জ্যৈষ্ঠের দুপুরে শহরের কোনো পাঁচতলা বাড়ির ছাদে উঠলে এখন প্রায়ই চোখে পড়ে একটি দৃশ্য: রংচটা প্লাস্টিকের ড্রামে কোমর সমান একটি আমগাছ, ডালে ঝুলছে কয়েকটি পাকা আম। নিচে রাস্তার কোলাহল, চারপাশে কংক্রিটের দেয়াল, অথচ এখানে একটুখানি বাগান। শহরে জায়গার অভাবে অনেকেই এখন ছাদে বাগান করার দিকে ঝুঁকছেন, আর দেশের সবচেয়ে প্রিয় ফল আমও সেই বাগানে জায়গা করে নিয়েছে। এর পেছনের মূল কৌশল হলো কলমের চারা। কলমের চারা দিয়ে ছাদে আম চাষ কম পরিশ্রমের, কার্যকর এবং পরিবেশবান্ধব। সঠিক পরিকল্পনা আর নিয়মিত পরিচর্যা থাকলে ছাদেই ফলানো যায় পুষ্টিগুণে ভরপুর সুস্বাদু আম।
শহরের ছাদে আমগাছ কেন
আম শুধু একটি ফল নয়, বাংলাদেশের মানুষের আবেগের অংশ। ২০১০ সালের নভেম্বরে মন্ত্রিসভার বৈঠকে আমগাছকে দেশের জাতীয় বৃক্ষ ঘোষণা করা হয়। উৎপাদনের দিক থেকেও আম বড় ফসল; সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে দেশে প্রায় আড়াই লাখ হেক্টর জমিতে আম চাষ হয়েছে এবং উৎপাদন হয়েছে প্রায় ২৫ লাখ ৮৯ হাজার টন।
তবু শহরের মানুষের কাছে আম মানেই বাজার থেকে কেনা ফল, যার উৎস ও পরিচর্যা সম্পর্কে ক্রেতা প্রায় কিছুই জানেন না। ছাদে নিজের হাতে লাগানো গাছ সেই দূরত্ব ঘুচিয়ে দেয়। সরকারও ছাদবাগানকে উৎসাহ দিচ্ছে। দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের খবর অনুযায়ী, ২০২৩ সালে স্থানীয় সরকারমন্ত্রী ঘোষণা দেন, দেশের সব সিটি করপোরেশন ও পৌরসভা এলাকায় ছাদে বাগান করলে বাড়ির মালিক হোল্ডিং করে ১০ শতাংশ ছাড় পাবেন। এর আগে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন আলাদাভাবে এমন ছাড় চালু করেছিল।
কলমের চারা কী, আর কেন এটি আদর্শ
কলমের চারা বোঝার জন্য একটু পেছনে যেতে হয়। আমের আঁটি থেকে যে গাছ হয়, তা মা গাছের মতো হবে কি না, নিশ্চিত নয়; ফল ছোট হতে পারে, স্বাদ বদলে যেতে পারে, আর ফল আসতেও অনেক বছর লাগে। কলম করার সময় একটি শক্ত চারাগাছের কাণ্ডের সঙ্গে পছন্দের জাতের একটি ডাল জুড়ে দেওয়া হয়। জোড়া লেগে গেলে ওপরের অংশ হুবহু সেই জাতের বৈশিষ্ট্য বহন করে। ফলে আম্রপালির কলম থেকে আম্রপালিই পাওয়া যায়, ল্যাংড়ার কলম থেকে ল্যাংড়া।
এই কারণেই ছাদবাগানের জন্য কলমের চারাই আদর্শ। প্রথমত, এটি কম ঝামেলায় বেড়ে ওঠে এবং দ্রুত ফল ধরে। দ্বিতীয়ত, বীজ থেকে চাষ করা গাছের তুলনায় এটি বেশি ফলনশীল। তৃতীয়ত, কলমের গাছ সাধারণত আকারে তুলনামূলক ছোট ও ঝোপালো থাকে, তাই টবে এবং অল্প জায়গায় চাষের জন্য উপযুক্ত। চারা কেনার সময় জোড়ার জায়গাটি ভালোভাবে দেখে নেওয়া দরকার; জোড়া মসৃণ ও শক্ত হলে বুঝতে হবে কলম ঠিকমতো লেগেছে। সরকারি হর্টিকালচার সেন্টার বা পরিচিত নার্সারি থেকে চারা নেওয়া নিরাপদ।
শুরুর আগে যা জোগাড় করবেন
কাজে নামার আগে উপকরণগুলো হাতের কাছে গুছিয়ে রাখলে রোপণের দিন ঝামেলা কম হয়। একটি আমগাছের জন্য মোটামুটি যা লাগবে:
- ১৮ থেকে ২৪ ইঞ্চি গভীর একটি বড় টব, হাফ ড্রাম বা ড্রাম, তলায় কয়েকটি ছিদ্রসহ।
- ছিদ্রের মুখ ঢাকার জন্য ভাঙা মাটির টবের টুকরো বা ইটের খোয়া।
- দোআঁশ মাটি, পচা গোবর বা কম্পোস্ট, আর বালি, প্রায় ছয় ভাগ, দুই ভাগ ও দুই ভাগ হিসাবে।
- অল্প পরিমাণ টিএসপি ও পটাশ সার।
- আম্রপালি, হিমসাগর বা ল্যাংড়ার মতো ভালো জাতের একটি সুস্থ কলমের চারা।
- চারা বাঁধার জন্য একটি সোজা কাঠি ও নরম দড়ি।
- ড্রাম ছাদ থেকে একটু উঁচুতে রাখার জন্য কয়েকটি ইট।
ছাদের কোন কোণে গাছ রাখবেন
আমগাছ রোদ ভালোবাসে। তাই ছাদের এমন জায়গা বেছে নিতে হবে, যেখানে দিনের বেশির ভাগ সময় পর্যাপ্ত সূর্যের আলো পৌঁছায়। পাশের উঁচু ভবন বা পানির ট্যাংকের ছায়া যেখানে পড়ে, সেখানে গাছ লম্বাটে হয়ে যায়, ফুল ও ফল কম আসে।
দ্বিতীয় শর্ত হলো পানি নিষ্কাশন। ছাদে যেখানে বৃষ্টির পানি জমে থাকে, সেখানে ড্রাম রাখা ঠিক নয়; ড্রামের নিচ দিয়ে বের হওয়া পানি যেন দ্রুত নালার দিকে চলে যায়, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। মাটি ও পানিভর্তি বড় ড্রাম বেশ ভারী হয়, তাই পুরোনো বা দুর্বল ছাদে একসঙ্গে অনেক ড্রাম বসানোর আগে ভবনের ভার বহনের ক্ষমতা সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া বুদ্ধিমানের কাজ। অনেকে ড্রামগুলো দেয়াল বা কলামের কাছাকাছি সারি করে রাখেন। ড্রাম সরাসরি ছাদের মেঝেতে না বসিয়ে চার কোণে ইট দিয়ে সামান্য উঁচু করে রাখলে নিচে বাতাস চলাচল করে, পানি জমে ছাদের ক্ষতি হয় না, আর ড্রামের ছিদ্রও বন্ধ হয় না। ছাদে জলরোধী আস্তর থাকলে তা আরও নিরাপদ।
টব না ড্রাম: পাত্রের মাপ
আমগাছের শিকড় গভীরে যেতে চায়, তাই ছোট টবে এটি টেকে না। মাটি ধরে রাখার ক্ষমতা ভালো এমন বড় টব বা ড্রাম ব্যবহার করতে হবে। ১৮ থেকে ২৪ ইঞ্চি গভীর এবং প্রায় ততটাই চওড়া টব বা ড্রাম বেছে নেওয়া ভালো। বাজারে পাওয়া প্লাস্টিক বা লোহার ড্রাম মাঝখান থেকে কেটে দুটি হাফ ড্রাম বানিয়ে নিলে খরচও কম হয়।
টবের নিচে অবশ্যই ছিদ্র রাখতে হবে, যাতে অতিরিক্ত পানি বেরিয়ে যেতে পারে। আমগাছের শিকড় জমে থাকা পানি সহ্য করতে পারে না; শিকড়ে বাতাস না পেলে পচন ধরে, আর গাছ ধীরে ধীরে হলুদ হয়ে মারা যায়। ছিদ্রের মুখে ভাঙা মাটির টবের টুকরো বা ইটের খোয়া দিলে মাটি বেরিয়ে যায় না, কিন্তু পানি ঠিকই চলে যায়।
মাটির মিশ্রণ: গাছের খাবারঘর
টবের গাছ মাঠের গাছের মতো চারদিকে শিকড় ছড়িয়ে খাবার খুঁজতে পারে না; ড্রামের মাটিই তার পুরো খাবারঘর। তাই মাটির মিশ্রণ তৈরিতে যত্ন দরকার। মিশ্রণে ৬০ শতাংশ দোআঁশ মাটি, ২০ শতাংশ জৈব সার, অর্থাৎ পচা গোবর বা কম্পোস্ট, এবং ২০ শতাংশ বালি ব্যবহার করা যায়।
দোআঁশ মাটি হলো বালি, পলি আর কাদার মাঝামাঝি মিশ্রণ; এটি পানি ধরে রাখে, আবার অতিরিক্ত পানি ঝরিয়েও দেয়। জৈব সার মাটিকে ঝুরঝুরে রাখে এবং ধীরে ধীরে গাছকে খাবার জোগায়। বালি মেশালে মাটি জমাট বাঁধে না, শিকড় অনায়াসে ছড়াতে পারে এবং পানি বের হওয়ার পথ খোলা থাকে।
মাটিতে প্রয়োজনীয় পুষ্টি সরবরাহের জন্য মিশ্রণে কিছু টিএসপি এবং পটাশ সারও মিশিয়ে নিতে হয়। টিএসপি থেকে গাছ পায় ফসফরাস, যা শিকড় গঠনে সাহায্য করে; পটাশ গাছকে রোগ প্রতিরোধে শক্ত করে এবং ফলের মান ভালো রাখে। মিশ্রণ তৈরি করে ড্রামে ভরে কয়েক দিন পানি দিয়ে রেখে দিলে সার মাটির সঙ্গে ভালোভাবে মিশে যায়, তারপর চারা লাগানো নিরাপদ।
কোন জাত বেছে নেবেন
ছাদের জন্য জাত বাছাই একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত। ভালো মানের কলমের চারা সংগ্রহ করতে হবে, যেমন আম্রপালি, হিমসাগর, ল্যাংড়া ইত্যাদি। এর মধ্যে আম্রপালি টবে চাষের জন্য বিশেষভাবে জনপ্রিয়। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বারি) এটিকে বারি আম-৩ নামে অবমুক্ত করেছে। কৃষি তথ্য সার্ভিসের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এটি প্রতি বছর নিয়মিত ফল দেয়, গাছ তুলনামূলক খাটো ও খাড়া, আর ফলের শাঁস গাঢ় কমলা রঙের ও আঁশহীন। এ কারণে ছাদ ও বারান্দার টবে এই জাত বেশি দেখা যায়।
হিমসাগর ও ল্যাংড়া স্বাদের জন্য বিখ্যাত। চাঁপাইনবাবগঞ্জের ক্ষীরশাপাতি, যা হিমসাগর নামেও পরিচিত, ২০১৯ সালে দেশের তৃতীয় ভৌগোলিক নির্দেশক পণ্য বা জিআই পণ্যের স্বীকৃতি পায়; এর আগে এই স্বীকৃতি পেয়েছিল জামদানি ও ইলিশ। জিআই মানে কোনো পণ্যের সঙ্গে নির্দিষ্ট এলাকার পরিচয়ের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি। এই জাতগুলো সাধারণত আম্রপালির চেয়ে বড় গাছ হয়, তাই ড্রামে লাগালে নিয়মিত ছাঁটাই করে আকার নিয়ন্ত্রণে রাখতে হয়।
চারা রোপণের নিয়ম
ড্রাম প্রস্তুত হয়ে গেলে মাঝখানে চারার মাটির বলের সমান একটি গর্ত করতে হবে। চারার পলিব্যাগ সাবধানে কেটে সরিয়ে দিতে হবে, যাতে শিকড়ের চারপাশের মাটি ভেঙে না যায়। এরপর চারার গোড়া শক্তভাবে মাটিতে বসিয়ে চারপাশের মাটি হাত দিয়ে চেপে দিতে হবে, যাতে ভেতরে ফাঁকা জায়গা না থাকে।
খেয়াল রাখতে হবে, কলমের জোড়ার জায়গাটি যেন মাটির নিচে চাপা না পড়ে। রোপণের পরপরই হালকা পানি দিতে হবে; বেশি পানি দিলে নরম মাটি বসে গিয়ে চারা হেলে পড়তে পারে। ছাদে বাতাসের বেগ বেশি, তাই প্রথম কয়েক মাস একটি সোজা কাঠির সঙ্গে চারা আলগা করে বেঁধে রাখলে ভালো।
সেচ ও পানি নিষ্কাশন
ছাদের গাছের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা পানি। কংক্রিটের ছাদ দুপুরে প্রচণ্ড গরম হয়, আর ড্রামের সীমিত মাটি মাঠের তুলনায় অনেক দ্রুত শুকায়। তাই চারার মাটি সব সময় আর্দ্র রাখতে হবে, তবে পানি জমতে দেওয়া যাবে না। নিয়ম হিসেবে গ্রীষ্মকালে প্রতিদিন এবং শীতকালে দুই থেকে তিন দিন পর পর পানি দেওয়া যায়।
পানি দেওয়ার আগে আঙুল দিয়ে মাটি পরীক্ষা করে নেওয়া ভালো অভ্যাস। ওপরের এক থেকে দুই ইঞ্চি শুকনো লাগলে পানি দিন, ভেজা থাকলে আরেক দিন অপেক্ষা করুন। সকালে বা বিকেলে পানি দেওয়াই উত্তম; ভরদুপুরে গরম মাটিতে পানি দিলে তা দ্রুত বাষ্প হয়ে যায়। বর্ষায় উল্টো সমস্যা: টানা বৃষ্টিতে ড্রামে পানি জমছে কি না, ছিদ্র বন্ধ হয়ে গেছে কি না, তা দেখে নিতে হবে।
গাছ বড় হয়ে ফল দিতে শুরু করলে সেচের হিসাবে একটু বদল আসে। কৃষি তথ্য সার্ভিসের আম বাগান পরিচর্যা বিষয়ক লেখায় বলা হয়েছে, ফুল আসার এক মাস আগে সেচ না দেওয়াই উত্তম, কারণ তখন সেচ দিলে গাছে নতুন পাতা বের হয় এবং মুকুলের সংখ্যা কমে যায়। আবার ফল ধরার পর থেকে বর্ষা শুরু পর্যন্ত নিয়মিত সেচ দিলে গুটি ঝরা কমে। টবের সীমিত মাটি দ্রুত শুকায় বলে মুকুল আসার আগের সময়টায় গাছ যেন নেতিয়ে না পড়ে, সেটুকু খেয়াল রেখে পানির পরিমাণ কমিয়ে আনা যায়।
সার প্রয়োগ
ড্রামের মাটির পুষ্টি ধীরে ধীরে ফুরিয়ে যায়, তাই নিয়মিত খাবার দেওয়া জরুরি। রোপণের এক মাস পর থেকে প্রতি মাসে জৈব সার প্রয়োগ করতে হবে। পচা গোবর, কম্পোস্ট বা সরিষার খৈল পচানো পানি টবের গাছের জন্য ভালো জৈব খাবার। সার দেওয়ার সময় গাছের গোড়া থেকে একটু দূরে, ড্রামের কিনারার দিকে মাটি হালকা খুঁচিয়ে মিশিয়ে দিতে হয়, তারপর পানি।
গাছে ফুল আসার সময় পটাশ সার প্রয়োগ করলে ফলন ভালো হয়। পটাশ ফুল ও কচি ফল ধরে রাখতে সাহায্য করে এবং আমের মিষ্টতা ও রং ভালো করে। তবে রাসায়নিক সার সব সময় অল্প মাত্রায় দিতে হবে; ড্রামের সীমিত মাটিতে অতিরিক্ত সার শিকড় পুড়িয়ে দিতে পারে। মাত্রা নিয়ে সংশয় থাকলে উপজেলা কৃষি অফিস বা নিকটস্থ হর্টিকালচার সেন্টারের পরামর্শ নেওয়া ভালো।
গাছ বড় হয়ে নিয়মিত ফল দিতে শুরু করলে মাঠের আমবাগানের সার দেওয়ার নিয়মটিও জেনে রাখা কাজে লাগে। কৃষি তথ্য সার্ভিসের পরামর্শ অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি থেকে শেষ সময়ে পুরো পরিমাণ গোবর, টিএসপি, জিপসাম, জিংক সালফেট ও বোরিক এসিড এবং অর্ধেক ইউরিয়া ও অর্ধেক এমওপি সার প্রয়োগ করতে হয়। গাছের বয়স অনুযায়ী সারের পরিমাণ বাড়ে। ড্রামের গাছে এসব সারের মাত্রা মাঠের গাছের তুলনায় অনেক কম হবে, কিন্তু সময়ের হিসাবটি একই রকম কাজে আসে: বর্ষার শেষে ভালো খাবার পেলে গাছ শীতের আগে শক্ত হয়ে ওঠে এবং পরের মৌসুমে মুকুল ভালো আসে।
ছাঁটাই ও পরিচর্যা
টবের আমগাছকে সুন্দর আকারে এবং ফলবান রাখতে ছাঁটাই জরুরি। গাছের শুকনো ডাল এবং মরা পাতাগুলো নিয়মিত কেটে ফেলতে হবে। ভেতরের দিকে ঘন হয়ে থাকা ডাল পাতলা করে দিলে গাছের ভেতরে আলো-বাতাস ঢোকে, রোগবালাইও কম হয়। কৃষি তথ্য সার্ভিসের পরামর্শ হলো, আম সংগ্রহের পর রোগাক্রান্ত বা মরা ডালপালা একটু ভালো অংশসহ কেটে ফেলা; কারণ আম তোলার পরেই গাছে নতুন ডাল গজায়, আর সেই ডালেই পরের বছর মুকুল আসে।
গাছে রোগবালাই হলে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে। পাতায় কালো দাগ, মুকুল কালো হয়ে ঝরে যাওয়া বা কচি আমে দাগ দেখা দিলে তা অ্যানথ্রাকনোজ নামের ছত্রাকজনিত রোগের লক্ষণ হতে পারে। ছাদের গাছ চোখের সামনে থাকে বলে প্রতিদিন একবার পাতা, ডাল ও মুকুল দেখে নেওয়ার অভ্যাস করলে সমস্যা শুরুতেই ধরা পড়ে।
পোকামাকড় দমন
বাড়ির ছাদে যেহেতু পরিবারের সদস্যরা হাঁটাচলা করেন, শিশুরা খেলে, তাই পোকা দমনে রাসায়নিকের চেয়ে জৈব উপায়ই আগে ভাবা উচিত। পোকামাকড় দমনে প্রয়োজন অনুযায়ী জৈব কীটনাশক, যেমন নিমের নির্যাস, ব্যবহার করা যায়। ফেরোমন ফাঁদ ব্যবহার করলে পোকার আক্রমণ কম হয়। ফেরোমন ফাঁদে পোকার নিজস্ব গন্ধের মতো একটি রাসায়নিক থাকে; পুরুষ পোকা সেই গন্ধে আকৃষ্ট হয়ে ফাঁদে আটকে যায়। আমের বড় শত্রু ফলের মাছি দমনে এই ফাঁদ বেশ কার্যকর।
মুকুলের সময় হপার বা শোষক পোকা মুকুলের রস চুষে ফুল ঝরিয়ে দেয়। কৃষি তথ্য সার্ভিস বলছে, মুকুল বের হওয়ার আনুমানিক ১৫ থেকে ২০ দিন আগে পুরো গাছ ভালোভাবে ধুয়ে দেওয়ার মতো করে কীটনাশক স্প্রে করলে এই পোকা আগেভাগেই নিয়ন্ত্রণে আসে। আক্রমণ বেশি হলে কৃষি তথ্য সার্ভিস মুকুল ১০ থেকে ২৫ সেন্টিমিটার লম্বা হলে কিন্তু ফুল ফোটার আগে সাইপারমেথ্রিন গ্রুপের কীটনাশক প্রতি লিটার পানিতে ১ মিলিলিটার হারে স্প্রে করার পরামর্শ দেয়; ফুল ফোটা অবস্থায় স্প্রে করা ঠিক নয়, তাতে মৌমাছির মতো উপকারী পোকার ক্ষতি হয়। কচি আম বড় হতে শুরু করলে ফল ব্যাগিং, অর্থাৎ প্রতিটি আম বিশেষ কাগজের ব্যাগে মুড়ে দেওয়া, ফলের মাছি ও ভোমরা পোকা থেকে রক্ষার সবচেয়ে কার্যকর ও লাভজনক উপায় বলে কৃষি তথ্য সার্ভিস উল্লেখ করেছে। অল্প কয়েকটি গাছের ছাদবাগানে এটি হাতেই করা যায়।
কবে মিলবে ফল
কলমের চারার বড় সুবিধা হলো অপেক্ষা কম। কলমের চারা সাধারণত দুই থেকে তিন বছরের মধ্যেই ফল ধরে। প্রথম দিকে গাছে মুকুল এলেও সব আম রেখে দিলে ছোট গাছ দুর্বল হয়ে পড়ে; তাই গাছ যথেষ্ট শক্ত না হওয়া পর্যন্ত অল্প কয়েকটি ফল রাখাই বুদ্ধিমানের কাজ।
ফল পাকার পর সাবধানে সংগ্রহ করতে হবে। বোঁটার কাছে রং হালকা হলুদ হতে শুরু করলে বা আধাপাকা আম নিজে থেকে ঝরতে শুরু করলে বুঝতে হবে তোলার সময় হয়েছে। আম টেনে না ছিঁড়ে বোঁটাসহ কেটে তুললে কষ লেগে দাগ পড়ে না, আমও বেশি দিন ভালো থাকে।
তোলা আম ছায়ায়, খবরের কাগজ বা খড় বিছিয়ে একটি স্তরে সাজিয়ে রাখলে কয়েক দিনের মধ্যে নিজে থেকেই সমানভাবে পেকে ওঠে। একটির ওপর আরেকটি চাপা দিয়ে রাখলে চাপ লাগা জায়গায় আম দ্রুত নষ্ট হয়। ছাদের গাছ থেকে একসঙ্গে সব আম না পেড়ে যেগুলো আগে পরিপক্ব হয়েছে সেগুলো আগে তুললে পুরো মৌসুম জুড়ে একটু একটু করে টাটকা আম খাওয়া যায়; বাজারের আমের সঙ্গে নিজের গাছের আমের এটাই বড় পার্থক্য।
ছাদে আমবাগানের যত সুফল
প্রথম সুফল সতেজ ও বিষমুক্ত ফল। নিজের বাগানের আম বিষমুক্ত ও সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক, কারণ কী সার আর কী ওষুধ দেওয়া হয়েছে, তা নিজেই জানা থাকে। কৃত্রিমভাবে পাকানোর রাসায়নিকের দুশ্চিন্তা নেই। তাই বাজারের ফলের তুলনায় এটি স্বাস্থ্যকর। পুষ্টির দিক থেকেও আম সমৃদ্ধ; যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগের খাদ্য তথ্যভান্ডার অনুযায়ী, ১০০ গ্রাম পাকা আমে প্রায় ৬০ ক্যালরি এবং প্রায় ৩৬ মিলিগ্রাম ভিটামিন সি থাকে, সঙ্গে থাকে ভিটামিন এ তৈরির উপাদান।
দ্বিতীয় সুফল জায়গার সঠিক ব্যবহার। শহরের ছোট জায়গাতেও ছাদে আম চাষ করা সম্ভব, আর তা ছাদের সৌন্দর্যও বাড়ায়। তৃতীয় সুফল আর্থিক সাশ্রয়। বাজার থেকে আম কেনার বদলে নিজের বাগান থেকে ফল সংগ্রহ করা সাশ্রয়ী, আর একবার লাগানো গাছ বছরের পর বছর ফল দেয়, তাই দীর্ঘমেয়াদে এটি একটি লাভজনক উদ্যোগ। ছাদবাগানের জন্য হোল্ডিং করে ছাড়ের সুযোগও এই হিসাবে যোগ হয়।
চতুর্থ সুফল পরিবেশের। ছাদে গাছ থাকলে সূর্যের তাপ সরাসরি কংক্রিটে পড়ে না, ফলে ছাদ ও নিচের ঘর তুলনামূলক ঠান্ডা থাকে। গাছ বাতাস থেকে ধুলো আটকায় এবং বাড়ির চারপাশের বাতাসকে শীতল ও নির্মল রাখতে সাহায্য করে। পাখি আর প্রজাপতিও ফিরে আসে কংক্রিটের শহরে।
পঞ্চম সুফল মনের। বাগান পরিচর্যা মানসিক চাপ কমায়। অফিস শেষে কিছুক্ষণ গাছের যত্ন নেওয়া, নতুন পাতা গজানো দেখা, প্রথম মুকুলের অপেক্ষা, এসব এক ধরনের প্রশান্তি এনে দেয়। এটি একটি দারুণ শখ, যা শরীর ও মন দুটোকেই সুস্থ রাখে। শিশুরাও হাতে-কলমে শেখে গাছ কীভাবে বড় হয়, ফল কোথা থেকে আসে।
একটি ড্রাম থেকে কয়েক বছরের ফল
ছাদে আমের কলমের চারা বাগান করা শুধু কম পরিশ্রমের নয়, পরিবেশ ও স্বাস্থ্যের জন্যও অত্যন্ত উপকারী। সঠিক জায়গা, ভালো ড্রাম, যত্ন করে তৈরি মাটি, মানসম্মত কলম আর নিয়মিত পানি ও সার, এই কয়েকটি শর্ত মানলেই সুস্বাদু, পুষ্টিকর ও বিষমুক্ত আমের ফলন পাওয়া সম্ভব। বর্ষার শুরু, অর্থাৎ জ্যৈষ্ঠ-আষাঢ়, চারা লাগানোর ভালো সময়; তাই পরিকল্পনা এখন থেকেই করা যায়।
শহরের ছাদে একটি ড্রাম হয়তো সামান্য জায়গা নেয়, কিন্তু কয়েক বছর পর জ্যৈষ্ঠের কোনো বিকেলে নিজের গাছ থেকে প্রথম পাকা আমটি পেড়ে খাওয়ার আনন্দ বাজারের কোনো ফলের সঙ্গে তুলনা করা যায় না।
ছবি: টবে আমের চারা, SYFTV1 / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC0)



মন্তব্য
(০)