হবিগঞ্জের চুনারুঘাট উপজেলার সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানের নাম এসেছিল সাতটি পাহাড়ি ছড়া থেকে। এখন তার চারটির অস্তিত্বই নেই, যে তিনটি দৃশ্যমান, সেগুলোতেও পানির প্রবাহ নেই বললেই চলে। বনের ভেতরের পুকুরগুলোও বালু ও পলিমাটিতে ভরাট হয়ে গেছে। স্থানীয় বাসিন্দা, বন বিভাগের কর্মকর্তা ও বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, আগামী শুষ্ক মৌসুমে এই বনের প্রাণীরা পানির সংকটে পড়বে।
রঘুনন্দন পাহাড়ি এলাকায় ২৪৩ হেক্টর বা প্রায় ৬০০ একরের এই মিশ্র চিরসবুজ ও পাতাঝরা বন ২০০৫ সালে জাতীয় উদ্যানের স্বীকৃতি পায়। বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী এখানে ২০০টির বেশি প্রজাতির গাছ—শাল, সেগুন, আগর, গর্জন, চাপালিশ, বাঁশ, বেত—এবং প্রায় ১৯৭ প্রজাতির প্রাণী রয়েছে: ২৪ প্রজাতির স্তন্যপায়ী, ১৮ প্রজাতির সরীসৃপ, ৬ প্রজাতির উভচর ও দেড় শতাধিক প্রজাতির পাখি। উল্লুক, চশমাপরা হনুমান, লজ্জাবতী বানর, মায়া হরিণ ও মেছো বাঘের আবাস এই বন; পাখির মধ্যে আছে ধনেশ, বনমোরগ ও লালমাথা ট্রগন।
১৪ সেপ্টেম্বর সরেজমিনে দেখা যায়, সাতছড়ি বন কার্যালয়ের উত্তরে প্রায় ৫০০ মিটার দূরের ১০ শতকের পুকুর এবং প্রবেশপথ থেকে পূর্ব-উত্তরে ৩০০ মিটার দূরের প্রায় ১২ শতকের পুকুর—দুটিই ভরাট। ওয়াচ টাওয়ারের পশ্চিমে বনের গহিনে ১৫ শতকের তৃতীয় পুকুরে পানি থাকলেও গভীরতা একেবারে কমে গেছে। বিজিবি ক্যাম্প ও টাওয়ারের পাশের দুটি ছড়া পাহাড়ি বালুতে হারিয়ে যাচ্ছে; টিপরাপল্লির সামনে থেকে সুরমা ও নোয়াপাড়া চা-বাগান হয়ে সুতাং নদে মেশা বনের বড় ছড়াটিও প্রায় শুকিয়ে গেছে। একসময় এই পুকুরগুলোর পানিতেই তৃষ্ণা মেটাতে আসত হরিণসহ নানা বন্য প্রাণী।
সাতছড়ি টিপরাপল্লির প্রধান ও বাংলাদেশ টিপরা কল্যাণ সংঘের সিলেট বিভাগীয় কমিটির সভাপতি চিত্ত রঞ্জন বর্মা বলেন, বৃষ্টি হলে ছড়াগুলোতে এক-দুই ঘণ্টা পানি দেখা যায়, তারপর শুকিয়ে যায়। বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) হবিগঞ্জ জেলা শাখার সহসভাপতি তোফাজ্জল সোহেলের মতে, বনের জলাধার শুধু প্রাণীর তৃষ্ণা মেটায় না—ব্যাঙ ও কীটপতঙ্গের প্রজনন, খাদ্যের জোগানসহ পুরো বাস্তুতন্ত্রের ভিত্তি তৈরি করে; তাই পুকুর পুনঃখনন করে আগের অবস্থায় ফেরানো খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
উদ্যানের দায়িত্বে থাকা মৌলভীবাজারের বন্য প্রাণী ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ কর্মকর্তা মির্জা মেহেদী সরোয়ার গত জুলাইয়ে বন বিভাগে পাঠানো প্রতিবেদনে জলাধার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কথা এবং পানি ধারণক্ষমতা পুনরুদ্ধার ও বিকল্প উৎস স্থাপনের প্রয়োজনীয়তা উল্লেখ করেছেন। সাতছড়ি রেঞ্জ কর্মকর্তা মোবারক হোসেন বলেন, উদ্যানে আরও পুকুর খননের প্রয়োজন, এবং জলাধারের বর্তমান পরিস্থিতি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জানানো হয়েছে।
বন্য প্রাণী, চিড়িয়াখানা ও সাফারি পার্কের বিশেষজ্ঞ রেজা খান সম্প্রতি সিলেট বিভাগের বনগুলো ঘুরে এসেছেন। তাঁর ভাষ্য, সিলেটের বনগুলোর মধ্যে সবচেয়ে কম ছড়া এখন সাতছড়িতেই; রেস্টহাউসের পাশের প্রধান ছড়াটি মরা ছড়ায় পরিণত হয়েছে। আশপাশের এলাকা থেকে অনিয়ন্ত্রিতভাবে বালু-পাথর তোলার ফলে সৃষ্ট ভূমিক্ষয়েই জলাধারগুলো ভরাট হয়েছে বলে তিনি জানান। তাঁর পরামর্শ—পুকুরগুলো সংস্কার করা, বনের ক্ষতি না করে আরও কয়েকটি পুকুর খনন করা, পাড় খাড়া না রেখে ঢালু করা, যাতে প্রাণীরা সহজে পানির কাছে পৌঁছাতে পারে, এবং সারা বছর পানি থাকার ব্যবস্থা করা।
স্থানীয়দের ভয় অন্য জায়গায়। চাকলাপুঞ্জির বাসিন্দা মনির মিয়া বলেন, বনে পানি থাকলে প্রাণীরা বনেই থাকে; না থাকলে লোকালয়ে চলে আসতে পারে—তাতে প্রাণীও বিপদে পড়বে, মানুষও আতঙ্কে থাকবে। বাসিন্দাদের আশঙ্কা, লোকালয়ে আসা বিপন্ন প্রাণী শিকারিদের কবলেও পড়তে পারে। বন বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, জলাধার পুনঃখনন কেবল প্রাণীর পানির প্রশ্ন নয়—গাছ, মাটি, পানি, পাখি, কীটপতঙ্গ ও স্তন্যপায়ী পরস্পরনির্ভর, এবং বনে পানি না থাকলে আশপাশের মানুষও সংকটে পড়বেন।
সূত্র: প্রথম আলো





মন্তব্য
(০)