বাংলাদেশ রেস্তোরাঁ মালিক সমিতি রবিবার ঢাকায় সংবাদ সম্মেলন করে গরুর মাংস আমদানির সুযোগ দেওয়ার দাবি জানানোর পর দেশে মাংসের দাম ও খামার খাতের সুরক্ষা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে। বাজারে এখন গরুর মাংস বিক্রি হচ্ছে কেজিপ্রতি ৮০০ থেকে ৮৫০ টাকায়; সমিতি বলছে, আমদানির সুযোগ পেলে দাম ৫০০ টাকার মধ্যে নামিয়ে আনা যাবে।
সমিতির মহাসচিব ইমরান হাসানের বক্তব্য, হোটেল-রেস্তোরাঁর ব্যবসা গরুর মাংসের ওপর নির্ভরশীল, অথচ দাম ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে গেছে এবং বেশি দামে খামারের মাংস কিনলেও রেস্তোরাঁর উপযোগী মাংস পাওয়া যাচ্ছে না। তার অভিযোগ, বড় শিল্পগ্রুপ ও শৌখিন উদ্যোক্তারা খামার নিয়ন্ত্রণ করায় দাম বেড়েছে আর সাধারণ কৃষকের জন্য গরু পালন ব্যয়বহুল হয়ে উঠেছে। তবে তিনি স্বীকার করছেন, সংবাদ সম্মেলনে দাবি জানালেও সরকারের কাছে আনুষ্ঠানিক কোনো প্রস্তাব তারা এখনো দেননি।
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব মোঃ দেলোয়ার হোসেন জানিয়েছেন, মাংস আমদানির কোনো পরিকল্পনা সরকারের নেই এবং এমন প্রস্তাবও কেউ দেয়নি। তার ভাষায়, "এবারের কুরবানিতেও পর্যাপ্ত সংখ্যক গবাদিপশু বাজারে আসবে। ফলে সরবরাহজনিত কারণে দাম বৃদ্ধির কোনো আশংকা নেই। আর আমরা মনে করি আমদানির প্রয়োজনীয়তাই তো নেই। কারণ কুরবানির চাহিদা পূরণের পরেও দেশে প্রায় ২৫ লাখের বেশি গবাদিপশু উদ্বৃত্ত থাকে।"
দামের ইতিহাস বলছে বৃদ্ধি কতটা দ্রুত। ২০১৯ সালের রোজায় ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন গরুর মাংসের দাম কেজিপ্রতি ৫২৫ টাকায় বেঁধে দিয়েছিল; ২০২১ সালে একই সময়ে দাম ছিল ৫৬০ থেকে ৬০০ টাকা, ২০২২ সালে সর্বোচ্চ ৬৫০ থেকে ৭০০ টাকা, আর টিসিবির বাজারদর অনুযায়ী ২০২৩ সালে ৭২০ থেকে ৭৫০ টাকা। অনেকের অভিযোগ, ভারত থেকে গরু আসা বন্ধ থাকার সুযোগে এক শ্রেণির বিক্রেতা দাম এই পর্যায়ে তুলেছেন। দেশে প্রায় ৬০ হাজার হোটেল-রেস্তোরাঁ আছে, যার ২৫ হাজারই ঢাকায়।
আমদানির পথ নীতিগতভাবেও সংকীর্ণ। ২০২২ সালের এপ্রিলে জারি হওয়া আমদানি নীতি আদেশে প্রথমবারের মতো গরু, ছাগল ও মুরগির মাংস আমদানিতে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের পূর্বানুমতির বিধান আসে, এবং এরপর বিশেষ কারণ ছাড়া অনুমতি দেওয়া হয় না। ২০১২ সালের পর ভারত গরু রপ্তানিতে কড়াকড়ি আরোপ করলে এক পর্যায়ে গরু আসা প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। কিছু প্রতিষ্ঠান অবশ্য হিমায়িত মাংস আমদানি করে, যা পাঁচতারকা হোটেল ও কিছু রেস্তোরাঁয় ব্যবহৃত হয়।
প্রস্তাবটি নতুনও নয়। ২০১৮ সালে দেশের কিছু ব্যবসায়ী ভারত থেকে মাংস আমদানির প্রস্তাব দিলে তৎকালীন এফবিসিসিআই সভাপতি শফিউল ইসলাম মহিউদ্দিন একে 'বাস্তবসম্মত সমাধান' বলেছিলেন; কিন্তু প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় তা নাকচ করে জানায়, বছরে দেশের ৭০ লাখ টন মাংসের চাহিদার পুরোটাই দেশে উৎপাদিত হচ্ছে, আমদানি করলে খাত সংকটে পড়বে। ২০২৪ সালের অগাস্টে সরকার পতনের কয়েক মাস আগে ব্রাজিলের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর প্রথম ঢাকা সফরে ব্রাজিল কেজিপ্রতি পাঁচশ টাকারও কম দামে মাংস সরবরাহের প্রস্তাব দেয়, বাংলাদেশ পাল্টা জীবন্ত গরু আমদানির আগ্রহ জানায় — এরপর আর অগ্রগতি হয়নি।
খামারি ও এগ্রোবিজনেস উদ্যোক্তাদের জন্য মূল প্রশ্নটি তাই দুই স্বার্থের ভারসাম্যের: ভোক্তা ও রেস্তোরাঁ চান সস্তা মাংস, আর গত এক দশকে খামার ও মাংসজাত পণ্যে বিনিয়োগ করা উদ্যোক্তারা চান সুরক্ষা। সরকার এখন পর্যন্ত দেশের পশু উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে এমন কোনো সিদ্ধান্তে যেতে রাজি নয়।
সূত্র: বিবিসি বাংলা





মন্তব্য
(০)