা হয়। সেই বন্ধ চলেছিল এক বছরেরও বেশি সময় ধরে। শাওনের বিশ্ববিদ্যালয়ও বন্ধ ছিল পুরোটা সময়। অনেক শিক্ষার্থীর জন্য সেই সময় ছিল অনিশ্চয়তা, হতাশা আর একঘেয়েমির। শাওন সময়টা নষ্ট করেননি। নানা রকমের ফুল আর ফলের গাছ দিয়ে তিনি গড়ে তুলেছেন তাঁর শখের ছাদ বাগান।
লকডাউনের সময় শুধু শাওন নন, দেশের নানা শহরে অনেকেই ছাদে বা বারান্দায় বাগান শুরু করেছিলেন। ঘরে বসে থাকার একঘেয়েমি কাটানো, পরিবারের জন্য টাটকা সবজি ও ফল পাওয়া আর মানসিক প্রশান্তি, তিনটিই মিলেছিল গাছের যত্নে। সেই সময়ের শখ অনেকের কাছে এখন স্থায়ী অভ্যাস।
রঙে রঙে ফুলের সমারোহ
শাওনের ছাদে পা রাখলেই প্রথমে চোখ আটকায় ফুলে। তাঁর বাগানে আছে গোলাপ, অ্যাস্টার, পর্তুলাকা, কসমস, সন্ধ্যামালতী, মিলি, থাই লিলি, জাম্বু লিলি, অ্যামারিলিস লিলি, ক্রিনাম লিলি, হলুদ, সাদা ও গোলাপি রেইন লিলি, বেলী, নয়নতারা, অপরাজিতা, টগরসহ আরও নানা রকমের ফুলগাছ। যে কারও মন ভালো করে দেওয়ার মতো দৃশ্য।
এই তালিকায় আছে নানা স্বভাবের গাছ। পর্তুলাকা আর নয়নতারা কড়া রোদ সইতে পারে, অল্প যত্নেই প্রায় সারা বছর ফুল দেয়; ছাদের মতো খোলা, রোদেলা জায়গার জন্য এরা বেশ উপযোগী। সন্ধ্যামালতী ফোটে বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামার মুখে, নামটাই তার পরিচয়। রেইন লিলি বা বৃষ্টি লিলি বৃষ্টির পরপর হঠাৎ ফুটে ওঠে; সাদা, হলুদ, গোলাপি রঙের এই ছোট লিলিগুলো বর্ষায় ছাদ ভরিয়ে তোলে। অপরাজিতা লতানো গাছ, নীল ফুলে রেলিং বা মাচা ঢেকে দেয়। বেলী আর টগরের সুবাস সন্ধ্যার ছাদে আলাদা আমেজ আনে। আর গোলাপ তো বাগানের রানি; তবে তার যত্নও বেশি, নিয়মিত ছাঁটাই আর রোদ চাই।
বিভিন্ন জাতের লিলি শাওনের সংগ্রহের বিশেষ আকর্ষণ। লিলিজাতীয় অনেক গাছ মাটির নিচের কন্দ বা বাল্ব থেকে জন্মায়; একবার লাগালে বছরের পর বছর ফুল দেয়, আর কন্দ ভাগ করে নতুন গাছও করা যায়। এ কারণে ছাদ বাগানিদের কাছে লিলি জনপ্রিয়।
ছাদের ভার সইবার ক্ষমতা: প্রথম হিসাব
আলাপের শুরুতেই শাওন একটা জরুরি সতর্কবার্তা দিলেন। আমরা অনেকেই ভাবি, মাটির আর কত ওজন হবে! কিন্তু একটা পুরো বাগান বা বড় গাছ লাগানোর পরিকল্পনা করলে যে পরিমাণ মাটি লাগে, তার ওজন নেহাত কম নয়। নিয়মিত পানি দেওয়ার ফলে ভেজা মাটির ওজন আরও বেড়ে যায়। তাই ছাদে বাগান করার আগে অবশ্যই জেনে নিতে হবে ছাদের ধারণক্ষমতা কতটুকু, যাতে পরে বাড়ির কোনো ক্ষতি না হয়।
শাওনের পরামর্শ, বাড়ির ধারণক্ষমতার ওপর নির্ভর করেই ঠিক করতে হবে কোন ধরনের গাছ লাগানো সম্ভব। কোনো কারণে ধারণক্ষমতা কম হলেও চিন্তার কিছু নেই। অল্প মাটিতে ছোট গুল্মজাতীয় গাছের বাগান করাও সম্ভব।
কথাটা কতটা গুরুত্বপূর্ণ, একটা হিসাব দিলেই বোঝা যায়। এক ঘনমিটার ভেজা মাটির ওজন এক টনেরও বেশি হতে পারে। দশ-বারোটা বড় ড্রাম মাটিতে ভরে পানি দিলে ছাদের ওপর কয়েক টন বাড়তি ভার চাপে। পুরোনো বাড়ি বা যে বাড়ির নকশায় ছাদে বাড়তি ভারের কথা ভাবা হয়নি, সেখানে এই ভার ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তাই বড় পরিসরে বাগান করার আগে বাড়ির নকশা দেখে নেওয়া কিংবা একজন প্রকৌশলীর পরামর্শ নেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ। ভারী টব আর ড্রাম ছাদের মাঝখানের বদলে বিম বা কলামের কাছাকাছি রাখার পরামর্শও দেন অনেক অভিজ্ঞ বাগানি।
ছাদের ফলবাগান: আম থেকে মাল্টা
শুধু ফুল নয়, শাওনের বাগানে দেখা মেলে নানা রকমের ফলগাছেরও। আমের মধ্যে আছে কিং অব চাকাপাত, বারি আম-৪, কাটিমন, কিউ সাভয়, ব্যানানা ম্যাংগো ও আমেরিকান রেড পালমার। আরও আছে থাই সফেদা, থাই জাম্বুরা, বারোমাসি আমড়া আর লাল জামরুল। পেয়ারার মধ্যে থাই সুপার ১০, থাই ৫ ও মাধুরী। সঙ্গে থাই মিষ্টি কামরাঙা, নাগপুরী কমলা, বারি মাল্টা-১, ভিয়েতনামী মাল্টা, মালবেরিসহ আরও অনেক ফল।
এই সংগ্রহের পেছনে একটা পরিকল্পনা আছে। শাওন আশা করছেন, পরিবারের সারা বছরের ফলের চাহিদা তিনি নিজের বাগান থেকেই মেটাবেন। বারোমাসি জাতগুলো সেই লক্ষ্যে বড় ভরসা। কাটিমন আম মূলত থাইল্যান্ডের জাত; বাংলাদেশে এটি পরিচিতি পেয়েছে সারা বছর ফল দেওয়ার জন্য। একই গাছে কখনো মুকুল, কখনো কচি আম, কখনো পাকা আম দেখা যায়। গাছ তুলনামূলক ছোট থাকে বলে ছাদ আর আঙিনার বাগানিদের কাছে এটি এখন খুব জনপ্রিয়।
বারি আম-৪ বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বারি) উদ্ভাবিত একটি হাইব্রিড জাত, যা নিয়মিত ফলন আর ভালো মানের জন্য পরিচিত। বারি মাল্টা-১ও একই প্রতিষ্ঠানের উদ্ভাবন; ২০০৩ সালে জাতটি উদ্ভাবনের পর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সারা দেশে এটি ছড়িয়ে দিয়েছে। এখন পাহাড় থেকে সমতল, এমনকি শহরের ছাদেও বারি মাল্টা-১ চাষ হচ্ছে। দেশি জাতের সঙ্গে থাই আর ভিয়েতনামী জাত মিলিয়ে শাওন যেন একটি ছোট ফল গবেষণা কেন্দ্রই গড়ে তুলেছেন।
ছাদে ফলগাছ লাগানোর ক্ষেত্রে সাধারণত কলমের চারা বেছে নেওয়া হয়। কলমের গাছ তাড়াতাড়ি ফল দেয়, আকারেও ছোট থাকে, ফলে টব বা ড্রামে রাখা যায়। বীজ থেকে জন্মানো আমগাছ যেখানে ফল দিতে অনেক বছর নেয় আর বিশাল আকার ধারণ করে, সেখানে কলমের চারা ছাদের সীমিত জায়গার সঙ্গে মানিয়ে নেয়।
শাওন ছাদ বাগানে গাছ লাগানোর জন্য তিন রকম পাত্র ব্যবহার করেছেন: টব, ড্রাম এবং চৌবাচ্চা। প্রতিটির সুবিধা আলাদা, প্রয়োজনও আলাদা। তাঁর কাছ থেকে পাওয়া তথ্য ধরে দেখে নেওয়া যাক, একটি সফল ছাদ বাগান কীভাবে গড়ে তোলা যায়।
টব পদ্ধতি: হাতের কাছে, সরানো যায়
টবের বড় সুবিধা হলো দরকার হলে অল্প পরিশ্রমেই এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় সরানো যায়। রোদ বেশি হলে ছায়ায়, ঝড়ের আগে নিরাপদ কোণে সরিয়ে নেওয়া যায়। এ কারণে অনেকের মতো শাওনও ছাদে ফুলগাছ লাগানোর জন্য টব পছন্দ করেন। টবে সার-মাটি দেওয়ার কাজও অল্প খাটুনিতেই সেরে ফেলা যায়।
আজকাল অনেকের মতো তিনিও পোড়ামাটি আর প্লাস্টিক, দুই ধরনের টবই ব্যবহার করেছেন। টবের গায়ে রং করে বাগানের সৌন্দর্যও বাড়িয়েছেন। পোড়ামাটির টবে বাতাস চলাচল ভালো হয়, মাটি অতিরিক্ত ভেজা থাকে না; তবে ভারী আর ভঙ্গুর। প্লাস্টিকের টব হালকা ও টেকসই, কিন্তু কড়া রোদে গরম হয়ে যেতে পারে।
শাওনের মতে, টবে গাছ লাগানোর সময় মনে রাখতে হবে যে গাছ বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে টবের অল্প মাটিতেই তার খাদ্য ও পুষ্টির জোগান ঠিক রাখতে হবে। মাঠের গাছ শিকড় ছড়িয়ে দূর থেকে খাবার টেনে নিতে পারে, কিন্তু টবের গাছের পুরো পৃথিবী ওই কয়েক কেজি মাটি। তাই নিয়মিত জৈব সার দেওয়া, মাঝে মাঝে ওপরের মাটি বদলানো আর গাছ বড় হলে বড় টবে সরিয়ে নেওয়া জরুরি।
হাফ ড্রাম পদ্ধতি: বড় গাছের জন্য বড় পাত্র
বড় জাতের ফুলগাছ আর ফলগাছের জন্য শাওন ব্যবহার করেছেন ড্রাম। তিনি জানান, বড় আকারের ড্রাম মাঝামাঝি কেটে দুই টুকরো করে তিনি দুটি বড় টব তৈরি করেছেন। এটিই ছাদ বাগানিদের কাছে পরিচিত 'হাফ ড্রাম' পদ্ধতি। একটি ড্রাম থেকে দুটি পাত্র, খরচও কম।
ড্রামগুলো তিনি সরাসরি ছাদের মেঝেতে বসাননি, রেখেছেন কয়েকটি ইটের টুকরোর ওপর। এতে ড্রামের নিচে বাতাস চলাচল করে, পানি জমে থাকে না, আর তলার ছিদ্র দিয়ে অতিরিক্ত পানি বাধা ছাড়াই বেরিয়ে যেতে পারে।
শাওন বলেন, অনেকে মনে করেন ছাদের ওপর হাফ ড্রাম রাখলে ছাদের ক্ষতি হয়, যা আসলে সঠিক নয়। তাঁর অভিজ্ঞতায়, ড্রাম মেঝে থেকে একটু উঁচুতে রাখা আর পানি বের হওয়ার পথ ঠিক রাখাই আসল কথা। ড্রামের তলায় কয়েকটি ছিদ্র করে তার ওপর ইটের খোয়া বা নুড়ির স্তর দিয়ে তারপর মাটি ভরলে পানি জমে গাছের শিকড় পচার ঝুঁকিও কমে।
চৌবাচ্চা পদ্ধতি: স্থায়ী বাগানের পরিকল্পনা
ভবিষ্যতে আরও কিছু গাছ লাগানোর জন্য শাওনের পরিকল্পনা স্থায়ী চৌবাচ্চা তৈরির। ছাদ থেকে এক থেকে দেড় ফুট উঁচুতে, তিন থেকে চারটি পিলারের ওপর পানির ট্যাংক বা চৌবাচ্চা আকারের রিং স্লাব বসিয়ে, ইটের টুকরো আর সিমেন্টের ঢালাই দিয়ে তিনি এই স্থায়ী চৌবাচ্চা বানাতে চান।
পিলারের ওপর বসানোর সুবিধা হলো চৌবাচ্চার নিচ দিয়ে বাতাস চলে, ছাদের মেঝে শুকনো থাকে, আর মেঝে পরিষ্কার করাও যায়। চৌবাচ্চায় মাটির পরিমাণ বেশি ধরে বলে বড় ফলগাছ এখানে শিকড় ছড়ানোর জায়গা পায়। তবে ভার সবচেয়ে বেশি এই পদ্ধতিতেই, তাই ছাদের ধারণক্ষমতার হিসাবটা এখানে আরও জরুরি।
শাওনের পরিকল্পনায় আছে আরও একটি মজার দিক। একই ধরনের চৌবাচ্চায় তিনি মাছ আর জলজ উদ্ভিদ চাষ করতে চান। তাঁর বিশ্বাস, এতে ছাদের পরিবেশ আরও সুন্দর হবে। শাপলা বা পদ্মের মতো জলজ ফুল, সঙ্গে কয়েকটি মাছ, ছাদের এক কোণে যেন এক টুকরো পুকুর।
পানি নিষ্কাশন: ছাদ বাঁচানোর মূল কৌশল
ছাদ বাগানের সবচেয়ে উপেক্ষিত অথচ সবচেয়ে জরুরি বিষয় সম্ভবত পানি নিষ্কাশন। শাওন জানান, বাগানের মাটি থেকে চুইয়ে পড়া অতিরিক্ত পানি ছাদের কংক্রিটের ক্ষতি করতে পারে। তার ওপর ছাদে আগাছা জন্মালে মেঝে পিচ্ছিল হয় এবং ধীরে ধীরে ক্ষয় হয়। তাই যে গাছই লাগানো হোক, যে পদ্ধতিতেই লাগানো হোক, পানি নিষ্কাশনের সঠিক পরিকল্পনা থাকতেই হবে।
শাওন টবের গাছের নিচে মাটির ট্রে রেখেছেন। তবে তিনি নিজেই স্বীকার করেন, অতিরিক্ত পানি সামলানোর জন্য এটি যথেষ্ট নয়। উল্টো মাটির ট্রে পানি শুষে নিয়ে সেটি ছাদের মেঝেতেই পৌঁছে দেয়।
তাঁর মতে, সবচেয়ে ভালো উপায় হলো ছাদের মেঝেতে পানিরোধী রং, টাইলস বা আলকাতরার একটি স্তর তৈরি করে তার ওপর যথাযথ নিষ্কাশন নালার ব্যবস্থা করা। নালার মুখে একটি ছাঁকনি রাখা যেতে পারে। এতে পানির সঙ্গে ধুয়ে আসা মাটি নিষ্কাশন নালা বা ছাদে না পড়ে ছাঁকনিতে আটকে থাকবে। এভাবে মাটি আর ছাদ, দুটোরই ক্ষয় রোধ করা যায়।
অনেকে পানি নিষ্কাশনের জন্য ছাদের এক কিনারা সামান্য ঢালু রাখেন; শাওনের মতে এটিও বেশ ভালো উপায়। তবে তিনি জোর দিয়ে বলেন, কোনোভাবেই ছাদের কোনো কিনারা ভেঙে পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করা যাবে না। এতে স্থাপনার বড় ক্ষতি হয়ে যেতে পারে।
ঘরে বানানো জৈব সার
বাজারের রাসায়নিক সারের ওপর পুরোপুরি নির্ভর না করে শাওন বাড়িতেই সার তৈরি করেন। তিনি ব্যবহার করেন খৈল পচা পানি আর নিমপাতা। সরিষার খৈল কয়েক দিন পানিতে ভিজিয়ে পচালে তা গাছের জন্য পুষ্টিকর তরল সারে পরিণত হয়; ছাদ বাগানিদের মধ্যে এই পদ্ধতি বেশ প্রচলিত। ব্যবহারের আগে এই তরল পানিতে মিশিয়ে পাতলা করে নিতে হয়, নইলে কড়া সারে শিকড়ের ক্ষতি হতে পারে।
নিমপাতার তেতো গুণ বহু যুগ ধরে পরিচিত। গ্রামবাংলায় নিমকে প্রাকৃতিক পোকা দমনের উপায় হিসেবে ব্যবহার করা হয়ে আসছে। শাওনের এই ঘরোয়া সারে তাই দুই কাজই হয়: গাছের পুষ্টি আর পোকামাকড় থেকে কিছুটা সুরক্ষা। এভাবেই তিনি দিন দিন তাঁর শখের বাগানকে আরও বড় ও সুন্দর করে তুলছেন।
যাঁরা নতুন শুরু করতে চান
শাওনের অভিজ্ঞতার পাশাপাশি ছাদ বাগান নিয়ে কৃষিবিদ ও অভিজ্ঞ বাগানিদের কিছু সাধারণ পরামর্শও কাজে লাগতে পারে। প্রথম কথা জায়গা বাছাই। বেশির ভাগ ফল ও ফুলগাছ দিনে কয়েক ঘণ্টা সরাসরি রোদ চায়। তাই ছাদের কোন অংশে সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত রোদ থাকে, আর কোন অংশ পাশের উঁচু দালানের ছায়ায় ঢাকা পড়ে, আগে সেটা খেয়াল করে নেওয়া ভালো। ছায়ার দিকটায় রাখা যায় পাতাবাহার বা কম রোদে টিকে থাকা গাছ।
দ্বিতীয় কথা মাটি। টব বা ড্রামে শুধু বাগানের মাটি ভরলে তা পানি পেয়ে জমাট বেঁধে যায়, শিকড় বাতাস পায় না। তাই সাধারণত দোআঁশ মাটির সঙ্গে পচা গোবর বা কম্পোস্ট মিশিয়ে ঝুরঝুরে মিশ্রণ তৈরি করা হয়, প্রয়োজনে সামান্য বালি বা কোকোপিট যোগ করা হয়। এমন মাটি হালকা হয়, পানি ধরে রাখে আবার অতিরিক্ত পানি বেরিয়েও যায়। হালকা মাটি ছাদের ভারও কিছুটা কমায়।
তৃতীয় কথা পানি দেওয়া। ছাদে রোদ আর বাতাস বেশি, তাই টবের মাটি মাঠের চেয়ে দ্রুত শুকায়। গ্রীষ্মে দিনে একবার, প্রয়োজনে দুবার পানি লাগতে পারে; শীত ও বর্ষায় লাগে অনেক কম। আঙুল দিয়ে ওপরের মাটি শুকনো কি না দেখে নিয়ে পানি দেওয়া নিরাপদ অভ্যাস। অতিরিক্ত পানি টবের গাছের সবচেয়ে বড় শত্রুদের একটি, কারণ এতে শিকড় পচে যায়। আর প্রতিবার পানি দেওয়ার পর দেখে নিতে হয়, নিচে পানি জমে থাকছে কি না।
পোকামাকড়ের দিকেও নজর রাখতে হয়। ছাদের গাছে জাবপোকা, মিলিবাগ বা সাদা মাছির আক্রমণ প্রায়ই দেখা যায়; পাতার নিচে, কচি ডগায় এরা দলবেঁধে থাকে আর রস শুষে নেয়। শুরুতেই ধরা পড়লে আক্রান্ত পাতা ছেঁটে ফেলা, পানির ঝাপটা দিয়ে পোকা ধুয়ে দেওয়া কিংবা নিম থেকে তৈরি কীটনাশক ছিটানোই অনেক সময় যথেষ্ট হয়। শাওন যে নিমপাতা ব্যবহার করেন, তার পেছনেও এই যুক্তি। আক্রমণ বেশি হলে স্থানীয় কৃষি অফিসের পরামর্শ নিয়ে তবেই রাসায়নিক ওষুধ ব্যবহার করা উচিত, বিশেষ করে যে গাছের ফল পরিবারের সবাই খাবে।
শেষ কথা ধৈর্য। প্রথম বছরেই সব গাছে ফুল-ফল আসবে না, কিছু গাছ মরেও যেতে পারে। শাওনের বাগানও এক দিনে তৈরি হয়নি; একটি একটি করে গাছ যোগ করে, ভুল থেকে শিখে তিনি আজকের জায়গায় পৌঁছেছেন। শুরুটা করা যায় অল্প কয়েকটি টবে, মরিচ, টমেটো বা পুদিনার মতো দ্রুত ফল দেওয়া গাছ দিয়ে, তারপর ধীরে ধীরে বড় গাছের দিকে যাওয়া।
শহরে ছাদ বাগানের কদর
শাওনের মতো শখের বাগানিদের সংখ্যা এখন দেশজুড়েই বাড়ছে। ঢাকার মতো ঘনবসতির শহরে যেখানে খোলা মাটি প্রায় নেই, সেখানে ছাদই হয়ে উঠেছে সবুজের শেষ আশ্রয়। ছাদ বাগান গ্রীষ্মে ঘরের তাপমাত্রা কিছুটা কমায়, পাখি আর প্রজাপতিকে ফিরিয়ে আনে, আর পরিবারকে দেয় রাসায়নিকমুক্ত টাটকা ফল-সবজি।
সরকারও এই উদ্যোগে উৎসাহ দিচ্ছে। ২০২৩ সালের জুনে স্থানীয় সরকারমন্ত্রী ঘোষণা দেন, সিটি করপোরেশন ও পৌরসভা এলাকায় যেসব বাড়ির মালিক ছাদ বাগান করবেন, তাঁরা হোল্ডিং করে ১০ শতাংশ ছাড় পাবেন। এর আগে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনও ছাদ বাগানের জন্য একই রকম ছাড়ের ঘোষণা দিয়েছিল। তবে মন্ত্রী মনে করিয়ে দেন, এই সুবিধা পেতে কয়েকটি টব রাখলেই হবে না; বাগান নিয়মিত পরিচর্যা করতে হবে, যাতে জমে থাকা পানিতে মশা জন্মাতে না পারে।
সেই সতর্কতা শাওনের পানি নিষ্কাশনের পরামর্শের সঙ্গে মিলে যায়। টবের নিচের ট্রে, ড্রামের তলা কিংবা ছাদের কোণে জমে থাকা পানি এডিস মশার প্রজননের জায়গা হতে পারে। তাই পরিকল্পিত নিষ্কাশন শুধু ছাদ রক্ষার জন্য নয়, পরিবারের স্বাস্থ্যের জন্যও জরুরি।
স্বপ্ন এখন ত্বীন ফলের বাগান
শাওনের বাগান এখানেই থেমে থাকছে না। তিনি জানান, ভবিষ্যতে ত্বীন ফল নিয়ে কাজ করার ইচ্ছা তাঁর অনেক বেশি। মিসরীয় বা আরবীয় জাতের ত্বীন, অর্থাৎ ডুমুর গাছও লাগাতে চান তিনি। মুসলিমদের কাছে ত্বীন ফলের আলাদা পরিচিতি আছে; পবিত্র কোরআনের একটি সুরার নামই 'আত-ত্বীন'। মধ্যপ্রাচ্য ও ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের এই ফল সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশেও শখের বাগানি ও উদ্যোক্তাদের আগ্রহ কেড়েছে। ত্বীন গাছ টবে বা ড্রামেও ফল দেয় বলে ছাদ বাগানের জন্য এটি একটি সম্ভাবনাময় ফল।
করোনার বন্ধে শুরু হওয়া একটি শখ এভাবেই শাওনকে নিয়ে গেছে ফুল থেকে ফলে, টব থেকে চৌবাচ্চায়, আর এখন নতুন ফলের স্বপ্নে। তাঁর বাগান দেখিয়ে দেয়, খানিকটা জায়গা, খানিকটা জ্ঞান আর অনেকখানি ধৈর্য থাকলে শহরের ছাদেও গড়ে তোলা যায় পরিবারের ফলের ভান্ডার। দা এগ্রো নিউজ তাঁর এই উদ্যোগকে স্বাগত জানায় এবং তাঁর ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার জন্য রইল শুভকামনা।
ছবি: ছাদ বাগান, লালবাগ কেল্লা, ঢাকা, Ragib Hasan / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 2.0)



মন্তব্য
(০)